এ বছর গান্ধী জয়ন্তীতে দেশজুড়ে এস আই আর বিরোধী গত আন্দোলনের নব সূচনা হল জেন জি দের হাত ধরে গতকাল। মুম্বাই, দিল্লির মত পশ্চিমবঙ্গেও। সর্বত্র নেমে এল রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস। যন্তরমন্তরের আগের সার্থক আন্দোলন মাথায় রেখে এবারে সব পথ যুদ্ধ করা হয়েছে শুরু থেকেই। তবু সারাদিন ধরে মানুষ তার ধারে কাছে পৌঁছে গেছেন। "কেহ নাহি জানে, কার আহ্বানে কত মানুষের ধারা"। বাস ভরে ভরে সারাদিন পুলিশ এদের গ্রেফতার করে থানায় থানায় নিয়ে গেছে। মুম্বাইয়ের শিবাজী পার্কে ককরোচদের ডাকে সরকারি নিষেধাজ্ঞার মুখে ছাই দিয়ে হাজারো মানুষ জমায়েত হয়েছেন। কী এক আশ্চর্য সময় পেয়েছি আমরা। পশ্চিমবঙ্গে আক্রমণ এখন ভয়াবহ মাত্রায় চারিদিকে।দিনের শেষে আমরা দেখলাম বিরাটীর বণিক মোড়ে পুলিশের ভাঙচুর করা সভায় একা দাঁড়িয়ে আছেন বামনেত্রী দীপ্সিতা, হাতে গান্ধীর ছবি।
মুহূর্তে এই ছবিটি মনের ভিতর আরো কত ছবি নিয়ে আসে।
১৯৩০ সালের বিখ্যাত ডান্ডি অভিযানের প্রেক্ষাপটে একটি ছবি খুবই জনপ্রিয়। সেই ছবিতে দেখা যাচ্ছে যে সমুদ্রতটে গান্ধীজীর লাঠি হাতে নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে এক ছোট্ট ছেলে। ছবিটি অবশ্য পরে জানা যায় যে সেই সময়ের তোলা নয় এবং ছবির ছেলেটি হল গান্ধীজীর নাতি কানু রামদাস গান্ধী। সম্প্রতি যন্তর মন্তরে জেন জি আন্দোলনের সময় এই ছবিটির আদলে তৈরি আরেকটি ছবি বা মিম দেখা গেল। সেখানে একইভাবে গান্ধীজি চলছেন কিন্তু তার লাঠিটা জমির সমান্তরালে ধরে আছে এক জেন জি যার আরেকটি বৈশিষ্ট্য হলো যে তার অন্য হাতে ধরা আছে একটি মোবাইল ফোন।
ইদানিং যন্তরমন্তর আন্দোলনের সময় অথবা আমাদের দেশে সাম্প্রতিককালের যেকোনো আন্দোলনের সময় বারবারই আমরা গান্ধীর কথা স্মরণ করছি। তার একটি কারণ অবশ্যই অহিংস আন্দোলন এবং আরেকটি হলো অনশন সত্যাগ্রহ ।এই পরিপ্রেক্ষিতে আমরা ভেবে দেখতে পারি আজকের জেন জি আন্দোলনের সাথে গান্ধীর সম্পর্ক কীরকম ত হতে পারে।
একটা দীর্ঘ সময় ধরে গান্ধী বনাম আম্বেদকর এই দ্বন্দ্ব নিয়ে ভারতবর্ষের দলীয় রাজনীতির বাইরে বিভিন্ন আন্দোলন গুলিতে আলোচনা হতো। এদেশে সক্রিয় গত আন্দোলনে যুক্ত একদল ভয়ংকর ভাবে গান্ধীকে নস্যাৎ করেন কিন্তু সেটা হিন্দুত্ববাদী হয়ে নয়, সেখানে অবস্থানটি আম্বেদকরীয় অবস্থান। অন্যদিকে যারা গান্ধীবাদী তাদেরও একটি অংশ আম্বেদকর নিয়ে কিছুটা সন্দিহান থেকেছেন এই সেদিনও। কিন্তু এই যে নতুন প্রজন্ম যাদের জন্ম ও বেড়ে ওঠার আবহ ছিল গান্ধী অবহেলায় এবং আম্বেদকরকে পাশ কাটিয়ে, তারা এঁদের জুড়েছেন। গান্ধী