পড়শি যদি আমায় ছুঁতো যম যাতনা সকল যেত দূরে: লালন সাঁই

পড়শি যদি আমায় ছুঁতো যম যাতনা সকল যেত দূরে: লালন সাঁই

hhhhhhhhhhhhhh

বাংলার ফুটবল ক্রমেই কর্পোরেট গ্রাসে?

  • 13 July, 2020
  • 0 Comment(s)
  • 874 view(s)
  • লিখেছেন : ডঃ দেবাশিস মজুমদার
পুরো ফুটবল পরিচালনার কাঠামোতেই এখন কর্পোরেটাইজেশনের একটা প্রচেষ্টা হচ্ছে। আর্থিক বিষয়টি এখন এমন জায়গায় পৌছচ্ছে যে বড় বড় ক্লাবগুলিকেও আত্মসমর্পন করতে হচ্ছে ব্যক্তিগত মালিকানার কাছে। এর সবচেয়ে বড় উদাহরণ এটিকে-মোহনবাগানের সংযুক্তকরণ।
 

 

১০ই জুলাই ২০২০ বাংলার ফুটবলের ইতিহাসে এক নতুন দিকচিহ্ন সূচীত করল। শতাব্দী প্রাচীন ঐতিহ্যশালী মোহনবাগান ক্লাব চলে এল কর্পোরেট ফ্রাঞ্চাইজির ছত্রছায়ায় আনুষ্ঠানিকভাবে। যদিও এবিষয়ে ঘোষণা হয়েছিল ২০২০-র জানুয়ারিতেই। এটলেটিকো দি কলকাতার সঙ্গে মোহনবাগানের আনুষ্ঠানিক সংযুক্তির প্রথমে ঘোষিত দিন ছিল ১লা জুন। কিন্তু করোনা পরিস্থিতির জন্য তা বদল করে হয় ১০ই জুলাই। এর সাথেই ইন্ডিয়ান সুপার লীগে খেলা নিশ্চিত হয়ে গেল মোহনবাগানের যা এখন থেকে হল এটিকে-মোহনাবাগান ফুটবল ক্লাব। ক্লাব পরিচালনের কনসর্টিয়ামের নাম দেওয়া হয়েছে এটিকে-মোহনবাগান প্রাইভেট লিমিটেড। চারদিকে একটা ধন্য ধন্য ভাব। আরপিএসজি গ্রুপের কর্ণধার সঞ্জীব গোয়েঙ্কা যার নিয়ন্ত্রণে থাকতে চলেছে এই সংযুক্ত নতুন ক্লাবের ৮০% (সঙ্গে আছেন সৌরভ গাঙ্গুলি, উৎসব পারেখ এবং হর্ষ নেওটিয়া) শেয়ার তিনি দাবি করেছেন এর ফলে বাংলার ফুটবলের ব্যাপক মঙ্গল হবে। তার সঙ্গে গলা মিলিয়েছেন মিডিয়ার একাংশ থেকে মোহনাবাগানের প্রাক্তন ফুটবলার তথা সবুজ-মেরুন সমর্থকদের হৃদয়ের সবুজ তোতা ও এটিকে প্রাক্তন সহকারী কোচ ব্রাজিলিয়ান হোসে রামিরেজ ব্যারেটোও। মোহনবাগান ক্লাব কর্তৃপক্ষের তরফ থেকে সৃঞ্জয় বসু এবং দেবাশিস দত্ত (এনারা দুজনেই পদাধিকার বলে এই সংযুক্ত ক্লাবের ডাইরেক্টর) এই সংযুক্তিকরণকে মোহনবাগানেরই নতুন অবতার বলে দাবি করেছেন (মোহনবাগান ক্লাব কর্তৃপক্ষের কাছে থাকছে সংযুক্ত ক্লাবের ২০% শেয়ার)। ক্লাবের লোগোতে শুধু এটিকে শব্দটি যোগ করা হয়েছে এবং প্রধান জার্সির রঙ-ও সবুজ মেরুন থাকছে (যাতে মোহনবাগানের বিশাল সংখ্যক সমর্থকদের ধরে রাখা যায়)। কিন্তু এর পরেও কিছু প্রশ্ন থেকেই যায়।

