পড়শি যদি আমায় ছুঁতো যম যাতনা সকল যেত দূরে: লালন সাঁই

পড়শি যদি আমায় ছুঁতো যম যাতনা সকল যেত দূরে: লালন সাঁই

hhhhhhhhhhhhhh

১৬ই আগস্ট ১৯৮০; চল্লিশ বছর পেরিয়ে ফিরে দেখা সেই ভয়ঙ্কর দিন

  • 17 August, 2020
  • 0 Comment(s)
  • 440 view(s)
  • লিখেছেন : ডঃ দেবাশিস মজুমদার
১৬ই আগস্ট, ১৯৮০ সালের ঘটনা বাঙালি ক্রীড়া সংস্কৃতি ও সামাজিক মননে ভীষণভাবে প্রাসঙ্গিক। এই ঘটনা আমাদের অনেক বড় শিক্ষা দিতে গেছে। মাঠের পরিবেশ আর রণক্ষেত্র কখনও এক হতে পারে না। খেলার প্রতিদ্বন্দ্বিতার আবেগ অনেক নিয়ন্ত্রিত ও পরিশীলিত হওয়া উচিত সেই শিক্ষা দিয়ে গেছে এই ঘটনা।

গতকাল ১৬ই আগস্ট ছিল ‘ফুটবল শহীদ দিবস’। ১৯৮০ সালের ১৬ই আগস্টের দিনে ইডেনে (রঞ্জি স্টেডিয়াম) মোহনবাগান-ইস্টবেঙ্গল কলকাতা লীগের ডার্বি ম্যাচকে কেন্দ্র করে যে মর্মান্তিক দূর্ঘটনা ঘটেছিল তার চল্লিশ বছর পূর্তির দিন। ঐ দিন সেই দূর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছিলেম ১৬ জন ফুটবলপ্রেমী বাঙালি আর গুরুতএ আহত হয়েছিলেন আরও বহু মানুষ। সেইসময় মোহনবাগান ইস্টবেঙ্গলের মত বড় দলের খেলা অনেক সময়ই আয়োজিত হত ইডেনে গার্ডেন্সে। কিন্তু তার জন্য প্রয়োজনীয় পরিকাঠামো ছিল না। ১৯৭০ এবং ১৯৮০-র দশকে ফুটবলকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা বাঙালি আবেগ ছিল অপরিমেয়। সেইসঙ্গে ফুটবলকে কেন্দ্র করে হিংসাত্মক ঘটনার সংখ্যা ও সম্ভাবনা উভয়েই বাড়ছিল। ১৯৭০-এর দশকের প্রথম পর্যায়ের রাজনৈতিক অস্থিরতা ও তার থেকে উদ্ভুত সামাজিক হতাশা ১৯৭০-এর দশকের শেষে এবং ১৯৮০-র দশকের শুরুর দিকেও কিছুটা বজায় ছিল। ফলে যুবসম্প্রদায়ের মধ্যে যে উত্তেজনা ছিল তার বহিঃপ্রকাশ অনেক সময় ঘটে যেত ফুটবল মাঠে নিজের প্রিয় দলের প্রতি সমর্থনে ও বিপক্ষ দলের প্রতি বিরূপতায়। যার থেকে ১৯৭০-র দশকের শেষের দিকেই মোহনবাগান-ইস্টবেঙ্গল এবং ইস্টবেঙ্গল-মহমেডান ম্যাচকে কেন্দ্র করে বহু দর্শক উত্তেজনার ঘটনা ঘটতে শুরু করেছিল। ছোটখাটো কিছু হিংসার আভাসও পাওয়া যাচ্ছিল। কিন্তু আইএফএ এইসব বিষয়কে একরকম অবহেলা করেই চলে আসছিল। আইএফএ-র তরফে এই বিষয়ে তখন কোনও সদর্থক ভূমিকা নেওয়ার পরিকল্পনা দেখা যায়নি। নবগঠিত বামপন্থী রাজ্যসরকারকে সেইসময় বেশ কিছু উল্লেখযোগ্য সংস্কারের পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হচ্ছিল আর্থ-সামাজিক ক্ষেত্রে ফলে খেলার মাঠের এই বিশেষ সমস্যাটি কিছুটা অন্তরালেই রয়ে যায়। অর্থাৎ ১৬ই আগস্ট ১৯৮০ সালের পূর্বেই কলকাতা ময়দান ডার্বি ম্যাচকে কেন্দ্র করে আগ্নেয়গিরিতে পরিণত হয়েই ছিল অগ্ন্যুৎপাত ঘটে ওই বিশেষ তারিখে।

