আহা এই গ্রামের মানুষ এই তো কিছু দিন আগেও পুখুরের জল খেতো।তার পরে গাঁয়ের পশ্চিম পাড়াতে একটা ইন্দারা তৈরি হলো।গোটা গ্রামের মেয়েরা সকাল সাঁঝ বিরামহীন পানি তুলে নিয়ে যায়।তখন সেই ইন্দারাতলা মেয়েদের হাসি বেদনায় মুখর থাকত-কিন্তু একি জামানা এলো!ঘরে ঘরে পাড়ায় পাড়ায় টিপকল বসালো সরকার।মাঠে মাঠে দুবার করে ধান চাষ।হদহদ করে পানি উঠে মাঠেদের ভাসিন দিছ্যে!হা গো তাজ্জ্যোবের কতা!এই ফকরে মাঠে কুনুদিন ফসল কুটো হয় নি তাকেবল পানির আকালে- আর এখুন এতো ফসল এতো ফসল!বলি আগকার দিনে মানুষেরা কি উদো ছ্যেল্যো!অত-অত মানুষ খাবারে কাঙালে মরে যেলছে।এই মাটি কাটলেই পানি।লাও কেনে কতো পানি লিবে।খালি এই জেহেন খাটাল্যেই তো আবাব ত্বরিন যেতো।পরক্ষনেই গুলঞ্চর মা মাথা এপাশ ওপাশ করে,উঁহু আগকের মানুষরা দুনিয়াকে বডো ভালোবাসত,এই ফকরে মাঠে পানির কাঙ্গাল ছ্যেলো ঠিকই কেন্ত মুশুরি,খেসারি,ছুলা,মোশনে কি হয় নি!কই এখুন হয় না কেনে?মানুষ নাই,মানুষ নাই,বাচ্চা ছেলেদের এতো অত্যাচার বেড়েছে কাঁচাতেই তুলে লিছে,গাঁয়ে শাসুন নাই।দেখো কেনে কি হয়।এগু পিছা না ভেবে দুনিয়া কত্তে নেমেছে মানুষ!
আপন মনে গুলঞ্চর মা কলসি কাঁখে নিয়ে চলতে চলতে এইই সব বলতে বলতে এগিয়ে যায় দক্ষিণ পাড়ার দিকে।তার মনেই নেই যে তার মেয়ে গুলঞ্চ রামদা হাতে নিয়ে গ্রামের দিকে দৌড়ে গেছে।এতো মনে রাখে না সে।তাহলে আপন পেটের কক্ষের ছেলেপিলেরা যা জ্বালন জ্বলায় তাতে বেঁচে থাকার যো কোতায়!খাও কাজ করো দুনিয়াকে ঠ্যেন্ডা রেখো।নামাজ কালাম করো।ব্যাস তাহলেই হবে।এই সব ভাবনা তার একটাও কাজে লাগে না।আগেই বলেছি গুলঞ্চ একটা কান্ড আজ ঘটিয়েছে।গুলঞ্চর মাকে কেউ কেউ জিজ্ঞাসা করে তুমাদের ঘরে কি হলছ্যে গ্যো?
কি জানি বাছা কি হল্যোছ্যে!আমি কি ঘরে রইছ্যি হা!আমি তো খাবারের পানি আনতে এই দক্ষিণপাড়া আলছ্যি।
তা বটে- তা পানি কি পেল্যে?কেউ কেউ প্রশ্ন করে এগিয়ে যায়।
গুলঞ্চর মা জবাব দেয়- না,কল খেরাপ হুয়ে যেলছ্যে বাছা।বল্যি পুঞ্চায়েতের বোদোরা ভোট লিব্যার বেলানে ভোট লিবে আর আমাদের দিকে ফিরেও চেহে দেখে না।যাগগো যেয়ে এই বেটিনে আমাকে আবার যেতে হবে মহজিদের কলে।সিতা যেতে গেল্যে আবার একখান ঢালোয়ার ঢেলে যেতে হবে। একতো অতোবড়ো হাঁড়ি কাঁখে কর্যে আনত্যে হবে-উল্টোদিকে আবার - গায়ে মাথায় হিজাব লাও নাহলে চাদর ঢালো।হা-গো কাজের সুমোতে এই সব কি ভালো লাগে!আমরাও তো বড়ো হলছ্যি না কি?কই কুনু মৌলোবি এসে কুনুদিন কয়নি কি “এইদেখো গো গুলুর মা শুনো,বুরখা পিন্দে কুলি হেঁট্যো!”
