পড়শি যদি আমায় ছুঁতো যম যাতনা সকল যেত দূরে: লালন সাঁই

পড়শি যদি আমায় ছুঁতো যম যাতনা সকল যেত দূরে: লালন সাঁই

hhhhhhhhhhhhhh

নতুন প্রজন্মের সমস্যা সমাধানে সরকার কতটা আন্তরিক?

  • 01 January, 1970
  • 0 Comment(s)
  • 203 view(s)
  • লিখেছেন : সুমন সেনগুপ্ত
নতুন প্রজন্মের আন্দোলন, নতুন প্রজন্মের নতুন করে ভাবনা স্কুল ঠিক করার দাবীতে রাস্তায় নামা এই সমস্ত বিষয়গুলোকে সরকার দমন করতেই পারে। তার শক্তি দিয়ে তার সমস্ত ক্ষমতা দিয়ে এই নতুন প্রজন্মকে গারদে পুরতেই পারে। কিন্তু তাহলেও তো কিছু কিছু মানুষ এই প্রশ্নগুলো করবেই সরকারকে। তখন তাদেরকে আরবান নকশাল দিমাগী নকশাল এইসব বলে চাপিয়ে দিলে কি সমস্যার সমাধান হবে? শুধুমাত্র দশ হাজার কন্ঠে 'বন্দে মাতরম' গাইয়ে দেশাত্মবোধ জাগিয়ে কিন্তু এই সমস্যার সমাধান নেই।

সেই ২০১৪ সালের আগে থেকে শুনে আসছি, নরেন্দ্র মোদী নাকি বছরে ২ কোটি বেকারের চাকরি দেবেন। তারপরেই আমাদের সমস্ত সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে আমরা আচ্ছে দিনে প্রবেশ করব। আর তারপর আমাদের কোন সমস্যাই আর থাকবে না ধীরে ধীরে আমরা "বিক্সিত ভারত" এর অংশ হয়ে উঠবো এবং তখন আমরা বলতে পারব এক যুগপুরুষ মহাপুরুষ আমাদের দেশে এসেছিলেন বলেই আমরা আজকে আবার বলতে পারছি ভারত জগতসভায় শ্রেষ্ঠ আসন নিয়েছে। কিন্তু ২০১৪ থেকে ২০২৬ সালে এসে আমরা যখন দেখছি যে আমাদের চারিদিকে শুধু বেকারত্ব তখনও আমরা ভাবছি নরেন্দ্র মোদি তো এত চাকরি দেবেন বলেছিলেন তাহলে চারিদিকে এত বেকারত্ব কেন? তখনই মনে হচ্ছে দোষটা আমাদেরই। সরকার বাড়ি এসে বলছে যে সরকারি চাকরি আছে দু কোটি সরকারী চাকরির মধ্যে আমার একটাও হবে না, তা কি হয়? আসলে আমরাই কুঁড়ে, অলস। সরকার দপ্তরে দপ্তরে চাকরির ব্যবস্থা করে রেখেছে আমরাই আবেদন করছি না বাড়িতে বসে বসে ভাবছি কেন কাজ করব? আমরা আসলে ভেবে নিয়েছি সরকার বিভিন্ন ভাতা দেবে আর সেটা না পেলে আমরা বিক্ষোভ করবো। তা না হলে জেলায় জেলায় এই অন্নপূর্ণা যোজনার টাকা নিয়ে এত বিক্ষোভ হয়? আমাদের কোন কান্ডজ্ঞানই নেই, সমস্ত মহিলা লক্ষী ভান্ডার পেত বলেই সবাই অন্নপূর্ণা পাবেন এরকম কোন কথা আছে? আসলে দোষটা আমাদেরই আমাদেরকে সেই কবে বলেছিলেন বারান্দায় দাঁড়িয়ে থালা বাজাতে হবে তবে করোনা চলে যাবে। লাইট নিভিয়ে এই কাজ করতে পারলে করোনা ঘরে ঢুকবেই না, সরকার ধরেই নিয়েছে আমাদের সবার বাড়ি আছে সবার ব্যালকনি আছে সেই ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে থালাও বাজানো যায় তা সত্ত্বেও আমরা ফুটপাতে দাঁড়িয়ে বাচ্চার জন্য দুধ গরম করি। আমরা বুঝতে পারিনি এই সরকারই আবার বলেছিল ২০২২ সালের মধ্যে সবার মাথায় একটা করে ছাদ দিয়ে দেবে। আসলে সরকার কিন্তু বলে আমরা ধরতে পারি না। সেটাই সমস্যা। সরকার কিন্তু বলেছিল চা বিক্রি করা ঝালমুড়ি বিক্রি করা পাকোড়া বিক্রি করা এগুলো কোন ছোট কাজ নয় আমরা ধরতে পারিনি, তাই সরকারি চাকরির আশায় এখনো হাপিত্যেশ করি আর সরকারকে দোষারোপ করি।

