মোথাবাড়িতে বিচারকেরা অবরুদ্ধ হয়েছিলেন। নিশ্চয়ই তাঁদের তাতে কষ্ট হয়েছিল। আমি সমব্যথি। রাস্তা অবরোধ, মিছিল, ধর্মীয় উৎসব এসবেও সাধারণ মানুষ নানা কষ্ট পেয়ে থাকেন। আমি ব্যক্তিগতভাবে কোনো ধর্মীয় উৎসবের জন্যই রাস্তা বন্ধ করতে দেওয়ার পক্ষপাতি নই। যাঁরা আনন্দ করবেন তাঁরা যেন অপর যাঁরা সেই বৃত্তের বাইরে তাঁদের প্রতি সহানুভূতি সম্পন্ন হ'ন এই কামনাই করি। আমার আনন্দ অন্যের দুঃখ হতে যাবে কেন?
মোথাবাড়িতে কি মানুষ আনন্দ করছিলেন? না তো! দেখুন, প্রথমে এসেছে বাঙালি মুসলমান কোনো কোনো ক্ষেত্রে বাঙালি হিন্দু প্রবাসী শ্রমিককে বাংলাদেশী বা রোহিঙ্গা বলে ভারতের অন্যান্য রাজ্যে মারধর, জেল এসব। তারপরে বাঙালি মুসলমানদের একেবারে সীমান্ত পার করে, কখনো বন্দুকের মুখে, কখনো জেসিবি দিয়ে ছুঁড়ে ফেলে দেওয়া। সুইটি বিবিরা আজও বাংলাদেশ থেকে ভারতে ফেরেননি দেশের বৈধ নাগরিক হওয়া সত্ত্বেও।
তারপরে এসআইআর চালু হবার পর থেকে পরিস্কার বোঝা যাচ্ছে দলদাস কমিশন সবচেয়ে বেশী নাম বাদ দিচ্ছে বাঙালি মুসলমানের। তথাকথিত হিন্দু নিম্নবর্ণ এবং বিপুল সংখ্যক নারীর নাম বাদ যাচ্ছে। বাদ যাচ্ছে রূপান্তরকামীদের নাম। নারীরা নিজেরা সংগঠিত নন বলে এখনো তাঁদের আলাদা করে রাস্তায় দেখা যাচ্ছে না। সব ধর্মের নারীদের কথাই বলছি। বাঙালি বা অবাঙালি মুসলমান সমাবেশে নারীদের তবু দেখতে পাওয়া যাচ্ছে। এই তো দেখুন না, মন্দির নিয়ে অত কাজ করা পাঠান সাহেবের মেয়ের নাম বাদ। তিনি বলছেন আমরণ অনশনে বসবেন। সে কি আনন্দ করে?
মোথাবাড়িতে যা হয়েছে, অন্যত্রও যা হচ্ছে, সে সব অসহায় মানুষের অসহায়তা। এসআইআর প্রক্রিয়া তো আদালতে গেছিল। প্রশান্ত ভূষণও আমার মতো সামান্য মানুষের কথাই বলেছেন গতকাল। কেন বৈধতা যাচাই-এর কাজ সর্বোচ্চ বিচারালয় ফেলে রেখেছেন? কেন বিচারালয়, সরাসরি প্রাশাসনিক হস্তক্ষেপ করে, ইলেকশন কমিশনের নির্দেশে চলা রাজ্যে, এনআইএ-কে তদন্ত দিচ্ছেন? তাঁরা যখন আলগোছে ও অবহেলায় মন্তব্য করেন, একজন এবারে ভোট দিতে না পারলে কী আছে, পরের বার দেবে, সেটা কি স্বাভাবিক? গণতান্ত্রিক দেশে ভোট দিয়েই সরকার হয়। সেই ভোট কি খেলনা হল, যে এবারে না পেলে পরের বার পাব মেনে নিতে হবে? যেখানে বিধান সংবিধানেই আছে, যে তালিকা সম্পূর্ণ না হলে আগের তালিকাতে ভোট করানো যায়। অর্থাৎ এখনো চাইলে ২০২৫-এর তালিকায় ভোট হতেই পারে, সেখানে এমন মন্তব্য, তাও সর্বোচ্চ আদালতের? মানুষ তাহলে কার কাছে যাবে বিচার চাইতে?
