পড়শি যদি আমায় ছুঁতো যম যাতনা সকল যেত দূরে: লালন সাঁই

পড়শি যদি আমায় ছুঁতো যম যাতনা সকল যেত দূরে: লালন সাঁই

hhhhhhhhhhhhhh

NEET-NET-NTA ঃ মুমূর্ষু শিক্ষাব্যবস্থা

  • 28 June, 2024
  • 0 Comment(s)
  • 703 view(s)
  • লিখেছেন : শুভ্রদীপ ঘোষ
৩২ বছর আগেই এক-দেশ-এক-পরীক্ষার ধারণা তৈরি হয়ে গিয়েছিল। বহু বছর ঠাণ্ডা ঘরে থাকার পর ২০১০ এবং ২০১৩ সালে দুটি কমিটি এনটিএ বাস্তবায়িত করার নীল নকশা তৈরি করে জমা দেয় সরকারের কাছে। ২০১৭ সালের বাজেট ভাষণে এই সংস্থা তৈরির ঘোষণা হয়। সেই কারণেই কি বিরোধী কংগ্রেস এই এনটিএ এবং কেন্দ্রীভূত এক পরীক্ষা ব্যবস্থাকে ভাঙার কথা বলতে এতো দ্বিধান্বিত?

সাধারণ নির্বাচনের ফলাফল ঘোষণার ৩ সপ্তাহও পার হয়নি, গোটা দেশের শিক্ষাব্যবস্থায় প্রবল কম্পন। কম্পন, যা অভূতপূর্ব। একের পর এক সর্বভারতীয় প্রবেশিকা পরীক্ষায় ধরা পড়ছে ত্রুটি, কারচুপি, দুর্নীতি। প্রশ্নের মুখে দাঁড়িয়ে আছে গোটা উচ্চশিক্ষার হাল হকিকত। মূলধারার সংবাদমাধ্যম হাল্কা করে ছুঁয়ে বেরিয়ে গেলেও প্রতিদিনই এ সংক্রান্ত কোন না কোন খবর প্রকাশ করতে বাধ্য হচ্ছে। এই ভূমিকম্পের কেন্দ্রে উঠে আসছে একটিই সংস্থার নাম - ন্যাশনাল টেস্টিং এজেন্সি, সংক্ষেপে এনটিএ (NTA)। বিগত বেশ কয়েক বছরে এ দেশের নাগরিক যে দুটি বর্ণমালা সংস্থার সঙ্গে সম্যক পরিচিত তারা হল ই ডি (ED) এবং সি বি আই (CBI)। মাত্র তিন সপ্তাহেই এই দুই সুপরিচিত সংস্থার টিআরপি কে কয়েক যোজন পিছনে ফেলে দিয়েছে এনটিএ।

কী এই এনটিএ? ভারত সরকারের শিক্ষা মন্ত্রকের অধীনস্থ একটি স্বয়ংশাসিত সংস্থা যার কাজই হল সর্বভারতীয় ক্ষেত্রে মূলত উচ্চশিক্ষায় যে সব প্রবেশিকা পরীক্ষা আছে আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে সেগুলির পরিচালনা করে এই এনটিএ। এর মধ্যে আছে প্রশ্নপত্র এবং উত্তরমালা তৈরি, প্রযুক্তির মাধ্যমে পরীক্ষা পরিচালনা করা এবং ফলাফল প্রকাশ। সঠিক পরীক্ষাকেন্দ্র বাছা, সেগুলির প্রযুক্তিগত দিক খতিয়ে দেখা, পরীক্ষার্থীদের সেই কেন্দ্রগুলিতে পক্ষপাতবিহীন ভাগাভাগি, একই বিষয়ের পরীক্ষা একাধিক দিনে করতে হলে প্রায় সমমানের একাধিক প্রশ্নপত্রের ব্যবস্থা রাখা এবং ফলাফল প্রকাশের আগে বিভিন্ন দিনের ফলাফল বিশ্লেষণ করে তার প্রমিতকরণ, এই কাজগুলি পরীক্ষা পরিচালনার অন্তর্ভুক্ত।

