পড়শি যদি আমায় ছুঁতো যম যাতনা সকল যেত দূরে: লালন সাঁই

পড়শি যদি আমায় ছুঁতো যম যাতনা সকল যেত দূরে: লালন সাঁই

hhhhhhhhhhhhhh

‘আগামী পৃথিবী’-র সূত্রপাত

  • 20 November, 2020
  • 0 Comment(s)
  • 208 view(s)
  • লিখেছেন : শুভেন্দু দাশগুপ্ত
সাহস আছে বটে অংশুর! না হলে অর্থনীতির পাশে ধপ করে বসিয়ে দেয় সংস্কৃতিকে। বলে কি না সংস্কৃতিতে বদল এলেই নাকি চাহিদা ও উৎপাদনকে শায়েস্তা করা যাবে। বোঝো ব্যাপারখানা! অংশুমান দাশের একটি ই- বুক নিয়ে আলোচনা।

অংশু এই লেখাটা, এই ছোট বইটা শুরু করেছে এই পৃথিবীটাকে বদলে ফেলার ডাক দিয়ে। সবাইকে ডাক পাঠিয়ে। সবাই কি একমত এই ডাকে? সবাই তো নানা ধরণের, এই এক মতের জায়গায় বহুমত। অংশুর এই ডাক, মিটিঙের জমায়েতের জন্য অনির্দিষ্ট ডাক নয়, সরাসরি ডাক: ‘আপনি যদি বদলান।’

এ এক মুশকিলের ডাক অংশু বানালো।

মুশকিল হরেক কিসিমের। বদলানোর সবটাই কি নিজের হাতে? পুঁজি, উৎপাদক, রাষ্ট্র, রাজনীতিক দল, সংস্কৃতির অধিকর্তা। মাথার ওপরে সব থাকনেওয়ালারা রয়েছেনা! আমরা বদলাই কখন? কিভাবে? একটা ‘আমরা’ তো আবার হয় না। বদলানো, বদলে ফেলা, বদলে দেওয়া, বদলে চলা এ সবের তো ইতিহাস হয়।নিছক ইতিহাস ইতিহাস নয়। রাজনীতিক ইতিহাস, আর্থনীতিক ইতিহাস, সামাজিক ইতিহাস, সাংস্কৃতিক ইতিহাস।ইতিহাসের লম্বা তালিকা।

বদলানোর মধ্যে যতই ঝুট ঝঞ্ঝাট থাক, অংশু এক ‘বদল’ পরবর্তী ‘আগামী পৃথিবী’ চাইছে।

এই আগামী মানে আজকের সময় ধরে চলে আগামী নয়, আগামী মানে ‘আজ’কে ভেঙ্গে‘আগামী’।

অংশু চেয়েছে ‘আগামী পৃথিবী কেমন হবে না’।

মত উচ্চারণ করেছে, মত আলোচিত হয়েছে, সমালোচিতও, মত বাতিল হয়েছে। এমন পথ হাঁটায় অংশু জরুরি কথা বলতে বলতে চলেছে। ‘গ্রামকে হাত পাততে শেখানো হয়েছে সরকারের কাছে।’ প্রশ্ন তুলেছে। স্বীকার করা ধারণাকে অস্বীকার করেছে। ‘গ্রাম স্বনির্ভর নয়।’

শুধু প্রশ্ন দেগে দেওয়া নয়, প্রশ্নের সাথে ভাবাকে উড়িয়ে দেওয়া, প্রশ্নের আগে ভাবা, প্রশ্নের পরেও ভাবা। আমাদের মধ্যেকার না-ভাবা না-প্রশ্ন করা, বলা এক-করা আর এক, না-জানা, না-সঠিক জানা। যাদের ভাবতে বলা, তাদের মধ্যেই গণ্ডগোল। অংশু দেখিয়ে দিয়েছে।

অংশু চালু প্রশ্নের ভুল ধরিয়ে দিয়েছে, ভাবনার স্ববিরোধিতা দেখিয়ে দিয়েছে, খেয়াল করিয়েছে আমাদের ভাবনার শৌখিনতা।

এই হল অংশু রচনাটির ‘মতবাদ’ নামের অংশটি। পাতা ওল্টালে পরের বিষয় ‘এক ডজন গপ্পো’। তার্কিক অংশু থেকে, কথক ঠাকুর অংশু, অধিকার ঘোষক অংশুমান, দার্শনিক অংশুমান দাশ।

প্রস্তাবনায়, মতবাদে যতটুকু জটিলতা ছিল, থাকে, থাকতে পারে, গপ্পোতে এসে সহজ সরল। নুড়ি পাথরে ধাক্কা খেয়ে খেয়ে কুল কুল জলের ধারা। চলার পথটা অন্যরকম বলে কিনা জানি না, প্রস্তাবনায় যা বলা, গপ্পো কোথায় খানিকটা অন্য কথা, একটু ভাঙচুর করা। বিকল্প চাষ, বিলি ব্যাবস্থা, সমবায়ে শষ্য জমানো, স্থানীয় খাদ্য, স্থানীয় জল, প্রাকৃতিক স্বাভাবিকতায় ফিরিয়ে আনা। গ্রাম ঠাকুর্দার কাঠের তোরঙ্গ খুলে হারিয়ে যাওয়া, যত্নে রাখা, লাল শালুতে মুড়ে রাখা কথাগুলোকে বের করে আনা। হারিয়ে ফেলা প্রকৃতির নিয়মকানুন স্বভাব চরিত্র বুঝতে চাওয়া, খুঁজে পাওয়া। প্রকৃতির অধিকার আর মানুষের অধিকারের মধ্যে হাত মেলানো। এই গপ্পোকথায় এসে হাঁটু মুড়ে বসে পড়ে আমাদের হরেক কিসিমের চারপাশ। খাদ্য পুষ্টি সম্পদ ব্যবস্থাপনা ব্যবসা প্রযুক্তি শিক্ষা সংস্কৃতি উৎপাদন বাজার, যাদের নিয়ে অংশু গপ্পোগাছা তারা মিলে মিশে বসে যায়। কখন কাকে নিয়ে কী বলা, কান পেতে থাকা।