অন্যদিকে নির্বাচন কমিশনের পরের পর সাংবিধানিক ও প্রাশাসনিক ডাকাতির বিরুদ্ধে কথাই বলছেন না? তাঁরা তো স্পষ্ট জানেন, একের পর এক মিথ্যে বলেছে ও বলছে কমিশন নানা রাজ্যে, ধরা পড়ছে, শাস্তিবিহীন ভাবে ছাড় পাচ্ছে। কেন পাচ্ছে ছাড়? এ তো বুঝিয়ে দিচ্ছে সেই পুরোনো কথা। যারা কোটি কোটি ডাকাতি করে, ঋণখেলাফ করে, তাদের জামাই-আদর করে, সব মকুব বা সামান্য দিলেই হবে বলা। আর যে দশ বিশ হাজার দিতে পারছে না তার ঘরে পুলিশ যাবে। একেবারেই শ্রেণীচরিত্রের চেহারা, যে আইন শুধু ধনীলোকের জন্য। সেই কাজটাই তো প্রকারান্তরে হচ্ছে দেখা যাচ্ছে। এবারে মানুষ যদি অসহায় হয়ে ওঠেন, ভীত হয়ে ওঠেন, ক্ষুব্ধ হয়ে ক্ষোভ জানাতে নিতান্ত গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতেই প্রতিবাদ জানান, তাতে মানুষ ক্রিমিনাল? শান্তিপূর্ণ অবরোধ প্রাগ্ স্বাধীনতা যুগের আন্দোলনের অস্ত্র। আজকের নয়। তাকে অপরাধীকরণ করা হচ্ছে কেন? রাজনৈতিক দলগুলিকে ধিক্কার জানাই এই অপরাধীকরণকে সমর্থন করার জন্য। কিন্তু বিচারালয় কি জানেন না যে বিচারের একটা বড় দায়ভার হচ্ছে সহানুভূতির সঙ্গে বিচার করার?
আপনাদের মনে করিয়ে দিই রবীন্দ্রনাথের 'গান্ধারীর আবেদন'।
"...দণ্ডিতের সাথে
দণ্ডদাতা কাঁদে যবে সমানে আঘাতে
সর্বশ্রেষ্ঠ সে বিচার। যার তরে প্রাণ
কোনো ব্যথা নাহি পায় তার দণ্ডদান
প্রবলের অত্যাচার।"
ব্যথা কি পাচ্ছেন আপনারা? পেলে কেমন করে এটা অনুভব করতে পারছেন না যে মানুষ বিপুল বিষাদগ্রস্ত, অবসন্ন, হতাশ এবং ভয়ঙ্কর আতঙ্কিত? ক'দিন আগের ঘটনা একটু মনে করিয়ে দিতে চাই সর্বোচ্চ আদালতকে। বিচারক উজ্জ্বল ভুঁইয়া, পুনেতে জানুয়ারি মাসে 'সাংবিধানিক নৈতিকতা এবং গণতান্ত্রিক প্রশাসন' নিয়ে বক্তৃতা দিলেন। সেখানে তিনি নাম উল্লেখ না-করেই বলেন, যে একজন বিচারককে কোন আদালতে পাঠানো হবে সেটি সর্বোচ্চ আদালতের কলেজিয়াম বা যৌথ অধিকার বিশিষ্ট পরিষদের অধিকার। অথচ একজন উচ্চ আদালতের বিচারককে এক রাজ্যের আদালত থেকে অন্য রাজ্যের আদালতে স্থানান্তরিত করতে গিয়ে, কলেজিয়াম কেন্দ্রের অনুরোধে তাঁকে অন্য রাজ্যে পাঠালেন, এই কাজটি কি কলেজিয়ামের বিচারবিভাগে সামগ্রিক বা অখণ্ড অধিকারের আপস নয়?
প্রসঙ্গটি এসেছিল মধ্যপ্রদেশের উচ্চ আদালতের বিচারক শ্রীধরণের বদলি নিয়ে। বিচারক শ্রীধরণের নেতৃত্বে সেখানকার উচ্চ আদালতের একটি বেঞ্চ, বিজেপি-র মধ্যপ্রদেশের মন্ত্রী বিজয় শাহের, কর্নেল সোফিয়া কুরেইশিকে নিয়ে করা একটি সাম্প্রদায়িক মন্তব্যের বিষয়ে স্বতঃপ্রণোদিত ভাবে ব্যবস্থা নিয়েছিলেন। তার কিছুকাল পরে বিচারপতি শ্রীধরণকে বদলি করা হচ্ছিল ছত্তিশগড়ে কলেজিয়ামের সিদ্ধান্তে। কিন্তু কেন্দ্র সরকারের 'অনুরোধ'-এ তাঁকে ছত্তিশগড়ের পরিবর্তে পাঠানো হয় এলাহাবাদ উচ্চ আদালতে। অনেকেই মনে করেছেন এই পদক্ষেপ আসলে ঐ বিচারপতিকে শাস্তি দেওয়া। সংবিধান অনুসারে, কেন্দ্র বা রাজ্য সরকারের প্রাশাসনিক বিভাগ বিচারবিভাগে হস্তক্ষেপ করতে পারে না, নানা বিভাগের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখার নীতিতে। তাহলে এমন নগ্নভাবে হস্তক্ষেপ করা গেল কেমন করে? কেন সর্বোচ্চ আদালতের কলেজিয়াম এই কাজটি করলেন? এতে বিচারবিভাগের স্বাধীনতার জয়গান থাকলো?
