এ গ্রামের কিনারাকে আহ্লাদে ছুঁয়ে বয়ে চলেছে খড়ে নদী। অভাবী-অভাবহীন সিধেসাদা মানুষের এ গ্রামের এক প্রান্তে ইহান্নবী তার পরিবার নিয়ে খুব কষ্টে দিন গুজরান করে। প্রতি বিকেলে যখন ক্লান্ত সূর্য ঘরে ফেরে খড়ের বুকে ইয়া বড়ো লাল গোল দাগ কেটে, যখন মাছরাঙা বাসায় ফেরে দিনের ঝিমুনি ভুলে, তখনই ইহান্নবী তার ছোট্ট ডিঙিতে লন্ঠন ঝুলিয়ে মাছ ধরতে বেরিয়ে পড়ে। ইহান্নবীর বৈঠার আদরে খড়ের জল আনন্দে খলবলিয়ে ওঠে।
খড়ের পুবপাড়ের গ্রাম সহজপুরের সঙ্গে পশ্চিমপাড়ের গ্রাম গোপালনগরের যোগাযোগের ধারা অতি ক্ষীণ। দুই গাঁকে আলাদা করে দেওয়া নদী পারাপারের জন্য নির্দিষ্ট কোনও খেয়াঘাট নেই। যাতায়াতের সমস্যার জন্য সহজপুর ও গোপালনগরের মানুষের সঙ্গে বেশি দেখা সাক্ষাৎ হওয়া সহজ নয়। আত্মীয়স্বজন কিন্তু কম নেই দুই পারে। পুজো, পার্বণ, ঈদ, ভোজবাড়িতে দেখা সাক্ষাৎ হয় অতি কষ্টে।
সমস্যায় জর্জরিত দুই গ্রামের মানুষ পঞ্চায়েতের কাছে সুপারিশ করল পারাপারের সুবিধার্থে একটি স্থায়ী খেয়া-ঘাট তৈরি করার। প্রস্তাবটি যুক্তি সঙ্গত ও প্রাপ্য বলে শীঘ্রই মঞ্জুর হয়ে গেল। বাঁশের মাচান করে ঘাট হল জলদি। ত্রিশ হাজার টাকার নৌকা বানানোর বরাত পেল গোপালনগরের বিমল মিস্ত্রি। দু'মাসের মধ্যে তৈরি হয়ে গেল নৌকো।খোলে আলকাতরার প্রলেপ পড়ল। সামনে আঁকা হল চোখ। খড়ের জলে নোঙর বাঁধা নায়ে ছলাৎ ছলাৎ শব্দ ওঠে। আর বাসলাইন থেকে দূরের গাঁয়ের মানুষের কলজেতে আওয়াজ ওঠে— আর দেরি নেই.. আর দেরি নেই...
আষাঢের গুরু পূর্ণিমা। বর্ষায় গতরভরা নদীতে 'বদর বদর হৈ' বলে দুই গ্রামকে এক সুতোতে গেঁথে ফেলার জন্য খেয়া পারাপার যাত্রার শুভ উদ্বোধন হল। নদীর ঘাটে সেদিন পঞ্চায়েত প্রধান-সহ দু'গ্রামের মানুষের ঢল। জিলাপি, চপ, বাদাম, বেলুনের দোকান বসে অসময়ে রথের মেলার আনন্দ বয়ে নিয়ে এল। যদিও রথ এ বারে মাসের শেষে। এই মিলন মেলায় দুই গ্রামের মানুষের উদ্যোগে নদীর ধারে সকাল থেকে রান্না হচ্ছে খিচুড়ি, ছ্যাঁচড়া আর পায়েস। এপারে নদীর ধারে বুড়ো বটের তলায় বসে ওপারের মানুষ খাচ্ছে আর ওপারে পড়েছে মস্ত ছাউনি। এপারের মানুষের আতিথিয়েতার জন্য। ত্রিশ জন যাত্রী নিয়ে সহজপুর থেকে গোপালনগরের দিকে প্রথমবারের মতো যাত্রা হল।
ডিঙি নিয়ে নদী চষে বেড়ানো ইহান্নবী মাঝির দায়িত্ব পেল সবার সম্মতিতে। বৌ রৌশনারা, এক ছেলে ও দুই মেয়ে নিয়ে তার নুন আনতে পান্তা ফুরানো সংসার। খড়ে নদীতে আর সেরকম মাছ মেলে না বর্ষা ছাড়া। আব্বার কাছে শুনেছে তার আমলে এ নদীতে মাছ মিলত মেলা। তখন নাকি পদ্মা বাঁধা পড়েনি। এখন সারা মরশুম মাছ ধরে সংসার চালানো খুব কঠিন। নৌকা চালানোর দায়িত্ব পেয়ে বেঁচেছে সে। ধরাবাঁধা রোজগারের পথ একটা খুলেছে অবশেষে । ঘাটের ডাক বছরে যেই পাক না কেন ইহান্নবী ছাড়া যোগ্য মাঝি দুই গ্রামে আর একটিও নেই। এই স্বস্তির শ্বাস বুকে নিয়ে প্রতিদিন ভোর পাঁচটায় বেরিয়ে বাড়িতে ফেরে দুপুর দু'টোয়। ঘন্টা খানিকের