আটচালায় বসে চালচিত্র সেঁটে নিয়ে খড়কুটো বেঁধে কাঠামো বানিয়ে গায়ে কাদা মাটি লেপে দিয়ে অংশুকুমোর-এর এবার প্রতিমা বানানো। কেমন হবে অংশুর পৃথিবী প্রতিমা। চালচিত্রের সামনে থাকছে কারা, শহর গ্রাম উৎপাদন বাজার।

অংশুর বাননোর দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে হঠাৎ করে বাড়তি জ্বলে ওঠা পিদিমের শিখার মত কথারা এসেছে।

‘আসল দাতা গ্রাম – সে নিজেকে গ্রহীতা ভাবছে।‘

‘চাষে উৎপাদন থেকে উৎপাদককে বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া’।

‘প্রশ্ন করে সমাধান খুঁজলে, চলে আসা জমে থাকা ব্যবস্থাটাকেই গড়ে পিটে নেওয়া যায়।‘

‘উৎপাদক এখনকার উৎপাদন ব্যবস্থা থেকে বেরিয়ে আসতে চাইছে, কারণ রোজগারের নিশ্চয়তা ও সম্মান কোনটাই বাকি নেই’। (আমার ফুটকারিঃ উৎপাদকের আবার সম্মান হয় বুঝি? কে জানে?)

‘উৎপাদকের চেয়ে বেশি ক্ষমতা যারা উৎপাদন ব্যবস্থার আনুসঙ্গিক বিষয়টা দেখভাল করে।‘

‘চাহিদা’কে নিয়ে নতুন করে ভাবাতে চেয়েছে অংশু। কী খাবার উৎপাদন হবে, যা জঙ্গল না কেটে, উর্বরতার বারোটা না বাজিয়ে।

যারা যা চায় তাই খায়, যা খাওয়ানো হয় তাই খেতে চায়, তাঁরা কি ভাবতে চাইবে কোথা থেকে খাবার, কি ধ্বংস করে তার এই খাবার খাওয়া। কে ভাবাবে?

আমরা নিজেরা কি নিজেদের ভাবনা ভাবি? নাকি অন্যরা ভাবায়। এই অন্যরা কারা? তাঁরা অংশু যা ভাবতে চায় তা ভাবাবে কেন? একটা প্রশ্ন থেকে আরেকটা প্রশ্ন। একটা প্রশ্নের উত্তরের সাথে আর একটা প্রশ্ন।

এখনকার ভাবনারা তো হাইওয়ের হাইস্পিডে। আর হাঁটা ও সাইকেলে চড়া প্রশ্নরা হাইওয়েতে বিস্ফোরণ ঘটানোর ফাটল খুঁজছে। অংশু এই দলে। বলে বসছেঃ খাবার উৎপাদন ও বন্টনের বিষয়টা স্থানীয়ভাবে করে ফেললে কেমন হয়? স্থানীয় স্তরে পরিকল্পনা, স্থানীয় খাবারকে অগ্রাধিকার । স্থানীয় সরকারের সিদ্ধান্ত ক্ষমতা, বৈষম্য কমানো, বন্টনের পরিকল্পনাকে নিচের স্তরে নামিয়ে আনা।

সাহস আছে বটে অংশুর! না হলে অর্থনীতির পাশে ধপ করে বসিয়ে দেয় সংস্কৃতিকে। বলে কি না সংস্কৃতিতে বদল এলেই নাকি চাহিদা ও উৎপাদনকে শায়েস্তা করা যাবে। বোঝো ব্যাপারখানা!

অংশুর শেষ প্রস্তাব – মানুষকে আরও দলবদ্ধ করার ও হওয়ার সুযোগ তৈরি করা। পা বাড়ালো বটে, কিন্তু হাঁটলো না। বোধহয় দল বেঁধে হাঁটার জন্য যারা তৈরি তাদেরকে উসকে দিল। হাঁটে কিনা! দেখি হাঁটে কিনা!

পায়ে পায়ে হাটলেই তো হাতে হাত ধরা, কথাদের এমুখ থেকে ওমুখে যাওয়া। ভাবনাদের এমাথা থেকে বেরিয়ে ও মাথায় ঢুকে পড়া।

এমন সব তো পাশাপাশি থাকলেই হয়।

অংশু হতে বলেছে।

এই বইটা বানিয়েছে।

লেখাটি পড়তে পারেন নীচের লিঙ্কে...

https://drive.google.com/file/d/1khYsCZ8e7HuAfSmkDCCAjFGV9SsU3-cq/view?usp=sharing

 

 

 

0 Comments

Post Comment