পড়শি যদি আমায় ছুঁতো যম যাতনা সকল যেত দূরে: লালন সাঁই

পড়শি যদি আমায় ছুঁতো যম যাতনা সকল যেত দূরে: লালন সাঁই

hhhhhhhhhhhhhh

ইলিয়াস শাহী বংশ আর আদিনা মসজিদ বিতর্ক

  • 01 January, 1970
  • 0 Comment(s)
  • 200 view(s)
  • লিখেছেন : উপল মুখোপাধ্যায়
ইলিয়াস শাহী বংশের প্রতিষ্ঠাতা সুলতান সামসুদ্দিন ইলিয়াস শাহের ছেলে সুলতান সিকান্দার শাহের (১৩৫৭-১৩৮০) আমলেই আদিনা মসজিদ তৈরি হয় আনুমানিক ১৩৭৫সালে। এ এস আইয়ের সুরক্ষায় থাকা মালদা থেকে কুড়ি কিলোমিটার দূরে পাণ্ডুয়ার সেই মসজিদের তলায় সংঘ পরিবার বেশ কয়েক বছর ধরে তাদের কায়দা মতো ভেঙে দেওয়া আদিনাথ শিব মন্দিরের অবস্থিতির দাবি জানিয়ে আসছে। বিজেপি বাংলার তখতে বসার পর সেই ন্যারেটিভকে ঘিরে কর্ম তৎপরতা শুরু হয়েছে। কিন্তু ইতিহাস কী বলে?

বাংলার স্বাধীন সুলতান শাহীর শুরু ইলিয়াস শাহী সুলতানদের আমলে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আমন্ত্রণে আচার্য যদুনাথ সরকার দ্য  হিস্ট্রি অফ বেঙ্গল খণ্ড দুয়ের( মুসলিম পিরিয়ড ) সম্পাদনা করেন।আগের খণ্ডটার অর্থাৎ হিন্দু যুগের  সম্পাদক ছিলেন ডক্টর রমেশ চন্দ্র মজুমদার।এই রকম ধর্ম ভিত্তিক যুগ বিভাজন জেমস মিল প্রদর্শিত পথে ঔপনিবেশিক ইতিহাস শাস্ত্রেরই অনুসারী। তবে যদুনাথ একদল মান্য ইতিহাসবিদদের দিয়ে খণ্ডটা লিখিয়েছিলেন যাঁরা সবাই একই মতানুসারী ছিলেন না মোটেই। আর কে না জানে আচার্য ঐতিহাসিক সত্যে উপনীত হবার চেষ্টায় আজন্ম ব্রতী ছিলেন।ইতিহাস শাস্ত্রে তাঁর এই সত্যে উপনীত হবার আকূতি অধুনা পরিত্যাজ্য। লভ্য উপাদান নির্ভর আপেক্ষিক সত্যই গতিশীল ইতিহাস শাস্ত্রে অধুনা গ্রাহ্য হয় যে বিচারে ঐতিহাসিক সত্য নিয়ত ভূলুন্ঠিত হবার অপেক্ষায় থাকার কথাই বটে। হিস্ট্রি অফ বেঙ্গলের অনেকটাই যদুনাথ নিজেই লেখেন কারণ তিনি অনেককে দায়িত্ব দিয়ে দেখেছিলেন যে  হবার নয়, তবু বইটার বড় অংশই অন্য কৃতবিদরা লেখেন যার মধ্যে চতুর্থ পরিচ্ছদটা, যেখানে বাংলার প্রথম স্বাধীন সুলতান শাহী ইলিয়াস শাহী বংশের কথা বিস্তারে বলা আছে লেখেন অধ্যাপক নীরদ ভূষণ রায়।

