পড়শি যদি আমায় ছুঁতো যম যাতনা সকল যেত দূরে: লালন সাঁই

পড়শি যদি আমায় ছুঁতো যম যাতনা সকল যেত দূরে: লালন সাঁই

hhhhhhhhhhhhhh

'সনাতন' রাজার, রাজা পুরোহিতের

  • 06 September, 2023
  • 0 Comment(s)
  • 923 view(s)
  • লিখেছেন : সুমিত দাস
সনাতন, ট্রাডিশন, পরম্পরা, কাস্টমস, চিরাচরিত - শব্দ যাই হোক। সনাতন শ্রমিকের না। কৃষক, তাঁতি, মুচি, মেথর, জেলে বা মজদুরের নয়। সনাতন রাজার, রাজার পুরোহিতের, পুরোহিত ঈশ্বরের। 'সনাতন' শব্দে কোতল হয়েছে মানুষের সামগ্রিক অর্জন। শ্রমচুরির এই রীতি,সভ্যতার অর্জন দখলের এই সহজ উপায়টির নামও 'সনাতন' ছবি - কৃষ্ণজিৎ সেনগুপ্ত

গল্পটা আসলেই 'সনাতন'-এর। ইতিহাসব্যাপী নির্মাতা কেউ, আর নামকরণ করলেন অন্য কেউ। 'সনাতন' শব্দটি নিয়ে বৌদ্ধদের দাবি আছে।  ব্রাহ্মণ্যবাদ সেই কবে থেকে সমাজের কেন্দ্রে মন্দির, আর মন্দিরের কেন্দ্রে ব্রাহ্মণ, এই সমাজদর্শন সামনে রেখে চলছে। সনাতন মানে প্রবাহমান, চিরাচরিত, চিরকালীন।  প্রশ্ন তো আছেই, এই 'চিরকালীন পরম্পরা'-র মালিকানা নেবে কে বা কারা?

দ্রৌপদীকে কেন্দ্র করে যে সমাজ ভাবনা, তাতে নারীর বহুগামিতা স্বীকার করে কবেকার ভারতীয় সমাজ। মনুর ব্রাহ্মণ্যবাদ কি আদৌ তা মানে? মানতে পারবে? পেরেছে? এটা উদাহরণ মাত্র। গুপ্তযুগের সমসাময়িক কাব্য 'মহাভারত' হয়ে ভাগবত গীতার নির্মাণে সময় লেগেছে। সমাজ বদলেছে। দীর্ঘ সময়। ভারতের মুসলমান শাসকদের সময় 'রুটি ও বেটি' মানে, রুটির বদলে বেটি কারা দিতেন? দ্রৌপদীর সমাজ বদলালো। নারী সম্পত্তি হল পুরুষের। কোন পুরুষের? সমাজের শ্রমশক্তির? কৃষক, তাঁতি, মুচি, মেথরের? না স্রেফ ব্রাহ্মণের? এ পথেই পুরুষের বহুবিবাহ এসেছে। এসেছে দ্রুত ব্রাহ্মণ্যবাদের বিস্তারের লক্ষ্যে। সম্পত্তির বন্টন ও বিবাদ মেটাতে সতীদাহ করেছে এরাই। সমাজের কর্তৃত্ব মন্দিরে ঢুকিয়ে ফেলার কঠিন লড়াইটা ব্রাহ্মণ্যবাদ জিতেছে বিশ্বাসের পথ ধরেই। যে বিশ্বাসে অজানার বাস, যে বিশ্বাসে ভবিতব্যের খোঁজ, যে বিশ্বাসে লীলা নাম পায়। সে নাম 'সনাতন'? নাকি, এই যে বিপদ-ভয় হারিয়ে চলতে থাকা মানুষের খোঁজ, তাইই 'সনাতন'?

