পড়শি যদি আমায় ছুঁতো যম যাতনা সকল যেত দূরে: লালন সাঁই

পড়শি যদি আমায় ছুঁতো যম যাতনা সকল যেত দূরে: লালন সাঁই

hhhhhhhhhhhhhh

আন্দোলনজীবীদের’ আন্দোলনের বর্ষপূর্তি

  • 12 November, 2021
  • 0 Comment(s)
  • 533 view(s)
  • লিখেছেন : সোমনাথ গুহ
আমাদের দেশে যে কোনও জোরালো আন্দোলন ভাঙ্গার প্রধান হাতিয়ার হচ্ছে তাতে ধর্মীয় বিভাজন সৃষ্টি করা। বৃটিশদের দেখানো সেই চিরাচরিত পথে শাসকরা গত পঁচাত্তর বছর ধরে বিভিন্ন আন্দোলন ধূর্তভাবে দমন করেছে। গত মে মাস থেকে পশ্চিম উত্তরপ্রদেশে সংখ্যালঘুদের ওপর আক্রমণ বেড়ে যায়। গোরক্ষার নামে, নানা অজুহাতে মুসলিমদের ওপর আক্রমণ হয়েছে, তাঁদের হেনস্থা করা হয়েছে এমনকি খুনও হয়েছে। কিন্তু তাও তাঁরা সফল হননি, আজকে কিছুদিন পর সেই কৃষক আন্দোলনের বর্ষপুর্তি হবে।

কয়েকদিন বাদেই ঐতিহাসিক কৃষক আন্দোলনের এক বছর পূর্তি হবে। শীত, গ্রীষ্ম, বর্ষা উপেক্ষা করে, পুলিশ ও সংঘীদের ভাড়াটে গুন্ডাদের আক্রমণকে প্রতিরোধ করে, কৃষক ঐক্যে ফাটল ধরানোর নানা ছলচাতুরিকে সামলে নিয়ে, লক্ষাধিক কৃষিজীবী মানুষ বারো মাস ধরে হিমালয়সম ধৈর্য, ত্যাগ, সাহসকে সম্বল করে অনড়, অটল হয়ে সমাবেশিত হয়ে আছেন দিল্লি সীমান্তে। এই অনমনীয়, অকুতোভয়, নাছোড়বান্দা মনোভাবের উৎসটা কি? প্রায় ৭৫০ কৃষক ইতিমধ্যে প্রয়াত হয়েছেন তবুও কোন মন্ত্রবলে বিভিন্ন রাজ্যের মানুষ, জাতি, ধর্ম, ভাষা, লিঙ্গ, শ্রেণী নির্বিশেষে সংগ্রামী মানুষের এই মিলনসমুদ্রে মহাপ্রতাপশালী এক কর্পোরেট, ফ্যাসিবাদি রাষ্ট্রের চোখে চোখ রেখে লড়াই করে যাচ্ছে? শাসক হয়তো এরকমটা কল্পনাও করেনি; চিরকালই তো তারা জনগণের বিভিন্ন অংশকে পরস্পরের বিরুদ্ধে লেলিয়ে দেওয়াতে সিদ্ধহস্ত। তারা হয়তো ভেবেছিলো সাময়িক কিছু প্রতিবাদ হবে তারপর পরস্পর স্বার্থ-বিরোধি নানা দ্বন্দ, ভিন্ন মতের ফলে আন্দোলনকারীরা বিভাজিত হবে এবং ছত্রভঙ্গ হয়ে যাবে। কিন্তু সেটা হল না; কেন হল না সেটা কিছুটা বোঝার জন্যই এই প্রতিবেদন।