দুদিনের ছুঁড়ারা সব বেড়ে উঠল্যো আমার ছামুতে। লিজে চ্যোখ্যে দ্যেখলাম-ছুটু থেকে তাদের না আছে কুরান পড়া না আছে নামাজ পড়া- না ভালো কাজকাম করা,না চোখ্যের লজর ভাল্যো!তারা যেই মাজ-বয়সি হচ্চ্যে আর তোউবা কত্তে শিখেছে-মহজিদে বসে দলপাকায়ছে-আবার দল বেন্দে এসে বলছে “বুরখা পিন্দে বাইরে যেতে হবে।”
কেনে?বুরখা পিন্দে কি ছাগোল গরুর গুয়াল ফেলব্যো?বুরখা পিন্দে কি আমি খাবারের পানির হাঁড়ি কাঁখে করে নিয়ে আনবো?কেনে বুরখা পিন্দে কি আমি ধান ভাপাবো ধান সিজেবো ধান লাড়াচাড়া করে ঝেড়ে পাছুড়ে চেলে-চুলে ডেরেমে ভরবো? কেমুন আ-শল্যো কতা শুনো দিকিনি!কিন্তু কি করব বল্যো!এই পাড়ার সামারসাল্টো খেরাপ হুয়ে যেলছে এপাড়ার সগ মাগিগুলান ঢালোয়র ঢেলে চলল্যো মহজিদের কলে পানি লিতে।আমাকেও তাই কত্তে হবে!
গুলঞ্চর মা মাথায় ঘোমটাকে টেনে একটু বেশি করে বাড়িয়ে নেয় যাতে করে কারো চোখে চোখ দিতে না হয়।একটু জোরে পা চালিয়ে ঘরে আসে।যতই ভাবে আর ছেলে মেয়েদের কথা ভাববে না কিন্তু তাতে কি যো আছে!ভাবতেই হবে।খালি কলসি নিয়ে বাড়ির উঠোনে ফিরে আসে।খালি কলসি নিয়ে রাস্তায় বেরোনোও যেমন অ-সাত তেমনি খালি কলসি ঘরে নিয়ে আসাও অ-সাত অশুভ।এই সব কথা ভেবে গুলঞ্চর মায়ের মনের ভিতটা খুঁতখুঁত করতে থাকলো।
ঘরে লোকে লোকারণ্য! কি হয়েছে?
উঠোন ভর্তি মানুষদের ধমক দিয়ে বলছে গুলঞ্চ - চলে যাও নিজের নিজের ঘরে, কি তামাসা দেখতে এসেছো?
কিছু লোক চলে যায়,কিছু দেমাক নিয়ে দাঁড়িয়েই থাকে।
দাঁড়িয়ে থাকা লোকদের উদ্দেশ্যে গুলঞ্চোর মা বলেন-বাছা তুমরা কতো ডাঁরিন রইব্যে!এই তালাই বিছন দিলাম বসো।আমার বিটির কথায় রাগ কর্যো না বাছা। মানুষের ঘরে মানুষ আসলে তাড়িন দিতে হয় না।এসো বাছারা বসো।
দাঁড়িয়ে থাকা লোকেরা কেউ কেউ এই আহ্বানে চঞ্চল হয়ে চলে গেলো।গুটিকয় মানুষ এসে তালায়ের উপরে বসলে গুলঞ্চর মা জানতে চাইলো কি হল্যো গুলু?রামদা নিয়ে যে গেলি তা-কে,কি কুপিন দিতে পেরেছ্যিস?আমি যত বলছি উয়ার সঙ্গ ছেড়ে দে ছেড়েদে।গড়সম্পক্ক হচ্ছে বিয়ে দিতে পারব্যো না।তা তু কুনু কতাই কানে দিস না! যাগগো যিয়ে সে কতা কয়ে লাভ নাই। তা হলোট কি?
