পড়শি যদি আমায় ছুঁতো যম যাতনা সকল যেত দূরে: লালন সাঁই

পড়শি যদি আমায় ছুঁতো যম যাতনা সকল যেত দূরে: লালন সাঁই

hhhhhhhhhhhhhh

মহা পরীক্ষার মাঠে

  • 01 January, 1970
  • 0 Comment(s)
  • 202 view(s)
  • লিখেছেন : খালিদা খানুম
পরীক্ষা শুরু হয়ে গেছে। মহা পরীক্ষা। অনন্তযাত্রার পরীক্ষা, যে পরীক্ষায় পাশ করলে অনন্তসুখ, যে পরীক্ষায় ফেল করলে অনন্ত কষ্ট। পরীক্ষার প্রস্তুতি নেওয়ার জন্য সবাই পেয়েছে একটা জীবন। জন্ম হয়েছে যার মৃত্যু হবে তার।

এই মরনশীল মানুষের জীবন একটি পরীক্ষার প্রস্তুতি নেবার জন্য দেওয়া হয়েছে। পরীক্ষার প্রস্তুতি নেবার জন্য দেওয়া হয়েছে ক্ষেত্র, তাতে বন্দোবস্ত করে দেওয়া হয়েছে খাদ্যের। পশু পাখি গাছপালা নদী পাহাড় দিয়ে সুসজ্জিত করা হয়েছে। কিন্তু এ ক্ষণস্থায়ী। এ কেবল রঙ্গমঞ্চ। অনন্ত জীবন মৃত্যুর পর। মৃত্যুর পর রয়েছে পরীক্ষা। অনন্ত জীবনে প্রবেশ করা যাবে কেবলমাত্র যদি সেই কঠিন পরীক্ষায় পাশ করা যায়।

"তোমার রব কে? "

এই প্রশ্নের উত্তর বলা হয়েছে পবিত্র গ্রন্থে। বারবার স্মরণ করানো হয়েছে আল্লাহ ছাড়া কেউ উপাস্য নেই। অন্য যা সব সৃষ্টিকর্তা  বলে পুজো করা হচ্ছে তা মিথ্যা তা চরম পাপ। তা বর্জনীয়। এই প্রশ্নের উত্তর যতটা সহজ বলে মনে হয় ততটাই কঠিন। কারণ তোমার মধ্যে যদি দুনিয়ার দিকে মোহ থাকে তাহলে সে প্রশ্নের উত্তর তোমার মুখে আসবে না।

রহমত আলীকে এই প্রশ্নের উত্তরে ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে থাকে প্রশ্নের দিকে। প্রশ্নকর্তা অলৌকিক দূত, সে আলোর তৈরি। অবয়ব বোঝা যায় না। রহমত আলী চারদিকে তাকিয়ে দেখে, দেখতে পায় না কাউকে। বিশাল এক ময়দানে সবাই দাঁড়িয়ে আছে। এমন মাঠ সে দেখেছিল কলকাতায় এসে। তার বাড়ি কলকাতা থেকে অনেক দূরে হলেও কলকাতা এসেছে সে অনেকবার। বাসে ট্রেনে চেপে। লাখো লাখো মানুষ সেখানেও গাদাগাদি করে দাঁড়িয়ে থাকতো। পতাকা উড়তো পতপত করে, লাল নীল সবুজ সাদা পতাকা। অনেকক্ষণ গাদাগাদি করে দাঁড়িয়ে থাকার পর সামনের মঞ্চের মাইক বেজে উঠতো। অনেক দূরে সেই মঞ্চ, সে মঞ্চে কে আছে তা দেখতে পেতো না রহমত। তার দেখার ইচ্ছাও থাকত না। সে যেত একশ টাকা আর ভাতের জন্য। কিন্তু আজকের মাঠে একশ টাকা বা ভাতের লোভ নেই। লোভ রয়েছে অনন্ত সুখের। লোভ রয়েছে চিরযৌবনের। হীরামোতির গাছ, দুধের নদী, মধুর নদী, মদের নদী আরও কতকিছু অদেখা জিনিসের। আর আছে সত্তরটি হুরের লোভ। অতীব সুন্দর সে নারী! রহমতের ভাতের লোভ আছে, কিন্তু মেয়েমানুষের  লোভ নেই। ভাতের লোভে সে দুনিয়ার সারা জীবন কাটিয়েছে।