এখন আমাদের সকলের জানা যে কেন্দ্রীয় শিক্ষাবিষয়ক সংস্থা এনসিইআরটি অষ্টম শ্রেণীর পাঠ্য তালিকায় 'আমাদের সমাজে বিচারবিভাগের ভূমিকা' শিরোনামে একটি অধ্যায় রেখেছিল। তাতে আদালতের নানা স্তর, বিচার পাওয়ার অবস্থার সঙ্গে বিচার বিভাগের দুর্নীতি ও বিপুল জমা মামলার কথাও ছিল। বর্ষীয়ান আইনজীবী কপিল সিবাল এ বছরের ২৪শে ফেব্রুয়ারি এ বিষয় ভারতের সর্বোচ্চ আদালতের দৃষ্টি আকর্ষণ করলে, প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত্ বিষয়টিতে স্বতঃপ্রণোদিত পদক্ষেপ গ্রহণের কথা জানান। পরবর্তীতে আদালত আদেশ জারি করে বইটির সমস্ত মূদ্রিত সংখ্যা বাজেয়াপ্ত করার এবং বৈদ্যুতিন অনুলিপি আন্তর্জাল থেকে সরিয়ে দেবার। বিচারপতির কথায়, প্রতিষ্ঠানের বদনাম করতে তিনি দেবেন না। উল্লেখযোগ্য এ বছরেরই ১৪ই ফেব্রুয়ারি, লোকসভা সাংসদ ভি এস মাথেশ্বরনের লিখিত প্রশ্নের উত্তরে আইনমন্ত্রক জানায় ২০১৬ থেকে ২০২৫-এর মধ্যে উচ্চ ও সর্বোচ্চ আদালতের বিচারপতিদের বিরুদ্ধে ৭,৫২৮টি অভিযোগ এসেছে, যা বিচারবিভাগ নিজস্ব পদ্ধতিতে বিবেচনা করছেন। প্রধান বিচারপতি মন্তব্য করেছিলেন, প্রতিষ্ঠানের প্রধানরূপে তিনি কর্তব্য করেছেন এবং অবগত এগুলোর বিষয়। আর এইটা, অর্থাৎ লোকসভায় প্রশ্ন-উত্তর, হিসেব কষেই করা হয়েছে। তিনি এর বেশী কিছু বলতে চাননি।
কিন্তু সর্বোচ্চ আদালত এতো স্পর্শকাতর কেন? রাজ্যসভায় বিজেপি সাংসদ রঞ্জন গগৈ, যিনি অসমে এনআরসি-র চালক হয়েছিলেন, সর্বোচ্চ আদালতের প্রধান বিচারপতি রূপে পাঁচ সদস্য নিয়ে সংবিধান নয়, মুখ্যত বিশ্বাসের এবং অস্পষ্ট প্রত্নতত্ত্বের ভিত্তিতে ভাঙা বাবরি মসজিদের স্থানে রামমন্দির করার রায় দিয়েছিলেন, তিনি নিজেরই বিরুদ্ধে যৌন-হেনস্থার অভিযোগের বিচারেও বসেছিলেন। নীতি না দুর্নীতি ছিলো? এক বিচারপতির বাড়িতে অগ্নিকাণ্ডে প্রচুর জমা কাঁচা টাকা পাওয়া গেলো, যার তদন্ত এখনো চলছে। এসব কথায় বুঝতে ইচ্ছে হচ্ছে ১৪ই আর ২৪শে ফেব্রুয়ারির ঘটনাদুটি সম্পর্কবিহীন কি? আর এই এনসিইআরটি-র ঘটনাটা ঘটছে কখন? সর্বোচ্চ আদালতে যখন ভারতের নির্বাচনী ব্যবস্থার বিশেষ নিবিড় সংশোধনী নিয়ে অজস্র মামলা চলছে। তার মধ্যে এই সংশোধনীর সংবিধানগত বৈধতার প্রশ্নও যেমন আছে, তেমনই আছে এর পদ্ধতি স্থিরিকরণের গুরুতর প্রশ্নগুলিও।