চাটায়ে বসে থাকা একটি মানুষ বলতে শুরু করলো।আহা গুলু- তু কিন্তু কামটো ঠিক কর্যিস নি।উদিকে ছুঁড়ার বিয়ের দিন ঠিক কততে আলছে আর তু ওই বিরানা গাঁয়ের লোকদের ছামুতে রামদা নিয়ে বললি “আমাকে যদি বে না করিস তাহলে কেটে দুটুকরো করে দুব্যো”।
গুলঞ্চ এই সব কথা শুনে হেসে ফেললো।তার হাসি এতো সাবলীল যে দেখে কে বলব্যে সে একটু আগেই মাকালিরে মূর্তি ধারন করেছিলো!বড়ো তাজ্জ্যোব!
তালায়ে বসে থাকা লোকেরা এক দুই করে চলে গেলে গুলঞ্চর মা গুলোঞ্চর দিকে এগিয়ে এসে বলে-যা কান্ড তুরা শুরু করেছিস তাতে হেস্তন্যাস্ত হবে না জিন্দেগীতে।উ ছুঁড়া সম্পকের না।কেনে অখেই বিয়ে কত্তে হবে?
গুলঞ্চ হেসে বলে-না মা অখে বে আমি করব্যো না,তবে আমার বিয়ে যাতে আর উ না ভাঙ্গাতে পারে তার ব্যবস্থা করে এলাম।
এতক্ষণ পর্যন্ত যা বললাম তা সবই পুরোনো কথা।কি হবে এসব কথা বলে।অনেক দিন হল্যো গুলুর মা মারা গেছে।কত আলো আঁধার এসেছে গেছে।কত মানুষ পাতা ঝরার মতো ঝরে গেছে। কত শিশু জন্মেছে তারা জোয়ান হয়েছে।কিচ্ছু থেমে নেই কেবল গুলঞ্চর জীবন গেছে থেমে।সেদিন রামদা দেখিয়ে যে বিয়ে সে বন্ধ করেছিলো সেটাই জীবনের কাল হয়ে দাঁড়ালো।যতই গড়সম্পর্কের আত্মীয় তবুও লোকটা জেদ করেই বিয়ে করেছিল।তার পর কয়েকদিন ভালো গেলেও আর পথ ছিলো না।রাস্তা বন্ধ!গোটা গ্রামের পুরুষদের একতা আছে তার সঙ্গে মেয়েরাও পুরুষের বিজয় পতাকা আপন কাঁধে নিয়ে গুলঞ্চোর পথে পাথর ছড়িয়ে দিলো। গুলু কাউকে কিছু বলে না।এক গুমোট বাতাবরনে নিজেকে আটকে রেখে কেবলই গুমরে যায় কেবলই উবে যায় অস্তিত্বহীন হয়ে শূণ্যে ভাসে।কেবলই অথৈ ডুব।
এই ভাবে তো চলতে পারে না।তাই সে সরে নড়ে চলতে চায়লে সামনে দেখে কাজের ক্ষেত্র।একদিন সেই অফিসে গিয়ে বলল একটি কাজ দিতে হবে।
মাইনে?
যেমন জীবন চলে যেতে পারে এমন মাইনে দিলেই হবে।শিক্ষাগত যোগ্যতা-জীবনিপুঞ্জ জমা দিয়েছে।বেসরকারি প্রতিষ্ঠান-কাজের চাপ আছে তবে মানুষিক অত্যাচার নেই।কাজ বুঝিয়ে বলেন- “কাজটা আপনার,এই পাঁচ দিনের মধ্যে কাজটি প্রতিবেদন সহ সমাপ্ত করতে হবে।এবার আপনি যেমন ইচ্ছে তেমন করেই করতে পারেন।”
গুলঞ্চ মন দিয়ে কাজ করে।এতোদিনে একটা রাস্তা পেয়েছে।অফিস আসার জন্য সময়েই স্নান সেরে খেয়েদেয়ে পোশাক পরে বেরিয়ে পড়ে সাইকেল নিয়ে। বলে রাখি,তার মা মারা যাবার পরে সে মায়ের বাড়িতেই ফিরে এসেছে।ভাবীরা পৃথক থাকে।গুলুও ভিন্ন হাঁড়ি চাপায়।এতোদিন ঘরে বসেই ছিলো ততদিন তার বর কোনো খবর নেয় নি ,যেই অফিসে যোগ দিয়েছে অমনি তার বর লোকের উপরে লোক পাঠাচ্ছে- গুলঞ্চকে শ্বশুরবাড়ি নিয়ে যাবার জন্য। গুলু এই সং দেখে একটু থেমে যায় ।ভাবনা নিয়ে নাড়াচাড় করে।ভাবে –এতো দিন সাড়া নেই তাহলে এতো দিনে সাড়া কেনো?আচ্ছা তাহলে উকিলে বলেছে তাকে।