এবং আম্বেদকর একসাথে। কেননা এই প্রজন্ম মূল লড়াইটা কোথায় সেটা বুঝেছেন, জেনেছেন একভাবে জীবন দিয়েই। মনে আছে এন আর সি নিয়ে আন্দোলনের সময় উজ্জিবিত দিল্লির কলেজ বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে ছাত্ররা পাশাপাশি তুলে ধরছেন দুজনের দুটি ছবি। আর যন্তরমন্তর আন্দোলনের মঞ্চে আমরা দেখেছি একই ফ্রেমে দুজনের ছবি। জয় ভীম স্লোগানের সাথে অনশন সত্যাগ্রহ। শিবাজী পার্কে জনসমুদ্রের মাঝে অভিজিৎ দীপকে বললেন যে গান্ধী এদেশের আত্মা, আম্বেদকর শিরদাঁড়া এবং নেহরু মন। সাত জন্ম চেষ্টা করলেও আজকের শাসক এর কোনোকিছুর ধারেকাছে আসবে না। এই আন্দোলনের সকল উদ্যোক্তারা চলমান গান্ধীর ছবি দেওয়া টি শার্ট পরেছিলেন।
গান্ধী তার নিজের সময়ে যুবসমাজকে সাথে পেয়েছিলেন। তাঁর পত্রিকার নাম ছিল ইয়াং ইন্ডিয়া। যদিও দক্ষিণ আফ্রিকায় সার্থক আন্দোলনের পর যে গান্ধী ভারতে এসেছিলেন তিনি যুবাবস্থা প্রায় পেরিয়ে গেছেন, তদানীন্তন হিসেবে তো বটেই। তখন দক্ষিণ আফ্রিকায় তাঁর অহিংসা, সত্যাগ্রহ, আইন অমান্য এবং পাশাপাশি জাত ধর্মের উর্ধ্বে উঠে তৈরি করা সহজীবনের একপ্রস্থ পরীক্ষা হয়ে গেছে। শান্তিনিকেতনে তাঁর আগেই এসে পৌঁছেছে ফিনিক্সের ছাত্রেরা যাদের আশ্রয় দিয়েছেন রবীন্দ্রনাথ। এই গান্ধী ভারতে এসে তাঁর প্রথম সত্যাগ্রহের প্রয়োগ করলেন নীলকরের অত্যাচারে জর্জরিত মৃতপ্রায় চম্পারণের কৃষক সমাজে। একদিকে অত্যাচারিত কৃষকদের কাছে তথ্যানুসন্ধান আর অন্যদিকে চম্পারণে শিক্ষার প্রসার, এই ছিল গান্ধীর প্রধান কাজ। দলে দলে তরুণ উকিলেরা এলেন পাশে, আর অন্যদিকে যুবসমাজকে তিনি ডাকলেন চম্পারণে স্কুলের কাজে।
আজকের জেনজিও তাদের মুখ্য ফোকাস রেখেছে শিক্ষায় এবং সরকারি শিক্ষা ব্যবস্থায়।
গান্ধীর চম্পারণে কাজের আহ্বানে সাড়া দিলেন ভারতের দক্ষিণ প্রান্তের এক যুবক। কিন্তু স্কুলে তিনি পড়াবেন কী করে? তাঁর ভাষাই তো আলাদা। গান্ধী তো ছাড়ার পাত্র নন। তিনি একজনকে পাঠালেন সেই তরুণের কাছে তাকে ভাষা শেখাতে।শেষ অবধি সেই তরুণ পড়াতে এল চম্পারণে। আজকের জেনজিরাও জোর দিচ্ছে শিক্ষায়, গ্রামে গ্রামে চলছে স্কুলের অডিট অবশ্যই সরকারের চক্ষুশূল হয়ে।
শিক্ষার মূল উদ্দেশ্য প্রায় আমরা ভুলেই গেছিলাম। অক্ষরের ক্ষমতা মানুষকে প্রশ্ন করতে শেখাবে, সেটাই তো প্রধান উদ্দেশ্য ছিল এখন আমরা অতি সংকুচিত করেছি শিক্ষাকে, স্কিল এবং নম্বর দিয়ে মেপে। সরকারি স্কুল একরকম ভাবনার বাইরেই, মিড ডে মিলের দূর্নীতি ছাড়া সেদিকে কারো নজর পড়ে না।জেনজি আজ সেখানে আলো ফেলছে, এটা গুরুত্বপূর্ণ।