বিরতিতে নেয়েখেয়ে রৌশনারার হাতের জাদুর তারিফ করতে করতে ঘাটে যায়। রাত আটটায় ওপারের শেষ খেয়া এপারে এনে, ঘাটে কোষে নৌকা বেঁধে তবে ছুটি। এখন পারাপারে আর ঝক্কি নেই। নাম ধরে হাঁক দিলে মাঝি হাজির। একসঙ্গে থাকতে থাকতে ইহান্নবীর সঙ্গে কাঠের নৌকার সখ্য গড়ে উঠে । ভালোবেসে ইহান্নবী চুপিচুপি নৌকার একটা নাম রেখেছে। নয়নচাঁদ। যখন খেয়া পারাপার থাকে না, সেই অবসরে ইহান্নবী নয়নের কোলে শরীর এলিয়ে দিয়ে সুখ-দুঃখের নানা গল্প করে।
নয়নচাঁদ আর ইহান্নবীর সময়যাপন নদীর জলে। স্রোতের সঙ্গে। ইহাননবী তার জীবনের সকল ক্লান্তি দূর করতে যখন নৌকায় বসে গান ধরে, ''তোরা কে যাস রে ভাটির গাঙ বাইয়া...", তখন আশেপাশের পরিবেশটা এক মিহি মায়ায় ভেসে যায়। চরের চাষিও সে গানের টানে বুড়োবটের তলায় এসে একটু জিরিয়ে নেয়। নদীর দু'পারের মানুষজন একবাক্যে স্বীকার করে, পার হতে ইহান্নবীর নৌকায় উঠলে পারাপারের সঙ্গে তার আবেগ ভরা সুখ -দুঃখের গান উপরি পাওয়া।
সহজপুরের মানুষের জীবন অনেকটাই বদলে গিয়েছে। গ্রামের ফসল পার হয়ে গোপালনগরের মাধ্যমে বাসের মাথায় উঠে পাড়ি দেয় দূর শহরে। সারাদিনে বেশ কয়েকটি বাস ছাড়ে সেখান থেকে। পারের জন্য যত জমায়েত ইহান্নবীর গালে তত চওড়া হাসি। আয়ের খাতায় কিছু কিছু দিন জমা হয় চাহিদার থেকে ঢের বেশি। এখন পরিবারটা ঠিকঠাক চলে। ছেলেমেয়েরা স্কুলে যায়।
এ বর্ষায় দুই বান টিন কিনে টালির ঘর লাগোয়া আরও একটি ঘর তুলেছে। ছেলে সেই ঘরে পড়ে। রৌশনারার বড়ো শখ, প্রতিবছর ক্লাসে ফার্স্ট হওয়া তার ছেলে শহরের কলেজে পড়বে।
মাঝের দশবছরে সহজপুরের ছেলেমেয়েদের পড়ার গতি কিন্তু বেড়েছে অনেকটাই। এখন অনেকই প্রাইমারি ছেড়ে হাই ইস্কুলে যায় নদী পার হয়ে। মুশকিল আসান, ভরসার মাঝি ইহান্নবী। বোশেখের ঝড় হোক, শ্রাবণের টইটম্বুর জল হোক— ইহান্নরীর বৈঠার প্যাঁচে সব কুপোকাত। ইস্কুলের ছোট ছেলেমেয়েরা তাকে হেসে প্রায়ই শুধোয়, "তোমার নাম এমন কেন গো চাচা?"
জবাবে সে জানায়, তার আব্বা আদর করে এ নাম দিছে।
খেয়ায় বসা ইস্কুলের ছেলেদের আলোচনায় সেদিন সে ঠিকমতো ঠাওর করেনি। আপন আবেগে বরাবরের মতো খড়ের বুকে বৈঠার দাগ কাটতে কাটতে ভাটিয়ালি সুরে মশগুল ছিল হয়তো। পারাপারের জন্য সরকারি ভাবে একটি সেতু নির্মাণের জন্য কোলকাতা থেকে ইঞ্জিনিয়ার এসেছে সরজমিনে তদারকি করতে এ কথা নায়ে বসা মণ্ডলবাবুর হাসি মুখ থেকে শুনে বুকটা ধড়াস করে উঠল তার। সহজপুর ও গোপালনগর গ্রামের গ্রাম-প্রধানদের স্বাক্ষর করা বিলটি জেলা পরিষদে নাকি পাশও হয়ে গেছে গত মাসে। এবার উপর মহল থকে আদেশ এলেই সেতু নির্মাণের কাজ শুরু হয়ে যাবে।
ক'দিন ধরে স্বামীর মনের আকাশের চিন্তার মেঘের ঘনঘটার রেশ রৌশনারার মুখেও পড়েছে। প্রধান সাহেব জরুরি তলব দিয়েছে, এবছর থেকে আর ঘাট ডাক হবে না। পাকা সেতু হবে।
ইহান্নবীর পায়ের তলার জমিন সরতে থাকে। সে প্রধানের দু'টি পা জড়িয়ে ধরে,"আমি বৌ-বাচ্চা নিয়ে খাব কী বাবু?"