গ্রামের মানুষেরা গুলঞ্চের বাবাকে বলে মেয়েকে শ্বশুরবাড়ি পাঠিয়ে দিন।গুলুর বাবা হেসে বলেন-কে মেয়ে?কার ঘর?কার বাবা?কে জানে!আকাশের দিকে তাকিয়ে ফেক ফেক করে হাসে।তার হাসিগুলো বিড়ির ধোঁয়ার মতো গন্ধ ছড়িয়ে হাওয়াতে মিশে যায়।
বরের মাতব্বরেরা সোজাসুজি গুলুকে বলে-তোকে যেতে হবে শ্বশুরঘরে।দেখছিস না তাদের ঘরে কত কাজ,গুরু ছাগল হাসমুরগি চাষবাস নিয়ে লাজেহাল তারা।রামদা দেখিনে অদের ঘরের বউ হলছিস থালে আখুন শ্বশুরঘ যাবি না কেনে?তুখে যেতে হবে না হলে তালাক লিয়ে লে। একটা প্রবাদ শুনিয়ে দেয়-“দুনি বুয়াবোও না- মান্দা ছাড়বো না” তা কল্লেতো হবে না বাফু। ঝাহোক একট কিছু করে লে।ইসপার উসপার।লে,কি বলছিস বল!আমারা কি তুর পায়ে ত্যাল ডলত্যেই থাকব্যো?
গুলু পরিষ্কার জবাব দেয়- আপনারা কোনো দিন এইই বিষয় নিয়ে আমার কাছে বলতে আসবেন না।আমি এখন আমার বাড়িতেই থাকবো এটাই আমার ইচ্ছা আমার আজাদি।
একথা শুনে গ্রামের মোড়লদের খুব গোসা হলে তারা গুলুর বরের আর একটা বিয়ে দেয় ঘটা করে।তাতে ভালো পণও পায়।গুলুর শ্বশুরের জমিজমা ভালো।যাকে দুশরি বৌমা করেছে সে গরীব ঘরের মেয়ে।পাড়ার লোকেদের চোখে সে বড়ো ভালো মেয়ে-মাথা থেকে কাপড় খোসে ঘাড়ে পড়ে না।চোখে চোখে কথা বলে না।সাতচড়ে মুখে রা নেই।আহা ডৌল-ডিজাইন খুব যুতের।কোরান খতম দিয়েছে পাঁচ থেকে সাত বার।এদিকে উচ্চোমাধ্যমিক পর্যন্ত পড়েছে।
কণ্যাশ্রী নিয়েছে রূপোশ্রী নিয়ে তার সঙ্গে আরো কিছু টাকা লাগিয়ে লাখ খানেক নগদ দিয়েছে বরের বাবাকে।দ্বিতীয় বৌ ঘরে আনার সঙ্গে সঙ্গে সেই মাস থেকেই আর তাকে ডুব দিতে হয় নি।আহা পাড়া থেকে পাড়া ধ্যনধ্যন করে।এক বার পাড়ার একটি বাচ্চা মেয়ে এসে বলেছিলো-“লৌতুন চাচী লৌতুন চাচী তুমার লুলু হবে তাই না?আমাকে পড়াট খানি বলে দাও”।
যেই বই খোলা অমনি লৌতুন চাচী ফেল্।সে কিছুই পড়াতে পারে না।লোতুন বৌ পড়া বলে দিতে না পারার জন্য মাথা নামিয়ে লজ্জ্বায় বসে আছে।বাচ্চাটার কি হাসি সে সমানে বলে যাচ্ছে –কান ধরো কান ধরো।
বৌমায়ের এমন অবস্থা দেখে শ্বাশুড়ি বলে - আজকাল কি আর পড়ালেখার দাম আছে গো!পড়া পারবেই বা কি করে? বোদো মাস্টাররা সুব্বাইকে অপর কিলাসে উঠিন দিছে।পড়া পারুক আর না পারুক।ফেল নাই!হা গো সুব্বাই পাশ?ইয়া কি আতান্দার কতা!সুবাই কি পাশ কত্তে পারে?তা হলে ছেলেদের কি দোষ দিব্বে?যাও মা যাও তুমি লিজের পাটকাম করোগা।
কই র্যে কি পড়তে আলছিস?এই বলে লৌতুনির শ্বাশুড়ি সহজপাঠ খুলে বলে- বলি হারে এই পোড়াট সেই কুন জামানা থেকে আছে- এই পোড়াট এই ইস্কুলের চারিদিকের ছাগল ভেঁড়ারা শিকে লিয়েছে।তা তু আখুনো শিকতে পারিস নি খ্যো!
