শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়কে নিয়ে চর্চা নতুন করে শুরু হয়েছে। এ এক নতুন প্রবণতা। এই প্রবণতার সাথেই আমাদের চলতে হবে। আবেগ নয়, রাজনীতি নয়, ইতিহাসের তথ্য দিয়ে কথা বলতে হবে। ইতিহাসের অঙ্কে সবসময় দুইয়ে দুইয়ে চার হয় না কারণ এটা সমাজবিজ্ঞান, গবেষণাগার ভিত্তিক প্রাকৃতিক বিজ্ঞান নয়। মানুষ কোন পরিস্থিতিতে কীভাবে প্রতিক্রিয়া জানাবে সেটা স্থান, কাল, পাত্রে বারবার বদলে যায়। ফলে ইতিহাস গবেষকদের দায়িত্ব নতুন করে শুরু হওয়া শ্যামাপ্রসাদ চর্চায় ইতিহাসের তথ্যগুলি সুষ্ঠ ও সঠিক ভাবে তুলে ধরা।
কিছুদিন আগে ২০ শে জুন পশ্চিমবঙ্গ দিবস পালিত হল। দেশভাগের মূল বীজ রোপিত হচ্ছে যেখানে, সেই দিনটাকে উৎসব হিসেবে উদযাপন করা বিষয়টি দেশভাগ ও উদ্বাস্তু জীবনের গবেষক ও সচেতন বাঙালি হিসেবে বেদনাদায়ক। ২০ শে জুন ১৯৪৭ সালে বাংলার আইনসভায় তিনটি নির্বাচন হয়েছিল। সমগ্র বাংলার সদস্যদের নিয়ে এবং মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ অঞ্চলের সদস্যদের নিয়ে যে দুটি নির্বাচন হয় সে দুটিতেই অবিভক্ত বাংলার পাকিস্তানে যোগদানের প্রস্তাব জয়লাভ করে। হিন্দু প্রধান অঞ্চলের সদস্যদের নিয়ে যে তৃতীয় নির্বাচনটি হয় সেটার কথাই সাম্প্রতিক সময়ে বারবার বলা হচ্ছে। এখানেও কয়েকটি স্তর আছে। কংগ্রেস বিশেষত পশ্চিম বাংলার কংগ্রেস নেতৃত্ব (অতুল্য ঘোষ, নিকুঞ্জ মাইতি প্রমুখরা, যাঁদের জয়া চ্যাটার্জি তাঁর গবেষণায় হুগলী গ্রুপ বলেছেন) দেশভাগের পক্ষে ছিলেন এবং তারা নিজেদের সুবিধা মতো পশ্চিমবঙ্গের একটি মানচিত্র তৈরি করেন। হিন্দু মহাসভা যে মানচিত্র তৈরি করে তাতে বেশ কিছু মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ অঞ্চলকেও পশ্চিমবঙ্গের অন্তর্ভুক্ত করার দাবী করা হয়। এর সাথে ছিল ব্রিটিশদের নির্ধারিত মানচিত্র। এই তিনটে ম্যাপ যদি আমরা পর্যবেক্ষণ করি তাহলে এই তিন গোষ্ঠীর মূল চাহিদা স্পষ্ট হবে। কমিউনিস্ট পার্টি প্রথমে খুব স্পষ্ট ভাবে দেশভাগ চায়নি। কিন্তু তারা একসময় বুঝতে পারেন যে মানুষের মননে দেশভাগ একরকম বৈধতা পেয়ে যাচ্ছে। তখন কমিউনিস্ট পার্টির অবস্থান পরিবর্তিত হয়। কোনভাবেই যেন পাকিস্তানের অঙ্গীভূত অংশে সংখ্যালঘুদের ওপর নির্যাতন নেমে না আসে এই সাবধানবানী মাথায় রেখে তারাও দেশভাগের পক্ষে কিছুটা দ্বিধাগ্রস্ত রায় দেয়।