মুখে সারাক্ষণ তারুণ্যের জয়গান করা ইনস্টাগ্রামে নতুন প্রজন্মকে ধরার জন্য রিলস বানানো আসলে যে শুধুমাত্র ভোটের জন্য করা সেটা আমরা সেদিন বুঝতে পারিনি আজও বুঝি কিনা জানিনা। আসলে মোদি সরকার যে যুব সমাজের জন্য বড় কবর খুঁড়ে রেখেছে তা সেদিন আমরা বুঝতে না পারলেও আজ কিন্তু পরিষ্কার বোঝা যাচ্ছে। তথ্য জানার অধিকার আইনে এক ব্যক্তি আবেদন করেছিলেন যে সরকারি চাকরিতে গত ১ দশকে কত চাকরি হয়েছে? আরো কিছু প্রশ্ন ছিল উত্তর যা এসেছে, তা কিন্তু চমকে দেওয়ার মতো। গত এক দশকে কেন্দ্রের চাকরিতে শূন্য পদের সংখ্যা দ্বিগুণ হয়েছে। ২০১৫ সালে এই সংখ্যা ছিল চার লক্ষ একুশ হাজার তা ২০২৪ সালে দাঁড়িয়েছে ৮ লক্ষ ২৪ হাজার। শতাংশের হিসাব করলে ১১. ৫ শতাংশ থেকে বের হয়েছে ২১ শতাংশ। এই শূন্য পদ গুলি কোথায় সৃষ্টি হয়েছে? রেল প্রতিরক্ষা স্বরাষ্ট্র স্বাস্থ্য মন্ত্রক, রাষ্ট্রপতির সচিবালয় কিংবা প্রধানমন্ত্রীর দপ্তর অব্দি এই শূন্য পদের বিস্তৃতি আছে। রাষ্ট্রায়ত্ব সংস্থা বা ব্যাংকের হিসাবে এর মধ্যে ধরা হয়নি। ঐ সংখ্যা যোগ করলে শূন্য পদ মোটামুটি ১০ লক্ষে পৌঁছাবে। সরকার জানিয়েছে শুধুমাত্র কেন্দ্রের ৭৮ টি মন্ত্রকের অনুমোদিত পদের সংখ্যা প্রায় ৪০ লক্ষ। ২০২৪ সালের পয়লা মার্চে কেন্দ্রীয় সরকারি কর্মীর সংখ্যা ছিল প্রায় ৩১ লক্ষ তারপরও অবসর নিয়েছেন বেশ কিছু মানুষ মারা গেছেন। অর্থাৎ এখনো বহু পদ শূন্য পড়ে রয়েছে। রাষ্ট্রপতি সচিবালয়ে ২৮৭ টি, প্রধানমন্ত্রীর অফিসের ১২৬ টি পদ এখনো খালি। দেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রতিরক্ষা মন্ত্রকে ২ লক্ষ ৪২ হাজার, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকে এক লক্ষ এগারো হাজার পথ খালি আছে। আরো অবাক করা বিষয় হচ্ছে ২০১৫ সালে রেল ও স্বাস্থ্য মন্ত্রকে কোন শূন্য পদ ছিল না কিন্তু কত ১০ বছরে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী এত চাকরি দিয়েছেন যে রেলে এই মুহূর্তে শূন্য পদের সংখ্যা ২ লক্ষ ৪০ হাজার আর স্বাস্থ্য মন্ত্রকে ১৬০০। আরো অবাক করা বিষয় হচ্ছে যত যা চাকরি দেওয়া হয়েছে গত ১০ বছরে তার প্রায় সবই হচ্ছে চুক্তিভিত্তিক। সঠিকভাবে বললে প্রায় ৫০ শতাংশই চুক্তি ভিত্তিক, মানে প্রতি দুজনে একজন স্থায়ী একজন চুক্তিভিত্তিক। বেকারত্বের জ্বালায় যখন যুবসমাজ জর্জরিত তখন শূন্য পদে চাকরি দেওয়ার ক্ষেত্রে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির এই অবদান সারা দেশ মনে রাখছে সারা দেশ আজীবনের জন্য মনে রাখবে। সরকারের কাছে আসলে এই চাকরির টোপ ঝুলিয়ে যুবশক্তিকে কাছে টানাই উদ্দেশ্য তাদেরকে হিন্দু মুসলমানের রাজনীতিতে ভুলিয়ে কিংবা বন্দেমাতরম কেন গাওয়া হবে না সেই রাজনীতিতে ঘুরপাক খাইয়ে রাখাটাই উদ্দেশ্য। যুবশক্তি রসাতলে গেলেও এই শাসক নির্বিকার। 