“র্যাম বুনে ফ্যুল পাড়্যে,
গায়ে তার ল্যালশ্যাল।
হাত্যে তার স্যাজি।”
বাচ্চাটা বলে – না গো দাদী ইটো পড়া লয়খো,ইটো তো কবে হুয়ে যেলছে ,এই দ্যাখো-চলো ভাই নিলু তেল মেখে জলে ডুব --
লওতুনির শ্বাশুড়ি চোখপাকিয়ে বলে সগুলি পড়া জানিস যতি থালে কি কত্তে আলছিস? ঝা ঝা বাপকে বলগা পিরাইভেট মাস্টার দিব্বে।
লৌতুনির শাশুড়ি হাঁসের ছানাদের পিটুলি খাওয়াবার জন্য উঠোনের একধারে টপ্পাতে ঢাকা ছানাদের বের করে ডাক দেয়-আয় আয় তিতিতিতি।
পাড়ার মেয়েরা আগে গুলুর কাছে কেউ এসে তার শ্বশুর ঘরের গল্প করতো না কিন্তু এখোন করে।লৌতুনি পড়া পারে না-সে মিছে করে বলেছে উচ্চমাধ্যমিক পাশ দিয়েছে-হা গো আমাদের ঘরের মেয়েরা কি পড়ে না-না কি? এই যি সারা দিন বই বগলে একবার স্কুল একবার পিরাইভেট যেছে।হ্যাঁ বুন তুর মতুন কি আর হলছে হা!যতই করুক বিইলে ইস্তিরির পারা কি আর হবে?খুদা আছে হাশরের মাঠে জুও্যাব দিত্যেই হবে।সেদিন কেররই ছাড় নাই খো।
গুলঞ্চ বিরক্ত হয় এই সব কথা শুনে- কিন্তু যে কাঁটার জঙ্গলে তার বাস তাকে তো কাঁটার খোঁচা খেতেই হবে। থাকতে না পেরে এক দিন অফিসের কলিগকে তার ব্যক্তিগত সমস্যাটা বললে অফিস জানালো তাকে আইনি সাহায্য করবে এবং এটা সম্পূর্ণ অফিসের খরচায়। শুরু হল মামলা।মামলার শুরু আছে শেষ নেই।অনেকটা রাস্তার মতো।ফেলেদিলাম লতা চলে গেলো কলকাতা।ব্যাস আর যায় কোথায়!গুলঞ্চর এবার প্রোমোশন অফিসে।পদ হলো তার পারিবারিক কাউন্সিলিং কোরডিনেটর।মাইনে ভালো কিন্তু সমস্যা হাজার।আগে ভাবতো তার জীবনটা ছিঁড়েখুঁড়ে গেছে কিন্তু এখন দেখে-শুধু তার জীবন ছিঁড়েখুঁড়ে ঝরে নি।গোটা সমাজটা মেয়েদেরকে বিবস্ত্র করে রেখেছে এবং এই লজ্জ্বা ঢাকতে মেয়েরা চার দেওয়ালের আগোল ভাঙতে পারছে না।
মামলা শুরু হয়েছে চলছে –কি ভালো গো বিচারক!তিনি তো কয়েকটা তারিখ নিয়েই একটা থাকধার করে দিলেন।বাহবাঃ কি আনন্দের কথা!পরে কতো টাকা খোরপোষ দিতে হবে পরে বলা যাবে কিন্তু এক্ষুনি এক্ষুনি দিতে হবে মাসে তিন হাজার টাকা।গুলঞ্চ এখন ভালো যুক্তি দিয়ে মেয়েদের বোঝায় কর্ম জীবনের আনন্দের কথা। তবুও নিজের অধিকার ছাড়া যাবে না।তাই আদালতে যাওয়া।ভারতজুড়ে নারী আন্দোলন চলছে তাতে সব সম্প্রদায়ের মেয়েদের অধিকারের কথা আছে।এদিকে আন্দোলনের শ্লোগান হাইজ্যাক করেছে সরকার।কি মুস্কিল!