পড়শি যদি আমায় ছুঁতো যম যাতনা সকল যেত দূরে: লালন সাঁই

পড়শি যদি আমায় ছুঁতো যম যাতনা সকল যেত দূরে: লালন সাঁই

hhhhhhhhhhhhhh

ভোরের শিউলি

  • 26 February, 2023
  • 0 Comment(s)
  • 785 view(s)
  • লিখেছেন : রাজকুমার শেখ
কে যেন বিলে ডিঙিতে চেপে টলটলে জল থেকে শাপলা তুলছে। আবির বিলের পাড়ে দাঁড়িয়ে দেখছে। কিন্তু ভোরের কুয়াশা মাখা বিলে তেমন নজর যাচ্ছে না। তবু আবির দেখবার চেষ্টা করছে। চারপাশে পুজো পুজো গন্ধ। ছাতিয়ার বিলে জল বাঁধ ছাপিয়ে যাবে যেন। কতদিন পর তার আসা। আবির পুজোর সময় আসতে পারে না তার গ্রামে। শহরে তার বহু দিনের ব্যবসা । তার একটিই ছেলে। বাইরে থাকে। তার বউ ইরা সঙ্গে এসেছে। পুরনো বাড়িটা তেমনই আছে। ওর কাকার ছেলে অমিত দেখা শোনা করে।

 


এই গ্রামে ওদের কিছু জমিজিরাত আছে। অমিত চাষাবাদ করে। আবির কখনো সে সবের হিসেব চায়নি। ওদের মতো ওরা থাকে। আসবার আগে অমিতকে ও ফোন করে দিয়ে ছিল। বাড়িঘর অমিত লোক লাগিয়ে সব পরিষ্কার করে রেখে ছিল। যাতে ইরাকে কষ্ট পেতে না হয়। পুজোর দিনকটা এখানেই কাটাবে বলে তার আসা। আজ ভোরে ওর ঘুম ভেঙে যায়। আবির দেখছে ইরা ঘুমিয়ে। ওর ঘুম সকাল সকাল ভাঙে না। একটু বেলা হয় উঠতে। কতবার বলা সত্বেও কোনো কাজ হয়নি। আবির আর বলে না। ওর বাবা মোহনলাল বলতেন,আবির সকালের হাওয়াতে আয়ু বাড়ে। চল মাঠে।
ছোট্ট আবির ওর বাবার পিছন পিছন হেঁটে যেত। মোহনলাল লাঙল আর বলদ জোড়া নিয়ে চলত চাষ দিতে। মাটি থেকে ভরভর করে সোঁদা গন্ধ বের হতো। মোহনলাল আপন মনে চাষ দিতেন জমিতে। সে সব কবেকার কথা। লাঙলটা এখনো পড়ে আছে। বলদ দুটোর শেষ কি হল তার এখন আর মনে নেই।  মোহনলালের জন্য এখনো তার বুকটা পোড়ে। সে আগুন কোনো দিনই নিভবে না। বুকের পাসটা এখনো খালিব বোধ করে আবির। এত দিন পর নিজ গ্রামে ফেরার কি যে আনন্দ তা কাউকে বলে বোঝাতে পারবে না। পুজোর গন্ধটা বুকে করে নিয়ে সারা ভোর ঘুরে বেড়াচ্ছে। এখনো কেউ জাগেনি। মণ্ডপে মণ্ডপে ধূপের গন্ধ। শিউলির গন্ধ। শিশিরের গন্ধ।  ছাতিয়ার বিলের জলজ গন্ধ। সব যেন মিলেমিশে একাকার হয়ে গেছে। আবিরের কি যে আনন্দ হচ্ছে। ইরা তার কিছুই জানতে পারলো না। এ ভোরে যে মা হেঁটে বেড়ায় বিলের জলের পাড় ধরে। সে দৃশ্য আজও কেউ দেখেনি। আবির কয়েকবার তার মাকে দেখেছে। যেন দুর্গা প্রতিমা। আবির তার মাকে খুঁজে বেড়ায়। সেই ছোট বেলায় তার মাকে হারিয়েছে। তার মা যখন শেষ শয্যায় তখন ছোট্ট আবির তার মায়ের কাছে যেতে চায়। কারা যেন ওকে আটকে রেখে ছিল। তার মায়ের মুখটা শেষ দেখতে পায়নি। আবির আজও খুঁজে ফেরে। বুকের গোপন ব্যথাটা কাউকে আজও ও দেখাতে পারেনি। তার দুর্গা মা কোথায় যেন হারিয়ে গেল!  মোহনলাল বড় একা হয়ে গেলেন। আবিরকে বুকে টেনে নিলেন তার কাকিমা মলিনা দেবী। ছোট্ট আবির একদিন বড় হলো। মোহনলালও চলে গেলেন। আবির এ গুলো নিতে পারলো না। ও শহরে চলে গেল। তার আর ফেরা হয়ে উঠে না। কিন্তু এবার সে আসতে পেরেছে। মাটির সোঁদা গন্ধ নিতে তার আসা।  
আজ ভোরটা খুব সুন্দর। বিলের ধারে গুচ্ছ গুচ্ছ কাশফুল। বাতাস লেগে দোলা দিচ্ছে। গোটা বিলে শাপলা আর পদ্ম। কিন্তু এত ভোরে শাপলা তুলছে কে? ও দাঁড়িয়ে থাকে। ধীরে ধীরে সকাল হয়ে আসছে। এবার ডিঙিটা দেখা যাচ্ছে। এক সময় পাড়ে ভিড়ে। আবির এবার চিনতে পারে বাদলকে।
আরে তুই বাদল না?
আবিরদা কবে এলে?
এই তো গতকাল। হাঁরে মনি কেমন আছে?
বাদল চুপ করে থাকে।
কি হল বল?
দাদা তো গত বছর মারা গেছে কোভিটে।
আবির কেমন থতমত খেয়ে যায়। কথা বলতে পারে না। মনি তার ছোট বেলার সঙ্গী। কত স্মৃতি!  পুজোর সময় বাবুদের বাড়িতে বসতো কবি গানের আসর। তারপর যাত্রাপালা। দুজনে চুপ করে দেখতে যেত। ভোরে বাড়ি ফিরতো। বকাও খেয়েছে অনেক। কত কথায় ওর মনে পড়ে যাচ্ছে।
হাঁরে বাদল, এত ভোরে এখানে কি করছিস?
আবিরদা, শাপলা আর পদ্ম তুলে শহরে বেচে আসি। এই দিয়ে আমাদের সংসার চলে। বউদি তার ছেলে আমার আশ্রয়ে। ওদের কে দেখবে বলো?
মনি কিছু রেখে যায়নি?
কি আর তেমন কাজ করতো! যা আয় করতো তা দিয়ে কোনো রকমে চেলে যেত। আবিরদা, আমাকে এ গুলো নিয়ে শহরে যেতে হবে। তুমি এসো আমাদের বাড়ি।
যাবোরে যাবো।
কেমন অন্য মনস্ক হয়ে বলে কথাটা আবির। মনির জন্য ওর মনটা খারাপ হয়ে যায়। আবির দাঁড়িয়ে থাকে চুপচাপ। বাদলের কষ্টটা ওর বুকে চেপে বসে। বাতাস নিতে কষ্ট হয়। কত-কীই ও হারিয়ে ফেলেছে। যা আর কোনো দিনই ও ফিরে পাবে না। হায়রে মানুষের জীবন!  
ছাতিয়ার বিলে ঢেউ উঠেছে। মনি যেন হাত ছানি দিয়ে ওকে ডাকছে। গভীর বিলের জলে ওরা কতদিন হারিয়ে গেছে। আজও সেই রকমই বিলটা আছে। নেই শুধু মনি। ডিঙি  গুলো পাড়ে বাঁধা। মনে হল একটা ডিঙি নিয়ে দূরে চলে যেতে। মনিকে খুঁজতে। মনি, আমি  এসেছিরে!  চল দূরে ডিঙি নিয়ে হারিয়ে যাই।
ও মনে বিড়বিড় করে কথাটা। সময় বয়ে যায়। ওর আজ ঘরে ফিরতে মন করছে না।