এই ইলিয়াস শাহী বংশের প্রতিষ্ঠাতা সুলতান সামসুদ্দিন ইলিয়াস শাহের ছেলে সুলতান সিকান্দার শাহের (১৩৫৭-১৩৮০) আমলেই আদিনা মসজিদ তৈরি হয় আনুমানিক ১৩৭৫সালে। এ এস আইয়ের সুরক্ষায় থাকা মালদা থেকে কুড়ি কিলোমিটার দূরে পাণ্ডুয়ার সেই মসজিদের তলায় সংঘ পরিবার বেশ কয়েক বছর ধরে তাদের কায়দা মতো ভেঙে দেওয়া আদিনাথ শিব মন্দিরের অবস্থিতির দাবি জানিয়ে আসছে। বিজেপি বাংলার তখতে বসার পর সেই ন্যারেটিভকে ঘিরে কর্ম তৎপরতা শুরু হয়েছে। আদিনার পাঁচিলের পঞ্চাশ মিটারের মধ্যে সম্ভবত এক পঞ্চানন মন্দির চত্বরে শিব লিঙ্গ প্রতিষ্ঠা হয়ে গেছে। হিন্দুত্ববাদিদের অভিযোগের তীর এবার সুলতান সিকান্দার শাহের দিকে, তিনি নাকি মন্দির ভেঙেই তার ওপর আদিনার মসজিদ বানিয়েছিলেন। প্রসঙ্গত, সুলতানের কবর আছে ওই মসজিদের  ভেতরই।

সামসুদ্দিন আর সিকান্দার দুই ইলিয়াস শাহী সুলতানকেই মহাপরিক্রমশালী দিল্লী সুলতান ফিরোজ শাহ তুঘলকের আক্রমণের মোকাবিলা করতে হয়েছিল। তুঘলকদের অধীন ছিল বাংলা। তেরো শো কুড়ির শেষের দিকে মুহম্মদ বিন তুঘলক রাজমহল থেকে ত্রিপুরার গারো পাহাড় পর্যন্ত সমভূমি অঞ্চলকে তিন প্রশাসনিক ভাগে ইকলিম  ভাগ করে দিয়েছিলেন তাঁর আমিরদের মধ্যে। সুলতান যে মনগড়া বিভাজন করে ছিলেন তা নয়, ঐ তিন অঞ্চল ছিল সেসময়ের বাংলায় প্রতিষ্ঠিত ক্ষমতা কেন্দ্র        (power zone)। গাঙ্গেয় উপত্যকা ধরে উত্তর-পশ্চিম বাংলার প্রবেশদ্বার লাখনওটি –গৌড় ( ইকলিম ই লাখনওটি), দক্ষিণ পশ্চিমে হুগলী -ভাগীরথী ধরে বঙ্গোপসাগরের থেকে আরব সাগরের প্রবেশ দ্বার হুগলির সাতগাঁ বন্দর (ইকলিম ই সাতগাঁ), ঢাকার কাছে পূব বাংলা থেকে ত্রিপুরা, কামরূপ, আরাকান রাজ্যের সীমান্ত মুখী সোনারগাঁ    (ইকলিম ই সোনারগাঁ)। ভৌগলিক বিচারে উত্তরে  জলপাইগুড়িকে মাথা ধরে: মালদার ইংলিশ বাজার হয়ে বাঁকুড়া হয়ে বালাসোর পর্যন্ত বাঁ  বাহু আর ডান বাহু রংপুর ঢাকা  হয়ে চট্টগ্রাম পর্যন্ত প্রসারিত। এই ত্রিভুজাকৃতি অঞ্চলের মাঝ দিয়ে বয়ে গেছে অসংখ্য নদীনালা যা পুরো বাংলাকে করেছে দিল্লীর সুলতানদের প্রথাগত ক্ষমতা কেন্দ্রগুলো   থেকে অনেক দূর দুর্গম এক শ্বাপদসংকুল ভূমি।দিল্লীর সঙ্গে যোগাযোগের অসুবিধের জন্য এই আমিররা যে যার নিজের ইচ্ছেতেই চলতে থাকে। মুদ্রায় নিজের নিজের নামও লেখে আরবিতে। মূলত ওইসব মুদ্রার সূত্রেই কে কবে তিন ক্ষমতা কেন্দ্রের আমির হয়েছে তার ইতিহাস লেখা হচ্ছে কারণ লিখিত সূত্র নেহাতই কম ও স্পষ্টত বানানো গুল গাপ্পা। সে সময়ের বাংলার ইতিহাস মূলত মুদ্রাশাস্ত্র (numismatics) নির্ভর একথা আচার্য যদুনাথ নিজেই বলে গেছেন। তবে ১৩৪৫-৪৬এ ইবন বতুতা বাংলায় আসেন, তাঁর বর্ণনা থেকে এখানকার জনজীবন আর রাজনৈতিক ইতিহাসের নির্ভরযোগ্য বিবরণ মেলে।

