পড়শি যদি আমায় ছুঁতো যম যাতনা সকল যেত দূরে: লালন সাঁই

পড়শি যদি আমায় ছুঁতো যম যাতনা সকল যেত দূরে: লালন সাঁই

hhhhhhhhhhhhhh

কাতার কি হয়ে উঠছে প্রতিবাদের মঞ্চ?

  • 24 November, 2022
  • 0 Comment(s)
  • 455 view(s)
  • লিখেছেন : সৌভিক ঘোষাল
কাতার বিশ্বকাপের মঞ্চ প্রতিবাদের আরো কিছু নজির দেখছে। ইরানের মতো কাতারও একটি মৌলবাদী কট্টর ইসলামিক দেশ। সেইখানকার নানা প্রতিক্রিয়াশীল নিয়মকে বিভিন্ন দেশ থেকে আসা দর্শকদের ওপর শেষ মুহূর্তে চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেছে কাতার সরকার। তারা বলেছে মেয়েদের কাঁধ খোলা বা হাঁটু দেখানো পোশাক না পরতে। স্টেডিয়ামে মদ্যপান করা যাবে না বলেও ঘোষণা করা হয়েছে। এর প্রতিবাদে অনেকেই কাতার বিশ্বকাপের উদ্বোধনী অনুষ্ঠান বয়কট করেছেন। কাতার কি হয়ে উঠছে প্রতিবাদের মঞ্চ?

 

১৬ সেপ্টেম্বর ২০২২। পুলিশি হেফাজতে কুর্দিশ তরুণী মাহশা আমিনির মৃত্যুর পর থেকেই বিদ্রোহের আগুন জ্বলছে ইরানে। দেশের মহিলারা রাস্তায় নেমেছেন, লাগাতার বিক্ষোভ চালিয়ে যাচ্ছেন। স্বাধীন ভাবে বাঁচার এবং নিজের ইচ্ছামতো পোশাক পরার অধিকার আদায় করে নেবার জন্য তাঁরা দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। এ নিয়ে কোনও সরকারি হস্তক্ষেপ তারা মানতে রাজি না।

কিন্তু ইরানের সরকার ও প্রশাসন ইসলামের অনুশাসনের নামে এই সব অধিকার নারীদের দিতে কিছুতেই প্রস্তুত নন। তারা বুঝিয়ে দিচ্ছেন যতই দেশের ভেতরে প্রতিবাদ হোক, যতই আন্তর্জাতিক মঞ্চে আলোড়ন উঠুক, তারা কট্টর মৌলবাদী নীতি থেকে সরবেন না। তারা বিক্ষভকারীদের ওপর আক্রমণ নামিয়ে আনছেন। নিরাপত্তা বাহিনীর গুলিতে এখনও পর্যন্ত শতাধিক বিক্ষোভকারী প্রাণ হারালেও প্রতিবাদের আগুন নিভছে না।

ইরানের খ্যাতনামী শেফ মেহরশাদ শাহিদি সরকার বিরোধী প্রতিবাদে সামিল হয়েছিলেন। নারী আন্দোলনের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন। এজন্য শাহিদিকে পিটিয়ে খুন করে ইরানের রেভলিউশনারি গার্ড ফোর্স। হিজাব-বিরোধী আন্দোলনে পথে নেমেছিলেন শাহিদি। তখনই তাঁকে তুলে নিয়ে গিয়ে হেফাজতে খুন করা হয় বলে অভিযোগ। শাহিদির শেষকৃত্যের সময় প্রতিবাদে পথে নামেন হাজার হাজার মানুষ। ১৯ বছর বয়সেই দারুণ জনপ্রিয় হয়েছিলেন শাহিদি। তাঁকে ইরানের ‘জেমি অলিভার’ বলা হত। আরক শহরে পথে নেমে প্রতিবাদের সময় তাঁকে তুলে নিয়ে যায় ইরানের নিরাপত্তারক্ষীরা। হেফাজতে নিয়ে গিয়ে বেধড়ক মারে বলে অভিযোগ। জানা গিয়েছে, খুলিতে আঘাতের কারণে মৃত্যু হয়েছে তাঁর। শাহিদির পরিবার অভিযোগ করে, তাদের ছেলের হৃদ্‌রোগে মৃত্যু হয়েছে বলার জন্য চাপ দিচ্ছে পুলিশ ও প্রশাসন।