আরে অত্যাচারির বিরুদ্ধেই না আমাদের ঝান্ডা ধরা কিন্তু অত্যারি এসে যদি সেই ঝান্ডা নিজের হাত ধরে তাহলে কার বিরুদ্ধে লড়াই!আগুনে পানি ঢেলে দিয়ে দারুণ আনন্দ বয়ে আনলো- এতো বছরের একটা নারীর অধিকারের আন্দোলনের অবসান ঘটেছে তাহলো এক সঙ্গে তিন তালাক বলা যাবে না আর মেয়েদের নানা সমস্যার সমাধান করে দিয়েছে এই আইন এই সব প্রচার চালাচ্ছে মেরে খাওয়া জেতা পাটির লিডারেরা।
গুলঞ্চকে অনেক মঞ্চ ফোন করে ডাকে-“আরে এসো এসো তোমাকে এই সুপ্রিম কোর্টের এই রায় নিয়ে বলতে হবে।বলতে হবে এবার থেকে মুসলমান মেয়েদের কতটা উন্নয় হবে।এই যে তোমাদের তিন তালাক বন্ধ করেদিলো সরকার।এবার যদি কেউ তার স্ত্রীকে তিন তালাক বলে তাহলে কি হবে জানো? হু হু বাবা সুজা জেল।অপরাধ! অপরাধ।অপরাধ!যা হোক সরকার একটো কাজই করেছে ইবারে!কুনু সরকার পারে নি।কেবল –”
গুলঞ্চ খেপে গিয়ে বলে – খুব হয়েছে এবারে থামোতো দেখি।কেবল বৌ তাড়ানো চায়েওয়ালা সরকারই পেরেছে এই তিন তালাক বন্ধ করতে!চালুনি আবার সূচের কসুর।
যা বাবা! এ আবার কি কতা গো!কালের ভালো কল্লে মুন্দ!
গুলঞ্চ অফিসে বসে আছে,ফাইল গুলো নিয়ে থানাতে যাবে-সঙ্গে ডেকে নিয়েছে ওই সমস্ত মেয়েদের যারা খোর-পোশের মামলায় জিতেই গেছে- কিন্তু সমাজের পোশাক পরা লোকগুলো আদালতের রায় আমান্য করেছে-
গুলঞ্চ ছেড়ে পালানোর পাত্রী না- সে ভিক্টিম মেয়েদের পক্ষ থেকে আদালত অবমাননার কেশ করেছে-সেটাতে উয়ারেন্ট হয়েছে ওই স্বামীগুলোর।কিন্তু উয়ারেন্ট কে নিয়ে যাবে?কার কাছে নিয়ে যাবে?কবে যাবে?হাজার প্রশ্ন করে মেয়েরা।গুলঞ্চ হাসে-সে বলে এটাই এবার আমাদের কাজ।চলো থানা চলো।মেয়েরা বলে থানা গিয়ে গিয়ে হন্যে- বড়োবাবু বললেন-আপনার বর কখন এই আমাদের থানার দিকে আসছে এই খেয়াল রাখুন আর যেই দেখবেন সে বেরিয়েছে আমাদের ফোনে জানিয়ে দেবেন কি রঙের জামা পরে আসছে।ব্যাস আর চিন্তা নেই।
গুলঞ্চ-তার পরে কি তাই করেছো?
ভিক্টিম মেয়ে- হ্যাঁ দিদি তাই করেছি।আমি ওই জহন্নেমের পেচ্ছ্যা পেচ্ছ্যা টিয়েলিতে ছিলাম। টো নিয়ে টো নিয়ে ঘুরে বেড়ায়ছি কখুন কুন বাগে সে যেছে।হ্যাঁ এক দিন দেকল্যাম-থানার রাস্তা নিয়েছে অমনি তড়াম করে ফোন লাগিনে দিয়েছি বড়োবাবুকে-
গুলঞ্চ- অমনি দড়িতে ফাঁস লাগিয়ে আব্দুল মাঝি এগিয়ে গিয়ে বললো-আও রে বাচ্চা, তাই না?