প্রধান পা ছাড়িয়ে নিয়ে পঞ্চায়েত অফিসে ঢুকতে ঢুকতে বলে," কয়েক মাসের মধ্যে সেতুর কাজ শেষের ওর্ডার আছে। এ ক'মাসে তুই অন্য কাজ জুটিয়ে নে। তোর জন্য তো উন্নয়ন থেমে থাকতে পারে না।"
গোপালনগর ঘাট লাগোয়া জায়গায় মস্ত মস্ত সব লোহার বিম এসেছে। সারাদিন সিমেন্ট, বালি, পাথরের বড় বড় লরি আসে আর ধুলো উড়িয়ে মাল খালাস করে চলে যায়। এ ধুলো খড়ের ধারে মাঝির নৌকায় বিষাদ বয়ে আনে আর বলে— বেশি দেরি নেই বেশি দেরি নেই...খোঁজ মাঝি, খোঁজ, বাঁচার পথ খোঁজ।
খুব তাড়াতাড়ি কাজ হচ্ছে....দুই গ্রামের মাঝের সেতুর দূরত্ব বাড়ার আনন্দ উচ্ছ্বাসের গল্প যত বেগবতী হয় মাঝির চোখের জল তত খড়ের বুকে মেশে। তার অসহায় চিৎকারে কেঁপে ওঠে চরের উলুখাগড়ার বন। নয়নচাঁদ তাকে বন্ধুত্বের প্রশ্রয় দেয়। সেও যেন বলে ওঠে, "তোর হাতে বৈঠা আছে। ভেসে পড়বি মাছ ধরতে। চালানি মাছের কদর কৈ?"
ইহান্নবীর বুকের গোপন কথা তার আদরের নয়নকে তো সে বলেনি। সেতু শেষ হলে নয়নকে পঞ্চায়েতে জমা দিতে হবে। সে তো সরকারের। তখন তারও চির অবসর। ঠিক ওরই মতো। ইদানীং নয়নচাঁদের কপালে একটু বেশি আদর জোটে। আসন্ন বিচ্ছেদের যতন সেটা। একমাত্র ইহান্নবীই তা বোঝে।
নদীর মাঝে সেতুর পিলার যত উঁচু হয় মাঝির কলজের ক্ষত তত গভীর হয়। কয়েক মাসের মধ্যেই ওপারের মস্ত সেতু এপারের মাটি ছোঁয়। আনন্দের বানডাকা এক মিষ্টি সকালে ফিতে কেটে মন্ত্রীমহাশয় সেতুর উদ্বোধন করে যান। গ্রামের সবাই একবাক্যে মেনে নিল, বয়সী মানুষরা এবার একমত হন... সহজপুর আসা এতদিনে সত্যিই সহজ হল।"
ইহান্নবী আর চার মজদুর নয়নচাঁদকে টেনে হিঁচড়ে ডাঙায় আনছে। কিছুতেই সে জল থেকে উঠতে চায় না। প্রতিবাদের চিৎকারে পিছলে নামে জলে। মাঝিকে বারেবারে শুধায়, "কোথায় যাই, কোথাই যাই...।" বানভাসি চোখ আকাশ পানে রেখে ইহান্নবী মজদুরদের সঙ্গে গলা মেলায়, হেই আ হেই আ.. জোরসে মারো... আরও জোরে... হেই আ...।
পঞ্চায়েত অফিসের পাশের শুখা জমিতে সাধের নয়নচাঁদকে রেখে আসার পরে ইহান্নবীর চোখের জল বাগ মানে না। বিড়বিড় করে, " নয়ন রে তুই আমার সুজন ছিলি। তোর ভরসাতেই আমার দিন গুজরান...।"
পরের জমিতে জন খাটতে খাটতে এক ঈদ থেকে আর এক ঈদ চলে এলো। গ্রামের চেহারা বিলকুল বদলে গিয়েছে। সহজপুরের গায়েও লেগেছে শহুরে ছোঁয়া। মাঝে মধ্যে চুপিচুপি নয়নচাঁদকে দেখে আসে ইহান্নবী। তার গায়ে যতনের ছাপ আর নেই। বাচ্চাকাচ্চাদের সেদিন তার উপরে উঠে কুমিরভাঙা খেলছিল। বেশ কয়েকটা পাটাতনও খসে পড়েছে। পরাপারের ভরসা নৌকাকে অতি সহজেই ভুলে গিয়েছে সহজপুর।
ইহান্নবীর বড় মেয়ে দিলরুবা আর ইস্কুলে যায় না। মায়ের সঙ্গে বিড়ি বাঁধে। ছেলেটা লেখাপড়ায় বড় ভালো। তাকে নিয়ে আকাশ ছোঁয়ার স্বপ্ন দেখে ইহান্নবী।
চৈত্রের এক কাকভোরে ইহান্নবী কলকাতাগামী বাস ধরে। গন্তব্য কেরল।