তৃণমূল কংগ্রেসের পরাজয়ের একাধিক কারণ রয়েছে। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় রাতারাতি হেরে যান নি। এই হারের পেছনে একটি পটভূমি আছে যা দীর্ঘদিন ধরে নির্মিত হয়েছে। একদিকে বিজেপির লাগাতার প্রচেষ্টা এবং অন্যদিকে তৃণমূল কংগ্রেসের লাগাতার আত্মঘাতী রাজনীতি একটি সাধারণ বিন্দুতে এসে মিলেছে —- তা হল তৃণমূল কংগ্রেসের পরাজয় এবং বিজেপির জয়লাভ। SIR এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। কিন্তু SIR এর গতিপথটি কী ছিল?
পশ্চিমবঙ্গ নিয়ে বিজেপির দীর্ঘদিনের একটি প্রচার আছে। সেটা হল লাগোয়া বাংলাদেশ থেকে দলে দলে মুসলমান সীমান্ত পেরিয়ে পশ্চিমবঙ্গে ঢোকে এবং মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়রা এদের এদেশের কাগজপত্র বানিয়ে দেন। এরা মমতা ব্যানার্জীদের একটা বড় ভোটব্যাঙ্ক। খেয়াল করলে দেখবেন যে, এই অনুপ্রবেশ বিরোধী প্রচার সারা পৃথিবীতেই ফ্যাসিবাদের রাজনৈতিক প্রচারের একটা গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ। আমেরিকাতে ট্রাম্প সমর্থকরা দক্ষিণ আমেরিকানদের নিয়ে এই খেলা খেলে, ইউরোপের ফ্যাসিবাদীরা পশ্চিম এশিয়া থেকে যাওয়া শরণার্থীদের নিয়েও এই হেট স্পীচ ছড়িয়ে জনপ্রিয়তা পাওয়ার চেষ্টা করে।
SIR শুরুর আগে ভারতের বিভিন্ন বিজেপি শাসিত রাজ্যে প্রবাসী বাঙালী শ্রমিকদের ওপর পরিকল্পনা মাফিক আক্রমণ নামিয়ে নিয়ে আসা হয়। অভিযোগ কী? এরা নাকি বাংলাদেশী। এর বিরুদ্ধে রাজ্যের তৃণমূল সরকারের যেভাবে ঝাঁপিয়ে পড়া উচিৎ ছিল সেভাবে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়রা ঝাঁপান নি। সরকারের মধ্যে ব্যক্তিগতভাবে কেউ কেউ চেষ্টা করেছিলেন বটে কিন্তু এই নিয়ে তৃণমূল কংগ্রেসের পক্ষ থেকে সেভাবে প্রচার আন্দোলন গড়ে তোলা হয় নি। এই আক্রমণ ছিল একটা ন্যারেটিভ তৈরির প্রয়াস যা তৈরি করতে বিজেপি সফল হয়েছিল। কিন্তু তৃণমূলের দিক থেকে পাল্টা ন্যারেটিভ তৈরি করার কোনো প্রচেষ্টাই নেওয়া হয় নি। একই ঘটনা SIR নিয়েও চলেছে। SIR এর বিরুদ্ধেও তৃণমূলের তেমন জোরালো কোনো প্রচার ছিল না।
উল্টে যারা এই প্রচারগুলো করতে চেষ্টা করেছেন তাদের লাগাতারভাবে বাধা দেওয়া হয়েছে। SIR এর বিরুদ্ধে অনেকেই প্রচার করেছেন। APDR লাগাতার প্রচার করেছে। কিন্তু বিভিন্ন জায়গায় APDR কে বাধা দেওয়া হয়েছে। SIR-এর বিরুদ্ধে কথা বলার দখলীসত্ত্ব তৃণমূল কংগ্রেস সর্বদাই নিজের হাতে রাখতে চেয়েছে। যা বলার তারা বলবে, যা করার তারা করবে। SIR রোখা যেত একমাত্র গণ-আন্দোলনের রাস্তায় কিন্তু এই নিয়ে একটা গণ-আন্দোলন বা গণ-জাগরণ গড়ে ওঠার পথে একটা অন্তরায় হিসাবে কাজ করেছে তৃণমূল কংগ্রেস নিজেই।