ভিক্টিম মেয়ে- না তা বলে নি, বললো- স্বামী কুনদিকে যেছে ইটো খুব দেকতে পারেন এখুন।তখুন এই কাজটই কল্লে পরে স্বামী কুনুবাগে লজর দিতে পাত্তুক না।ঘরে কাজ কাম নাই? সি কি চড়া গলার রেওয়াজগো বড়োদারগার! আমাকে খেকিনে বললো- আমাদের অফিসে কেউ নেই যে আপনার স্বামিকে ধরতে যাবে।
গুলঞ্চ খুব হাসে।এই হাসি বড়ো নাচারের হাসি।আচ্ছা চলো আজ থানা যাবো সবাই এসেছে?
ভিক্টিম মেয়ে- দিদি সবাই থানার কাছে গিয়ে দাঁড়িনে আছে তুমি যেলেই হবে।
গুলঞ্চ উয়ারেন্টের ফাইলটা নিয়ে থানার উদ্দ্যেশ্যে গেলে দেখে মেয়েরা দাঁড়িয়ে আছে। কিন্তু এক সঙ্গে এতো মেয়েকে থানার গেটে ঢুকতে দেবে না রক্ষি-এই জন্য যে এই থানাটাকে মাও-অধ্যুষিত ঘোষনা করেছে।একথা শুনে মেয়েরা বললো-মাও ফাও বুজি না।জহন্নমেদের নামে উয়ারেন আছে ধত্তে যাবে কি না বলো?
বেচারা রক্ষী সেও তো সিভিক তার ধমকাধমিকে মেয়েরা পাত্তা দেয় না।এদিকে গেটে এমন ঝামেলা ধরা পড়েছে ক্যমেরাতে।এর নিরসন করতে এগিয়ে আসেন মেজোবাবু।মেজোবাবু বিশাল ভুড়ি!দেখে মনে হয় ভ্রূণের নবম মাহিনা বয়স হবে।তিনি লদরপদর করে গেটে এলে তাকে দেখে মেয়েদের কি হাসি। বেচারা মেয়েরা গ্রামের উঠোন খামারে লিপন দেওয়া,দেওয়ালে নক্সাকাটা আর কুড়োবুড়ো শাকে রসুনের ফোড়ন দিয়ে স্বাদে ভরেদেয়া মন তাই সুখ দুঃখ ধুপছায়ার মতোই এই হাসিতে খেলে যায়।তা যতই স্বামী খেতে পরতে না দিক।কিন্তু আজ একি দেখছে তারা!
দুজন মেয়ে মুখে কাপড় নিয়ে সেই যে হাসতে শুরু করেছে সে হাসি তাদের থামেই না।এক জন আর একজনকে আঙুল বাড়িয়ে বলে – হা-লো ইয়া কুথা এলাম!এই পুলিশের যদি এতো মুটা প্যাট হয় থালে কি করে উ আমার জহন্নমেকে তেড়ে ধরব্যে বলদিখিনি বুবু?সে তো চোচ্চুঠঠা-দোড়ে পালাবে।
আর এক জন মেয়ে হাসি থামিয়ে বলে- শুশোনি দাইকে ডাক পুলিশটোকে খালাস কত্তে হবে।
গুলঞ্চ দাঁড়িয়ে সব দেখে-তার হাসি এলেও হাসে না।শুধু ভাবে সব জাগা নষ্ট করে রেখেছে সরকার।তবুও ঝরঝরে আওয়াজ তুলে গেটের দিকে এগিয়ে গেলে পুলিশ বাধা দেয় না।মেয়েরা হাসি থামিয়ে গুলঞ্চর পিছুপিছু যায়।
বড়োবাবু অফিসে থাকলেও দায়িত্ব দেয় এস আইকে।এস আই মেয়েদের দিকে একবার তাকিয়ে নেয় তার পরে প্রশ্ন-
আপনার স্বামির নাম কি?
