পড়শি যদি আমায় ছুঁতো যম যাতনা সকল যেত দূরে: লালন সাঁই

পড়শি যদি আমায় ছুঁতো যম যাতনা সকল যেত দূরে: লালন সাঁই

hhhhhhhhhhhhhh

ভারতের মাদকবিরোধী আইন: প্রয়োজন আমূল সংস্কার

  • 06 November, 2021
  • 0 Comment(s)
  • 592 view(s)
  • লিখেছেন : রনি সেন
খুব কম করে বললেও ভারতবর্ষে মাদকাসক্তির চিকিৎসা এখনও ভয়াবহ রকমের মধ্যযুগীয়। একজন “ সামাজিক মদ্যপায়ী” এবং মদ্যপের মধ্যে যে ফারাক আছে একজন বিনোদনমূলক ব্যবহারকারী ও একজন মাদকাসক্তের ফারাক তার চেয়েও কয়েকগুণ বেশি। নতুন আইনে মাদকাসক্ত রেহাই পাবেন কিন্তু বিনোদনের জন্য মাদক ব্যবহারকারী পাবেন না? তবে কি বিনোদনের জন্য মাদক ব্যবহারকারীর শাস্তির হাত থেকে বাঁচার একমাত্র রাস্তা নিজেকে আসক্ত বলে মেনে নেওয়া? সাম্প্রতিক শাহরুখ খানের ছেলেকে নিয়ে যা হল, তাকে কিভাবে দেখলেন রনি সেন

খবরে প্রকাশ যে পৃথিবীর অন্যতম কঠিন শাস্তিমূলক অথচ বিভ্রান্তিকর এবং অসার মাদক আইনটিতে কিছু পরিবর্তন আনা হচ্ছে। সম্প্রতি ভারত সরকারের সামাজিক ন্যায় এবং ক্ষমতায়ন দপ্তর রাজস্ব দপ্তরের কাছে একটি যুগান্তকারী প্রস্তাব পেশ করেছে। বর্তমান “ নারকোটিক ড্রাগস অ্যান্ড সাইকোট্রপিক সাবস্ট্যান্সেস অ্যাক্টে ( এন ডি পি এস ) ” কিছু ‘ অতি ক্ষতিকারক মাদক’ রাখা অপরধামূলক কাজ। নয়া প্রস্তাবে অল্প পরিমাণে এই মাদকগুলি রাখা অপরাধমূলক কাজের তালিকা থেকে বাদ পড়েছে। প্রস্তাবটি যুগান্তকারী কারণ একাধারে তা বিজ্ঞান এবং জনস্বাস্থ্যকে বিচার ও শাস্তির বিপরীতে অগ্রাধিকার দেবে এবং অন্যদিকে বিচার ব্যবস্থার অযৌক্তিক অংশের বিরুদ্ধে মাদক সেবনকারীদের রক্ষাকবচ হিসাবে কাজ করবে।

এন ডি পি এস আইনে মাদক রাখা এবং মাদকের উৎপাদন ও ক্রয়- বিক্রয় সমান অপরাধযোগ্য। অদ্ভুত ব্যাপার যে এই অপরাধের শাস্তির একমাত্র মাপকাঠি হল মাদকের পরিমাণ, মাদক রাখার গুণগত কারণ অর্থাৎ ব্যবসায়িক না ব্যক্তিগত ব্যবহারের জন্য তা এখানে বিচার্য নয়। যদিও ‘ বিঅপরাধীকরন’ অতি শ্রুতিমধুর শব্দবন্ধ, কিন্তু মাদকসেবীদের চিকিৎসার জন্য আদালতের নির্দেশনামা স্থিতাবস্থা বৈ কিছু নয়।

১৯৮৯ সালে এন ডি পি এস আইনে অন্তর্ভুক্ত ৬৪ ক ধারায় চিকিৎসায় ইচ্ছুক মাদকসেবীদের আইনি বিচারের থেকে রেহাই দেবার ব্যবস্থা আছে। মাদকাসক্ত ব্যক্তি এই ধারার বলে কেবলমাত্র সেবনই নয় ( ধারা ২৭), স্বল্প পরিমাণ সংক্রান্ত অন্যান্য অপরাধের জন্যও রেহাই পাওয়ার অধিকারী। ফলে এই নতুন প্রস্তাবে নতুন কী আছে তা স্পষ্ট নয়। এটুকু আশা করা যায় যে এই পরিবর্তন চুপিসাড়ে স্বল্প পরিমাণ সংক্রান্ত সব “অপরাধের” রেহাই পাওয়ার অধিকারকে প্রত্যাহার করার ছুতো নয়। সেক্ষেত্রে এ দেশের মাদক সংক্রান্ত আইন বর্তমানের চেয়েও পশ্চাদপদ বলে প্রতিপন্ন হবে।

২০১৭ সালে সিকিম মাদকবিরোধী আইন ( SADA) সংশোধন করে ‘ ব্যবহারকারী’ এবং ‘ ব্যবসায়ীর’ তফাতকে স্বীকৃতি দেওয়া হয়। এর ফলে সিকিম সরকারের পক্ষে মাদকাসক্তদের মধ্যে অপেক্ষাকৃত দুর্বল অংশটির প্রতি স্বাস্থ্য পরিষেবার অভিমুখ নিবদ্ধ করা সম্ভব হয়। সমস্যা হল যে যদিও স্বল্প (যথেষ্ট) পরিমাণ মাদকসহ ধরা পড়া ব্যক্তিকে ব্যবহারকারী (ব্যবসায়ী) বলে শ্রেণীবদ্ধ করা হয় কিন্তু ব্যবহারিক ক্ষেত্রে এই মাপকাঠিতে অনেক সময়েই ব্যবহারকারীকে ব্যবসায়ী হিসেবে গ্রেপ্তার করা হয়ে থাকে।

কেবল পরিমাণগত ভিত্তিতে করা এই বিভাজনের সমস্যা হল তা সামাজিক বাস্তবতাকে অগ্রাহ্য করে। মাদকাসক্তদের একটা বৃহৎ অংশ নেশার যোগানের জন্য ‘ব্যবসায়ী’ হয়ে ওঠেন। কঠোর শাস্তি তাঁদের স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসার ক্ষেত্রে বিরাট প্রতিবন্ধকতা তৈরি করে।

নতুন প্রস্তাবের অন্যতম সমস্যা হল মাদকাসক্তদের চিকিৎসার ক্ষেত্রে আদালতের নির্দেশ। ২০১২ সালের গুরজিত সিং বনাম পাঞ্জাব মামলায় পাঞ্জাব - হরিয়ানা উচ্চ ন্যায়ালয় পরীক্ষামূলক ভিত্তিতে আবেদনকারীর চিকিৎসা রাজ্য সরকার পরিচালিত পুনর্বাসন কেন্দ্রে চালানোর উৎসাহ দেন। আদালত পাঞ্জাব সরকারকে এই মর্মে নির্দেশ দেন যেন সরকার মাদক আইনে অভিযুক্ত ব্যক্তিদের থেকে আসক্তদের চিহ্নিত করে তাদের চিকিৎসা এবং পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে চালু নয়া চিকিৎসা প্রণালী, যাতে মাদকাসক্তদের জৈব- মানসিক রোগী হিসেবে ধার্য করা হয়, তা উদ্ধৃত করে আদালত প্রস্তাব করেন রাজ্যগুলি যেন মাদকাসক্তদের কারাদণ্ডের বদলে চিকিৎসা এবং কারাগার ও পুনর্বাসন কেন্দ্রগুলিতে আলাদা ব্যবস্থা প্রদান করে।