ভয়ের বাজার, চিন্তার বাজার, দুশ্চিন্তার বাজার নতুন নয়। প্রয়োজন আর যোগানও নানা সময়ে নানান আকার পেয়েছে। মজাটা সাম্প্রতিক নয়া অর্থনীতি আসার পরের। বর্ণবাদ, ব্রাহ্মণ্যধর্মের শাসক-শোষিত নয়া বাজারে শুধু টিকলো না, হাসপাতালের এমার্জেন্সি, পাড়ার মোড় এমনকি জনপদ গড়ে ওঠার আগেই বানিয়ে ফেলছে মন্দির। একই ভাবে আসছে মসজিদ, চার্চ। বাজার তৈরি। 'সনাতন' থেকে যাচ্ছে। প্রাতিষ্ঠানিক ধর্মের এই বাজার গিলে ফেলছে নানান সুর, কাব্য, লোকাচার। এই গিলে ফেলা 'সনাতন'-ই। শক্তিশালী দুর্বলকে গিলবে। ক্রমাগত গিলবে। ইহা চিরায়ত, মানে সনাতন। প্রয়োজনে ইতিহাস বদলাবে, এটাও সনাতনী। বিজয়ী গল্প বলবে, গল্পের উপাদান বদলাবে, সভ্যতা এভাবেই এগিয়েছে। সনাতনী প্রথা, অভ্যাস।

গত সাড়ে তিন দশক আগের শনি-সত্যনারায়ন নানান মহল্লায় ঠাঁই না পেয়ে পাড়ার মোড়ে আসতে শুরু করে। সত্যনারায়ণের পাঁচালি উঠোন সহ মুছে যায়। পীর, পীরের মুখের 'খোদা-তাল্লা' বদলাতে শুরু করে নয়া বাজার। শনির পাশে আজ হনুমান। বিশ্বাসীর বিপদ-শঙ্কায় আর ভবিষ্যতের ভাবনায় বিপদ-বিঘ্ন রোখার শনিঠাকুর বেচারা পেয়ে যান বিপদ খতমের সহযোদ্ধা হনুমানকে। সনাতন বিস্তৃত হয়। নতুন পন্থা নিয়ে আসরে নামে।

সাড়ে ন'শো বছর আগে বাংলায় এসেছিল ব্রাহ্মণ্যবাদী সেন'রা। দেড়শো বছর পর তাড়াও খেয়ে ছিল। কারা ছিল তার আগে পরে? সনাতনী? নাকি অন্য কেউ? সিরাজের পতনের পর বর্গী সেনাপতি কীর্তিচাঁদ বর্ধমানের রাজা হলেন, এই পরিবার একে দুটি ১০৮ শিবমন্দির বানিয়েছে। বাহ, তাহলে এভাবে এসেছে মন্দির? দখল আর সীমানা নির্ধারণ! এভাবেই বিশ্বাসে ভর করে মসজিদ, চার্চ এসেছে? বাকিটা ভক্তের অনুরাগে নির্মিত? এই বিস্তারবাদটিই সনাতন? এই সভ্যতার চলনে তিলে তিলে জমা হওয়া যাপন-কৃষ্টি সনাতন, নাকি তা ধ্বংস করে নয়া বিশ্বাসের উপনিবেশ বানানো সনাতনী প্রথা? প্রশ্নের উত্তর নির্দিষ্ট শব্দে এলে, তা ভক্তের মুখস্থ বুলি। উত্তরের খোঁজে অনুরাগ মিশে চিন্তার মিশেল জুড়লে তাও সনাতনী। স্রেফ উত্তর  ধর্মস্হান গ্রহণ করবে কিনা, তাও সনাতনী ক্ষমতার পরম্পরা ঠিক করবে।

আপাতত, এ সভ্যতায় বিজ্ঞানীর দাম কমেছে। ধর্মদেশ বলছে রাজাই শ্রেষ্ঠ। এবার আরও উৎকৃষ্ট সনাতনী হওয়া যাচ্ছে। ভারতের চন্দ্রযান চাঁদে পৌঁছানোর হোতা কে? কে নামকরণ 'ভারত' করেছেন? মোদি,  মোদি, মোদি। এও সনাতনী ধরনধারণ।  তাজমহলে শ্রমিকের নাম নেই, নেই খাজুরাহোতে। সনাতনী পরম্পরা দেখিয়েছে - রাজা থাকবেন,  থাকবেন পুরোহিত, আর থাকবেন ঈশ্বর। অতএব, সনাতনে বিলীন হলো সনাতনী যত।

0 Comments

Post Comment