১ম মেয়ে-ওই যে সীতার স্বামীর যা নাম ছ্যেলো।স্বামীর নাম মুখে ল্যে যাবে না তো।
গুলঞ্চ এক ধমকদেয়- কে তোমার স্বামী? যে তোমাকে রেখে দিয়ে আবার একটা বিয়ে করে সুখে ঘর করে আর তুমিপথে পথে দৌড়াও ভাত দাও কাপড় দাও করে কাঁদো বামুনের ঘরের মেয়ে তুমি।কত কষ্ট করে তোমাকে আদালতে টেনে এনেছি।এসো নিজের অধিকারের কথা বলো।কতো মার খাবে আর?মাথায় সিঁদুর ঘোষে কতদিন স্বামীর উপস্থিতি বুঝাবে সমাজকে?
এদিকে দ্বিতীয় মেয়ে বলে-ও ছটবাবু ওই দেখেন আমার স্বামীর নামের ফাইলটো দেকতে পেছি,অটোই বটে- আমার স্বামির নাম আফজলে স্যাক।
এস আই –কোন গ্রা-------ম ?
কেনে খোলসাগড়ে-লেখায়ত রইছে গো। ভালো করে দেখ্যেন কেনে?
এস আই গান গাইতে গাইতে ফাইল খোঁজে উলটোদিকের র্যাকে –
তুমি যে আমার কত আপনার-
তুমি কি তা জানবে এ এ এ-
তুমি কাছে এসো
তুমি ভালোবাসো
আমি যে তোমার
কতো আপনার---।
এই গান শুনে মেয়েরা পরস্পরের দিকে চেয়ে দেখে।ভ্রু তোড়ে ফিসফিস করে বলে আমাদের আগুনে আমরা মচ্ছি আর পুলিশের ঢঙ্গের গান শুন লো!
বড়োবাবু ডেকে পাঠিয়েছে গুলঞ্চকে- ম্যাডাম আমরা কতবার ধরতে যাবো বলুন? আপনারা যাদের জন্য এসেছেন তারা বেশ কয়েক বার জেলে থেকে এসেছে এই আপনাদের খোরপোষ কেশের আদালতের রায় মানে নি বলেই উয়ারেন্ট-আমরা গেছি ধরতে।গ্রামের মানুষ অনুরোধ করেছে এখোন তো ধান রোঁয়ার সময় তাই এখন কাউকে ধরা যাবে না।গ্রামের মানুষ বলে দিয়েছে কথা না শুনলে ভোটের সময় দেখে নেবে।বলুন দিদিমুনী আমাদের হাত পা বাঁধা। এগোইতে পাচ্ছি না। সরকার যা বলবে তাতো করতে হবে।না কি বলুন আপনিই বলুন!ধান রুইতে আর মাত্র দশদিন লাগবে তার পরে ওরা নিজেরাই থানাতে দেখা করে জেলে ধুকে যাবে।কটা দিন জেলের ভাত খাবে। দিদি আর সেদিন নাই যে পীটেবে পুলিস।ঊ বেটা আরামে ঘাসছিড়ে ভাত খাবে।ছেলে গুলোর আদব আছে খুব ভালো ব্যবহার করে বলেই জেল থেকে চাদ্দিন আগেই ছাড়া পায়।একটু ধৈর্য ধরুন।দেখবেন খেয়াল রাখবেন গাঁয়ে ওদের দেখা যাচ্ছে কি না। শাস্তি ওরা পাবেই-
গুলঞ্চ দাঁড়িয়ে থাকে আদালত দাঁড়িয়ে থাকে হাকিমের হুকুম দাঁড়িয়ে থাকে মাঠে ধান রুয়া হয় ধান কাটা হয় - ফসল তোলে পুত্রসন্তানকে দইভাত খাওয়ায় লৌতুনির শাঁখ বাজে-পূজো পেরিয়ে যায় ফাল্গুন ভেসে যায় ঈদের মোনাজাতে সবার মঙ্গল চায় হাজার প্রার্থনা হাত।গুলঞ্চ,রোহিনি,নীলিমা,কদরা,সাফিন মলিন শাড়ি পরে লক্ষীভান্ডারের টাকা তুলতে যায় উকিলকে দিতে হবে-ফোনে রিচারজ করতে হবে বড়োবাবুর হুকুম জহন্নেমেরা থানার পাশ দিয়ে গেলেই টুক করে ফোন করেদিলেই কাজ,হু হু বাবা দ্যাশে লৌতুন আয়েন হলছে।