দুই --

ইরা , চলো আজ বাবুদের মন্ডপের পুজো দেখতে যাবো। কতদিন ওদিকটায় যাওয়া হয়না। মনি আর আমি যাত্রাপালা দেখতে যেতেম লুকিয়ে। বাবা বকা দেবে ভেবেও রাতে জুমলির মাঠ পেরিয়ে চলে যেতাম দুজনে। সে কত সুখ। এখন সব কেমন লাগে ভাবলে।
ওদের ওখানে খুব ভালো পুজো হয় বুঝি?
খুব ধূম করে পুজো হয়। বাবুরা সব শহরে থাকেন। কিন্তু পুজোর কটাদিন সব নিজের দেশে ফিরে আসে।  আনন্দ করে। মানুষজনকে খাওয়ায়। জামাকাপড় উপহার দেন। বাবদের তুলনা হয় না গো। আজও সেই নিয়ম ধরে রেখেছে। বাদলের মুখে সব শুনলাম। জানো ইরা, আমার বন্ধু মনি চলে যাওতে কিছু ভালো লাগছে না। পুজোর আনন্দটা মাটি হয়ে গেল। ওর ছেলেটার জন্য খুব কষ হচ্ছে।
দূরে কোথায় ঢাক বাজছে। আর একটা দিন। আজ নবমী। মনটা ওর কেমন কেমন করছে। খাঁ খাঁ করছে চারপাশে। মা চলে যাবে। তাকেও শহরে ফিরতে হবে। আবার কবে ফিরবে তার জানা নেই। ছাতিয়ার বিলে নামা হল না ওর। পুজোর ছুটিটা বড়ই কম। কেন শেষ হয়ে যায়? গোটা বাড়িতে মায়ের গন্ধটা ও অনেক দিন পর অনুভব করছে। যেন তার পাশেই মা আাছে। শিউলি  ফুল পড়ে উঠোনে। গাছটা ওর মা লাগিয়ে বলে ছিলেন, আবি, আমি যখন থাকবো না তখন দেখবি ফুল হয়ে ফুটে থাকবো ডালে।
ছোট্ট আবির এ কথার মানে বোঝেনি। ফ্যাল ফ্যাল করে ওর মায়ের মুখের দিকে তাকিয়ে ছিল। আজ ওর মা নেই। কিন্তু গাছটা আছে।
জানে ইরা, এই গাছটা মা লাগিয়ে ছিল। তোমাকে এর আগে হয়তো বলিনি। গাছটাকে কাটতে বারণ করেছি ভাইকে। গাছটা আছে বলেই আজ একটু সুখ অনুভব করছি।
আজ তোমার কি হয়েছে গো? কেমন সব কথা বলছো! আমি তোমাকে বুঝতে পারছি না।
আবির আলতো করে হাসে। ওকে আর কিছু বলে না। কেমন উদাস হয়ে তাকিয়ে থাকে গাছটার দিকে। ইরা চলে যায় কলতলে গা ধুতে। তার অনেক তাড়া। আজ পুজো দেখতে বের হবে। আবির থাক তার জগৎ নিয়ে।  ও কেমন যেন করছে। ওকে ও বুঝতে পারে না। ইরা কলতলে গিয়ে ঠান্ডা জল গায়ে ঢালে। ওর মনে এখন ঢাকের দোলা।