২০২০র জুন মাসে কেন্দ্রীয় সরকার ঘোষণা করে যে তারা তিনটি কৃষি আইন প্রণয়ন করতে চলেছে। তখন রাজ্যে কৃষকরা অন্তত ৩৩টি সংগঠনে বিভক্ত। নটি স্বতন্ত্র সংগঠন ছিল এছাড়া বাকিরা ‘অল ইন্ডিয়া কিষান সংঘর্ষ কোওর্ডিনেশন কমিটি’ এবং ‘ভারতীয় কিষাণ ইউনিয়ন’ এর সদস্য ছিলেন। আজকে যখন আন্দোলন উচ্চ পর্যায়ে চলে গেছে তখন কেউ ভাবতেও পারবেন না এই সংগঠনগুলিকে একত্রিত করা কতো কঠিন ছিল। এঁদের মধ্যে ধনী কৃষকের সংগঠন যেমন ছিল তেমনি ছোট, প্রান্তিক কৃষক ও ক্ষেতমজুরদের সংগঠনও ছিল। আকালি দল-ঘেঁষা সংগঠন, ধর্মীয় সংগঠন থেকে তথাকথিত অতিবাম সহ বিভিন্ন মতাদর্শের সংগঠন ছিল। প্রায় দু মাস ধরে চেষ্টার ফলে এঁদের ঐক্যবদ্ধ করা সম্ভব হয়েছে।

সংসদে কৃষি বিলের অর্ডিন্যান্স আনা হয় ১৪ই সেপ্টেম্বর, লোকসভা ও রাজ্যসভায় তা গৃহীত হয় যথাক্রমে ১৭ ও ২০ সেপ্টেম্বর। এই প্রক্রিয়া কৃষকদের ঐক্য ত্বরান্বিত করে। ২৪শে সেপ্টেম্বর তাঁরা রাজ্যে তিন দিন ব্যাপি বন্ধ ডাকে যা জনজীবন স্তব্ধ করে দেয়। পরের দিন সারা দেশ জুড়ে কৃষকরা ‘অল ইন্ডিয়া কিষাণ সংঘর্ষ কোওর্ডিনেশন কমিটি’র ব্যানারে বিক্ষোভ দেখায়। পরে অনেক কৃষক বলেন তাঁরা তখন থেকেই জানতেন যে এই আন্দোলন লম্বা চলনে ওয়ালা হ্যায়। তেসরা নভেম্বর দেশজুড়ে রাস্তা রোকো প্রোগ্রাম হয়, ২৫ তারিখ পাঞ্জাব ও হরিয়ানার কৃষকরা ‘দিল্লি চলো’ আওয়াজ দেন। পরের দিন দিল্লি অভিমুখে বিখ্যাত অভিযান শুরু হয়।

প্রথমেই কেন্দ্রীয় সরকার পাঞ্জাব ও হরিয়ানার মধ্যে রাজ্য বিভাজন এবং শতদ্রু নদীর জল বন্টন নিয়ে পুরানো বিবাদ খুঁচিয়ে তুলে শিখ ও হিন্দুদের মধ্যে বিভেদ তৈরির চেষ্টা করে। এতে কোনও কাজ হয় না উল্টে পাঞ্জাবের কিষাণদের যখন ব্যারিকেড করে, জলকামান দিয়ে বাধা দেওয়ার চেষ্টা করা হয়, হরিয়ানার কৃষিজীবীরা সদলবলে তাঁদের সাথে পুলিশ প্রশাসনকে প্রতিরোধ করেন। এরপর আমরা জানি সরকারের সাথে ১১টি বৈঠক হয়, কিন্তু সরকারের একগুঁয়ে মনোভাবের কারণে কোনও সমাধান সূত্র বের হয় না।