ইতিপূর্বে বেশ কয়েকটি ম্যাচে দর্শক হিংসার পরিবেশ তৈরী হওয়া সত্ত্বেও আইএফএ সাবধান হয়নি। শুধু তাই নয় ১৬ই আগস্ট ১৯৮০-র তারিখে রঞ্জি স্টেডিয়ামের গ্যালারিতে মোহনবাগান ও ইস্টবেঙ্গল সমর্থকদের পাশাপাশি একসাথে বসানো হয়েছিল। ফলে মিশ্র জনতার মধ্যে উত্তেজনা ছড়িয়ে ছিল অত্যন্ত দ্রুত দাবানলের মত। প্রত্যক্ষদর্শী অনেকেই উল্লেখ করেছেন যে খেলা শুরু হওয়ার অনেক আগে থেকেই মাঠে উত্তেজনা ছিল। টিকিটের লাইনে দাঁড়ানো নাকাল জনতার মধ্যে ক্ষোভ জমতে শুরু করেছিল আগে থেকেই। যদিও এই খেলাটি ছিল শুধুমাত্র কলকাতা লীগের একটি সাধারণ ডার্বি ম্যাচ কোনও নক আউট ডার্বি নয় কিন্তু তাসত্ত্বেও সেসময়ের পরিবেশ অনুসারে এই খেলার জন্যও উত্তেজনা ছিল তুঙ্গে। উভয়পক্ষের সমর্থক দর্শকদের এটা ছিল চরম সম্মানের বিষয়। কারণ আমাদের এটা মনে রাখতে হবে ১৯৭৫-এর শিল্ড ফাইনালে ইস্টবেঙ্গলের কাছে ০-৫ গোলে হেরে যাবার পরে আত্মহত্যা করেছিলেন তরুণ মোহনবাগান সমর্থক উমাকান্ত পালৌধি। অর্থাৎ আবেগের বহিঃপ্রকাশটা ছিল অত্যন্ত চরম। এই সময় ফুটবলাররাও ছিলেন দর্শক-সমর্থকদের কাছে ঈশ্বরের প্রতুভয় স্বরূপ।

 

এইরকম পরিবেশে খেলার দ্বিতীয়ার্ধের ১২ মিনিটের মাথায় যখন মোহনবাগানের বিদেশ বসু ও ইস্টবেঙ্গলের দিলীপ পালিত একে অন্যের সঙ্গে রীতিমতো শারীরিক সংঘাতে জড়িয়ে পড়েন তখন উত্তেজিত গ্যালারিকে আর সামলানো যায়নি। যদিও রেফারি সুধীন চ্যাটার্জী যথেষ্ঠ কড়া হাতেই খেলা পরিচালনা করছিলেন এবং বিদেশ বসু ও দিলীপ পালিত উভয়েই লাল কার্ড দেখিয়ে তিনি মাঠ থেকে বের করে দেন কিন্তু দর্শক গ্যালারিতে তখন উত্তেজনা চরম আকার নিয়েছে। মানুষের মধ্যে রোষ এতটাই নৃশংসতার রূপ নিয়েছে যে বিপক্ষ দলের সমর্থককে গ্যালারি থেকে নিচে ছুঁড়ে ফেলে দিতেও কোনওরকম কুন্ঠাবোধ হয়েনি।