তিন-

এখনো বিসর্জনের ঢাক বাজছে। ওর বুকে বাজছে কি? ইরা পাসে শুয়ে নাক ডাকছে। ভোর হতেই ওরা বেরিয়ে পড়বে। সব গোছগাছ করা হয়ে গেছে। ইরা সকাল সকাল খেয়ে নিয়েছিল। বেশি রাত করে শুলে সকাল পাঁচটার ট্রেন পাবে না। যেতে বেলা হয়ে যাবে। আবির পাস ফিরে একটু ঘুমাবার চেষ্টা করলো। কিন্তু ওর ঘুম আসছে না। মনির ছেলাটার কথা। ওর মায়ের কথা মনে পড়ছে। আজ অনেকের সঙ্গে দেখা হল। কথা হল। কত আপন করে নিয়েছে তাকে।খগেনকাকা ওকে দেখতে পেয়েই ওকে বুকে জড়িয়ে ধরে বলে, আবি, তুই কত দিন পর এলি বলতো? ভুলেই গেছিস সব।
খগেনকাকার চোখ দুটো ছলছল করে ওঠে। খগেনকাকা তাকে পড়াতেন। আবির প্রণাম করে।
আবার আসবো কাকা।
আসিস। কবে চলে যাবো!
আবিরের মন ভার হয়ে যায়। কথা বলতে পারে না। ঢাকের কাঠিতে যেন আজ বেদনা মিশে। বুকের তার ছিঁড়ে যাবে। আবির আর থাকতে পারে না। কেঁদে ফেলে। খগেনকাকা ওর পিঠে হাত বুলিয়ে দেয় পরম যত্নে। অনেক দিন পর যেন মোহনলাল তার পিঠে হাত রেখেছেন। বাবা, আবার আসিস।
আবিরের আর ঘুম আসে না। দূরে একটা রাতচোরা পাখি ডেকে উঠলো। ছাতিয়ার বিলে বাদল আজও যাবে। ওর যে বিরাম নেই।  কবে ছুটি হবে ওর জানা নেই। জীবনের পাঠশালাটা বড়োই এলোমেলো। হিসাব মিলে না। আবির বাইরের শব্দ শোনে। ঝিঁঝি ডাকছে। কেমন একটা রাত যেন। সময় কাটছে না। সকাল হবার আগেই তো ওদের বের হতে হবে। টিকটিক করে সময় বেরিয়ে যাচ্ছে। ভোর হতে আর বেশি দেরি নেই। মোবাইলটা দেখতে ওর মন করছে না। যেন মনে হচ্ছে সময় যেন না কাটে। এ বাড়ির শেকড়টা সে ছিঁড়ে ফেলে যেতে পারবে না। ইরা, আর একটা দিন কি থাকা যাবে না? তোমার অত কিসের তাড়া?
ও আপন মনে বিড়বিড় করে কথাটা। কিন্তু সে ইরাকে বলতে পারেনি। বুকের খাঁজে আটকে আছে সে কথা।
ওর কেমন একটা ত্রন্দ্রা মতো এসেছে। এমন সময় ইরা ওকে ডেকে তোলে। ওদের যাবার সময় হয়ে গেছে। আবির তৈরি হয়ে নেয়। তারপর সকলকে বিদায় জানিয়ে বের হয়। এমন সময় হঠাৎ ও দাঁড়িয়ে যায়। তারপর ও ধীর পায়ে এগিয়ে যায় শিউলি গাছটার কাছে। আবির গড় হয়ে প্রণাম করে গাছটাকে। ডাল গুলো ঝুলে যেন বলে আবার আসিস খোকা।দুগ্গা দুগ্গা ।

0 Comments

Post Comment