পড়শি যদি আমায় ছুঁতো যম যাতনা সকল যেত দূরে: লালন সাঁই

পড়শি যদি আমায় ছুঁতো যম যাতনা সকল যেত দূরে: লালন সাঁই

hhhhhhhhhhhhhh

ভাষ্যে পিছিয়ে পড়ছে বিজেপি?

  • 01 January, 1970
  • 0 Comment(s)
  • 201 view(s)
  • লিখেছেন : প্রশান্ত ভট্টাচার্য
আমাদের মাথায় একটা দুরুহ দার্শনিক প্রশ্ন আসছে, ভারতে যদি বিজেপিরই সরকার থাকে, তাহলে ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী গণতন্ত্র বাঁচানোর কথা কাকে বলছেন? কার বিরুদ্ধে রাস্তায় নেমেছেন কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী? তিনি কি প্রধানমন্ত্রীর বিরুদ্ধে রাস্তায় নেমে 'গণতন্ত্র বাঁচাও' আন্দোলন করছেন? নাকি ইচ্ছাকৃতভাবেই অমিত শাহ বিষয়টা গুলিয়ে দিতে চাইছেন? তবে কি ১২ বছরে প্রথমবার ভাষ্যে পিছিয়ে পড়ছে বিজেপি?

মোদী জমানায় এই প্রথম বিরোধীদের বলে বিজেপিকে ব্যাট করতে হচ্ছে। পাটা পিচ না ভাঙা পিচ, তা বোঝা যাবে আরও পরে। দুটি স্লোগান এখন ভারতীয় রাজনীতির স্ট্রিং। বিরোধীদের 'ভোট বাঁচাও, দেশ বাঁচাও' আর তার পালটা বিজেপি 'গণতন্ত্র বাঁচাও, অরাজকতা হঠাও' --- এই দুটি স্লোগানই এখন রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতাকে সংজ্ঞায়িত করে। আর তাড়িয়ে নিয়ে বেড়াচ্ছে শাসকদল ও বিরোধীদের। তবে এই ডুয়েটে এখনও অ্যাডভান্টেজ কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন ‘ইন্ডিয়া’ জোট। সেটাই হায়দরাবাদ থেকে হরিয়ানা, কলকাতা থেকে কালিক়ট ছোটাচ্ছে অমিত শাহ, নীতিন নবীনদের। নির্বাচন কমিশনের বিশেষ আদেশে ভোটার তালিকা থেকে প্রায় ১৩ কোটি নাম বাদ দেওয়া হয়েছে, যা মোট ভোটারের প্রায় ১৫ শতাংশ। বিরোধীদের অভিযোগ, অনুপ্রবেশকারী হিসেবে চিহ্নিত করে ভোটারদের নাম তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে এবং এতে সংখ্যালঘু ও নারীরা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন।