ইরানের প্রথম সারির অভিনেত্রী তারানেহ আলিদুস্তি হিজাব ছাড়া ছবি দিয়ে শোরগোল ফেলেন। দেশব্যাপী সরকার বিরোধী বিক্ষোভের প্রতি সমর্থন জানাতেই এই পদক্ষেপ নেন। ইনস্টাগ্রামে একটি ছবি পোস্ট করেন তিনি। দেখা যাচ্ছে সেখানে কালো পোশাকে এলোচুলে দাঁড়িয়ে তারানেহ। হাতে সাদা পোস্টার, যাতে নীল কালি দিয়ে কুর্দি ভাষায় লেখা বিক্ষোভের স্লোগান, “নারী, জীবন, স্বাধীনতা”। ছবির ক্যাপশনে কবিতার আকারে অভিনেত্রী লেখেন, “তোমাদের চলে যাওয়া, গান গাওয়া পরিযায়ী পাখির ঢল— এ সবে শেষ হয়ে যাবে না বিপ্লব।”

এইবার কাতার বিশ্বকাপের মঞ্চে ইরানের সরকার ও প্রশাসনের বিরুদ্ধে জোরদার প্রতিবাদে সামিল হলেন ইরানের ফুটবলাররা। ২১ নভেম্বর ইরানের প্রথম খেলা ছিল ইংলণ্ডের বিরুদ্ধে। সেই খেলায় তাঁরা জাতীয় সঙ্গীত না গেয়ে, জাতীয় সঙ্গীতের সময় চুপ করে দাঁড়িয়ে থেকে নীরবে সরব প্রতিবাদ জানালেন। খেলা শুরুর আগেই ইরানের অধিনায়ক আলিরেজা জাহানবকশ জানিয়েছিলেন, জাতীয় সঙ্গীত গাওয়া হবে কিনা সেটা দলের সঙ্গে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নেবেন তাঁরা। পরে জানা যায় ইরানের বেশির ভাগ ফুটবলারই জাতীয় সঙ্গীত না গাওয়ার পক্ষে মত দেন। এই প্রতিবাদ গোটা বিশ্বেই আলোড়ন ফেলেছে। সমস্ত সংবাদমাধ্যমের খবরের শিরোনামে উঠে এসেছে। ক্যামেরায় দেখা গিয়েছে, স্টেডিয়ামে হাজির অনেক ইরানীয় সমর্থকও জাতীয় সঙ্গীতের সময় চুপ ছিলেন। এই প্রতিবাদের মধ্যে দিয়ে যথেষ্ট ঝুঁকি নিলেন ইরানের ফুটবলাররা। দেশে ফেরার পর তাঁদের শাস্তির মুখে পড়তে হবে বলে অনেকেই আশঙ্কা করছেন। ইরানের ফুটবলাররাও তা জানেন। তবু যে তাঁরা এই সাহসী সিদ্ধান্ত নিলেন এজন্য তাঁদের কুর্ণিশ।

কাতার বিশ্বকাপের মঞ্চ প্রতিবাদের আরো কিছু নজির দেখছে। ইরানের মতো কাতারও একটি মৌলবাদী কট্টর ইসলামিক দেশ। সেইখানকার নানা প্রতিক্রিয়াশীল নিয়মকে বিভিন্ন দেশ থেকে আসা দর্শকদের ওপর শেষ মুহূর্তে চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেছে কাতার সরকার। তারা বলেছে মেয়েদের কাঁধ খোলা বা হাঁটু দেখানো পোশাক না পরতে। স্টেডিয়ামে মদ্যপান করা যাবে না বলেও ঘোষণা করা হয়েছে। এর প্রতিবাদে অনেকেই কাতার বিশ্বকাপের উদ্বোধনী অনুষ্ঠান বয়কট করেছেন। পশ্চিমা বিশ্বের রাষ্ট্রনায়কদের কাউকে এই উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে দেখা যায় নি। তারা ছাড়াও অনেক শিল্পী ও বিশিষ্ট মানুষ বিশ্বকাপের উদ্বোধনী অনুষ্ঠান বয়কট করেছেন। তবে ইসলামিক দেশগুলোর অনেকেই কাতারের সঙ্গে তাদের পুরনো বিবাদ ভুলে বিশ্বকাপের উদ্বোধনী মঞ্চে হাজির হয়েছে। সৌদির যুবরাজ ও বর্তমান প্রধানমন্ত্রী মহম্মদ বিন সলমন, মিশরের রাষ্ট্রপ্রধান আব্দেল ফতাহ আল সিসি কাতারের রাষ্ট্রপ্রধান শেখ তামিমের পাশেই ছিলেন উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে।