পঁচাত্তর বছরের ভারতীয় গণতন্ত্রে এমন আমূল উথাল-পাথাল করা নির্বাচনী সংস্কার আর হয়নি এর আগে। ভারতীয় নাগরিককে অকল্পনীয় হেনস্থা ও বিভীষিকার মধ্যে দিয়ে নির্বাচন কমিশনের কাছে নাগরিকত্বের প্রমাণ দিতে হচ্ছে, যার মাথারা আবার ভারতের শাসক দলের তৈরী করা আইনে সব বিচারের ঊর্দ্ধে। সর্বোচ্চ আদালত আশ্চর্যজনকভাবে বিশেষ নিবিড় সংশোধনী পদ্ধতিটির বৈধতার প্রশ্নকে ফেলে রেখেই পদ্ধতি-প্রকরণ নিয়ে নানা আদেশ জারি করে চলেছেন। এতো খুবই সাধারণ ধারণার বিষয় যে এই পদ্ধতিতে সকল রাজ্যে ও কেন্দ্রে নির্বাচন হয়ে গেলে, বৈধতার প্রশ্নটিই আর বিবেচনা করে লাভ হবে না। কারণ এতো সব নির্বাচনকেও বাতিল করতে হবে, যা কার্যত অসম্ভব।
দুর্নীতি, ভারতীয় বাস্তবতায় শুধু নয়, বৈশ্বিকভাবেই এক ভয়ঙ্কর মহামারী যার কোনো টিকা, গণতন্ত্র থেকে স্বৈরতন্ত্র কোথাও কাজ করছে না আর। কাজ করাতে গেলে সবচেয়ে বেশী প্রয়োজন আগামী প্রজন্মকে পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্র, গণতন্ত্র ইত্যাদির প্রসঙ্গে নীতির কার্যকরী পাঠদান করা। কারণ তারাই আগামী বিশ্ব, তারাই পারে একে এপস্টেইন ফাইলে উন্মোচিত কদর্যতম বিশ্ব-শাসনের কবল থেকে মুক্ত করতে। সেই কাজটা করতে গেলে সর্বস্তরের দুর্নীতির হিংস্র রাজনীতি সম্পর্কেও তাকে ওয়াকিফহাল হতে হবে। পাঠ্যবইয়ে বিচারব্যবস্থা সহ সব ব্যবস্থার দুর্নীতিকে আনার আদেশ দিয়ে সেই কাজটা করা যেতো না?
এনসিইআরটি, শিক্ষা দপ্তরের অধীন স্বয়ংশাসিত সংস্থা। কিন্তু আমরা দিনের পর দিন দেখে আসছি স্বয়ংশাসিত সংস্থাগুলিকে কেন্দ্রের শাসকদল কেমন ভাবে দখল করে নিয়েছে। বিচারব্যবস্থাকেও কি তারা ভয় দেখাচ্ছে বিচারব্যবস্থার দুর্নীতিকে পাঠ্য করে ইঙ্গিতে জানিয়ে দেওয়ার মাধ্যমে, যাকে পিতৃতান্ত্রিক প্রবাদ বলে 'ঝিকে মেরে বৌকে শেখানো'?
অবশেষে এই সংঘাতের অবসান হলো। এনসিইআরটি ক্ষমা প্রার্থনা করে সবটাই প্রত্যাহার করে নিলো। কিন্তু করলো এমন সময় যখন স্থির হয়ে গেছে পশ্চিমবঙ্গের আদালতের নথি বিচারে নাম না থাকলে বিচারবিভাগের ট্রাইবুনালের কাছেই বিচার চাইতে হবে। আবার এই ট্রাইবুনালের পদ্ধতি কী হবে তা নির্বাচন কমিশন এখনো জানায়নি বলে, বহু বিচারক অসন্তুষ্ট। কেউ কেউ তো চলেই গেছিলেন কমিশনের ট্রেনিং ছেড়ে। এখন সেখানে যাঁর নথি বিচার হবে, তাঁর কথা শোনা হবে বলে জানা যাচ্ছে। জানা যাচ্ছে কলকাতা হাইকোর্টের প্রাক্তন তিনজন প্রধান বিচারপতি বা প্রাক্তন বর্ষীয়ান বিচারপতি একটি পদ্ধতি বা স্ট্যান্ডার্ড অপারেটিং প্রসেস বানাবেন, সব ট্রাইবুনাল তা অনুসরণ করবেন। এইটা একমাত্র আলোক রেখা এই অন্ধকারে। কিন্তু অন্ধকারের বিষয় হচ্ছে, যাঁরা বিচারাধীন থাকলেন, তাঁদের ভোট দেওয়া হবে না। অথচ ২০২৫-এর তালিকায় ভোট করানোর উপায় সংবিধানেই ছিল। পরিবর্তে এই প্রথমবার, ভারতীয় গণতন্ত্রে এক পদ্ধতি জন্মালো যেখানে নাগরিক শুধুমাত্র কমিশনের সন্দেহের বশে ভোট দিতে পারলেন না। এ লজ্জা কোথায় রাখব, গণতন্ত্রে?
