পড়শি যদি আমায় ছুঁতো যম যাতনা সকল যেত দূরে: লালন সাঁই

পড়শি যদি আমায় ছুঁতো যম যাতনা সকল যেত দূরে: লালন সাঁই

hhhhhhhhhhhhhh

লাভ-জিহাদ--স্বৈরতান্ত্রিক বিজ্ঞাপন

  • 18 December, 2020
  • 0 Comment(s)
  • 567 view(s)
  • লিখেছেন : জিনাত রেহেনা ইসলাম
ক্ষমতার ষড়যন্ত্র ‘লাভ জিহাদ’। ইতিহাসে এক নতুন শব্দবন্ধের আমদানি। বাস্তব ও ব্যাখ্যায় খুব দূর্বল। ঘৃণা আর বিদ্বেষে ভরপুর। পীড়নের সন্তুষ্টি ও দমনের ইচ্ছাতে ষোলো আনা খুশি একপক্ষ। একের বিনাশেই আরেকের বিস্তার। ধর্ম আর রাজনীতি মিলেমিশে এক অন্ধগলিপথের দিশা দেয়। সেখানে স্বাধীনতা নেই, মনন নেই। নেই উত্তরণ।

গল্পটা প্রেমের। তখন সাল ১৯৩৫। ইহুদি ইরমা একলার প্রেমে পড়লেন নাজি পার্টি সদস্য আসস্ট ল্যান্ডমাশার। প্রেমের পরিণতি বিয়ে। সেই অপরাধে গ্রেপ্তার হন ল্যান্ডমাশার। যে আইন বলে প্রেমের মানুষটিকে অপরাধী সব্যস্ত করা হয়েছিল, সেটি ছিল ‘ব্ল্যাক নিউরেমবার্গ আইন’। ক্ষমতার নিয়ন্ত্রকরা এক জনগোষ্ঠীকে টার্গেট করে। প্রতিশোধ স্পৃহা বা ঘৃণা বর্ষণের হাতিয়ার নির্মাণ করে। আজকের ‘লাভ জিহাদ’ সেই রকমই ক্ষমতার ষড়যন্ত্র। ইতিহাসে এক নতুন শব্দবন্ধের আমদানি। বাস্তব ও ব্যাখ্যায় খুব দূর্বল। কিন্তু তাতে কি! ঘৃণা আর বিদ্বেষে ভরপুর। পীড়নের সন্তুষ্টি ও দমনের ইচ্ছাতে ষোলো আনা খুশি একপক্ষ। একের বিনাশেই আরেকের বিস্তার। ধর্ম আর রাজনীতি মিলেমিশে এক অন্ধগলিপথের দিশা দেয়। সেখানে স্বাধীনতা নেই, মনন নেই। নেই উত্তরণ। আছে শুধু অবাধ গ্রাস। একে অন্যকে গিলে ফেলার প্রতিযোগিতা। সভ্যতার লজ্জার এই মুহূর্তের সাক্ষী ইতিহাস। আর ইতিহাস লেখা হচ্ছে বিশ্বের শ্রেষ্ঠ গণতন্ত্রের মুকুট পরা এক সেরা সংবিধানে বলীয়ান এক দেশে।

বিবাহ নামক প্রতিষ্ঠানের পাত্র-পাত্রী এখন ‘আমাদের মেয়ে ও ওদের ছেলে’। এই বিভাজন রাজনৈতিক। এখানে ধর্মের কোনও ভূমিকা নেই। ধর্মকে হাতিয়ার করা হয়েছে মাত্র। জিহাদের একশো একটি ব্যাখ্যা আছে। কিন্তু ইচ্ছাকৃতভাবে এই শব্দটি বেঁধে জুড়ে দেওয়া হয়েছে বিদ্বেষ চরিতার্থ করতে। সুচতুর ভাবে উত্তরপ্রদেশের অর্ডিন্যান্সে শব্দটিকে এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে। কেন না এমন জেহাদের কোনও বাস্তবতা প্রমাণ করা যায়নি। তবুও এক শ্রেণীর মানুষকে অপরাধী সব্যস্ত করতে রীতিমত প্রশাসন ব্যবহৃত হচ্ছে। যেখানেই ভিন্ন দুই ধর্মের দম্পতি সেখানেই ভিড় ডেকে আনা চলছে। এই ‘ভিড়’ গণতন্ত্রের অন্যতম স্তম্ভের রূপ নিতে চলেছে। আইন-প্রশাসন-বিচারের নিয়ন্ত্রক হতে চলেছে।