এনটিএ তৈরির প্রস্তাব প্রথম আসে ১৯৯২ সালে। ১৯৮৬ সালের জাতীয় শিক্ষানীতির প্রয়োগ নিয়ে আলোচনায় তৎকালীন মানব সম্পদ উন্নয়ন মন্ত্রক ১৮৮ পাতার একটি খসড়া তৈরি করে। সেই খসড়ার ৭৭ পাতায় বলা আছে

“  Specially designed tests can also be administered at the national level for the purpose of entry to educational institutions at various levels. For example, a single test at 2 level conducted on a national basis can replace a multiplicity of entrance examinations to universities and colleges, specially professional courses like engineering, medicine, etc. Similarly, a test conducted at the Bachelors' degree level can determine the eligibility of candidates for-admission to Master's degree courses irrespective of the fact that the concerned universities have declared the bachelor's degree results. At the Master's degree level, a similar test can determine the suitability of candidates for admission to researchdegrees, award of fellowships, etc.

অর্থাৎ ৩২ বছর আগেই এক-দেশ-এক-পরীক্ষার ধারণা তৈরি হয়ে গিয়েছিল। বহু বছর ঠাণ্ডা ঘরে থাকার পর ২০১০ এবং ২০১৩ সালে দুটি কমিটি এনটিএ বাস্তবায়িত করার নীল নকশা তৈরি করে জমা দেয় সরকারের কাছে। ২০১৭ সালের বাজেট ভাষণে এই সংস্থা তৈরির ঘোষণা হয়। বর্তমানে এনটিএ পরিচালন সমিতির সদস্যদের মধ্যে আছেন তিনটি আই আই টির (IIT) অধিকর্তা, দুটি এন আই টি (NIT) দুটি এ আই আই এম এস (AIIMS), একটি আই আই এস ই আরের (IISER) অধিকর্তা, জহরলাল নেহেরু বিশ্ববিদ্যালয় এবং ইন্দিরা গান্ধী মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য এবং কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ের মান নির্ধারণকারী সংস্থা ন্যাশনাল অ্যাসেস্মেন্ট এবং অ্যাক্রিডেশন কাউন্সিলের (NAAC) অধিকর্তা। এনটিএ’র পরিচালনায় সর্বভারতীয় ইঞ্জিনিয়ারিং ( JEE Mains), ডাক্তারি (NEET-UG), ম্যানেজমেন্ট (CMAT), ফ্যাশন টেকনোলজি, বিভিন্ন  বিশ্ববিদ্যালয়ে বিভিন্ন শাখায় স্নাতক পাঠক্রম (CUET), দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয় (DUET) এবং জহরলাল নেহেরু বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন স্নাতক ও স্নাতকোত্তর পাঠক্রম, হোটেল ম্যানেজমেন্ট (NCHMJEE), স্নাতকোত্তর ফার্মাসির প্রবেশিকা (GPAT)ছাড়াও কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা এবং গবেষণার জন্য বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (UGC-NET)এবং কাউন্সিল অফ সায়েন্টিফিক অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিয়াল রিসার্চের (CSIR-NET) ফেলোশিপের মত গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষাগুলি নেওয়া হয়ে থাকে।

যাত্রা শুরুর ৩ বছর পর থেকেই একের পর এক বিতর্কের জন্ম দিয়েছে এই সংস্থাটি। ২০২০ সালের JEE Mains পরীক্ষায় এক পরীক্ষার্থীর হয়ে অন্য একজন পরীক্ষা দিয়ে তার রাজ্যে প্রথম হয়। সংস্থা প্রথমে ব্যাপারটি ধরতেই পারেনি।  সেই বছরের NEET পরীক্ষায় ভুল ফলাফল প্রকাশের জেরে আত্মঘাতী হন এক পরীক্ষার্থী। আরেক পরীক্ষার্থী দাবি করেন এনটিএ স্বীকার করে নিয়েছে তার প্রকাশিত ফলাফল ভুল। ২০২২ এর JEE Mains পরীক্ষায় ফের অভিযোগ ওঠে নানা ধরণের প্রযুক্তিগত ত্রুটির, যার জন্য গড় নম্বর খুব কম ওঠে। এই বছরের শুরুর দিকে JEE Mains পরীক্ষা পরিচালনায় গুরুতর অনিয়ম এবং ভুলের একাধিক অভিযোগ ওঠে। এরপর NEET ও UGC-NET বিতর্ক সবার জানা। মুলতুবি হয়ে গেছে CSIR-NET। অনিশ্চয়তায় ভুগছেন  লাখ লাখ হবু গবেষক এবং শিক্ষক। গোটা ব্যবস্থার উপর আস্থা হারাচ্ছেন ছাত্র, অভিভাবক, শিক্ষক, চাকরিপ্রার্থী প্রত্যেকেই।