এদিকে এটা ভুলে যাবার মতো নয় যে ইডেন আসলে ক্রিকেট মাঠ। এর বাইরে যাবার পথও অনেক সঙ্কীর্ণ। কলকাতা পুলিশ এই সময় জনতাকে নিয়ন্ত্রণ করতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়। আতঙ্কিত জনতা একসাথে ঐ সরু বাহির পথ দিয়ে বেরোতে গেলে অনেকেই পদপৃষ্ঠ হয়ে প্রাণ হারান। এই দূর্ঘটনায় মোট ১৬ জন নিহত হন এবং গুরুতরভাবে আহত হন সংখ্যায় অনেক বেশি মানুষ। পরদিন সংবাদপত্র গুলিতে খবরের সঙ্গে যে ছবি বেরোয় তাতে সাধারণ মানুষ আরও শিহরিত হয়ে ওঠে। সংবাদপত্রের শিরোনামে উল্লিখিত হয় যে এই দূর্ঘটনার জন্য দায়ী ফুটবল খেলাই। কিন্তু এই ঘটনার প্রভাব হয় সূদূরপ্রসারী। সাধারণ বাঙালি সমাজে ফুটবল খেলাই এক ভীতিপ্রদর্শনকারী হয়ে ওঠে। ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক আমল থেকে শুরু করে পরবর্তী সময়ে ফুটবল ছিল বাঙালির প্রাণের খেলা। বাঙালির সামাজিক-সাংস্কৃতিক ইতিহাসের যাত্রাপথে এই ১৬ আগস্ট, ১৯৮০-র মর্মান্তিক ঘটনার পরই প্রথমবারের জন্য বাঙালি মধ্যবিত্তের হৃদয়ে ফুটবল খেলা সম্পর্কে ভয় ও আশঙ্কার উদ্রেক হয়। শুধু ফুটবল খেলাই নয় বাড়ির অভিভাবকরা ছোট ছোট ছেলেদেরকে ফুটবল মাঠ থেকে যতটা সম্ভব দূরে রাখতে সচেষ্ট হয়ে পড়েন। এর প্রভাব পড়ে বাঙালির ফুটবল চর্চা ও ফুটবল সংস্কৃতির ওপর। ১৯৮০-র দশকের শেষের দিকে কলকাতা ফুটবলে স্থানীয় প্রতিভার উত্থানের অভাব রীতিমতো লক্ষ্যনীয়। এদিকে ১৯৮৩ সালে একদিনের আন্তর্জাতিক ক্রিকেট বিশ্বকাপে ইংল্যান্ডের মাঠে কপিল দেবের নেতৃত্বে ভারতীয় দলের জয় এবং ১৯৮৫-র বেনসন এন্ড হেজেস ওয়ার্ল্ড সিরিজ প্রতিযোগিতায় অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে সুনীল গাভাসকারের নেতৃত্বে ভারতীয় ক্রিকেট দলের জয়লাভ ভারতের অন্যান্য প্রান্তের মানুষের মত বাঙালিকেও অনেক বেশিমাত্রায় ক্রিকেট মুখী করে তোলে। যার ফলে আক্ষরিক ক্ষতি হয় বাংলার ফুটবল সংস্কৃতির। কিন্তু বাঙালির সাময়িক ফুটবল বিরূপতার প্রধান কারণ ছিল ১৯৮০ সালের ১৬ই আগস্টের মর্মান্তিক দূর্ঘটনা। জনপ্রিয় সংস্কৃতিতেও এই ঘটনার প্রভাব লক্ষ্য করা যায় বিশেষত মতি নন্দীর লেখা উপন্যাস ‘ফেরারি’ ও মান্না দে-র গাওয়া গান ‘খেলা ফুটবল খেলা’-র মধ্য দিয়ে। অনেক ফুটবলপ্রেমী বাঙালি এই ঘটনার দ্বারা ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে বা বিতশ্রদ্ধ হয়ে প্রতিবাদ জানানোর ভাষা হিসাবে মাঠে গিয়ে ফুটবল খেলা দেখা চিরতরে ছেড়ে দেন। ১৯৮০-র দশকের শেষের দিক থেকে স্টেডিয়ামে গিয়ে খেলা দেখার থেকে বাড়িতে বসে টিভিতে খেলা দেখা অনেক শ্রেয় এবং নিরাপদ বলে মনে করেন।  