এই মুহূর্তে যে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি নিয়ে আন্দোলনের সূত্রপাত হতে চললো সেটি হল নাগরিকত্বের অধিকার। দক্ষিণ আফ্রিকায় জীবনের প্রথম লড়াই গান্ধী লড়েছিলেন খানিকটা একইরকম বিষয় নিয়ে। ১৮৯৫ সালের শেষের দিকে ৫০ পাতার একটি প্যামফ্লেট প্রকাশিত হলো দক্ষিণ আফ্রিকার নাটালে। লেখক মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধী, যিনি একজন অসফল উকিল কিন্তু সেখানকার ভারতীয়দের নেতা হয়ে উঠেছেন কম বয়সে। বিষয় ছিল 'দ্য ইন্ডিয়ান ফ্রাঞ্চাইজি', ভারতীয়দের ভোটাধিকার, যে অধিকার খর্ব করার জন্য উঠে পরে লেগেছিল তদানীন্তন ঔপনিবেশিক সরকার। সেই লেখায় গান্ধী সামাজিক রাজনৈতিক সমস্ত স্তরে ভারতীয়দের অবদান উল্লেখ করে স্পষ্ট বলেছিলেন, ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের কোনো খানে তাদের দ্বিতীয় শ্রেণীর নাগরিক বানানোর চেষ্টা অন্যায়। ১৯০৬ সাল নাগাদ আদেশ হল ট্রান্সভালে ভারতীয়দের 'পাস' নিয়ে ঘুরতে হবে। প্রত্যেককে সর্বদা আঙুলের ছাপ সহ তাদের সমস্ত তথ্য সম্বলিত একটি নথি বহন করতে হবে। আট বছরের বেশি বয়সী প্রত্যেককে নতুন করে একটি নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে তাদের কাগজপত্র সংগ্রহ করতে হবে। এই কাগজ না থাকলে সে বেআইনি অনুপ্রবেশকারী (পড়ুন ঘুসপেটিয়া) হিসেবে চিহ্নিত হবে এবং শাস্তি পাবে। পনেরো হাজার ভারতীয়ের চলাফেরায় বাধা পড়লো। তখন একজন ভারতীয় অভিবাসী উঠে দাঁড়িয়ে বললেন, "আমি আপনাকে আমার কাগজপত্র দেখাবো না।" সেখানেই থামলেন না তিনি। প্রকাশ্যে সেগুলোকে জ্বালিয়ে দিলেন। তার দেখাদেখি আরো অনেকেই। সত্যাগ্রহের সূচনা হল দক্ষিণ আফ্রিকার মাটিতে।
আজ ভারতে সুপরিকল্পিতভাবে সংবিধানের তোয়াক্কা না করে এক বিরাট সংখ্যক মানুষের ভোটাধিকার কেড়ে নেওয়ার পরিকল্পনার নাম বিশেষ নির্বাচনী সমীক্ষা। আজ এস আই আর কোটি কোটি মানুষকে বেনাগরিক করে তুলছে। যেন ভুলে না যাই নিজ দেশে পরবাসী করার এই চক্রান্তের বিরুদ্ধে একই সাম্রাজ্যের মধ্যে ভারতীয়দের বিশেষ ভাবে চিহ্নিত করে তাদের অধিকার হননের বিরুদ্ধে যে লড়াই, সেটিই গান্ধীর প্রথম সফল সত্যাগ্রহ।
সত্যের উপর জোর দিয়েই তো গান্ধীর চলা আর সেই পথে চলার উপায় অহিংসা। দক্ষিণ আফ্রিকা থেকেই যে জোরে তিনি মোহনদাস থেকে মহাত্মায় রূপান্তরিত হবেন একদা। সত্য এবং অন্ধবিশ্বাসের পার্থক্য করেছেন গান্ধী। সত্য বলতে সাহস লাগে। তাঁর চেয়েও বেশি সাহস যখন হিংসার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে সত্য উচ্চারিত হয়। যন্তর মন্তরে আমরা একটি প্রজন্মকে দেখলাম অহিংস সত্যাগ্রহীর