প্রশ্ন হল এত প্রযুক্তিগত কৃৎকৌশল এবং সেইসঙ্গে ওজনদার শিক্ষাবিদদের উপস্থিতি সত্ত্বেও এনটিএ’র নির্ভুল এবং সুষ্ঠু পরীক্ষা পরিচালনার উদাহরণ এত কম কেন। শুধু তাইই নয়। NEET এবং NET কেলেঙ্কারির ব্যাপ্তি স্বাধীন ভারতে ঘটা শিক্ষা সংক্রান্ত সমস্ত দুর্নীতিকে পিছনে ফেলে দিয়েছে। এর কারণ কী? আরও বড় প্রশ্ন হল কেন্দ্রীভূত এবং অতিরিক্ত প্রযুক্তিনির্ভর এই পরীক্ষাপদ্ধতি কি আদৌ কার্যকরী? এই দুটি প্রশ্নের উত্তর একে অপরের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত।

এনটিএ তৈরি এবং তার মাধ্যমে এমনকি গোটা দেশের গুরুত্বপূর্ণ স্নাতক স্তরের পাঠক্রমে অন্তর্ভুক্তির ছাড়পত্র পাবার ব্যবস্থা একাধারে শিক্ষাকে মুষ্টিমেয়ের কব্জায় এনে ফেলা, শিক্ষার বাণিজ্যকরণ ত্বরান্বিত করা, এবং সেইসঙ্গে ভারতবর্ষের আঞ্চলিক বৈচিত্র্যকে স্বীকৃতি দেবার বদলে সমস্ত কিছু শক্তিশালী একটি কেন্দ্রের আয়ত্বে এনে ফেলার রাজনীতির বহিঃপ্রকাশ বৈ কিছু নয়। NEET, JEE-Mains, এবং CUET-  স্নাতক স্তরে যথাক্রমে  ডাক্তারি, ইঞ্জিনিয়ারিং এবং এ দুইয়ের বাইরে প্রচলিত বিষয়গুলি পড়ার জন্য একমাত্র প্রবেশিকা পরীক্ষা ঘোষণা করে অস্বীকার করা হয়েছে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের স্বাতন্ত্র্য এবং ভারতবর্ষ নামক দেশটির বিপুল আঞ্চলিক বৈচিত্র্যকে। শুধু তাইই নয়, যেহেতু একটিই প্রবেশিকা পরীক্ষা ব্যতিরেকে সামনের সারির প্রতিষ্ঠানগুলিতে পছন্দের বিষয় পড়ার সুযোগ পাওয়া যাবে না তাই এই পরীক্ষায় সাফল্য পাওয়ানোর জন্য মাথা চাড়া দিয়েছে নানা রঙয়ের কোচিং সেন্টার। এই কোচিং সেন্টারগুলির কাজ বিষয় শেখানো কিংবা বিষয়ের প্রতি ভালবাসা, আগ্রহ তৈরি করা নয়। তাদের কাজ কেবলমাত্র একটি বিশেষ পরীক্ষার বিশেষ ধাঁচের প্রশ্নপত্রকে কীভাবে বাগে আনা যায় তার কৌশল শেখানো। ফলত এমনকি মেধাবী ছাত্র ছাত্রীরাও বিষয় শিখতে চাইছে না। ভাল প্রতিষ্ঠানে সুযোগ পেয়ে তারা চাইছে কোনরকমে ডিগ্রিটুকু নিয়ে ভাল বাজারদর পেতে যাতে প্রবেশিকার প্রস্তুতি এবং বাজারের কাছে কাম্য প্রতিষ্ঠানে পড়ার জন্য করা বিনিয়োগ সুদে আসলে উসুল হয়ে যায়। বাজারপ্রেমী, কর্পোরেট-প্রিয় এই মনস্তত্ব ক্রমশ চারিয়ে গেছে কৈশোর কাটিয়ে সদ্য বড়দের পৃথিবীতে এসে পড়া বাচ্চাদের মনে। উচ্চশিক্ষার মানদণ্ডই বন্ধক রয়ে গেছে MCQ অর্থাৎ Multiple choice questions এর সঠিক উত্তরের কাছে।