ভারতীয় ফুটবলের ইতিহাসে এর আগেও বহু ক্লাব ব্যক্তিগত মালিকানাধীন হবার মূল্য দিয়েছে। লালা দ্বারকাদাস সেহগল যখন ফুটবলের ওপর থেকে আগ্রহ হারিয়ে ফেলেন তখন উঠে যায় জলন্ধরের লিডার্স ক্লাব। মফতলালের ক্ষেত্রেও একই ঘটনা ঘটে। ফাগোয়ারা জেসিটি মিলস বা মহীন্দ্রা ইউনাইটেডের ক্ষেত্রেও এর ব্যতিক্রম ঘটেনি। ফ্র্যাঞ্চাইজি মালিকদের ক্ষেত্রে বাণিজ্য যতটা গুরুত্ব পায় খেলার প্রতি দায়বদ্ধতা ততটা নয়। আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে এর সবথেকে উজ্জ্বলতম দৃষ্টান্ত ১৯৭০-৮০-র দশকে চ্যানেল নাইনের অধিকর্তা কেরি প্যাকারের প্যাকার সার্কাস। হ্যাঁ ক্রিকেটের গ্ল্যামারের হয়ত অনেক পরিবর্তন এসেছিল কিন্তু নতুন প্রতিভা বিকাশে কতটা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে পেরেছিল তা সন্দেহের উর্দ্ধে নয়। ২০১৪ সালে ভারতে যখন ঘটা করে আইএসএল (ইন্ডিয়ান সুপার লীগ) শুরু হয় তখন বলা হয়েছিল ভারতীয় ফুটবলের অনেক কিছু পরিবর্তন হবে এবং সর্বোপরি ফুটবলের মানে পরিবর্তন আসবে। বিগত কয়েক বছর ধরে আমরা প্রত্যক্ষ করেছি ভারতীয় ফুটবলের আন্তর্জাতিক মঞ্চে কতটা পরিবর্তন হয়েছে। আহামরি কিছুই নয়। উপরন্তু রিলায়েন্স গ্রুপের আর্থিক স্বার্থকে চরিতার্থ করতে এর জনপ্রিয়তা বাড়ানো ছাড়া আর কোনও গঠনমূলক প্রচেষ্টা দেখা যায়নি। বয়স্ক বিদেশি ফুটবলারদের অধিকমাত্রায় খেলানো হয়েছে। ক’জন দেশীয় উদীয়মান প্রতিভাকে উঠে আসতে দেখা গেছে এই আইএসএল থেকে সেটাও বিচার্য বিষয়। কিন্তু এমন একটা হাওয়া তৈরী করা হয়েছে যেন আইএসএল-ই ভারতের প্রধান প্রথম শ্রেণীর ফুটবল প্রতিযোগিতা। খেলার থেকে বেশি গুরুত্ব পেয়েছে গ্ল্যামার। অপরদিকে আই-লীগ যা ভারতের প্রথম পেশাদার ঘরোয়া ফুটবল প্রতিযোগিতা ছিল তা ক্রমশ ম্রিয়মাণ হয়ে পড়েছে। অন্যান্য ঘরোয়া ফুটবল প্রতিযোগিতাগুলি (যেমন ফেডারেশন কাপ) একে একে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছে।