বিষয়টা আরো গুরুত্বপূর্ণ কেন হয়ে উঠেছে তার কারণ সরকারি সংস্থা নীতি আয়োগ এবার এই শিক্ষিত যুবকদের কর্মহীনতার প্রসঙ্গটি তাদের রিপোর্টে এনেছে। শুধু নীতি আয়োগ নয় আইএলও অর্থাৎ ইন্ডিয়ান লেবার অর্গানাইজেশন ২০২৪ সালের যে রিপোর্ট প্রকাশ করেছেন তাকে বলা হয়েছে যে ভারতে কর্মহীনদের মধ্যে ৮৩ শতাংশই যুব সমাজের প্রতিনিধি। এই হিসাবটা অবশ্য অমিত শাহের ৪৩ শতাংশ কাজ হয়ে যাবার মত নয়। এই হিসেবটা অনেক অংক কষেই করতে হয়েছে। ২০০০ সালের শিক্ষিত যুবকদের ৫৪ শতাংশ ছিলেন কর্মহীন। ২০২২ সালে তা বেড়ে হয়েছে ৬৬ শতাংশ। নীতি আয়োগ এর যে রিপোর্ট প্রকাশ হয়েছে তাতে বলা হয়েছে ১৫ থেকে 29 বছরের প্রায় ৯ কোটি যুবক যুবতী কোন পড়াশোনা করছে না কোন প্রশিক্ষণ নিচ্ছে না কোন কাজের সঙ্গে যুক্ত নয়। বলা যায় একরকম কর্মহীন অলস জীবন কাটাচ্ছে জেন জির একাংশ। এর কারণও তারা ব্যাখ্যা করেছেন ব্যবহারিক শিক্ষা ও শিল্প সংক্রান্ত প্রশিক্ষণের সীমিত সুযোগ নতুন প্রজন্মের কর্মসংস্থানের পথে বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে। এর পাশাপাশি যারা চাকরি পাচ্ছেন যারা কাজ করছেন তারাও হতাশ সেই কথাও নীতি আয়োগ বলেছে। তাদের কথা অনুযায়ী যারা কাজ পাচ্ছেন তাদের সিংহভাগই শিক্ষাগত যোগ্যতা অনুযায়ী কাজ পাচ্ছেন না বেশিরভাগই এমন কোন কাজের সঙ্গে যুক্ত যার সঙ্গে তাদের পড়াশোনার কোনো যোগাযোগ নেই। স্নাতক স্তরের প্রায় সাড়ে তিন কোটি ছাত্র-ছাত্রীর মধ্যে দিয়ে বি এ, বি কম, বিএসসির মত সাধারণ ডিগ্রী করছে পাশ করা ছাত্র-ছাত্রীর সংখ্যা দু কোটির বেশি। এই যে পড়াশোনা গুলো করানো হচ্ছে তার সিলেবাসে কর্মসংস্থানের কোন উপযোগী পাঠ্যবিষয় বা প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা নেই উল্টে ভারতীয় জ্ঞানতত্ত্ব পড়ানোর নাম করে তাদের মধ্যে এমন কিছু ধারণা তৈরি করে দেওয়া হচ্ছে, তাতে তাদের লাভের বদলে ক্ষতিই হচ্ছে। ফলে শিক্ষাগত যোগ্যতা থাকলেও এদের জন্য উপযুক্ত চাকরির দরজা খুলছে না অর্থাৎ সরকারের পরিকল্পনার অভাব স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে। 