সাম্প্রতিক একটি রিপোর্টে (১ নং ছবি) জানা যাচ্ছে গোটা দেশে প্রায় ৪ কোটি ছাত্র কোচিং ইন্সটিটিউটে নাম লেখায়। কোচিং ইন্সটিটিউটগুলি শিক্ষা বাজারের প্রায় ১৭ % দখল করে নিয়েছে। তাদের অংশীদারি ঊর্ধগামী বটে কিন্তু সাফল্যের হার নগণ্য। এদিকে উচ্চশিক্ষাখাতে সরকারী বরাদ্দ ক্রমশ কমছে, তার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে কমছে আসন সংখ্যা। এই দুয়ে মিলে সবেধন নীলমণি প্রবেশিকা পরীক্ষায় সাফল্যের জন্য অসাধু উপায় অবলম্বনের চেষ্টা বাড়াটাই স্বাভাবিক। আগেই বলা হয়েছে গত ৪ বছরে এনটিএ পরিচালিত পরীক্ষাগুলিতে গুরুতর অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। আজ একের পর এক পরীক্ষায় দুর্নীতি এবং তার ফলে পরীক্ষার পরে পরীক্ষা বাতিলের মত অভাবনীয় সিদ্ধান্ত সেই অনিয়মের ধারা জলপ্রপাতে পরিণত হবার লক্ষণ। কেবল একটি দুটি অঞ্চলে মুষ্টিমেয় কয়েকজনের দুর্নীতির ফসল এ হতে পারে না। পরীক্ষা সংক্রান্ত পুরো বিষয়ের রন্ধ্রে রন্ধ্রে ঘুণ না ধরলে এত বেনিয়ম এবং দুর্নীতি সম্ভব নয়।

 

১ নং ছবি ঃ সূত্র Deccan Herald

এই প্রবণতার বলি হচ্ছেন হবু শিক্ষক এবং গবেষকরাও। দুর্নীতির গন্ধে UGC-NET যা মূলত মানবীবিদ্যার নানা শাখায় গবেষণা এবং শিক্ষকতার ছাড়পত্র এবং CSIR-NET যা বিজ্ঞানের বিভিন্ন শাখায় গবেষণা এবং শিক্ষকতায় প্রবেশের চাবিকাঠি সেগুলিও এই বছর অনির্দিষ্ট কালের জন্য  মুলতুবি হয়ে গেল।  বিগত দশ বছরে বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণার জন্য সুযোগ ক্রমশ কমেছে, NET ফেলোশিপ না থাকলে দরজা প্রায় বন্ধ। ফলে গলা কাটা প্রতিযোগিতাও বেড়েছে আড়ে বহরে। কোচিং সেন্টারের ব্যবসা ধরে নিয়েছে বাজার। হাত ধরাধরি করে এসেছে  অসাধু উপায় অবলম্বনের পথ। এই সবের সমষ্টিগত বলি হলেন শিক্ষকতা গবেষণার সুযোগ পাওয়ার স্বপ্ন দেখা লাখ লাখ তরুণ তরুণী।