সুলতানি আমলের দেশগত ধারণা (spatial category) অস্বচ্ছ ছিল।দিল্লী সুলতান শাহীকে নানা নামে চিহ্নিত করা হয়েছে তবাকত ই নাসিরির লেখক জুজজানি (১১৯৩-১২৬৬ বলছেন মামালিক ই দিলহি–দিল্লী সাম্রাজ্য আবার পরের শতকে তারিখ ই ফিরোজ শাহীর লেখক বারানি (১২৮৫-১৩৫৭) বলছেন বিলাদ ই মামালিক ই দিলহি –দিল্লী সাম্রাজ্যের প্রদেশগুলি,ইবন বতুতা মুহম্মদ বিন তুঘলকের সাম্রাজ্যকে –হিন্দ আর সিন্ধ বলেছেন অর্থাৎ অষ্টম শতকের প্রথম ইসলামী শাসনের এলাকা সিন্ধুপ্রদেশের সঙ্গে দেশের অন্য অংশের তফাৎ করা হয়েছে। এর থেকে বোঝা যায় তখন কেন্দ্রীভূত সাম্রাজ্যের সংহত ধারণাই ছিল না। ( The Delhi Sultanate, Political and Military History Peter Jackson page 86) দেশটার বেশির ভাগ এলাকাকে তখনো হিন্দুস্থান বলে চিহ্নিত করার চলও তখন ছিল না মুসলমান তারিখকারদের মধ্যে। সুলতানি আমলের সংস্কৃত সূত্র কী দেশগত ধারণা পোষণ করত তা গবেষণার বিষয়। হিন্দুস্থান বলতে সীমিত অর্থে গঙ্গা –যমুনার মাঝের দোআব অঞ্চলকেই বোঝাত। সাম্রাজ্য বলতে নানা প্রায় স্বাধীন রাজ্যের সমষ্টি যেগুলোর মধ্যে বেশ কিছু নানা হিন্দু রাজবংশ শাসন করে নতুবা সুলতানের  জ্ঞাতিগুষ্টি কেন্দ্রীয় শক্তির প্রতি ন্যূনতম কিছু আনুগত্যের ভিত্তিতে রাজ করে। সে সময়ের বাংলাকে এই প্রেক্ষিতে বুঝতে লাগে।   