পরবর্তী সময়ে এই বিশেষ দিনটিকে ‘ফুটবল শহীদ দিবস’ হিসাবে ঘোষণা করা হয়েছে ওই ১৬ জন ফুটবল প্রেমী যারা সেদিন ইডেনে খেলা দেখতে গিয়ে প্রাণ হারিয়েছিলেন তাঁদের স্মৃতিতে ও সম্মানে। আসলে চল্লিশ বছর পেরিয়েও ১৬ই আগস্ট, ১৯৮০ সালের ঘটনা বাঙালি ক্রীড়া সংস্কৃতি ও সামাজিক মননে ভীষণভাবে প্রাসঙ্গিক। এই ঘটনা আমাদের অনেক বড় শিক্ষা দিতে গেছে। মাঠের পরিবেশ আর রণক্ষেত্র কখনও এক হতে পারে না। খেলার প্রতিদ্বন্দ্বিতার আবেগ অনেক নিয়ন্ত্রিত ও পরিশীলিত হওয়া উচিত সেই শিক্ষা দিয়ে গেছে এই ঘটনা। ১৯৮৪ সালে যুবভারতী ক্রীড়াঙ্গণের প্রতিষ্ঠা  বাঙালির বহুকালের ইচ্ছা একটা আন্তর্জাতিক মানের ফুটবল স্টেডিয়ামের আবির্ভাবের আকাঙ্খাকে পূরণ করে। পাশাপাশি এইরকম দূর্ঘটনার সম্ভাবনাকেও অনেক কমিয়ে দেয়। প্রশাসনও এর পর থেকে ডার্বি ম্যাচ বিষয়ে অনেক বেশি মনোযোগী ও ওয়াকিবহাল হয়ে ওঠে। নেহেরু কাপ প্রভৃতি আন্তর্জাতিক আমন্ত্রণমূলক প্রতিযোগিতার আয়োজনের মাধ্যমে আইএফএ ও এআইএফএফ ফুটবল খেলার প্রতি সাধারণ মানুষের আগ্রহ বাড়িয়ে তুলতে সচেষ্ট হয়। সর্বোপরি খেলার মাঠের স্পোর্টসম্যানশিপ যে শুধু খেলোয়াড়দের মধ্যেই নয় দর্শকদের মধ্যেও একইভাবে প্রয়োজন সে’কথা প্রমাণ করে দিয়ে যায় এই মর্মান্তিক দূর্ঘটনা। পরবর্তী সময়ে কলকাতা ফুটবলে দর্শক হিংসার সম্ভাবনা সম্পূর্ণ নির্মূল না হলেও অনেকাংশেই যে কমেছে সেকথা বলাই বাহুল্য। সেই চরম আবেগের বহিঃপ্রকাশও পরবর্তী সময়ে অনেকাংশেই নিয়ন্ত্রিত ও সংযত হয়েছে। কিন্তু আফশোসের বিষয় এই উপলব্ধি অর্জনের জন্য ১৬ জন মানুষকে ওই বিশেষ দিনে প্রাণ বিসর্জন দিতে হয়েছিল। তাই তারা ‘ফুটবল শহীদ’। ১৬ আগস্ট, ১৯৮০-র ওই মর্মান্তিক দূর্ঘটনার চল্লিশ বছর পূর্তিতে একটাই প্রার্থনা সেই দিন যেন আর কখনও না ফিরে আসে।

১৬ই আগস্ট, ১৯৮০-র ইডেনে ১৬ জন ফুটবল শহীদের নামঃ-

১। হিমাংশু শেখর দাস

২। উত্তম চাউলে

৩। কার্তিক মাইতি

৪। সমীর দাস

৫। অলোক দাস

৬। সনত বসু

৭। বিশ্বজিৎ কর

৮। নবীন নস্কর

৯। কার্তিক মাঝি

১০। ধনঞ্জয় দাস

১১। প্রশান্ত কুমার দত্ত

১২। শ্যামল বিশ্বাস

১৩। অসীম চ্যাটার্জী

১৪। রবিন আদক

১৫। মদন মোহন বাগলি

১৬। কল্যাণ সামন্ত । 

0 Comments

Post Comment