অক্টোবরের প্রথম সপ্তাহ থেকে বিরোধী দল ও ছাত্র সংগঠনগুলো প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগেরও দাবি জানিয়ে আসছে। এখানেই অস্বস্তিতে পড়েছেন মোদী-শাহরা। জ্ঞানেশ কুমার যে শাহর সরাসরি আজ্ঞাবাহী, তা আজ দেশের সব স্তরের মানুষের কাছে স্পষ্ট হয়ে গিয়েছে। রাহুল গান্ধীদের অভিযোগ আর কাগুজে নয়, পাথুরে প্রমাণসহ সামনে উঠে এসেছে। বিশেষ করে ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের প্রতিবেদন প্রকাশের পর, জ্ঞানেশ কুমার যে এই ভোটার কাটার মূল 'কসাই',  তা আর গোপন করতে পারছে না কমিশন। এমনকী, জ্ঞানেশের অন্যতম রক্ষক সুপ্রিম কোর্টও আর শুধু কমিশনের কথায় তুষ্ট নয়। এই পরিস্থিতিতে ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন (এসআইআর) নিয়ে নির্বাচন কমিশন  মোদী সরকারকে প্রশ্নবিদ্ধ করে ‘ইন্ডিয়া' জোট প্রথম পদক্ষেপ হিসেবে রাস্তায় নেমেছে। ছদ্ম সংসদে জ্ঞানেশ কুমারকে দোষী সাব্যস্ত করে 'পদচ্যুত' করা হয়েছে। পরিস্থিতির গ্রাভিটি বুঝতে পেরে রাহুলদের ১ নভেম্বর দিল্লির রামলীলা ময়দানে সমাবেশ ঠেকাতে আইনি ও প্রশাসনিক, সবরকম চেষ্টা চালায় মোদী সরকার। এমনকী, মোদী-শাহদের বশংবদ ব্যবসায়ী সংগঠনকেও মাঠে নামানো হয়। বিরোধীদের 'দিল্লি চলো' কর্মসূচিতে উৎসবের মরশুমে ১০,০০০ থেকে ১৫ হাজার কোটি টাকা ক্ষতি হবে বলে, ব্যবসায়ী সংগঠন কংগ্রেসের ওপর চাপ তৈরি করে। কিন্তু কোনোভাবেই যখন 'ভোট চুরি'র অভিযোগে বিরোধীদের সমাবেশ ঠেকানো গেল না, তখন, ইডি-সিবিআই-এনআইএ লেলিয়ে দেওয়ার পাশাপাশি বিজেপির সামনে রাস্তায় নামা ছাড়া কোনও পথ রইল না। মনে রাখতে হবে, বিজেপি কেন্দ্রে ১২ বছর ধরে ক্ষমতায় রয়েছে এবং দলটি বা তার মিত্ররা দেশের প্রায় ৭২ শতাংশ এলাকা অর্থাৎ ২১টি রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল শাসন করে। নীতিগতভাবে গণতন্ত্র রক্ষা করা সরকারেরই কাজ: প্রতিষ্ঠানগুলোকে বিশ্বাসযোগ্য রাখা, সুষ্ঠু নির্বাচন নিশ্চিত করা এবং ভিন্নমত প্রকাশের সুযোগ দেওয়া। এই গণতান্ত্রিক চিহ্নগুলো যে ভীষণভাবে মুছে দেওয়া হচ্ছে, তা আর কোন ধামায় চাপা দিতে পারছে না গেরুয়া শিবির। তাই জাতীয় পতাকা কাঁধে নিয়ে শাহ, নবীন, নাড্ডা, শিবরাজ সিং চৌহান, শুভেন্দু, যোগী আদিত্যনাথরা রোড শো করতে বাধ্য হচ্ছেন। 

 
আমাদের মাথায় একটা দুরুহ দার্শনিক প্রশ্ন আসছে, ভারতে যদি বিজেপিরই সরকার থাকে, তাহলে ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী গণতন্ত্র বাঁচানোর কথা কাকে বলছেন? কার বিরুদ্ধে রাস্তায় নেমেছেন কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী? তিনি কি প্রধানমন্ত্রীর বিরুদ্ধে রাস্তায় নেমে 'গণতন্ত্র বাঁচাও' আন্দোলন করছেন? প্রধানমন্ত্রীর তৈরি 'অরাজকতা' হটাতে দেশের বিভিন্ন শহরে পদযাত্রা করছেন? মাননীয় শাহ, জাতি জানতে চায়, এই রাস্তায় নামা কার বিরুদ্ধে?  কান পাতুন, শাহ-নাড্ডারা, লোকে হাসাহাসি করছে আপনাদের 'দক্ষণপন্থী বৃদ্ধসুলভ বিশৃঙ্খলা' দেখে। 

 

কে বাঁচাবে গণতন্ত্র? গণতন্ত্র রক্ষার দায়িত্ব কার?


