এই দেশে গরিব হওয়া যত সহজ, গরিব প্রমাণ মোটেই অত সহজ নয়। বিশেষ করে যদি আপনি হন গ্রামের এক মহিলা এবং আপনার হাতে ধরিয়ে দেওয়া হয় অন্নপূর্ণা ভাণ্ডারের বারো পাতার ফর্ম। সরকারি ভাষায় যাকে বলে “দান খয়রাতি থুড়ি সামাজিক প্রকল্পের সুবিধা প্রাপ্তির আবেদনপত্র”।
ফরমের সাইজ দেখে গ্রামের মহিলারা ভাবে, চন্ডীমণ্ডপের আটচালায় বসে মহাভারত শোনাও এর থেকে ঢের সোজা ছিল।
প্রথম দিনেই পঞ্চায়েত অফিসের সামনে এমন ভিড় হল, যেন চাকরি বিলি হচ্ছে।
কেউ লাইন দিচ্ছে, কেউ লাইনের জায়গা ধরে রাখছে, কেউ আবার লাইনে দাঁড়িয়ে অন্য লাইনের খোঁজ করছে। অন্য লাইনে রয়েছে ‘সাহায্যকারী’ দালালবাবু। সে বলে, অতো ভাবনার কী আছে? তোমার পরিবারের সকলের আঁধার, ভোটার, ব্যাংকের পাশ বই, প্যান-ট্যান সব দাও, আর আমার বাঁ হাতে ৫০০ গুঁজে দাও, আমি ঠিক সব ভোরে দেবো।
পাড়ার সরলা বৌদি সকাল আটটা থেকে দাঁড়িয়ে ছিল। দুপুরে যখন তার হাতে ফর্ম এল, সে উল্টেপাল্টে দেখে সরল মনেই বললে –
“এটা ফরম, না মাধ্যমিকের টেস্ট পেপার?”
প্রথম পাতায় নাম, দ্বিতীয় পাতায় ঠিকানা, তৃতীয় পাতায় ব্যাঙ্ক, চতুর্থ পাতায় পরিচয়পত্র, পঞ্চম পাতায় প্যান, ষষ্ঠ পাতায় সোয়ামীর কাজকাম, সপ্তমে ছানাপুনাদের পড়াশোনা, চাকরি। অষ্টমে পরিবারের সকলে ভোটার লিস্টিতে বেঁচেবর্তে আছে কিনা, আমার অষ্টমী টিকা লিয়েছে কিনা। ইসব পেরিয়ে শেষে বারো পর্বে ঘোষণা – আমি বাংলাদেশী লই, ঘুষপেটিয়া রুহিঙ্গা লই, আমি খাঁটি ভারতীয় বটেক।
যেন সরকার নিশ্চিত হতে চাইছে –তুমি সত্যিই গরিব তো? নাকি অভিনয় করছো?
আর এক গ্রাম্যবধূ কমলা রেগেমেগে ব্যাজার মুখে বলেই ফেললে –
“গরিবেরও আবার এত প্রমাণ লাগে নাকি? পেটটা দেখলেই তো বোঝা যায়!”
কিছু উঠতি ছোকরা ভিড় জমিয়েছে। ভিড়ের মধ্যে এক ফিচেল ছোঁড়া ফিক করে হেসে বলে –আরে সামাজিক প্রকল্পের নামে মানুষের সবকিছু জেনে সরকার এক তথ্যভান্ডার জোগাড় করছে, যা অন্নপূর্ণা ভাঁড়ারের থেকেও শক্তিশালী।
সবচেয়ে ভয়ঙ্কর শব্দ ছিল –“Self Attested”।
অনেকেই ভাবল, এটা নিশ্চয়ই নতুন কোনো ট্যাক্স।
ফুলমণি বলল –“আগে আধার ছিল, এখন আবার সেলফ অ্যাটেস্টেড এসেছে!”
তারপর শুরু হল জেরক্স তীর্থযাত্রা।
একটা কাগজের তিন কপি, তিন কাগজের নয় কপি, নয় কাগজের সাতাশ কপি। এ যেন ঢাকের দায়ে মনসা বিক্রি! জেরক্স দোকানদার হঠাৎ এমন হাসতে শুরু করল, যেন সে রাতারাতি শিল্পপতি হয়ে গেছে।
“signature mismatch” নামক শব্দগুচ্ছ শুনে এক বয়স্কা ফোকলা দাঁত বের করে বললেন –বাবু ব্যাপারটা টুকুন সুজা করে বোলবেক? বিরক্ত অফিসার বলে – তোমার সই মিলছে না গো।
—“আমার সই তো আমি নিজেই চিনতে পারিনা, তুরা মিলাবি কী করে?”