তারপর থেকে শুরু হয়েছে এক তিতিক্ষা পর্ব। রাষ্ট্র তার যাবতীয় শক্তি নিয়ে কৃষকদের হিংসায় প্ররোচিত করার চেষ্টা করেছে; তাঁদের হঠকারি পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য উসকিয়েছে। ধনি-দরিদ্র চাষি, উচ্চবর্ণ-দলিত চাষি, শিখ-হিন্দু-মুসলিম ধর্মের ভিত্তিতে তাঁদের মধ্যে বিবাদ সৃষ্টি করার চেষ্টা করেছে, কিন্তু কৃষকরা অসীম ধৈর্য ও বিচক্ষণতা দেখিয়ে সমস্ত প্ররোচনা, আক্রমণ উপেক্ষা করে নিজেদের লক্ষে অবিচল থেকেছেন। গ্রামে পরম্পরাগত ভাবে যে শ্রেণী ও জাতি বৈষম্য দীর্ঘদিন ধরে বিদ্যমান সেটাকে উসকে দিয়ে সরকার বারবার প্রমাণ করার চেষ্টা করেছে যে এটা শুধুমাত্র সম্পন্ন কিষাণদের আন্দোলন। সংযুক্ত কিষান মোর্চার অভিজ্ঞ নেতৃত্ব শুরু থেকেই এই সমস্যাগুলো সম্পর্কে অবহিত ছিলেন। এই মোর্চায় ক্ষেতমজুরদের নিজস্ব সংগঠন আছে। ক্ষুদ্র, ছোটো চাষি এবং ক্ষেতমজুররা নিজেরা মনে করছেন এই কালা আইনের ফলে তাঁদের কর্মসংস্থান এবং মজুরিতে টান পড়বে। তাই ধনী কৃষকদের সাথে শ্রেণীগত দ্বন্দ থাকলেও, জাতিগত বৈষম্য থাকলেও তাঁরা আন্দোলনে শামিল হয়েছেন। রাজস্থানে যেমন তফসিলি জাতির মীনা সম্প্রদায়ের কৃষকরা আন্দোলনে সক্রিয় অংশগ্রহণ করছেন; জাঠ, গুজ্জরদের পাশাপাশি তাঁরাও কালা কানুনের প্রতিবাদে সরব। আন্দোলনের অন্যতম শক্তি হরিয়ানার খাপ সংগঠনগুলি, যারা প্রবল ভাবে পিতৃতান্ত্রিক ও জাতিগত ভাবে রক্ষণশীল। কিন্তু আন্দোলনের তোড়ে এই সাবেকি পাঁচিলগুলো আপাতত ভেঙে গেছে। হরিয়ানার জাঠ-অধ্যুষিত অঞ্চলে এসকেএমের সভায় মহিলাদের উপস্থিতি লক্ষণীয়। পাঞ্জাবে অধিকাংশ পুরুষ যখন দিল্লি সীমান্তে চলে গেছে তখন তাঁদের ঘর ও কৃষি দুটোই সামাল দিয়েছেন মহিলারা। পাঞ্জাবে বিভিন্ন বিক্ষোভে মহিলারা নেতৃত্ব দিয়েছেন।

আমাদের দেশে যে কোনও জোরালো আন্দোলন ভাঙ্গার প্রধান হাতিয়ার হচ্ছে তাতে ধর্মীয় বিভাজন সৃষ্টি করা। বৃটিশদের দেখানো সেই চিরাচরিত পথে শাসকরা গত পঁচাত্তর বছর ধরে বিভিন্ন আন্দোলন ধূর্তভাবে দমন করেছে। গত মে মাস থেকে পশ্চিম উত্তরপ্রদেশে সংখ্যালঘুদের ওপর আক্রমণ বেড়ে যায়। গোরক্ষার নামে, নানা অজুহাতে মুসলিমদের ওপর আক্রমণ হয়েছে, তাঁদের হেনস্থা করা হয়েছে এমনকি খুনও হয়েছে। নুর পঞ্চায়েতে একটি বৃহৎ সভা থেকে মুসলিমদের সরাসরি হুমকি দেওয়া হয়েছে। সেই নুর অঞ্চলেই রাকেশ টিকায়েত সহ অন্য নেতারা মহাপঞ্চায়েত করেছে এবং তারপর ৫ই সেপ্টেম্বর মুজাফরপুরে বিশাল মহাপঞ্চায়েত করে অভুতপূর্ব হিন্দু-মুসলিম ঐক্য স্থাপন করেছে। ভারতবর্ষে যা কদাচিৎ ঘটে সেটাই মুজাফরপুরে হয়েছেঃ হিন্দু ও মুসলমানরা একত্রে শ্লোগান তুলেছে, আল্লাহ হো আকবর, হর হর মহাদেব। এই সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি উত্তরপ্রদেশের আসন্ন নির্বাচনে বিজেপির পক্ষে চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এসকেএম ২৬ ও ২৭শে সেপ্টেম্বরে কনভেনশন করে বাইশটি রাজ্যের কৃষকদের সংঘবদ্ধ করেছে। আরও গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন ট্রেড ইউনিয়ান, মহিলা সংগঠন, ছাত্র যুব সংগঠনকে এই সম্মেলনে শামিল করে তাঁদের দাবিদাওয়া সংযুক্ত করে বৃহত্তর আন্দোলনের পথে এগিয়েছে।

সমস্ত ঘৃণ্য, বিভাজনকারী পন্থা ব্যর্থ হওয়ার পরে শাসক শারীরিক ভাবে কিষাণদের আক্রমণ করে তাঁদের দমন করার চেষ্টা করেছে। কুখ্যাত লখিমপুর খেরি, কারনাল আমরা জানি; সিঙ্ঘু সীমান্তে গুপ্তহত্যা, অজানা ট্রাক সংগ্রামী নারীদের পিষ্ট করে দেওয়ার কাহিনী সবই আমরা জানি, তবুও এই আন্দলোন বহমান আরও দুর্বার। এর রসায়নটা কি?