অলৌকিক অদৃশ্য দূতের কথার উত্তর সে দিতে না পেরে মহাদেবকে খোঁজে। জয়নাল রফিকুল, হাসান, চাঁদ মহম্মদ কে খোঁজে। কাউকেই দেখতে পায় না। ধীরে ধীরে তার স্মৃতিতে কুলসুমের কথা আসে। তার একমাত্র বৌ, তার একমাত্র মেয়েমানুষ। খুব ভয়ভক্তি করত আল্লাকে, নামাজ কালাম দোয়া দরুদে পাগল থাকত। কপালের চুল ঢেকে রাখত আল্লা রেগে যাবে বলে। পাঁচবার নামাজে দোয়া করত বেহেস্তর জন্য, অনন্ত সুখের জন্য আর রহমতের কাছে ঘ্যানঘ্যান করত চাল আনার জন্য, ডাল আনার জন্য। কুলসুমের সাথে দেখা পেলে, হয়তো ' তোমার রব কে ' এই প্রশ্নের জবাব পেত।

 

আল্লা বলেছেন কেয়ামতের মাঠে কেউ কাউকে চিনবে না। এ কথা রহমত শোনেনি। শুনলে কাউকে খুঁজতো না। কিন্তু সে প্রানপনে খুঁজে চলেছে পরিচিত মুখগুলো। যেভাবে সে খুঁজেছিল রহমানকে। তার আব্বা রহমান। রহমান মারা গিয়েছিল গুলিতে। পুলিশের গুলিতে। চালের জন্য গুদাম লুট করতে গিয়েছিল তারা, পারেনি। চাল আনতে গিয়ে লাশ হয়ে ফিরে এসেছিল।

আহামদ মৌলবি সাহেব বলেছিল, দুনিয়ায় আল্লাহ গরীব  অবস্থা দেন পরীক্ষার জন্য। হাজার কষ্ট সত্ত্বেও যেন আমরা আল্লাকে না ভুলি, নামাজ না ভুলি। আল্লা এ দুনিয়ায় পাঠিয়েছেন পরীক্ষার জন্য। পরীক্ষায় সফল হতে পারলে অনন্ত সুখ।

রহমান ভরপেট খিদে নিয়ে জুম্মার নামাজ পড়তে যেত মসজিদে। সেখানে মৌলভী সাহেব বলত, এ দুনিয়া হলো পরীক্ষার জায়গা।  আল্লাতালা ইমানের পরীক্ষা নেন বান্দাদের। বড়লোককে টাকাপয়সা দিয়ে পরীক্ষা নেন, গরীব লোকদের অভাব দিয়ে পরীক্ষা নেন। টাকাপয়সা আর অভাব দুটোই আল্লার দান। গরীব অবস্থাতে না শুকরি হবেন না, আল্লা এর প্রতিদান দেবেন হাশরের মাঠে

। বেহেশতের নুরে ভরে দেবেন কলিজা।

 

রহমত আলীর মনে হয় একবার যদি আব্বা রহমান এর সাথে দেখা হতো তাহলে মনে হয় সে বলতে পারত, রব কে! আব্বা তো কখনও না শুকরি হয় নি।

রব কথাটির অর্থ মালুম করতে পারে না রহমত আলী। সে পড়া লেখা শিখেনি। আরবি উর্দু তো দূরের কথা। টিপ ছাপ দিয়ে কাজ চালিয়েছে। আরবি শব্দ কিছু সে জানে, যেমন আসলামুয়ালাইয়কুম। নামজের কিছু সুরা, তার বাপ তাকে মুখস্ত করিয়েছিল  কিন্তু সে সব মনে নেই তার। সে সবের মানেও সে জানে না, বোধকরি তার আব্বাও জানত না। এমন আরও কিছু আরবি শব্দ সে শুনেছে। কিন্তু তার মধ্যে রব কথাটি শোনে নি। রহমত অদৃশ্য অলৌকিক দেবদূতের দিকে তাকানোর চেষ্টা করে। বলে, রব মানে?