পশ্চিমবঙ্গে সাম্প্রদায়িকতা চিরদিনই ছিল। কিন্তু গত পাঁচ বছরে যেভাবে তা বেড়েছে তার কোনো তুলনা ছিল না। ‘'জন্ম যদি হিন্দু কুলে ভোট তবে পদ্মফুলে” —- এই স্লোগানকে হাতিয়ার করে হিন্দু ভোট সংহত করার ওপর ভিত্তি করে বিজেপি ভোট করতে নেমেছিল। কিন্তু গত পাঁচ বছর ধরে পশ্চিমবঙ্গের জেলায় জেলায় সঙ্ঘের শাখাগুলো তৃণমূলস্তরে বিদ্বেষ প্রচার চালিয়ে যেতে পারল কী করে? সঙ্ঘ ২০১১ সাল থেকেই এটা চালাচ্ছে কিন্তু গত পাঁচ বছরটাতে তাদের প্রচেষ্টা বহুগুণ বৃদ্ধি পায়। এদের অবাধে বিষ ছড়াতে দিয়েছিল কারা? অন্য কেউ তো মাথা তুলতে পারে নি। কারণে অকারণে নকশালপন্থীদের ওপর এবং অন্যান্য বাম দলগুলির ওপর সরকারি দমন পীড়ণ নামিয়ে আনা হয়েছে। যাদবপুরের হস্টেলে একটি মৃত্যুকে কেন্দ্র করে যেভাবে তৃণমূল যাদবপুর দখল করতে ঝাঁপিয়েছিল সেই আগ্রাসনের ছিটেফোঁটাও বিজেপির বিরুদ্ধে কখনও দেখা যায় নি। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন ছাত্র হিন্দোলকে যেভাবে লুক আউট নোটিশ জারি করে মিথ্যা অভিযোগে এয়ারপোর্টে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল তা ছিল অভাবনীয়। কিন্তু গত পাঁচ বছরে পশ্চিমবঙ্গের মাটিতে বারবার সাম্প্রদায়িক হেট স্পীচ দিয়ে এবং সংবিধান বিরোধী প্রচার করেও শুভেন্দু অধিকারীরা পার পেয়ে গেছে। কেন তাকে গ্রেপ্তার করে নি রাজ্য সরকার? কীসের ভয়ে? তখন তো গণেশকুমার ছিল না। কেন্দ্রীয় বাহিনী ছিল না। গত পাঁচ বছরে এই ফ্যাসিবাদীরা নির্বিবাদে বিষ ছড়িয়ে গেছে কাদের দৌলতে?
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বরং বলেছেন,’আমি RSS কে সম্মান করি।’ বোঝো কান্ড! RSS যে প্রতিদিন প্রতি ঘন্টায় কাজ করেছে তার সরকারকে ফেলে দেবার লক্ষ্যে সেই সত্য অন্যরা না বুঝলেও তিনি তো বুঝেছিলেন। তিনি কী করছিলেন?
তিনি তার কাজ আর বাক্যের মধ্যে দিয়ে বারংবার বিজেপি তথা RSS কে বার্তা দিয়ে গেছেন যে, ‘তোমরা আমার সরকার ফেলার চেষ্টা কোরো না, আমি তোমাদের কথা মত কাজ করব।’ বলুন তো সত্যি কি না!
মমতা মুখে SIR এবং ঘুষপেটিয়া তত্ত্বের বিরোধিতা করলেও তলে তলে ডিটেনশন ক্যাম্পের জন্য জমি দিয়েছেন।
মমতা RSS এর গুড বুকে থাকার জন্য তথাকথিত দেশদ্রোহী যাদবপুরের ছাত্রদের বিরুদ্ধে ঝাঁপিয়েছেন।
মমতা গৈরিক শিক্ষানীতি ২০২০ মেনে কাজ চালু করেছেন।
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় অনেক বাগাড়ম্বর করেও ওয়াকফ বিল মেনে নিয়েছেন।
তদুপরি, বিজেপির হিন্দুত্বের সাথে প্রতিযোগিতা করে নিজেই হিন্দুত্ববাদী রাজনীতি করেছেন।
বিজেপির রামনবমী আর হনুমান জয়ন্তীর সাথে পাল্লা দিয়ে, এবং তাদের টক্কর দিয়ে, রামনবমী, হনুমান জয়ন্তী কারা করেছিল?