২০ শে জুনের সেই বহুল আলোচিত নির্বাচনের আগে শ্যামাপ্রসাদ, কংগ্রেস এবং কোনো কোনো অঞ্চলে ফরওয়ার্ড ব্লক দেশভাগের বাস্তবতার পক্ষে বাংলা জুড়ে বিভিন্ন সভার আয়োজন করে। সরকারি নথি, পুলিশি নথি, আর্কাইভাল তথ্য, সমসাময়িক আত্মজীবনী কোনো স্থানেই দেশভাগে অথবা পশ্চিমবঙ্গের স্বাতন্ত্র্য আদায় করে হিন্দুদের রক্ষায় শ্যামাপ্রসাদের একক ও অনন্য কোনো বৃহৎ অবদান খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না । বরং দেখা যাচ্ছে ১৯৪৬ এর দাঙ্গার পর থেকে মানুষকে দেশবিভাগ প্রয়োজনীয় এবং এটা মেনে নিতে হবে বোঝাতে কংগ্রেস অনেকবেশি আগ্রাসী ভূমিকা নিচ্ছে। এই প্রসঙ্গে ছেচল্লিশের দাঙ্গার প্রসঙ্গে যেতেই হয়। এই দাঙ্গার প্রেক্ষিতেই সাধারণ মানুষ দেশভাগের পক্ষে দ্ব্যর্থহীনভাবে মত দেয়। কংগ্রেস এবং লিগের শীর্ষনেতৃত্ব দেশভাগ মেনে নিয়েছিলেন, ব্রিটিশরা তো রাজি ছিলেনই, রাজি ছিলেন না বিভিন্ন দলের মাঝারি ও নিম্নস্তরের নেতৃত্ব ও সাধারণ মানুষ। জনগণকে খুব সহজে সাম্প্রদায়িকতার বিষ পান করানো যায়নি। সম্ভবত এদেরকে দেশভাগে রাজি করানোর জন্যই ‘আয়োজিত’ হয়েছিল দাঙ্গা। দাঙ্গার বীভৎসতা ও রক্তস্রোত দেখে সাধারণ মানুষ বিশ্বাস করতে শুরু করেন এর থেকে দেশভাগ ভালো। দেখা গেলো, বরাবর দেশভাগের তুমুল বিরোধিতা করা গান্ধীও মেনে নিলেন এর থেকে দেশভাগ ভালো। দাঙ্গা প্রমাণ করে দিলো দেশভাগ অবশ্যম্ভাবী। দাঙ্গার পরে কমিউনিস্ট পার্টিও দেশভাগ মেনে নিতে বাধ্য হয়। অধ্যাপক বাসুদেব চট্টোপাধ্যায় বলেছেন কমিউনিস্টদের শক্তি ছিল অতি সামান্য যার দ্বারা দাঙ্গা প্রতিহত করা যায়নি।
এবার, শ্যামাপ্রসাদের হিন্দু মহাসভায় যোগদানের বিষয়টি দেখা যাক। আশুতোষ মুখোপাধ্যায় কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ছিলেন। সেই সময় শ্যামাপ্রসাদ স্নাতকোত্তর স্তর পর্যন্ত প্রত্যেক পরীক্ষায় প্রথম হয়ে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে আইনের অধ্যাপক হিসবে যোগ দেন। ক্রিমিনাল ল ছিল তাঁর অধ্যাপনার মূল ক্ষেত্র। ব্যারিস্টারি পড়তে যান এবং প্রথম পরীক্ষায় তৃতীয় শ্রেণীতে উত্তীর্ণ হন এবং ক্রিমিনাল লয়ের পরীক্ষায় অনুত্তীর্ণ হন। নিন্দুকেরা বলেন, কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় ছিল মুখার্জি পরিবারের একাধিপত্যের জায়গা। বিদেশ থেকে ফিরে আশুতোষ মুখোপাধ্যায়ের পরে শ্যামাপ্রসাদ কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য হন। ১৯৩৭ সালের পর মুসলিম লিগ ফজলুল হকের কৃষক প্রজা পার্টির সাথে মিলে যখন বাংলা শাসন করতে শুরু করে তখন তাদের অন্যতম মূল উদ্দেশ্য ছিল বর্ণহিন্দুদের আয়ত্তে থাকা বাংলার সমস্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রসাসনিক পদ, বিভিন্ন বোর্ড ও বিশ্ববিদ্যালয়ের পদগুলিকে মুসলিমদের উন্নতির স্বার্থে নিয়ন্ত্রনে আনা। এরপর থেকেই বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সরকারি পদে ফজলুল হক এবং মুসলিম লিগের যৌথ উদ্যোগে মুসলিমদের বসানো শুরু হয়। মাধ্যমিক বোর্ডের সদস্যদের জন্য ৪১% সংরক্ষণ ঘোষণা করা