প্রশ্ন আসে, তোমার মালিক কে? তোমার সৃষ্টিকর্তার নাম বলো।

 

রহমত আলী এই প্রশ্নগুলোর সামনে আরও ধাঁধায় পড়ে যায়। সারাজীবন সে মালিক বলতে আড়তদার নিয়াজ চৌধুরী কে বুঝে এসেছে, তাকেই মালিক বলে এসেছে।

নিয়াজ চৌধুরী আড়তদার। বাজারে তাদের সবজির আড়ত, পাটের আড়ত, চালের আড়ত। চাষিরা তার আড়তে আলু পাট ধান বিক্রি করে। সিজন শেষ হলে সেই আলু পাট ধান নিয়াজ মোল্লা বেশি দামে তাদের কাছে বিক্রি করে। নিয়াজ মোল্লার গুদামজাত হলেই ফসলগুলোর দাম হুহু করে বাড়তে থাকে যেন। নিয়াজ চৌধুরী ছিল তাদের হর্তাকর্তা। নিয়াজ চৌধুরীর মন মতো দামে ফসল বিক্রি না করলে ঘরে নষ্ট হত আবাদ। নিয়াজ চৌধুরীর মন ভালো থাকলে ভালো দাম পেত তারা।

কিন্তু এই অলৌকিক দূত নিশ্চয়ই সেই মালিকের কথা জিজ্ঞেস করছে না।

রহমতের ভেতরটা আঁফড় ফাঁফর করে। এ আবার কেমনধারা কড়া বিচারক রে বাবা! প্রাণে একটুও মায়া দয়া নেই। এক প্রশ্ন করে যাচ্ছে বারবার। প্রশ্নের উত্তর না পারলে কি জানি কি হয়! এরা এমনভাবে ধরেছে যেন প্রশ্নের উত্তর না পারলে শুলে চড়াবে। রহমতের দুনিয়াতে বুদ্ধি ভরসার জায়গা ছিল মহাদেব।  রহমত বলতে মহাদেব খুড়া। মহাদেব এর চা দোকান।  বাপ রহমান মারা যাবার পর মহাদেব তার চা এর দোকানে লাগিয়েছিল রহমতকে। ভাগ্যিস লাগিয়েছিল না হলে না খেতে পেয়ে মারা যেত রহমত আর রহমতের মা। রহমতের হাতের জোর তখন আসেনি যে জমি চাষ করবে। মহাদেব এর দয়াতে খেয়েপরে বেঁচে ছিল তারা। মহাদেব ছিল ইশ্বরভক্ত। চা দোকানের একটি তাকে নিত্যপুজো পেত লক্ষ্মী গনেশ, শিব কালী, রাধা কৃষ্ণ । মহাদেব বলত, যিনি আমদের খাওয়াচ্ছে রহমত, তাকে একটু সেবা না করলে হয়! আমাদের এই জীবন তার দেওয়া, তার স্মরণ করলে তবেই মুক্তি। না হলে এই দুঃখের জনম বারবার।

মহাদেব খুড়াকে খুঁজছিল রহমত। যদি সে বলতে পারে, তার রব কে! মহাদেব খুড়া হয়তো এই প্রশ্নটার উত্তর জানে। মহাদেব খুড়ার ঈশ্বর ভক্তি ছিল বেশি। হটাৎ করে খেয়াল এলো রহমতের, তার আল্লা আর মহাদেব খুড়ার ঈশ্বরতো একই নয়। তাদের খাওয়াদাওয়া উঠাবসা এক রকম হলেও তাদের ধর্ম আলাদা। তাদের মন্দির মসজিদ আলাদা। তাদের ধর্মের রকমসকম, রীতিনীতি আলাদা। মহাদেব কে কি এই মাঠে পাওয়া যাবে!