ভূমিকায়। অহিংস আন্দোলনের আসল পরীক্ষা যখন সে আক্রমণের সামনে পড়ে এবং দৃঢ় সংকল্পবদ্ধ হয়েই প্রত্যাঘাত করে না। মনে পড়ে লবণ সত্যাগ্রহের সময় সবচেয়ে ভয়ঙ্কর দমন ঘটেছিল ধারসানায়। গান্ধী নিজে সেখানে দাঁড়িয়ে ছিলেন না। ছিলেন অজস্র তরুণ সত্যাগ্রহী। সেখানে তাদের "উপর যে অমানুষিক লোহা বসানো লাঠিচার্জ হয় এবং তারাও যে বীরোচিতভাবে তার সম্মুখীন হয় তার প্রত্যক্ষদর্শী ছিলেন প্রসিদ্ধ মার্কিন সাংবাদিক ওয়েব মিলার। ভারত সরকারের সেন্সর শিপ এড়ানোর জন্য আমার যতদূর মনে পড়ে তিনি ইরানে যান ও সেখান থেকে যে সব রোমহর্ষক সংবাদ পরিবেশন করেন তা দুনিয়া জুড়ে তেরশো পঞ্চাশখানা সংবাদপত্রে প্রকাশিত হয়। ওয়েব মিলার তাঁর আঠারো বছরের সাংবাদিক অভিজ্ঞতায় বিশটি দেশে শত শত দাঙ্গা-হাঙ্গামা রাস্তায় রাস্তায় লড়াই বিদ্রোহ ইত্যাদি দেখেছেন, কিন্তু এমন হৃদয়বিদারক দৃশ্য দেখেননি।" (গান্ধী, অন্নদাশঙ্কর রায়।)
আমরা স্মরণ করতে পারি এমনই কাঁটাওয়ালা লাঠি এবং পেলেটগান ব্যবহার করা হয় যন্তরমন্তরে, স্বাধীন দেশের সরকারের দ্বারা তার যুবসমাজের উপর। পাশাপাশি আমরা দেখেছি তেমন কোনো নেতৃত্ব ছাড়াই ছেলেমেয়েরা, বিশেষ করে মেয়েরা অহিংস ভাবেই এর মোকাবিলা করেছে, হাত মেলে দিয়ে সঙ্গীদের আড়াল করেছে। কিন্তু ঘুরিয়ে মারেনি কাউকে। রক্তাক্ত যুবক আরো মারের জন্য প্রস্তুত। কেউবা বলেছেন যতবার মারবে ততবার জন্মাবো, লড়বো। সেই আশ্চর্য ছবিটা ভাবুন উদ্যত লাঠির সামনে মানুষ জাতীয় সংগীত গাইছেন, হাতে জাতীয় পতাকা।
ডান্ডি অভিযানের সময় গান্ধীর সাথে হেঁটেছিলেন একদল সাংবাদিক তাদের নোটবই খাতা নিয়ে। গান্ধীর শর্তেই তাঁরা সাথে ছিলেন, একেবারে পথে পথেই। গান্ধী তো সেই রাজনীতিবিদ যিনি জানেন আসল লড়াইটা পথেই লড়তে হবে। আজকের ভারতে এখন সেটাই শেষ উপায়। সাংবাদিকতার হাতেখড়ি গান্ধীর দক্ষিন আফ্রিকায়, তিনি জানেন কতটা জোরালো এই মাধ্যম। কিন্তু গান্ধী মনে করেন সংবাদ মাধ্যমের দায়িত্ব পাঠককে খুশি করা নয়, তার কাছে সত্যকে পৌঁছে দেওয়া। গোদী মিডিয়ার যুগে আজ সমান্তরালে আমরা সত্যকে পৌঁছে দেওয়ার সমাজমাধ্যম দেখলাম। সবার হাতে আজ ক্যামেরা, সমস্ত প্রতিবাদ লাইভ করা যায় মুহূর্তে, আজ সত্যকে তুলে ধরার দায়িত্ব নিয়েছে বহু মানুষ, কোথায় তাদের টিকি বাঁধা নেই। টাকা নিয়ে রিল বানানো ইনফ্লুয়েন্সারকে টপকে গেছে তারা। যন্তরমন্তরে এমন অনেক মুহূর্ত উঠে এসেছে, যা তুলনীয় গান্ধীর লবণ তৈরির যাত্রা। গান্ধী পারতেন জটিল রাজনৈতিক সামাজিক তত্ত্বকে সকলের কর্মকান্ডে পরিণত করতে, নাহলেএক চিমটি লবণ সাম্রাজ্যের ভিত কাঁপায়!