দেশের যুবশক্তিকে সঠিক দিশা দেখাতে না চাওয়াটাই কি তাহলে উদ্দেশ্য? দেশের যুবশক্তিকে হিন্দু মুসলমান বিতর্কের মধ্যে মাতিয়ে রাখাটাই তাহলে কি উদ্দেশ্য এই প্রশ্ন উঠছে। বছরে দু কোটি বেকারের চাকরি নতুন বিক্সিত ভারত, আচ্ছে দিনের স্বপ্ন এগুলো সবই কি তাহলে অন্তসারশূন্য জুমলা? নতুন প্রজন্মের আন্দোলন, নতুন প্রজন্মের নতুন করে ভাবনা স্কুল ঠিক করার দাবীতে রাস্তায় নামা এই সমস্ত বিষয়গুলোকে সরকার দমন করতেই পারে। তার শক্তি দিয়ে তার সমস্ত ক্ষমতা দিয়ে এই নতুন প্রজন্মকে গারদে পুরতেই পারে। কিন্তু তাহলেও তো কিছু কিছু মানুষ এই প্রশ্নগুলো করবেই সরকারকে। তখন তাদেরকে আরবান নকশাল দিমাগী নকশাল এইসব বলে চাপিয়ে দিলে কি সমস্যার সমাধান হবে? যত দিন যাচ্ছে সরকারের বয়স যত বাড়ছে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর দেওয়া প্রতিশ্রুতি গুলো তত বেআব্রু হচ্ছে। রাত্তির বারোটার সময় ইনস্টাগ্রামে ফ্রেন্ডস বলে সম্বোধন করেও কিংবা মন কি বাত বলেও কিন্তু ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে আর ভুল বুঝানো যাচ্ছে না। কথাটা যেমন দেশের ক্ষেত্রেও সত্যি রাজ্যের ক্ষেত্রেও সত্যি। অনেকে বলতে পারেন রাজ্যে তো মাত্র তিন মাস হলো নতুন সরকার এসেছে। হ্যাঁ, অবশ্যই সেটা সত্যি কথা কিন্তু এই তিন মাসকে ধরতে হবে গত ১২ বছরের কেন্দ্রীয় সরকারের কন্টিনিউটি হিসেবে। এখন কিন্তু আর বলা যাবে না আমাদের সরকার তো কেন্দ্রের বিরুদ্ধে কথা বলার সরকার। কেন্দ্রের বঞ্চনার নিয়ে কথা বলার সরকার। এখন কিন্তু ডবল ইঞ্জিন সরকারের সুবিধা ও যেমন পাওয়া যাবে বলে বলা হচ্ছে তেমনি ডবল ইঞ্জিন সরকারের অন্যান্য খামতি গুলোকেও লোকে চোখে আঙুল দিয়ে দেখাবে। বাংলার সরকারকে কিন্তু ওই কেন্দ্রের বিজেপি সরকারের অংশ হিসেবেই মানুষ দেখবে। সুতরাং চাকরির সমস্যা যদি ওখানে থাকে এখানে চাকরি না হলেও কিন্তু মানুষ প্রশ্নটা কেন্দ্রীয় সরকার এবং রাজ্য সরকার দুটোকেই করবে। সেই প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার জন্য সরকারগুলো তৈরি আছে তো?

0 Comments

Post Comment