ডবল ইঞ্জিন সরকারের এইটুকু তাগত নেই, সাংবিধানিক চৌহদ্দির মধ্যে গণতন্ত্রকে রক্ষা করার! কারণ, গণতন্ত্রর প্রাণভোমরা পরমতসহিষ্ণুতা। সেটাই মোদী-শাহদের নেই। আমরাই কথা বলব, বাকি কেউ বলবে না, ওটাই গণতন্ত্র। আমরাই কথা বলব, যারা ভিন্নমত পোষণ করে, তাদের জেলে পোরা হবে। তারা 'দিমাগি নকশাল', আর মুসলিম হলে 'জিহাদি'। মোদী জমানার ডবল ইঞ্জিনের একটাই কথা, আমরাই মিছিল করব, আর কাউকে মিটিং মিছিলের অনুমতি দেওয়া হবে না। আমরাই জিতব, কারো উল্টোদিকে ভোট দেওয়ার অনুমতি নাই। তারপরও কেউ কেউ বা কোনো দল যদি জিতে যায়, তবে সেই দলকে লোভ আর ভয় দেখিয়ে কিনে নেব ( যেমন পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভায় ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায় ঝুলনে সাজানো বিরোধী দলনেতা)। এটাই মোদী জমানার গণতন্ত্র। এমন গণতন্ত্র যে ফ্যাসিবাদ সেটা সবচেয়ে ভাল জানেন মোদী-শাহরা, তাই এবার সত্যি সত্যি ভয় পেয়েছেন রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘর দুই বিশ্বস্ত 'চৌকিদার'। তাই কৌশল বদলাচ্ছেন মোদী-শাহরা। খুঁজছেন নতুন রাজনৈতিক ভাষ্য। নিট-প্রশ্নপত্র ফাঁস কেলেঙ্কারিতে বিজেপির লেজে একটু একটু করে গোবর লাগতে শুরু করে। তারপর ককরোচ ও জেন জি-র যন্তর মন্তরের আন্দোলনে ওঁদের টেলে কাউডাং পর্ব সারা। তার পর 'ভোট চুরি' নিয়ে দেশজুড়ে বিরোধীদের আন্দোলন। দেশ দেখছে আর বিজেপি শীর্ষ নেতৃত্ব মনে করছেন, গত ১২ বছরে এই প্রথম তাঁরা রাজনৈতিক ভাষ্যে পিছিয়ে পড়ছেন। যন্তরমন্তরের আন্দোলনের চাপে ধর্মেন্দ্র প্রধানকে ইস্তফা দিতে হয়েছিল। এখন জ্ঞানেশ কুমারের ইস্তফার দাবিতে বিরোধীদের আন্দোলনের ঠেলায় বিজেপি পদ্মফুলের জায়গায় সরষে ফুল দেখছে। অমিত শাহ আর রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীদের জাতীয় পতাকা হাতে রাস্তায় নামতে হয়েছে। তার পরও বিরোধীরা আক্রমণাত্মক। রাজনৈতিক ভাষ্য তৈরিতে  এগিয়ে। অথচ ইট ইজ আনলাইক মোদী রিজিম! এতদিন মোদীরাই একচেটিয়া ভাষ্য তৈরি করছিলেন, আর 'রাহুলবাবাদের' কাউন্টার ন্যারেটিভ তৈরি করতে হচ্ছিল। এবারই তার অন্যথা দেখা যাচ্ছে। 
বিজেপির শীর্ষ নেতাদের দাবি, রাহুল গান্ধী সহ বিরোধী দলগুলো কোনো প্রমাণ ছাড়া দেশের নির্বাচন ব্যবস্থা আর সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর ভিত্তিহীন অভিযোগ তুলে দেশে অরাজকতা ও বিশৃঙ্খলা তৈরির চেষ্টা করছে। বিজেপির যুক্তি হল, তারা সাংবিধানিক সংস্থা ও নির্বাচন কমিশনের পবিত্রতা আর স্বচ্ছতা রক্ষা করতে মাঠে নেমেছে, যাতে বিরোধীদের রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত প্রচার সাধারণ মানুষকে বিভ্রান্ত করতে না পারে। এসআইআর একটি সাধারণ সাংবিধানিক প্রক্রিয়া হিসেবে তুলে ধরে বিজেপি বোঝাতে চাইছে যে এর মাধ্যমে অনুপ্রবেশকারীদের ডিপোর্ট করে নির্ভুল ভোটার তালিকা তৈরি করা হচ্ছে, যা শক্তিশালী  গণতন্ত্রর নেসেসারি অ্যান্ড সাফিসিয়েন্ট কন্ডিশন। বলছেন, কিন্তু শোনে কে! উল্টে বিরোধীরা বলছেন, 'গণতান্ত্রিকভাবে' জিতে আসা ক্ষমতাসীনরা রাস্তায় কেন? গণতন্ত্র রক্ষা করতে হলে ভিন্নস্বরকে মর্যাদা দিতে হবে, তার জন্য তো লম্বা লস্বা ডান্ডায়, আরো বড় জাতীয় পতাকা লাগিয়ে  মিছিল করার দরকার নেই। সংসদ সব সদস্যদের পূর্ণমর্যাদা দিয়ে চালাক সরকার, সরকারের কাজটা যথাযথভাবে করুক। রাজধর্ম পালন করুক। তা'হলেই গণতন্ত্র তার নিজস্ব পোটেনশিয়ালিটিতে টিকে থাকবে। তা নয়, নিজের যেটা কাজ সেটা না-করে 'গণতন্ত্র বাঁচাও, অরাজকতা হটাও' বলে মিছিল করতে নেমেছে। এর পর তো দেখছি, 'আইনশৃঙ্খলা রক্ষা করো' স্লোগানে দিল্লিতে শাহর পুলিশ, কলকাতায় শুভেন্দুর পুলিশ মিছিল করতে শুরু করবে! বলা যায় না, 'সীমান্ত বাঁচাও' স্লোগানে অমিত শাহর বিএসএফ সীমান্ত লাগোয়া জনপদে মিছিল-আন্দোলনে নেমে পড়বে কি না! আসলে 'ভোট চুরির’ অভিযোগ সাধারণ ভোটারদের কাছে পৌঁছনোয় বিজেপি শীর্ষ নেতৃত্ব উদ্বেগে। ২০২৭ সালের বিধানসভা ও ২০২৯ সালের লোকসভা নির্বাচনে এর প্রভাব পড়ার আশঙ্কা তাঁরা করছেন।