কথাগুলি শুনতে ভাল কিন্তু আজকের দিনে এই ধরণের পুনর্বাসন ব্যবস্থা তৈরির জন্য প্রয়োজনীয় কাঠামো কোথায়? উপরন্তু, খুব কম করে বললেও ভারতবর্ষে মাদকাসক্তির চিকিৎসা এখনও ভয়াবহ রকমের মধ্যযুগীয়। একজন “ সামাজিক মদ্যপায়ী” এবং মদ্যপের মধ্যে যে ফারাক আছে একজন বিনোদনমূলক ব্যবহারকারী ও একজন মাদকাসক্তের ফারাক তার চেয়েও কয়েকগুণ বেশি। নতুন আইনে মাদকাসক্ত রেহাই পাবেন কিন্তু বিনোদনের জন্য মাদক ব্যবহারকারী পাবেন না? তবে কি বিনোদনের জন্য মাদক ব্যবহারকারীর শাস্তির হাত থেকে বাঁচার একমাত্র রাস্তা নিজেকে আসক্ত বলে মেনে নেওয়া?

ভারত রাষ্ট্র ও ভারতীয় সমাজ আজও বুঝে ওঠে নি মাদকাসক্তকে অপরাধী না রোগী হিসেবে গণ্য করা উচিত। একদিকে দেশের মাদক আইন মাদক ব্যবহারকারীকে জেলে পাঠানোর নিদান দেয় আবার অন্যদিকে সমাজকল্যাণ দপ্তরের ওয়েবসাইটে মাদকাসক্তিকে একটি সামাজিক মনোবৈজ্ঞানিক অসুস্থতা হিসেবে চিহ্নিত করা হয় - যত্রতত্র একই বন্ধনীতে ফেলা হয় মাদক ব্যবহার এবং আসক্তিকে।

ভারতের আইনে মাদকাসক্তিকে অসুস্থতা হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা আশু প্রয়োজন। সরকারের তরফ থেকে মাদকাসক্তের চিকিৎসা এবং পুনর্বাসনের সম্পূর্ণ খরচ বহনের জন্য উপযুক্ত বিমার ব্যবস্থা করা উচিত। এতে বেসরকারি বীমা সংস্থাগুলিও তাদের পরিকল্পনায় মাদকাসক্তির চিকিৎসা অন্তর্ভুক্ত করতে উৎসাহিত হবে। মাদক ব্যবহারকে অপরাধের আওতামুক্ত করা, এবং মাদক আইন এবং মানসিক স্বাস্থ্য পরিষেবা আইনে অসুস্থতা হিসেবে মাদকাসক্তির অন্তর্ভুক্তিকরণের পর ভারত সরকারের উচিত সমস্ত মাদকাসক্তের জন্য অন্যান্য শারীরিক ও মানসিক রোগীর সমান অধিকার নিশ্চিত করা।

ভারতের মাদক আইন ১৯৭১ সালে আমেরিকায় রাষ্ট্রপতি নিক্সনের ‘ মাদকের বিরুদ্ধে যুদ্ধ’ ঘোষণার নকলনবিশি বৈ কিছু নয়। বিজ্ঞান, সহমর্মিতা, স্বাস্থ্য এবং মানবাধিকারের ভিত্তিতে নির্ধারিত নীতি ব্যতিরেকে ফের পশ্চিমের অন্ধ অনুকরণ করা আমাদের পক্ষে ক্ষতিকর। বাধ্যতামূলক কারাদণ্ড কিংবা চিকিৎসা কোনটাই যে মাদকাসক্তির নিশ্চিহ্নকরণে কার্যকরী নয়, সময় এসেছে WHO এবং আন্তর্জাতিক মাদক নিয়ন্ত্রণ সংস্থার পথে হেঁটে ভারত সরকারের তাকে স্বীকৃতি দেওয়ার।

কভার পিকচার ঃ জন লেনন আর ইয়োকো ওনো, তাঁদের কাছে মাদক আছে, এই অভিযোগের শুনানির পর যখন লন্ডনের কোর্ট থেকে বেরিয়ে আসছেন। গেটি ইমেজেস

এই লেখাটি এখানে থাকলো, প্রয়োজনে দেখা যেতে পারে।

https://www.outlookindia.com/magazine/story/india-news-indias-archaic-and-draconian-drug-laws-do-more-harm-than-good/305103

0 Comments

Post Comment