পড়শি যদি আমায় ছুঁতো যম যাতনা সকল যেত দূরে: লালন সাঁই

পড়শি যদি আমায় ছুঁতো যম যাতনা সকল যেত দূরে: লালন সাঁই

hhhhhhhhhhhhhh

লাভ জিহাদ ও ধর্মাধর্ম

  • 14 November, 2020
  • 0 Comment(s)
  • 191 view(s)
  • লিখেছেন : মনসুর মণ্ডল
দেশে বিকল্পের রাস্তা খোলাই আছে। স্পেশ্যাল ম্যারেজ অ্যাক্টে বিবাহবন্ধনই যুক্তিপূর্ণ পন্থা। নারীর মর্যাদার দিক থেকে সেটাই প্রয়োজন। অপর ধর্মে যখন বিরূপ প্রতিক্রিয়ার সমস্যা আছে, তখন এটা সামাজিক দায়িত্ব হয়ে দাঁড়াচ্ছে। অভাবেই দাম্পত্য জীবনে ধর্মীয় সমমর্যাদার সম্পর্ক তৈরি হতে পারে।

ক’দিন আগে উত্তরপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী বললেন, লাভ জিহাদ রুখতে তাঁর সরকার আইন আনবে। হরিয়ানা সরকারও একই পথে হাঁটবে বলে ঘোষণা করেছে। এদিকে যারা ভিন্ন জাতি বা ধর্মে বিবাহ করবে, তাদের আর্থিক সাহায্য করার প্রকল্পে বরাদ্দ বাড়িয়ে দিয়েছে ওড়িশা সরকার। লাভ জিহাদের জিগির ও ভিন্ন জাতি-ধর্মে বিবাহে উৎসাহ দেওয়া, দুই বিপরীত ভাবনার মধ্য দিয়ে এটা পরিষ্কার যে, এ নিয়ে রাষ্ট্রের সেক্যুলার প্রকৃতির প্রশ্নে রাষ্ট্রের পরিচালকদের মধ্যে মতানৈক্য আছে। ধর্মীয় বিদ্বেষের পরিবেশের মধ্যে কিছু স্বস্তির রসদ আছে। কিন্তু এটাই সব নয়। চূড়ান্ত বিচারে ধর্ম যে পিছু ছাড়ে না।
ইসলামীয় ভাবনায় জিহাদের ধর্মতাত্ত্বিক ভিত্তি আছে। কিন্তু মুসলিম সন্ত্রাসবাদের নামে যা চলছে, তা আসলে জিহাদ নয়। একদিক থেকে জিহাদকে ধর্মযুদ্ধ বলে ব্যাখ্যা করা হয়। নিতান্ত সস্তা ব্যাখ্যায় জিহাদ হয়ে যায় বিদ্রোহ। এই সবদিক থেকেই একেবারে আলাদা— অন্যান্য ভিন্ন জাতি বা ধর্মাবলম্বীদের মধ্যে বিবাহের মতোই হিন্দু-মুসলমানে বিবাহ স্বতঃপ্রবৃত্ত। ভিন্ন ধর্মাবলম্বী দুই তরুণ-তরুণী ধর্মের বেষ্টনী পেরিয়ে বিবাহ-বন্ধনে আবদ্ধ হচ্ছে, এটা তারুণ্যের ধর্মে উত্তম। সেখানে জিহাদের কথা তোলা অবাস্তব। স্রেফ  প্রেমের  সম্পর্কে লাভ জিহাদের তকমা লাগানো ধর্মীয় বিদ্বেষের ফলশ্রুতি।
 তা সত্ত্বেও  একাংশের  হিন্দুমনে এই বিরোধের ছাপ পড়ে। আর সবটাকে ধর্মীয় বিদ্বেষের নিক্তিতে মাপা যাবে না।
প্রেম, সে তো মূলাধারে আবেগের স্রোতে সাঁতার কাটা।
ধর্মবিশ্বাস ভিন্ন হলে বোধহয় আবেগ সেখানে প্রবল হয়। ধর্মীয় সম্প্রীতিও কিছু থাকে নিশ্চয়। কিন্তু প্রেমের পরিণতিতে সেসব লঘু হয়ে পড়ে ধর্মের অনুশাসনে। কত প্রেম নিষ্ফল হয়ে হারিয়ে যায়। যারা অসম্ভব জেদে সার্থক পরিণতি বুঝে নেয়, তাদের বেলায় সাধারণত যেটা ঘটে, তা হল— ধর্মীয় অনুশাসন। পুরুষতন্ত্রের দণ্ডে তার কীর্তি হাসিল করে। যত  নিন্দা-গঞ্জনা একতরফা মেয়েদের জন্যই। প্রায় ব্যতিক্রমহীনভাবে মেয়েদের স্বামীর ঘরে গতি হয় ধর্মান্তরের মূল্যে। ধর্মান্তর সচরাচর স্ব-ইচ্ছায় ঘটে। কিন্তু তা ঘটে পুরুষতান্ত্রিক রীতি-নীতির দুর্লঙ্ঘ্য বাস্তবতায়। তার প্রতিক্রিয়া নারী-মনস্তত্ত্বে কতটা ভার নামায়, জানার উপায় থাকে না। কিন্তু সমাজ বিচলিত হয়, সন্ধানী চোখে সে’ছবি ঠিক ধরা পড়বে। পুরুষতন্ত্রই ধর্মীয় বিদ্বেষ-পীড়ন বা অনার কিলিংয়ের পথ খুলে দেয়।