আসল কথা হচ্ছে কৃষকদের দেয়ালে পিঠ ঠেকে গেছে। এই আইনগুলো যদি লাগু হয় তাহলে তাঁরা জমি হারাবেন, রুটিরুজি হারাবেন। ২০২১ এর NSSO র (ন্যাশানাল স্যাম্পেল সার্ভে অফিস) সমীক্ষা অনুযায়ী দেশের কৃষি অবস্থা অত্যন্ত করুণ। ভূমিহীন চাষির সংখ্যা ২০১২-১৩তে ছিল ৩৪.৫%, সেটা ২০১৮-১৯য়ে বেড়ে হয়েছে ৪২%। কৃষকের গড় আয় মাত্র ১০১২৮ টাকা যার মধ্যে কৃষি উৎপাদন থেকে আসে ৪০৬৩ টাকা। এটা কিন্তু নিজের এবং পরিবারের শ্রম এবং জমির ভাড়া ব্যাতিত, যেগুলো হিসাবে ধরলে চাষ থেকে প্রকৃত আয় দাঁড়াবে যৎসামান্য। বাকি আয় আসে ক্ষেতমজুরি থেকে, এনরেগার মতো বিভিন্ন সরকারি স্কিম থেকে যেগুলো গ্রামাঞ্চলে সাধারণ মানুষের কাছে একেবারেই সহজলভ্য নয়। কৃষিতে বিমা বেশির ভাগ মানুষের ক্ষেত্রেই কোনও কাজে আসে না। যাঁরা ব্যাংক থেকে ঋণ নেন তাঁদের বাধ্যতামূলক বিমা করতে হয়। বিমার ডকুমেন্ট ব্যাংক আটকে রাখে, যাতে লোন অনাদায়ী হলে সেই টাকা থেকে তা শোধ করা যায়। সমীক্ষায় দেখা যাচ্ছে ২০১৮-১৯এ, ৩৮% ধানচাষি, ৩৫% গমচাষি, ৪৫% তুলো চাষির ফসল নষ্ট হয়েছে। এঁদের মধ্যে অল্প কয়েকজন মাত্র বিমার টাকা পেয়েছে। কৃষকরা কতো বঞ্চিত সেটা সামান্য কিছু উদাহরণ থেকে দেখা যেতে পারে। ১৯৭০এ গমের কুইন্টাল প্রতি দাম ছিল ৭৬ টাকা, ২০১৫ সালে সেটা ছিল ১৪৫০ টাকা, অর্থাৎ ১৯ গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। একই সময়ে সরকারি কর্মচারীদের মাহিনা, শুধুমাত্র বেসিক ডিএ ধরলে, ১২০ থেকে ১৫০ গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে; শিক্ষকদের বেড়েছে ২৮০ থেকে ৩২০ গুণ; অধ্যাপকদের ১৫০ থেকে ১৭০ গুণ। এঁদের এই বৃদ্ধির কেউ বিরোধিতা করছে না কিন্তু একই সময়ে গমের দাম যদি অন্তত ১০০ গুণ বৃদ্ধি পেত তাহলে কৃষকদের কুইন্টাল প্রতি ৭৬০০ টাকা পাওয়া উচিত ছিল। সমাজের অন্য পেশার চেয়ে কৃষিজীবীরা কতটা অবহেলিত এটা তাঁর জ্বলন্ত উদাহরণ।

এই তিন কৃষি কানুন মেনে নেওয়ার অর্থ নিজেদের মৃত্যু পরোয়ানায় সই করা। ভারতের কৃষিতে কর্পোরেট রাজ কায়েম হবে। লক্ষ লক্ষ কৃষক জমি থেকে উচ্ছেদ হয়ে নিরন্ন, অসহায় মজুর বাহিনীতে পরিণত হবে।

0 Comments

Post Comment