যাদবপুর থেকে বাঘা যতীন যেতে যে বিরাট ‘ভারত মাতা’র মন্দিরটা চোখে পড়ে সেটা কে বানিয়েছিল? দীঘায় সরকারি পয়সায় জগন্নাথ মন্দির তৈরি করার বুদ্ধিটা কে দিয়েছিল? শিলিগুড়িতে মহাকাল মন্দিরের পরিকল্পনা কেন ছিল?
এই প্রতিটা ঘটনা বিজেপির হিন্দুত্বের বিভেদকামী রাজনীতিকে সমাজে মান্যতা দিতে সাহায্য করেছে। না তো প্রশাসনিক কোনো পদক্ষেপ, না তো পাল্টা কোনো ন্যারেটিভ তৈরির প্রয়াস —- মমতা কিছুই করেন নি। বরং উল্টে BJP/RSS -কেই সাহায্য করে গেছেন।
সমাজে যদি হিন্দুত্ববাদী রাজনীতি চ্যাম্পিয়ন হয়, হিন্দুরা যদি হিন্দু হিসাবেই রাজনীতিকে বুঝতে শেখে তাহলে তারা ছোট খিলাড়ির পেছনে থাকবে কেন? তারা তো বড় খিলাড়ির পেছনেই যাবে। কংগ্রেসের নরম হিন্দুত্ব কীভাবে বিজেপির হার্ড হিন্দুত্বের জমি তৈরি করেছিল ইতিহাস থেকে তা না শিখলে তার দ্বারা আর কী হবে?
আমার গত পর্বের লেখা পড়ে আমার এক বিদেশ প্রবাসী বন্ধু আমাকে ফোন করেছিল। সে আমাকে জিজ্ঞাসা করছিল আমরা মমতাকেও ফ্যাসিবাদী বলে মনে করি কি না! আমি বলেছিলাম, না। তখন সে বলছিল —- “তাহলে সব সমালোচনা সত্ত্বেও ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে তোদের সকলের মমতা বন্দ্যোপাধায়ের হাত ধরা উচিৎ ছিল”। আমি তাকে বললাম মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় কি কারুর হাত ধরতে চান? অথবা, তিনি কি চান কেউ তার হাত ধরুক? তিনি সর্বদাই চেয়ে এসেছেন সবাই তার দলের ল্যাজ ধরুক। এখানে হাত ধরার কোনো গল্প নেই, ল্যাজ ধরার গল্প আছে। বিজেপি আর সঙ্ঘকে খোলা ময়দান তিনি দিয়েছেন কিন্তু যে কোনো ঘরানার বামপন্থীরা মাথা তোলার চেষ্টা করলেই তিনি খাঁড়ার এক কোপে সেই মাথা নামিয়ে দিতে চেয়েছেন। ‘মুন্ডুহীন ধড়গুলো আহ্লাদে চিৎকার’ করতে করতে তার দলের ল্যাজ ধরে হাঁটবে এটাই তিনি চিরকাল চেয়েছেন। বলুন তো সত্যি কি না?
এভাবে কি কোনো ফ্যাসিবিরোধী ঐক্য হয়? কেউ করে দেখিয়ে দিক। আমি তাকে তিনবার লাল সেলাম জানিয়ে ফটোফ্রেমে বাঁধিয়ে রেখে দেব।
(চলবে)
পুনশ্চ —- আমার আর এক বন্ধু আমাকে জিজ্ঞাসা করেছে আমি কি শুধু দক্ষিণপন্থীদের নিয়েই লিখব নাকি বামপন্থীদের নিয়েও লিখব! আমি বলেছি, সবাইকে নিয়েই লিখব। নিজেকে নিয়েও লিখব। এই লেখা কাউকেই ছাড় দেবে না। সমালোচনা যেমন চলবে আত্মসমালোচনাও চলবে। দৌড়াদৌড়ি, প্রজেক্টিভ কর্মসূচি বরং কম হোক। বেশি করে হোক যা হয় না, আত্ম-মন্থন, আত্ম-আলোচনা। নতুন রাজনীতি গড়ে তোলার ভিত্তিভূমি এটাই। এটাই আজ সময়ের দাবি।