মুহম্মদ বিন তুঘলকের বন্দোবস্ত বাংলায় স্থায়ী হয়নি। দিল্লীর তোয়াক্কা না করার  প্রবণতা বেড়ে  তিন  ইকলিমের শাসকদের মধ্যে যুদ্ধ লেগেই থাকে। অবশেষে এই মারামারি কাটাকাটির মধ্যে থেকে ইকলিম ই সাতগাঁর শাসক শামসুদ্দিন ইলিয়াস শাহ তিন ইকলিমের মাথা হয়ে লাখনওটির তখতে বসলেন তেরো শো বিয়াল্লিশ নাগাদ, শুরু হয় বাংলার শক্তিশালী স্বাধীন ইলিয়াস শাহী সুলতানদের যুগ। অবশ্য তখনো সুলতান ফক্রুদ্দিনের অধীনে ছিল সোনারগাঁ। মুহম্মদ বিন তুঘলকের রাজত্বের শেষের দিকে এলাহাবাদের পূবে উত্তর ভারতের স্থানীয় হিন্দু রাজ্য গোরখপুর, চম্পারন, তিরহুত দিল্লীর বিরুদ্ধে স্বাধীনতা ঘোষণা করে নিজেদের মধ্যে মারামারি করছিল। সুলতান শামসুদ্দিনের বাংলার হাতির দল আর নৌ যুদ্ধে দড় বাঙালি পাইকরা তুর্কি ঘোড়সওয়ারদের সঙ্গে নিয়ে ক্রমে তিন রাজ্যকেই কব্জা করে ফেলে। বাংলার সুলতান আক্রমণ করে দুর্গম কাঠমান্ডু পর্যন্ত দখলে আনলেন, ওড়িশার রাজাকে বশ্যতা স্বীকারে বাধ্য করলেন, ১৩৫২ তে সোনারগাঁ দখল করে কচুকাটা করলেন ফক্রুদ্দিন আর তাঁর পরিবারের অনেককে আর নিজে দিল্লীর তখতে বসেছেন কল্পনা করতে লাগলেন। তাঁর এই দাপট অচিরেই কমে। ১৩৫১ তে মুহম্মদ বিন তুঘলক মারা যান আর ফিরোজ শাহ তুঘলক দিল্লীর তখতে বসে অনেকটাই ঘর গুছিয়ে ফেলছেন। ১৩৫৩ র নভেম্বরে ইলিয়াস শাহর হাত থেকে উত্তর ভারত কেড়ে নিয়ে নব্বই হাজার  ঘোড়সওয়ার, লাখো পদাতিক-তিরন্দাজ আর হাজার নৌকোর বিশাল বহর নিয়ে ফিরোজ শাহ এবার কোশী নদী পার হয়ে ইলিয়াস শাহী রাজধানী ফিরোজা বাদ –পাণ্ডুয়া দখল নিতে এগিয়ে দেখলেন সুলতান শামসুদ্দিন ততক্ষণে সৈন্য সামন্ত নিয়ে আশ্রয় নিয়েছেন মহানন্দার দুই শাখা নদী বালিয়া আর চিরামতির সাড়াশি বেষ্টনী তে সুরক্ষিত দিনাজপুরের একডালা দুর্গে। এত বড় এ দুর্গ আর তার সংলগ্ন চাতাল যে গোটা সৈন্য বাহিনী ঢুকে বসে আছে দিব্যি যেন এক দ্বীপের মধ্যবর্তী এই একডালা। এই যুদ্ধের বর্ণনা হিস্ট্রি অফ বেঙ্গল খণ্ড দুয়ে বিস্তারে দিয়েছেন অধ্যাপক নীরদ ভূষণ রায়। সে যুদ্ধে সুলতান ফিরোজ শাহের আক্রমণে একডালার পতন হয়নি। অনেক ক্ষয়ক্ষতি হলেও বাংলার সুলতানকে বাঁচিয়ে ছিল অভিনব যুদ্ধ কৌশল আর বাঙালি পাইকদের লড়ার ক্ষমতা। বেশিদিন বাংলার জল হাওয়ায় টিকতে না পেরে ফিরোজ তুঘলক কে সাতচল্লিশ টা যুদ্ধ হাতি, বন্দীর দল আর অন্যান্য লুটের মাল নিয়ে নিয়ে আপাতত দিল্লী ফিরতে হয়। এখানে লক্ষণীয় যে প্রতিরোধ হীন ফিরোজা বাদ দখলের পর ফিরোজ শাহ দুটি রাজকীয় ঘোষণা করেন। একটায় প্রজাদের জান মাল রক্ষায় নানা সুযোগ সুবিধে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি ছিল তার মধ্যে বাংলার পাইক সর্দার আর পাইকদের আমদানি বাড়ানও আছে। দ্বিতীয়টায় শামসুদ্দিন ইলিয়াস শাহকে ইসলাম ধর্মবিরোধী, নারী ঘাতক বলে প্রজাদের কাছে আবেদন জানানো হচ্ছে যে তারা যেন সুলতানের খপ্পর থেকে বেরিয়ে আসে। অবশ্য প্রজারা সে কথায় কর্ণপাত করেনি, ইলিয়াস শাহী রাজত্ব অটুট থাকে। এর থেকে মনে করাই যায় যে প্রজা বিক্ষোভ হবার পূর্বশর্ত অনুপস্থিত ছিল। বাংলার শাসক অভিজাতরাও ফিরোজ তুঘলকের সাথ দেয় নি।কৌশলী দিল্লী সুলতান ফিরোজ শামসুদ্দিনের ছেলে সিকান্দার শাহের আমলে দ্বিতীয় বার বাংলা দখলের চেষ্টা করলেন সুলতানি অভিজাতদের মধ্যেকার বিভাজনকে কাজে লাগিয়ে। ইকলিম ই সোনারগাঁর নিহত শাসক ফক্রুদ্দিনের জামাই জাফর খান পালিয়ে দিল্লী দরবারে ঠাঁই নেন। তাঁকে সহকারী উজির করে বাংলা দখলে বিশাল সেনাবাহিনী পাঠিয়ে দিচ্ছেন সুলতান ফিরোজ। সেটা ১৩৫৯, সবে বছর দুই সিকান্দার শাহ বাংলার সুলতান হয়েছেন। দিল্লীর বিশাল ফৌজের বিরুদ্ধে সিকান্দার শাহ আবার বাবার অনুসৃত কৌশল অবলম্বন করে সামনাসামনি লড়াইয়ে না গিয়ে পাইক বরকন্দাজ নিয়ে একডালার দুর্ভেদ্য দুর্গে আশ্রয় নেন। তাঁর নেতৃত্বের ওপর আস্থা ছিল বাংলার অভিজাতদের তাই জাফর খানের দিকে তারা গেলো না। এক সফল কূটনৈতিক চুক্তি সম্পন্ন হয় তাতে বাবার মতোই ফিরোজ তুঘলকের প্রতি সামান্য আনুগত্য দেখিয়ে, বাংলার হাতি সহ নানা রকম নজরানা দিয়ে, সিকান্দার শাহ সেই বাংলার মসনদ ধরে রাখেন। এবারো দিল্লীর ফৌজ শেষমেশ ফিরে যাচ্ছে।