অফিসার –তোমার বয়স কত?
–তিন কুড়ি হবেক হয়তো। সেই বড়ো বন্যার মা আমায় বিয়েছিলো।
অফিসার মুচকি হাসে।
ফর্মের এক জায়গায় লেখা ছিল—
“Applicant must attach income certificate।”
এটা শুনে পাড়ার মালতি হেসে ফেলল।
বলল –“আমাদের আয় থাকলে কি আর এই লাইনে দাঁড়াতাম? পোড়া কপাল আমাদের! পাশ থেকে আর একজন বললে –কপাল, সবই কপাল! কী কুক্ষনে যে গরিবের ঘরে জন্মেছিলাম!
ভিড়ের মধ্যে একটা হাসির গুঞ্জন শোনা যায়। নবম শ্রেণীর গন্ডি পার করা এক বাচাল মেয়ে বলে বসে –
আর একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় বাদ গেছে। জন্মলগ্ন, ঠিকুজি কুষ্ঠিও থাকা উচিত। লগ্নে কোন দোষ থাকলে আয়ুষ সেন্টারে পাঠাতে হবে তো। আয়ুষ্মান প্রকলর যোগ্য হবে কিনা, সেটাও তো বিচার করতে হবে!
ঠিক কিনা?
এতো সময় শ্রম টাকা নষ্ট করে ফর্ম জমা দেওয়ার পরেও নিশ্চিন্তে থাকা যায়না।
কারণ, এরপর শুরু হবে “ভেরিফিকেশন” নামক রহস্যময় অধ্যায়।
কোনো একদিন হঠাৎ হয়তো একজন অফিসার এসে জিজ্ঞেস করবেন – “আপনার বাড়িতে ফ্রিজ আছে?
আপনার ছেলের বাইক আছে?”
মহিলারা ভয়ে কুঁচকে, কেঁদেকেটে হয়তো বলবেন –ছেলের বিয়েতে একটা পুরোনো ফ্রিজ আর একটা সেকেন্ড হ্যান্ড বাইক দিয়েছিলো বটেক, তুবে সিসব ইখন কাজ না করার মতোই।
পাশ থেকে ছেলের ‘স্বগতোক্তি’ – এইসব এখন জাতীয় সম্পদ হিসেবে গণ্য হবে নাকি!
এতো কাঠ খড় পুড়িয়ে অফিসের মহাকাব্যিক ভাষায় যবনিকা পাত –
“Document incomplete”,
“Application under process”,
“Pending due to discrepancy”.
এইসব শুনতে শুনতে গ্রামের লোকের ধারণা হয়ে যায় –বাংলা ভাষার আসল শত্রু ইংরেজি নয়, আসল খলনায়ক সরকারি নিয়ম কানুন, অফিস দপ্তর, শিক্ষিত অফিসার বাবু।
সবচেয়ে বড় কৌতুক হল –
যে প্রকল্প দুমুঠো “অন্ন” যোগান দেবে গরিবের মুখে, সেখানে ভাতের চেয়ে কাগজের গুরুত্ব বেশি। ভরসার থেকে ভয় বেশি। মানুষের পেট নয়, যেন ফাইলের পেট ভরানো হচ্ছে।
গ্রামের বুড়ো হরিপদ মন্তব্য করল –
“আগে শুনতাম স্বাধীন দেশে মানুষ বাঁচে।
এখন দেখছি, ফর্ম বাঁচে। মানুষ শুধু তার সঙ্গে স্ট্যাপলার হয়ে ঝুলে থাকে!”
বুড়ো মানুষটার কথা শুনে সবাই হেসে উঠল।
তবু এই মেয়েরা হাল ছাড়ে না।
রোদে দাঁড়িয়ে থাকে, লাইনে ঝগড়া করে, আবার হাসাহাসিও করে। কারণ তারা জানে, সংসারের হাঁড়ি বড় কঠিন জিনিস।
বারো পাতার ফর্মের চেয়েও কঠিন।
হরিপদ আবার হাসতে হাসতেই বললে –
“আগে মহাভারত ছিল আঠারো পর্বের। এখন গরিবের মহাভারত বারো পাতার!”
আবার হাসির রোল উঠল।
হাসির ভিতরেও লুকিয়ে রইল এক চিলতে দীর্ঘশ্বাস। কারোর কারোর চোখের কোণে হয়তো অশ্রুধারা নেমে এলো!