হয়। এই ঘটনায় বর্ণহিন্দুদের ভীত করে তোলে। শ্যামাপ্রসাদ বুঝতে পারেন দীর্ঘদিন ধরে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে চলতে থাকা তাদের পারিবারিক প্রভাব হারিয়ে গিয়ে মুসলিম লিগের হাতে নিয়ন্ত্রন চলে যাচ্ছে। এইসময় আর একটি ঘটনা ঘটে যাতে সকল জাতীয়তাবাদী নেতারাই আতঙ্কিত হয়ে পড়েন – বন্দেমাতরম স্লোগান টিকে সাম্প্রদায়িক হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। এই প্রেক্ষাপটে শ্যামাপ্রসাদ হিন্দু মহাসভায় যোগদান করেন।
এই প্রসঙ্গে ব্রিটিশ সরকারের সাথে শ্যামাপ্রসাদের সম্পর্ক বিবেচনা করা যায়। বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য হিসেবে ব্রিটেনের পতাকা তুলতে অস্বীকার করাতে শ্যামাপ্রসাদ দুই ছাত্রকে বেত্রাঘাতের আদেশ দিয়েছিলেন একথা অনেকেই জানেন। গভর্নর অফ বেঙ্গল জন হার্বার্টকে ১৯৪২ সালের জুলাই মাসে ভারত ছাড়ো আন্দোলনের প্রেক্ষিতে শ্যামাপ্রসাদ একটি চিঠিতে লেখেন, “anybody who during the war plans to stir up mass feelings resulting in internal disturbances or insecurity must be resisted by any government that may function for the time being.” এই আন্দোলনকে কীভাবে প্রতিহত করা যায়, সে প্রসঙ্গে তিনি গভর্নর কে লেখেন, “The administration of the province should be carried on in such a manner that in spite of the best efforts of the Congress the movement will fail to take root in the province.” এছাড়াও তিনি লেখেন একজন মন্ত্রী হিসেবে তিনি প্রশাসনের ভালো চান, ফলে এই আন্দোলন দমনে তিনি সরকারকে সর্বান্তকরণে সহযোগিতা করবেন।
শ্যামাপ্রসাদ যখন হিন্দু মহাসভায় যোগ দিচ্ছেন তখন তিনি সাহায্যের আশায় নেতাজি এবং শরৎ বসুর সাথে দেখা করেন। তারা কোনভাবেই হিন্দু মহাসভার আদর্শের সাথে সহমত ছিলেন না এবং তাঁরা বিভাজনের রাজনীতির বিরুদ্ধে তাঁদের অবস্থান স্পষ্ট জানিয়ে দেন। এ সময়ে শ্যামাপ্রসাদ মুসলিম লিগের কাছের সাহায্য প্রত্যাশী হন এবং বিফল হন। ইতিমধ্যে গান্ধীর সাথে মতবিরোধে সুভাষ কংগ্রেসের প্রেসিডেন্ট পদ হারান। সেসময় কলকাতা কর্পোরেশনের নির্বাচনে শ্যামাপ্রসাদ নিজেকে প্রকৃত কংগ্রেস হিসেবে দাবী করে হিন্দু মহাসভা ও কংগ্রেসের বিরুদ্ধে প্রার্থী হন। এরপর থেকে শ্যামাপ্রসাদ ও হিন্দু মহাসভার প্রত্যেকটি সভা সমিতিতে সুভাষচন্দ্রের অনুগামীরা আক্রমণ ও ভাঙচুর করেন, কর্মীদের শারীরিক আক্রমণ করা হয় এবং শ্যামাপ্রসাদকে লক্ষ্য করে ইটও ছোড়া হয়। হিন্দু মহাসভা ও সুভাষপন্থীদের সরাসরি সংঘাত প্রকাশ্যে আসে। এরপরের ঘটনাক্রম দেখে সুভাষ ও শ্যামাপ্রসাদের অবদান বিবেচনা করতে বসা দরকার! এরপরে আমরা দেখি স্বাধীনতার লক্ষ্যে সুভাষ দেশ ছাড়লেন, জার্মানি ঘুরে সাবমেরিন চেপে জাপানে গেলেন এবং তাঁর নেতৃত্বে আজাদ হিন্দ বাহিনীর লড়াই ব্রিটিশদের মনে এক চরম ভীতির সঞ্চার করে। বলা যায়, আই এন এ র লড়াই এবং ভারতে তার বিপুল প্রতিক্রিয়াই ব্রিটিশ সরকারকে তড়িঘড়ি ভারত ছাড়ার সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য করে। সুভাষের এই অবস্থানের বিপরীতে ব্রিটিশ শাসনের অবসানে শ্যামাপ্রসাদের অবদান ঠিক কোথায় বা কতখানি তা নিরূপণ করা মুশকিল! আমরা শুধু দেখেছি দেশ ছাড়ার আগে পর্যন্ত শ্যামাপ্রসাদের তীব্র বিরোধিতা নেতাজি করে গেছেন। যে সময় নেতাজির আই এন এ লড়ছে, সে সময় শ্যামাপ্রসাদ বাংলাকে খণ্ডিত করতে লড়াই করছেন। আমার গবেষণায় কলকাতা ও শহরতলির উদ্বাস্তু কলোনিতে সমীক্ষা করতে গিয়ে বিভিন্ন গোয়েন্দা রিপোর্টে দেখেছি স্বাধীনতার পরে উদ্বাস্তু কলোনিতে বিভিন্ন সভায় উদ্বাস্তু নেতারা শ্যামাপ্রসাদ সম্পর্কে উদ্বাস্তুদের সাবধান করছেন। ১৯৫২ সালের নির্বাচন স্পষ্ট করে দিচ্ছে উদ্বাস্তু হয়ে আসা হিন্দু জনগন চূড়ান্ত প্রতিকূলতায় জীবন সংগ্রাম চালালেও হিন্দু মহাসভার ওপর আস্থা রাখছেন না। নির্বাচনে কমিউনিস্ট পার্টি ২৮ টি আসন এবং হিন্দু মহাসভা ৪ টি আসন পায়। এই ফলাফলের পেছনে মহিলা আত্মরক্ষা সমিতির একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা চিহ্নিত করা যায়। ঘরে ঘরে গিয়ে তাঁরা উদ্বাস্তু মহিলাদের বুঝিয়েছিলেন দাঙ্গা যারা করেন তাদের কোনো ধর্ম হয়না, তাদের একটাই পরিচয়, তারা অপরাধী। কাজেই, শত প্রতিকূলতাতেও সাম্প্রদায়িক ঘৃণার পরিবেশ তৈরি হয়নি। অর্থাৎ বোঝাই যাচ্ছে স্বাধীনতা পূর্ববর্তী এবং পরবর্তী কোনো পর্যায়েই পশ্চিমবঙ্গে নেতা হিসেবে শ্যামাপ্রসাদের গুরুত্ব অনুধাবন করা যাচ্ছে না।
শেষে শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় সম্পর্কে অন্নদাশঙ্কর রায়ের মুল্যায়ন উল্লেখ করা যায়। অন্নদাশঙ্কর একবার শ্যামাপ্রসাদকে তাঁর হিন্দু মহাসভায় যোগদানের কারণ জিজ্ঞেস করেছিলেন। শ্যাম্যাপ্রসাদ উত্তর দিয়েছিলেন যে কংগ্রেসে যদি তিনি যেতেন এতো দ্রুত ওপরে উঠতে পারতেন না, হিন্দু মহাসভায় তিনি প্রথমেই নেতৃত্বের সর্ব্বোচ্চ স্থানে পৌছাতে পেরেছিলেন। এই উত্তরের মুল্যায়ন করে অন্নদাশঙ্কর লেখেন, কংগ্রেস করলে কারাবরণ করতে হবে, পুলিশি অত্যাচার সইতে হবে কিন্তু হিন্দু মহাসভা বা মুসলিম লিগে সেই ভয় নেই। তাই শ্যামাপ্রসাদ নিরাপদ রাস্তাটি বেছে নেন। আজ যখন জিরাটে শ্যামাপ্রসাদের ১২৫ ফুট মূর্তি বসানোর পরিকল্পনা চলছে, স্বাভাবিক ভাবেই প্রশ্ন চলে আসছে বাংলার বুকে নেতাজিরও এতো বড় মূর্তি নেই, তখন অবশ্যই সঠিক ইতিহাস পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে মুল্যায়ন জরুরী।