এবার আসল কথায় আসা যাক। আদিনা মসজিদ বানানোর পেছনে সিকান্দার শাহের একটা রাজনৈতিক উদ্দেশ্য ছিল। ফিরোজ শাহের আক্রমণের পর এক দীর্ঘ শান্তির পর্বে সিকান্দারের মনে হয় এবার শুধু  বাংলা নয়, এমনকি ভারতও নয়, আরব ইরান সহ গোটা ইসলামি দুনিয়ার শ্রেষ্ঠ সুলতান হচ্ছেন তিনি। এই  বৈশ্বিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা চরিতার্থ করতে ত্রয়োদশ শতকের সুফি শেখ জালাউদ্দিন তাব্রিজির পদধন্য রাজধানী ফিরোজাবাদের (গৌড়) কাছে হজরত পান্ডুয়ায় নতুন দেশে ইসলামের আগমন বার্তার দোত্যক হাইপোস্টাইল মসজিদ ,আদিনা মসজিদ বানানো হয়। এই ধরণের মসজিদের বৈশিষ্ট্য হচ্ছে সারিবদ্ধ থামের বিশাল প্রার্থনা কক্ষ, প্রকাণ্ড খোলা উঠোন এইসব। আদিনায় যেটা দেখা যায় তা হলো তার কেন্দ্রস্থিত অর্ধেক সিঁলিন্ডার আকৃতির ছাদ ঢাকা বিশাল নামাজ পড়ার জায়গা। গঠনশৈলী ৭১৫ সালে শেষ হওয়া দামাস্কাসের বিখ্যাত উমায়েদ মসজিদের সঙ্গে তুলনীয়। আলাদা যেটা তা হলো কোনার থাম, সূঁচালো আর্চ আর টেরাকোটা ডিজাইন যা বাংলার প্রথাগত মসজিদ শৈলীর সঙ্গে মেলে। এই রকম ঢাউস হাইপোস্টাইল মসজিদ বাংলার প্রয়োজনীয়তা, তার জলবায়ুর উপযোগী না হওয়ার কারণে আর তৈরি হয়নি। সে দিক থেকে বিচার করলে আদিনা এক অভিনব স্থাপত্য। স্থানীয় মিস্তিরিরা এতো বড় বড় গম্বুজ বানাতে পারতেন বলে সুলতানী মসজিদ স্থাপত্যের গবেষক পারভীন হাসান মনে করেন না। প্রশ্ন হলো সিকান্দার শাহ আদিনার স্থপতি বা মিস্তিরিদের কি বহির্বিশ্ব থেকে এনেছিলেন?