রাহুল গান্ধী নরেন্দ্র মোদীকে চ্যালেঞ্জ করেছেন খোলাখুলি বিতর্ক করার জন্য। এতে আরো চটেছেন বিজেপি নেতারা। উপায় খুঁজতে রাহুলকে রাস্তা থেকে তুলে সংসদবন্দি করতে চান তাঁরা। তাই এসআইআর নিয়ে অমিত শাহ এখন রাহুল গান্ধীকে আহ্বান জানাচ্ছেন সংসদে বিতর্ক করার জন্য। অথচ, এই স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এর আগে বলেছিলেন, নির্বাচন কমিশন তো একটা স্বশাসিত সংস্থা তাহলে সংসদে বিতর্ক হলে কে এর উত্তর দেবে? নির্বাচন কমিশনার তো সংসদে উপস্থিত থাকতে পারেন না, তাহলে কে উত্তর দেবে? অতএব আলোচনা নয়। তা'হলে এখন কে উত্তর দেবেন 'কত্তা'? জ্ঞানেশ কুমারের মনিব? আসলে মোদী-শাহরা জানেন, বিজেপির পদযাত্রা ও সমাবেশগুলোর মাধ্যমে এসআইআর সংক্রান্ত প্রশ্নগুলো মুছে যাওয়ার সম্ভাবনা কম। তাই তারা বিষয়টাকে এবার সংসদে ফেলতে চায়। এটাও বিজেপি নেতারা জানেন, বিরোধীদের তোলা প্রশ্নের উত্তর রাস্তার ড্রামাবাজি ভাষণ ঝেড়ে হবে না সমাবেশের মাধ্যমেও নয়, বরং তথ্যর মাধ্যমেই জবাব দিতে হবে। মোদী-শাহ এখন তথ্য খুঁজতে লেগে পড়ুন, নইলে বাঁশি হারিয়ে আর কিসে ফুঁ দেবেন!

0 Comments

Post Comment