প্রবেশিকা পরীক্ষা ব্যবস্থার কথাই যখন উঠল তখন মনে রাখা ভাল MCQ ভিত্তিক পরীক্ষার উপযোগিতা নিয়ে আন্তর্জাতিক স্তরেই যথেষ্ট  প্রশ্ন তোলা হয়েছে। আমেরিকান বিশ্ববিদ্যালয়গুলিতে জায়গা পাবার জন্য আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত GRE পরীক্ষার ফলকে গ্রাহ্য করছেন না সেদেশের একাধিক নামজাদা প্রতিষ্ঠান। তাঁরা বিশ্লেষণ করে দেখেছেন GRE তে দারুণ নম্বর পাওয়া আর ভাল গবেষক হবার সম্পর্ক সমানুপাতিক হবার বদলে ক্রমশ ব্যস্তানুপাতিক হয়ে দাঁড়াচ্ছে। অর্থাৎ একটি বিশেষ পরীক্ষার সাফল্য গবেষণায় প্রতিফলিত হচ্ছে না কারণ গবেষক হওয়াটা কোন বিশেষ কৌশলে বুৎপত্তি থাকার বিষয় একেবারেই নয়। কতকটা একই প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে NET পাশ করে গবেষণায় আসা ছাত্র ছাত্রীদের মধ্যেও। আজ থেকে ১০/১৫ বছর আগেও NET পরীক্ষায় সফল হওয়া ছাত্র ছাত্রীদের আলাদা চোখে দেখা হত। নিজের কাজের জায়গার এবং অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের সহকর্মীদের অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে আমরা বুঝতে পারছি সেই পরিসর ক্রমাগত সঙ্কুচিত হয়ে আসছে।   

সরকারী বদান্যতায় এভাবেই ফাঁপা হয়ে যাওয়া শিক্ষাব্যবস্থার অগোছালো অবস্থার সুযোগ নিতে গুছিয়ে মাঠে নামছে বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলি। চড়া দামে পড়াশুনোর সুযোগ করে দিচ্ছে তারা। ক্রম সংকুচিত কাজের বাজারে নিজেদের জায়গা করে নিতে প্রাণপণ ছুটছে এমনকি সাধারণ মধ্যবিত্তও। ফলে এক-দেশ-এক-পরীক্ষা নীতির নিট ফল উচ্চশিক্ষার সম্পূর্ণ পণ্যায়ন এবং একটি ক্ষুদ্র সুবিধাভোগী শ্রেণীর হাতে গোটা ব্যাপারটা চলে যাওয়া।

প্রশ্ন হল এই জটিল অবস্থার সমাধান কী? সমাধানের প্রাথমিক শর্ত হল এক দেশ এক পরীক্ষা নীতি সর্বক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয় এই কথাটা অনুধাবন করা। ভারতবর্ষের মত বৈচিত্র্যের দেশে (ভৌগলিক, ঐতিহাসিক, সামাজিক) এক মাপের কাপড় সর্বত্র চালাতে গেলে আসলে দেখা যাবে সে কাপড় ক্ষুদ্র একটি গোষ্ঠীর মাপেই হবে। বাকিদের সে ক্ষেত্রে বিনা কাপড়েই থাকতে হবে। সুতরাং, NEET, CUET, JEE Mains পরীক্ষাগুলির বিকেন্দ্রীকরণ ঘটাতে হবে। অর্থাৎ রাজ্যের হাতে ছেড়ে দিতে হবে রাজ্যের ইঞ্জিনিয়ারিং এবং ডাক্তারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রবেশিকা পরীক্ষা। বিশ্ববিদ্যালয়ের হাতে ছেড়ে দিতে হবে তাদের স্নাতক এবং স্নাতকস্তরে প্রবেশিকার দায়িত্ব। এমনকি কেন্দ্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়গুলিকেও বের করে আনতে হবে এর আওতা থেকে। এর বিরুদ্ধে একটা যুক্তি খুব চলে - এতগুলো প্রবেশিকা দিতে হওয়া ছাত্র ছাত্রীদের উপর খুব চাপ ফেলে। এমনকি একই সময়ে হওয়ার কারণে সবাই সব পরীক্ষা দিতে পারে না। কথাটা অযৌক্তিক বলে উড়িয়ে দেবার নয়। কিন্তু এর উল্টোদিক হল এই যে একাধিক পরীক্ষায় একজন ছাত্র কিংবা ছাত্রীর সুযোগ থাকে একটা পরীক্ষা খারাপ হলেও অন্যটা ভাল হবার। একটিই প্রবেশিকা পরীক্ষা হলে সে সুযোগ নেই। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের পরীক্ষা যাতে একই সময়ে না পড়ে সেটা শিক্ষাবর্ষের শুরুতেই প্রতিষ্ঠানগুলি আলোচনা করে স্থির করে নিতে পারে। এ ব্যতীত দরকার সরকারী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যথেষ্ট পরিমাণে আসনসংখ্যার বৃদ্ধি। এই অসুস্থ প্রতিযোগিতা এবং বাজারের হাতে শিক্ষাকে বিকিয়ে দেবার অতিমারী অনেকাংশেই রোধ করা যাবে যদি সরকারী প্রতিষ্ঠানে আসনসংখ্যা কয়েকগুণ বাড়ানো যায়। ২৮ লাখ প্রত্যাশীর জন্য ১ লাখ আসন ( ১ নং ছবি) বুঝিয়ে দেয় শিক্ষার রক্তাল্পতা।