এখানেই থেমে না থেকে পুরো ফুটবল পরিচালনার কাঠামোতেই এখন কর্পোরেটাইজেশনের একটা প্রচেষ্টা হচ্ছে। আর্থিক বিষয়টি এখন এমন জায়গায় পৌছচ্ছে যে বড় বড় ক্লাবগুলিকেও আত্মসমর্পন করতে হচ্ছে ব্যক্তিগত মালিকানার কাছে। এর সবচেয়ে বড় উদাহরণ এটিকে-মোহনবাগানের সংযুক্তিকরণ। কিন্তু কী অবস্থায় যাচ্ছে বাংলার ফুটবলের ভবিষ্যৎ? একসময় বাংলার ফুটবলের আঁতুড়ঘর বলা হত যে ক্লাবগুলিকে তারা বিস্মৃতির অন্ধকারে তলিয়ে গেছে। বাংলার ফুটবলে প্রতিভা তুলে আনার সাপ্লাই লাইনের অবস্থা খুব খারাপ। উয়াড়ি, খিদিরপুর প্রভৃতির মত ক্লাবগুলি কোনওরকমে টিকে রয়েছে কিছু মহানুভব সদস্য-কর্তাদের আগ্রহে। কিন্তু বাংলার ফুটবল মঞ্চে তারা তাদের আগেকার গুরুত্ব হারিয়েছে। বাংলা তথা ভারতীয় ফুটবলের প্রকৃত উন্নয়নের পটভূমি নতুন নতুন প্রতিভাকে তুলে আনার মধ্যে। সেই জায়গা  আরও বেশি করে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। প্রদীপের তলার অন্ধকারের মত ফ্র্যাঞ্চাইজি মালিকানার জাঁকজমকের ভারে সেই প্রেক্ষাপট আজ অবহেলিত। শুধুমাত্র কর্পোরেট বাণিজ্যিক লাভের লীলাক্ষেত্র হয়ে দাঁড়াচ্ছে বাংলা তথা ভারতীয় ফুটবল।

মোহনবাগানের পাশাপাশি বাংলার ফুটবলের আরেক প্রধান ইস্টবেঙ্গলও নিজেদের আভ্যন্তরীণ সমস্যা মিটিয়ে সেই একই পথে এগোচ্ছে। আইএসএল-এর আরেক দল বেঙ্গালুরু এফ সি-র মালিক পার্থ জিন্দাল ইস্টবেঙ্গল ক্লাব কেনার ব্যাপারে আগ্রহী। এবিষয়ে আগ্রহ প্রকাশ করেছেন মিনার্ভা পাঞ্জাব ক্লাবের বর্তমান মালিক রঞ্জিত বাজাজও। আসলে একথা তো অনস্বীকার্য বাংলা তো বটেই ভারতীয় ক্লাব ফুটবলের সবচেয়ে বড় ইউএসপি নিঃসন্দেহে মোহনবাগান-ইস্টবেঙ্গল প্রতিদ্বন্দ্বিতা। এবার আইএসএলের মঞ্চে সেই প্রতিদ্বন্দ্বিতাকে তুলে এনে বাণিজ্যিক স্বার্থে ব্যবহার করছে চাইছে আইএসএল নিয়ন্ত্রক কর্পোরেট সংস্থা। কারণ বিশালরকম গ্ল্যামারের আয়োজন সত্ত্বেও আইএসএল সেভাবে হালে পানি পাচ্ছিল না বিগত কয়েক মরশুম। এখন মোহন-ইস্টের আবির্ভাব ষোলোকলাকে পূর্ণ করবে। কিন্তু বাংলা তথা ভারতীয় ফুটবলের পরিকাঠামো ভিত্তিক উন্নয়ন যে তিমিরে ছিল থেকে যাবে সেই তিমিরেই।

 

ক্রীড়াক্ষেত্রে বাণিজ্যায়ন তখনই শুভ ফল দিতে পারে যখন সেটা ভবিষ্যৎমুখী হিসাবে আবির্ভূত হয়। শুধুমাত্র আর্থিক লাভভিত্তিক হলে তা কিছু সাময়িক চমক সৃষ্টি করে বিলীন হয়ে যায়। দীর্ঘমেয়াদি বৃহত্তর স্বার্থে তার কোনও ভূমিকা থাকে না। এখন দেখার বাংলার তথা ভারতীয় ফুটবলের ক্ষেত্রে এটিকে-মোহনবাগান সংযুক্তিকরণ বা ইস্টবেঙ্গলের মত পাবলিক ক্লাবের ফ্র্যাঞ্চাইজি মালিকানাধীন  হওয়ার চেষ্টা এবং আইএসএল-এ এদের অন্তর্ভূক্তিকরণ কি ধরণের পরিবর্তনকে সুচীত করার ঈঙ্গিত দেয়।     

 
 
 
 
 
 
0 Comments

Post Comment