সংঘ পরিবারের তরফে আদিনার বিশাল চত্বরে বা মূল কাঠামোয় খোদাই করা অসংখ্য হিন্দু বা বৌদ্ধ প্রতীক, দেব মূর্তির উপস্থিতিকে তা যে আদিনাথ শিব মন্দির ভেঙে তার অকাট্য প্রমাণ হিসেবে দাবি করা হচ্ছে সংসদের ভেতরে, বাইরে। বিভিন্ন পুরনো স্থাপত্যে আগেকার নানা স্থাপত্যের পুনরায় ব্যবহার (reuse) মানে আগেরটার কাঠামোর ওপরই, সেটা ভেঙেই যে বানানো হয়েছে তা নির্দিষ্ট ঐতিহাসিক প্রমাণ  সাপেক্ষ। নির্মাণের সময় বাইরে থেকে এনেও পুনরায় ব্যবহার হতেই পারে। তাই যদি হয়, প্রশ্ন হলো এসব এলো কোত্থেকে? মধ্যযুগের ইতিহাসবিদ অধ্যাপক ইটন বারি মরিসনের গবেষণাকে উল্লেখ  করে  দেখিয়েছেন উত্তর -পশ্চিম বাংলার বারেন্দ্রভূমিতে  মহাস্থানগড়ের পৌন্ড্রনগর (22,555,000 sq. ft), গৌড়(13,186,800 sq. ft) আর পান্ডুয়ায় (10,000,000 sq. ft.) সাড়ে চার কোটি স্কোয়ার ফিটের বেশি তিন পেল্লায় সব রাজপ্রাসাদের অস্তিত্ব ছিল (The Rise of Islam and the Bengal Frontier, 1204–1760 Richard M. Eaton)। তাই পুরনো ভাঙাচোরা পাথুরে কাঠামো খুঁজতে  সিকান্দার শাহকে বেশি দূর যেতে হয়নি।তবে তিনি মন্দির ভেঙেই যে তার ওপরই মসজিদ বানান এ লোকশ্রুতি হতে পারে কিন্তু ঐতিহাসিক প্রমাণ কই? ভারতে মুসলিম শাসকরা মন্দির ভাঙলে আরবি –ফারসি সূত্র ইসলামের বিরাট জয় বলে উল্লেখ করে, আদিনার ক্ষেত্রে তেমন কোনো কিছু কিন্তু ইতিহাসবিদরা পান নি। হিস্ট্রি অফ বেঙ্গল খণ্ড দুয়ের (মুসলিম পিরিয়ড) চতুর্থ পরিচ্ছদে অধ্যাপক নীরদ ভূষণ রায় আদিনায় প্রাপ্ত হিন্দু, বৌদ্ধ প্রতীক, দেব মূর্তির নিশ্চিত উপস্থিতির উল্লেখ করে দুজনের মতের উল্লেখ করেছেন : প্রথমত গবেষক আর কে রায় চৌধুরীর মত উল্লেখ করে তা যে বৌদ্ধ স্তুপের ধ্বংসাবশেষ থেকে তৈরি একথা নিশ্চিত ভাবে উল্লেখ করেছেন। দ্বিতীয়ত পার্সি ব্রাউনকে উদ্ধৃত করছেন যে আদিনা নির্মাণে হিন্দু রাজাদের লাখনওটি র অপূর্ব সব স্থাপত্যের পুনরায় ব্যবহারের সম্ভবনা উড়িয়ে দেওয়া যায় না (The History of Bengal _II Muslim Period, page 114)। অর্থাৎ আচার্য যদুনাথ সরকার সম্পাদিত দ্য হিস্ট্রি অফ বেঙ্গল খণ্ড দুয়ে কোথাও নির্দিষ্ট ভাবে প্রাচীন আদিনাথ শিব মন্দির ভাঙার কথা বলা হচ্ছে না । কিন্তু হিন্দুত্ববাদিদের কে বলে সে কথা, আচার্য  যদুনাথকে তাঁদের ততটুকুই দরকার যতটুকু রাজনীতির কাজে লাগে! কে আর আদিনার ইতিহাসে মন দেয়!

 

সূত্র

১) The History of Bengal _II Muslim Period edited by Sir Jadunath Sarkar

২) The Delhi Sultanate,Political and Military History by Peter Jackson

৩) The Rise of Islam and the Bengal Frontier, 1204–1760 by Richard M. Eaton

৪) Sultanate Mosques and Continuity in Bengal Architecture by Perween Hasan, Jstor article

0 Comments

Post Comment