গবেষণা এবং শিক্ষকতার জন্য সর্বভারতীয় NET ফেলোশিপের সংখ্যাবৃদ্ধি আর একটি জরুরী দাবি। শুধুমাত্র গবেষণার জন্য একমাত্র  NET নয়, Non NET ফেলোশিপের বন্দোবস্ত করতে হবে এবং প্রত্যাশীদের মধ্যে থেকে উপযুক্ত প্রার্থী বাছার দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের হাতে দিতে হবে। এর পরে যে কটি সর্বভারতীয় পরীক্ষা থাকবে তার প্রত্যেকটিতে প্রশ্নপত্র এবং মূল্যায়নের ধরণ বদলানোও আশু কর্তব্য। শুধু MCQ নয়, প্রশ্নপত্রের সিংহভাগ থাকবে বিশ্লেষণাত্মক যাতে বিষয় সম্বন্ধে পরীক্ষার্থীর গভীরতার আন্দাজ পাওয়া যায়। এই বিষয়টিতে অনেকেই দ্বিমত হবেন। তাঁদের যুক্তি হবে এত উত্তরপত্রের মূল্যায়ন কীভাবে হবে। আর মূল্যায়ন হলেও আর টি আইয়ের জেরে গোটা পদ্ধতি মন্থর হয়ে যেতে পারে। অবশ্যই এ বক্তব্যে যুক্তি আছে। কিন্তু সদিচ্ছা থাকলে অসম্ভবও নয়। ভাবনাচিন্তার ছাপ রাখা প্রশ্নপত্র, সন্দেহাতীত নির্ভুল উত্তর, গোটা দেশের বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের দিয়ে মূল্যায়ন এবং যথাযথ সাম্মানিক দেবার ব্যবস্থা থাকলে সুষ্ঠুভাবে পরীক্ষা এবং মূল্যায়ন সম্ভব। প্রয়োজন সদিচ্ছা এবং পারস্পরিক বোঝাপড়া।

একের পর এক ভূমিকম্পের জেরে সরকার নড়ে চড়ে বসেছেন। শিক্ষা মন্ত্রক পরীক্ষা ব্যবস্থায় সংস্কার, পরীক্ষা সংক্রান্ত তথ্যের সুরক্ষা এবং এন টি এ’র কার্যকারিতা খতিয়ে দেখার জন্য একটি উচ্চপর্যায়ের কমিটি (২ নং ছবি) গঠন করেছেন। আগামী ২ মাসের মধ্যে সেই কমিটির রিপোর্ট পেশ হওয়ার কথা। কিন্তু প্রশ্ন রয়ে গেল এই বছরের NEET পরীক্ষার পরিচ্ছন্নতা এবং NET পরীক্ষার ভবিষ্যৎ নিয়ে। সে বিষয়ে কোন উচ্চবাচ্য নেই। লাখ লাখ প্রত্যাশীর অবর্ণনীয় মানসিক যন্ত্রণার দিকটি নিয়ে কোন মহলেই কোন কথা শোনা যাচ্ছে না।

আমরা যারা শিক্ষকতা গবেষণায় আছি কিছু প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নিতে হবে আমাদেরই। যদি আমরা শিক্ষাব্যবস্থার কংকালসার অবস্থায় উদ্বিগ্ন হই, যদি একের পর এক প্রজন্মের ভবিষ্যৎ নিয়ে আশঙ্কিত হই  তবে আলাপ আলোচনা শুরু করতে হবে এখনই এবং টান দিতে হবে গোড়া থেকেই। মৃত্যুপথযাত্রী শিক্ষাব্যবস্থাকে ভেন্টিলেটর থেকে বার করে আনার কোন শর্ট কাট নেই।

 

২ নং ছবি ঃ সূত্র প্রেস ইনফরমেশন ব্যুরো।

0 Comments

Post Comment