দুটি প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের বিবাহের মতো সিদ্ধান্ত নিয়ে রাষ্ট্রের মাথাব্যাথা অন্য ইঙ্গিত দেয়। ‘ফোর্সড কনভার্সনের’ গল্পটা বানানো। বিয়ে নিজের পছন্দ। কি পদ্ধতিতে বিয়ে হবে সেটাও ছেলেমেয়ের সিদ্ধান্ত। বিবাহরীতির যে কোনও আইনানুগ পদ্ধতি তারা গ্রহণ করতে পারে। কিন্তু বলা হচ্ছে ‘রোমিও’দের ছাড়া যাবে না। রোমিও সবাই নয়। শুধু মুসলিম প্রেমিকরা এখন রোমিও। তারা ভালোবেসে অন্য ধর্মের মেয়ে বিয়ে করছে। সেখানে আছে পরিকল্পনা। ধর্মীয় জেহাদের শর্তপূরণ। এমন এক কষ্টকল্পিত ভাবনার ভূতে প্রাণপ্রতিষ্ঠা করবে আরও পাঁচ রাজ্য। নতুন আইন এনে এই রোমিও বধের অভিযান শুরু হবে। ভালোবাসার অপরাধে শাস্তি দেবে রাষ্ট্র। কমিউনিটির ‘ইজ্জত’ নষ্টের প্রতিবাদে চড়াও হবে মেয়েদের উপর।

‘আমাদের মেয়ে’ আর ‘ওদের মেয়ে’ এই বিভাজন রেখা টেনে দেওয়া হয়েছে দেশের মেয়েদের মধ্যে। একদল খুব বোকা। এদের ‘মগজ ধোলাই’ করে বিয়ের মতো সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য করা যেতে পারে। এবং ধর্মও পরিবর্তন করানো যেতে পারে। আবার এক দলের বিষয়ে কোনও কথাই হবে না। তারা সিকিউওরড। এদের বিয়ে ও ধর্ম নিয়ে রাষ্ট্র মোটেই ব্যতিব্যস্ত নয়। সামগ্রিকভাবে মেয়েদের চিন্তাশক্তি ও বিচারধারাকেই অস্বীকার করা হচ্ছে। আসলে সেই ‘অবলা’ একটা বায়োলিজিক্যাল এনটিটিতেই ফোকাস করার পুরানো অভ্যাস। তাই পৌরুষের সুপ্রিম্যাসি প্রতিষ্ঠাও ‘লাভ জিহাদ’ অর্ডিন্যান্স জারির এক বড় দিক। সেটাও এক বিশেষ শ্রেণির পৌরুষকে শাস্তিদন্ড দিয়ে শাসণ করার অভিপ্রায় নিয়ে। ক্ষমতার চোখের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য কিন্তু খুব স্পষ্ট। তাই প্রতিবাদের ঝড়টা বড় করে না উঠলে মুশকিল।

আজকের ‘ওয়ান নেশন’ থিয়োরিতে দেশপ্রেম নেই। সরাসরি পলিটিক্স আছে। এক কমিউনিটির মেজরিটারিয়ান হয়ে ওঠার মিথ্যা আশংকা থেকে মুক্তি পাওয়ার মরিয়া চেষ্টা আছে। আখেরে জাতির একটিই রঙ। একে স্বীকার করে নেওয়ার মধ্যেই দেশের সার্বিক উন্নতির চাবিকাঠি। ডাইভারসিটির চেয়ে বড় রঙ এই পৃথিবীতে আর কি আছে! সব ধর্মের মানুষ, সব বর্ণের মানুষের বেঁধে বেঁধে থাকার স্বর্গ এই দেশের মাটি। সেখানে ‘লাভ জিহাদের’ নামে মানুষকে আলাদা করে বেছে নিয়ে কাঠগড়ায় টেনে আনার ভাবনা নিন্দনীয়। সাংবিধানের অপমান। সিভিল সোসাইটির বড় দায় এই ঘনীভূত সংকট থেকে দেশের মানুষদের উদ্ধার করা। এই বিষয়ে লাগাতার প্রশ্ন তুলে যাওয়া।

রাষ্ট্রীয় ব্যর্থতায় এক গণশত্রুর সন্ধান চলে অবিরাম। সেই অবয়বে অভিযোগের পর অভিযোগ গেঁথে দেওয়া হয়। মানুষকে বিশ্বাস করানো হয় এরাই আসলে রাষ্ট্রকে ফেইল করিয়ে আসছে। এদের দমনে রাষ্ট্র আবার মেরুদন্ড খুঁজে পাবে। উন্নতির শিখরে পৌঁছাবে। আসলে এ এক প্রোপোগান্ডা। সেই ফাঁদে মানুষ পা দেয় বরাবর। এভাবেই রাষ্ট্রীয় আবেগ তৈরি করা হয় ও ব্যবহার করা হয়। এই আবেগ যুদ্ধ পর্যন্ত ঘটাতে সমর্থ। তাই লাভ জিহাদ শুধু ইন্টারফেইথ ম্যারেজকে প্রভাবিত করবে না। দেশের আরও ক্ষেত্রগুলিতে ঘৃণা আর পোলারাইজেশনের ভিত্তি প্রস্তুত হবে। এবং তা ছড়িয়ে পড়বে। এইভাবেই এক জাতির ধ্বংস হতে পারে!

0 Comments

Post Comment