জেন-জি আন্দোলন আর একটি সত্যকে সামনে এনেছে যার জন্য গান্ধীকে জীবন দিতে হয়েছিল।নফরতের বিষাক্ত আবহে মোহাব্বতের দোকান খুলেছে জেন-জি তাদের মত করে। সর্বধর্ম প্রার্থনা নাই বা হল, সর্ব ধর্ম সমাবেশ তো ঘটেছে। আর এইখানেই মোক্ষম চোট লেগেছে তথাকথিত রাষ্ট্রবাদে। হিংসায় উন্মক্ত পৃথিবীতে ছোটখাটো চেহারার অতি সাধারণ এই মানুষটি ভাঙাচোরা সেতু বেয়ে চিরকাল ভালোবাসা ও শান্তির ভাবনায় জুড়েছেন মানুষকে। এখানে আজও গান্ধীর বিকল্প নেই।
গান্ধী শুধু এই পথ খোঁজেননি যে ইংরেজের সাথে কীভাবে লড়বেন, পাশাপাশি এক মৌলিক প্রশ্নের জবাব খুঁজেছেন, লড়তে লড়তে শেষকালে শত্রুর মত হয়ে যাবো না তো? সেই একই বিদ্বেষ, একই অহংকার মনের মধ্যে জমা হবে তো? সত্যাগ্রহ অহিংসাকে এইখানে প্রতিষ্ঠা দেয় যে আপাতভাবে যার প্রতি বিরোধ, তাকেও ঘৃণা করা যাবে না। প্রতিপক্ষকে শয়তান না ভেবে মানুষ ভাবতে হবে। আজ যখন তরুণ প্রজন্মের একটি অংশকে রামের নামে বিষাক্ত এক ভিড়ে পরিণত করা হল, তখনই যেন আলো হয়ে জাগলো আরেকদল, যারা মারতে আসা পুলিশকেও খাবারের ভাগ দিতে চায়। ককরোচ আন্দোলনের অন্যতম মুখ সৌরভ দাস সেই কথাই বলেছেন। শান্তি এবং প্রতিবাদ এই দুটি শব্দকে গান্ধীই প্রথম যুক্ত করেন।
দেশভাগের যন্ত্রণা নিয়ে যখন দেশ স্বাধীন হয়, গান্ধী তখন উৎসবের আঙিনা থেকে দূরে কলকাতায় হায়দারি মঞ্জিলে। সাম্প্রদায়িকতার আগুনে পুড়ে থাকা শহর তখন সবে স্বাভাবিক হয়েছে। আগের রাতে গান্ধীর অনুরোধেই পুলিশ পাহারা উঠিয়ে দেওয়া হয়েছে। সমসংখ্যক তরুণ হিন্দু ও মুসলমান স্বেচ্ছাসেবক পাহারা দিয়েছেন রাতভর। রমজান মাস।রাত তিনটেতেই রোজাদার মুসলমানেরা এসেছেন গান্ধীর সাথে দেখা করে তাঁরা শেহরি করবেন। সকালের প্রার্থনার আগেই একদল কিশোরী রবীন্দ্রসঙ্গীত গাইতে গাইতে পৌঁছলেন, যোগ দিলেন প্রার্থনায়। পশ্চিমবঙ্গের মন্ত্রী মন্ডলের সদস্যরা এলে গান্ধী তাঁদের বললেন এবার আপনাদের আসল পরীক্ষার সময়। আজ থেকে মাথায় কাঁটার মুকুট পরতে হবে। ১৯৪৮ সালে বলেছিলেন যে, সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে আমি যে লড়াই করেছিলাম, তার চেয়েও কঠিন হবে এই লড়াই, কারণ তা আমার নিজের মানুষদের বিরুদ্ধে। এই লড়াই লড়তে হবে প্রতিটি ঘরে, প্রতিটি বাড়িতে। এটা ছাড়া সাফল্য অসম্ভব, এবং তা টিকবেও না। অতএব, নিজেদের ঘরে ছড়িয়ে থাকা ও প্রচারিত হওয়া প্রতিটি সংকীর্ণ মানসিকতার বিরুদ্ধেই আজ সত্যাগ্রহ। ২৩ দিন ধরে অনশন করা, আজ এ দেশে গণ আন্দোলনের অন্যতম মুখ নেহা বোরা খানিকটা এই কথাই বলেছেন।
তরুণ প্রজন্মের দুটি শ্রেণীও আজ মিলেছে। যারা সুবিধাজনক অবস্থায় ছিল, যাদের কেবল ক্যারিয়ার ও ফোন সর্বস্ব ভাবা হয়েছিল তারা আজ বুঝেছেন এই সরকার সুপরিকল্পিতভাবে সাংস্কৃতিক, শিক্ষাগত, সামাজিক এবং বুদ্ধিবৃত্তিক ব্যবস্থাকে এক নীতিহীন সাম্প্রদায়িক সংগঠনের সদস্যদের নিয়ন্ত্রণে দিয়েছে।গান্ধীবাদী চিন্তক কুমার প্রশান্ত যেমন বলেন, "আমাদের শিখতে হবে কীভাবে গান্ধী কার্যত ভারতীয় সমাজের চেতনা থেকে তাদের নির্বাসিত করেছিলেন। এই হতাশা থেকেই তারা তাঁকে হত্যা করেছিল। সুতরাং, তাদের বিরুদ্ধে চূড়ান্ত লড়াইটা আমাদেরই।"
এই যে সময়, যখন জেন জি প্রজন্ম এক উদ্বিগ্ন প্রজন্ম যাদের ভবিষ্যৎ প্রতিদিন বিঘ্নিত, তার উপর পরিবেশগতভাবে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব এবং একই সাথে প্যালেস্টাইনের মত অঞ্চলে নব্য উপনিবেশবাদের ভয়াবহ আক্রমণ। এই সমস্তের বিরুদ্ধেই গান্ধী তাঁর সময়ে লড়েছিলেন। তিনি সেই মানুষ যিনি বিকাশের ধারণাকে অন্ত্যোদয় বা অন্তিম জনের কল্যাণের সাথে যুক্ত করেছিলেন।
বেনারসের রাজঘাট থেকে দিল্লির রাজঘাট পর্যন্ত গতবছর একটি পদযাত্রা হয়েছিল গান্ধীর সাথে। এক কদম গান্ধী কে সাথ। এই পদযাত্রা বহুদিন ধরে চলে শেষ হয় যন্তরমন্তরে। সেখানে শুরু থেকে থাকা একজন ট্রান্সজেন্ডার মানুষ বলেছিলেন, আমি জানতে চাই গান্ধী ট্রান্সজেন্ডারদের নিয়ে কিছু বলেছিলেন কি না। আদৌ কিছু বলেছিলেন কি না তার চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ ছিল এই আশা যে গান্ধী নিশ্চয় কিছু বলেছেন। সকলকে নিয়ে চলতে পারার জন্যই তো গান্ধী।