বিশাল এই মাঠে এসে  রহমত পুরো হতভম্ভ হয়ে গিয়েছে। আজব এক মাঠ। আসেপাশে অনেকেই আছে কাউকেই সে চিনতে পারছে না। প্রত্যেক কাঁধে কাগজ। বাঁ কাঁধে, ডান কাঁধে দুই কাঁধে দিস্তা দিস্তা কাগজ।  বেশিরভাগ লোকের বাঁ কাঁধে বেশি। তাদেরকে টেনে টেনে নিয়ে যাচ্ছে আলোর দেবদূতরা। একটা সাঁকো।  সাঁকোটি তাদের গাঁয়ের পাতলা নদীর উপর তিন বাঁশের নড়বড়ে সাঁকোর মতন। নীচে আগুনের নদী।  পিঁপড়ের মতো মানুষ ওই নদীর উপর দিয়ে যাচ্ছে। কেউ যাচ্ছে গরুর উপর চড়ে, কেউ যাচ্ছে ছাগলের উপর চড়ে। সাদা রঙের একটা ছাগল দেখে রহমত চিনতে পারে। এ তার মোতি। এত বড় শিং এমন চকচকে গায়ের রঙ মোতি ছাড়া আর কারোর হতে পারে না। মোতিকে সে বিক্রি করেছিল নিয়াজ চৌধুরীর কাছে। কুরবানির জন্য। বড় আদরের ছিল মোতি, রহমতের গা ঘেঁষে শুতো, কিন্তু বিক্রি না করা ছাড়া উপায় ছিল না তার। কুলসুমের এপেন্ডিক্সের ব্যাথা। ডাক্তার বলল অপারেশন লাগবে। টাকা  কোথায় পাবে। বিক্রি করে দিলো মোতিকে।

রহমত এক জায়গায় দাঁড়িয়ে আছে। সে মোতির দিকে যেতে চাইছে কিন্তু পারছে না। মাটিতে যেন পা আটকে আছে, যেমনটি তালডুবির পুকুরে নামলে কাদায় পা আটকে যায়। তালডুবির পুকুরে শোল মাছ ছিল গাদা। কাদার মধ্যে গিয়ে পা আটকে যেত। তবু রহমত পিছু যেতো না। একটা বড় শোল মাছ ধরতে পারলে বেশ কিছু টাকা। টাকা মানে গরম ভাত।

সারাজীবন কেটে গেছে গরম ভাতের চিন্তায়।  'রব কে ' এই প্রশ্নের উত্তর সে খোঁজার সময় পায়নি, বা খোঁজার চেষ্টা করেনি। সে ভাবেনি এমন একটা বিচ্ছিরি জায়গায় এসে সে উপস্থিত হবে। এমন একটা  কড়া পরীক্ষার সম্মুখীন হবে।

রহমতের প্রাথমিক ভয় কেটে গেছে এখন। সে চীৎকার করে বলতে থাকে, আমার বাপ যখন মরেছিল গুলিতে তখন কোথায় ছিলি তুই আর তোর রব, পেটের চিন্তায় যখন তালডুবিতে মাছ ধরতে গেছি জান হাতে করে তখন কোথায় ছিলি তোরা! যখন মোতিকে বিক্রি করেছিনু বৌএর অপারেশন লেগে, তখন আমার বৌকে এমনি এমনি ভালো করে দিসনি তোরা। তুই আর তোর রব আমার কুন কাজে লেগেছিস যে তোর কথার উত্তর আমি দিবো। দিবো না আমি তোর প্রশ্নের জবাব, আমি জানি না আমার রব কে, আমার জানার দরকার নাই এমন রবের নাম।

 

চিৎকার করে কথাগুলো  বলার চেষ্টা করে রহমত। পারে না। অদৃশ্য এক আলো তাকে ঘিরে ধরে। মাঠ, শব্দ, প্রশ্ন সব উধাও হয়ে যায়।  বড্ড আরাম হয় তার।

 

 

0 Comments

Post Comment