কিছুদিন আগের ঐ বক্তৃতায় বিচারপতি ভুঁইয়া বলেছেন যে, স্বাধীন বিচারব্যবস্থার সবচেয়ে বড় বিপদ তার ভিতর থেকেই আসছে। এও বলেছেন, মানুষ যেহেতু রাজনৈতিক প্রাণী, মানুষ বিচারপতিরও ব্যক্তিগত রাজনীতি থাকা অন্যায় নয়। কিন্তু বিচার সাংবিধানিক মৌলিক নীতি দিয়েই বিচার হওয়া বাঞ্ছনীয়, ব্যক্তির রাজনৈতিক মতাদর্শ দিয়ে নয়। একজন বিশেষ বিচারক বা বেঞ্চের কাছে মামলা এলে, আগে থেকেই নিয়ে রাখা সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে যদি বিচার হয়, তাহলে তা বিচারব্যবস্থার জন্য দুঃখজনক দিন।
সঙ্গে মনে রাখা দরকার সর্বোচ্চ আদালতের আরেক বিচারপতি বি ভি নাগরত্নের কথা। তিনি আবার মনে করাচ্ছেন ইলেকশন কমিশন, সিএজি, ফিনান্স কমিশন এগুলো স্বাধীন সংস্থা রূপে থাকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যদি তাদের কাজকর্ম যারা নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছে তাদের উপর নির্ভরশীল হয়, পদ্ধতির নিরপেক্ষতা স্থির থাকে না।
আরো কতগুলো জরুরী কথা বলেছেন। "যখন স্বাধীনতা সুবিধের কাছে আত্মসমর্পণ করে, যখন জবাবদিহিতার বদলে সুবিধাবাদীতা আসে, যখন (সংবিধান ও আইন প্রবর্তন এবং তার প্রয়োগ) সীমাকে রক্ষাকবচের পরিবর্তে বাধা বলে মনে হয় - (সাংবিধানিক ও বিচার) কাঠামো, অব্যর্থভাবে, আলগা হতে এবং ভাঙতে শুরু করে।" এখানে ব্র্যাকেটের কথাগুলো আমার যোগ করা। আমার বোধ অনুসারে। এবং সবচেয়ে যা গুরুত্বপূর্ণ তাও বলেছেন। "সংবিধান নিজে নিজেকে রক্ষা করতে পারে না," তিনি বলছেন এটি নির্ভর করে "প্রাতিষ্ঠানিক বিশ্বস্ততা"-র উপর, এবং "ক্ষমতার ব্যবহারে লাগামের উপর"। "ক্ষমতা, তার উৎস যতই বৈধ হোক না কেন, সব সময় অবশ্যই তাকে 'answerable' থাকতে হবে।" আমি যার বাংলা করতে চাই "জবাবদিহি" করতে হবে।
এই জন্য বলছি, একদিন সাতঘন্টা অবরোধে ওঁদের এত কষ্ট হল, তা আপনারা অনুভব করলেন, আর এই যে বিজপি-র দলদাস কমিশনের এবং বিজেপি-র স্পষ্ট আওতায়, লাগামহীন ক্ষমতার ব্যবহারে, এত লক্ষ লক্ষ মানুষ, এতোগুলো দিন ধরে যে অবর্ণনীয় যন্ত্রণা এবং বিপন্নতা বোধ করছেন, আত্মহত্যা করছেন এ কি আপনাদের চোখে পড়ছে না? যদি সম্প্রদায়, লিঙ্গ, জাতি, ধর্ম এসবের ভিত্তিতে ভারতের গণতন্ত্রে অজস্র মানুষকে বা কাউকে একলা হলেও, আক্রমণ করা হয়, আমরা তো জবাবদিহি চাইব-ই সংবিধানে প্রদত্ত আমাদের অধিকারে। স্বাধীন ভারতের স্বাধীন নাগরিক আমরা। কেউ কারোর চাইতে ছোটো নই। আমাদের সবার জন্য রাখা আছে সংবিধান। এবং তারও উপরে আছে যুগ যুগ ধরে সারা বিশ্বে জন্মানো মানবাধিকারের আদর্শ।