ভারতীয় বহুত্বের সংস্কৃতিতে ধর্মগুলি পারস্পরিক বিনিময় ও সম্প্রীতির পরম্পরায় বিকশিত। স্বাতন্ত্র্যের পাশেই তার স্থান। চোখের সামনে নির্লিপ্তভাবে (সমাজে কোনো আলোড়ন নেই বা কোনো ডিসকোর্স নেই এমন) একজনের স্বধর্ম ত্যাগে সমধর্মবিশ্বাসীদের ধর্মীয় ভাবাবেগে আঘাত একটা লাগে। এতে সংশ্লিষ্ট দুই সম্প্রদায়ের সামাজিক সম্পর্কে চিড় ধরতে পারে। ইসলাম ধর্মে বিধর্মীর সঙ্গে বিবাহ স্বীকৃত নয়। সেক্ষেত্রে বিবাহের আগে ধর্মান্তরিত করা হয় (ধর্মান্তর লাভ জিহাদ জিগিরের মূল ইস্যু)। হিন্দু ধর্মে ভিন্ন ধর্মে বিবাহ ব্যাপারটা ভাবনার জায়গায় নেই। তখন মুসলিম হলে তো প্রবল আপত্তি। এজন্য দেখাযায়, হিন্দু-মুসলমানে বিবাহে সচরাচর পাত্র মুসলিম, পাত্রী হিন্দু। ফলে ধর্মীয় বিদ্বেষের কৌশলী চালে মুসলিমদের বিরুদ্ধে লাভ জিহাদের জিগির তুলে দেওয়া হচ্ছে।
কথা হল, প্রেমের টানে ধর্মের বেষ্টনী ভাঙা সম্ভব হলে ধর্মান্তরের গোঁড়ামিও ভাঙা যায়। ভাঙা উচিত। প্রয়োজন পুরুষ তন্ত্রের এই গোঁড়ামি থেকে মুক্ত হওয়া ও মানবিক স্বচ্ছতা। দেশে বিকল্পের রাস্তা খোলাই আছে। স্পেশ্যাল ম্যারেজ অ্যাক্টে বিবাহ-বন্ধনই যুক্তিপূর্ণ পন্থা। নারীর মর্যাদার দিক থেকে এটা প্রয়োজন। অপর ধর্মে যখন বিরূপ প্রতিক্রিয়ার সমস্যা আছে, তখন এটা সামাজিক দায়িত্ব হয়ে দাঁড়াচ্ছে। এর ফলে দাম্পত্য জীবনে ধর্মীয় সমমর্যাদার সম্পর্ক তৈরি হবে। সম্পর্কিত দুই ধর্মীয় সমাজের মধ্যে সম্প্রীতির পরিবেশে এই বৈবাহিক সম্পর্ককে স্বাভাবিক বলে মানিয়ে নেওয়াতে বড়সড় বাধা থাকবে না বলেই মনে হয়। তাতে ধর্মীয় বিদ্বেষের রাজনীতিটা নড়বড়ে হয়ে পড়বে।
নিজের সমাজে লড়াইটা পাত্রকেই বেশি করে লড়তে হবে। নিজের সমাজে লড়াইটা তেমন সংঘাতপূর্ণ না হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি। এখানে নমনীয়তার নানা সুযোগও থাকবে। ধর্মীয় বিদ্বেষ বা গোঁড়ামির বিপরীতে লড়াইটা মানবিক ও সামাজিক দায়বদ্ধতার সঙ্গে জড়িত। আর যদি পরিবার ও সমাজ থেকে অস্বীকৃতি অনড়-অলঙ্ঘ্য হয়, তাহলে জীবনসঙ্গিনীর হাত ধরে পরিবার-পরিজন ত্যাগ করার মতো দৃঢ়তা দেখাতে হবে। অনন্যোপায় উপায় হিসেবে এটাই হবে মানবিক দায়বদ্ধতার পরিচয়। জীবনসঙ্গিনী যখন পরিবার-পরিজন ত্যাগ করেই তার হাত ধরছে, তখন তার কোনো  রকম দ্বিধা  দেখানোটা হবে অসংবেদনশীলতা ও দায়িত্বজ্ঞানহীনতার পরিচয়।

0 Comments

Post Comment