এর আগে বিশ্বকাপের মতো এত বড় কোনও প্রতিযোগিতা এই দেশে আয়োজিত হয়নি। মানবাধিকার রক্ষা, তৃতীয় লিঙ্গের মানুষের অধিকার সুনিশ্চিতকরণের দিক থেকে এই দেশটির রেকর্ড খুব একটা ভাল নয়। কাতারে সমকামী সম্পর্ক নিষিদ্ধ। কাতারে বিশ্বকাপের আয়োজনের খবর প্রকাশ্যে আসতেই তাই আয়োজকদের সিদ্ধান্ত নিয়ে চর্চা শুরু হয়েছিল। তবে আলোচনা-সমালোচনার মুখে বিশ্বকাপ কর্তৃপক্ষ জানিয়েছিলেন, যে কোনও ধর্ম, যে কোনও যৌন চাহিদা কিংবা যে কোনও লিঙ্গের মানুষ বিশ্বকাপ দেখতে কাতারে আসতে পারবেন। বিশ্বকাপে সকলেই স্বাগত।

সেটা আবার একেবারেই পছন্দ হয়নি আল কায়দার মতো দুনিয়ার এক নম্বর জঙ্গী সংগঠনের। জঙ্গি সংগঠনটি বিশ্বের সমস্ত ইসলাম ধর্মাবলম্বী মানুষকে এই বিশ্বকাপ থেকে দূরে থাকার পরামর্শ দিয়েছে। কাতার বিশ্বকাপের বিরুদ্ধে কট্টর ইসলামপন্থী এই জঙ্গি সংগঠনটির মূল অভিযোগ, ইসলামের নৈতিক বিধি লঙ্ঘন করছেন কর্তৃপক্ষ। মুসলিম দেশটিতে বিশ্বকাপের সুবাদে অনেক ‘অনৈতিক, সমকামী এবং দুর্নীতিবাজ মানুষ’ অবাধে প্রবেশ করছেন বলে দাবি তাদের। আল কায়দার অভিযোগ, বিশ্বকাপের মাধ্যমে কাতারের সংস্কৃতি, যাবতীয় ইসলামপন্থী রীতিনীতি ধ্বংস করে দিতে উদ্যত হয়েছেন এক দল মানুষ। তাঁদের বিরুদ্ধে জেহাদ ঘোষণা করেছে এই জঙ্গি সংগঠন। কাতার বিশ্বকাপের মাধ্যমে আরবীয় মালভূমিতে নাস্তিকতার অনুপ্রবেশ ঘটছে বলেও দাবি আল কায়দার।

কাতারের সমকামিতা বিরোধী অবস্থানের জন্য “ওয়ান লাভ ব্যান্ড”, যা কীনা সমপ্রেমের প্রতীক – তা পরার কথা ছিল অনেক ফুটবলারের। কিন্তু শেষ মুহূর্তে কাতারের তরফে জারি হওয়া নানা অন্যায় ফতোয়া যেমন ফিফা মুখ বুজে মেনে নিয়েছে, তেমনি ফুটবলারদের এই ব্যান্ড পরার অনুমতিও দেয় নি। বলেছে এই ব্যান্ড পরে মাঠে নামলেই হলুদ কার্ড দেখানো হবে। কাতারের মতো একটি দেশকে ফিফা কেন বিশ্বকাপ ফুটবলের মতো টুর্নামেন্ট আয়োজনের দায়িত্ব দিল, সেই প্রশ্ন ও নানা সন্দেহ আগেও উঠেছিল। সমালোচকেরা অনেকেই বলছেন যে বিপুল পরিমাণ কাতার ডলারের প্রলোভনে ফিফা কর্মকর্তারা এই কাণ্ড ঘটিয়েছেন।

সব মিলিয়ে কাতার বিশ্বকাপ শুরু থেকেই নানা বিতর্কে জর্জরিত। চারিদিকে মৌলবাদের আস্ফালনের মধ্যে উজ্জ্বল হয়ে থাকবে ইরানের ফুটবলারদের নজিরবিহীন প্রতিবাদ।

 

0 Comments

Post Comment