পড়শি যদি আমায় ছুঁতো যম যাতনা সকল যেত দূরে: লালন সাঁই

পড়শি যদি আমায় ছুঁতো যম যাতনা সকল যেত দূরে: লালন সাঁই

hhhhhhhhhhhhhh

দেশ খুঁজে ফেরা ঘরে ও বাইরে: 'স্বাধীনতা পঁচাত্তরে' নারী

  • 20 August, 2021
  • 0 Comment(s)
  • 743 view(s)
  • লিখেছেন : শতাব্দী দাশ
নারীর 'স্বাধীনতার লড়াই' তাই চিরকালই দ্বিবিধ। ঘরের আর বাইরের। স্বাধীনতার ৭৫ তম বছরে এ লেখা লিখতে বসলাম বটে, কিন্তু রাজনৈতিক ভাবে রাষ্ট্রের স্বাধীনতা নারীর স্বাধীনতার একটি একক হতে পারে বড়জোর। 'রাজনৈতিক' কথাটিও নারীবাদের আওতায় এলে অর্থের সম্প্রসারণ ঘটায়, কারণ সেখানে 'ব্যক্তিগতও রাজনৈতিক'। অতএব খাতায় কলমে ভারত রাষ্ট্রের স্বাধীনতা যে নারীর স্বাধীনতার সমার্থক নয়, তা বলাই বাহুল্য। ঠিক যেমন খাতায় কলমে নানা আইনি বা সাংবিধানিক অধিকার থাকলেই নারীর অধিকার নিশ্চিত হয় না৷

'পূর্বকালে মেয়েরা পুরুষের অধীনতাকে একটা ধর্ম মনে করত৷ তাতে এই হত যে চরিত্রের উপর

অধীনতার কুফল ফলতে পারত না...প্রভুভক্তিকে যদি ধর্ম মনে করা হয় তাহলে ভৃত্যের মনে মনুষ্যত্বের সম্মানহানি হয় না'

উদ্ধৃতিতে যে প্রবৃত্তি ও মনোভাব সুস্পষ্ট তাকে বর্তমান কালের পরিভাষায় 'ম্যানসপ্লেনিং' বলে। পুরুষ দিচ্ছেন নারীকে অধীনতায় মুক্তি খুঁজে নেওয়ার নিদান। লেখক রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর স্বয়ং। রবীন্দ্রনাথ 'স্ত্রীর পত্র' গল্পে মৃণালের সহমর্মী হয়ে ওঠেন আরও বেশ কিছু বছর পর৷ তবে নারীকে ঠিক কতটা স্বাধীনতা 'দেওয়া' উচিত আর কী তার ভূমিকা হবে সমাজে, তা নিয়ে দোলাচল তাঁর চিরকালই ছিল। আমাদের উদ্দেশ্য অবশ্য রবীন্দ্রনাথের লিঙ্গভাবনায় আলোকপাত করা নয়, রবীন্দ্রনাথের এই রচনার উপলক্ষ্যটি ধরে ভারতীয় সমাজমানসের হদিশ পেতে চেষ্টা করা। উপলক্ষ্যটি গুরুতর। এতটাই, যে রচনার নামেই আছে 'উপলক্ষ্য' কথাটি। রচনার নাম- 'রমাবাঈ-এর বক্তৃতা উপলক্ষ্যে' (ভারতী ও বালক, ১২৯৬, জৈষ্ঠ্য, ইং ১৮৯১ খৃ)।

পণ্ডিতা রমাবাঈ, যিনি সংস্কৃত সাহিত্য ও ব্যাকরণে প্রজ্ঞা অর্জন করে 'পণ্ডিতা' খেতাব অর্জন করেন, উচ্চবংশীয় মারাঠি ব্রাহ্মণ হয়েও কলকাতার এক শূদ্র আইনজীবীকে বিবাহ করেন, সেকালে একাই ইউরোপ ও আমেরিকায় ভ্রমণ করেন, 'হাই কাস্ট হিন্দু উইমেন' নামক বই-এ উচ্চবংশীয় হিন্দু নারীদের দুর্দশার কথা লিপিবদ্ধ রাখেন ও আরও নানা অসম্ভব কাজ করেন, অথচ ঊনবিংশ শতকের নবজাগরণের বহু পাঠ্যক্রম যাঁর নামটিও উচ্চারণ করে না, তিনি নবজাগরণের উত্তুঙ্গ সময়ে এসেছেন কলকাতার টাউনহলে বক্তৃতা দিতে। শুনতে এসেছেন তাবড় নব্য শিক্ষিত, আলোকিত পুরুষেরা। নবজাগরণের কাল মানে মুক্তির কাল, চিন্তনের নতুন সব দিগন্ত উন্মোচনের কাল। সেই সময়ে দাঁড়িয়ে, রমাবাঈ তাঁর বক্তৃতা শেষ করতে পারেননি টাউন হলে। রবীন্দ্রনাথও কলম ধরেছিলেন তাঁর বক্তব্যের বিরোধিতায়। 'কাল বিকেলে বিখ্যাত বিদূষী রমা বাঈ এর বক্তৃতার কথা ছিল তাই শুনতে গিয়েছিলাম...তিনি বললেন, মেয়েরা সকল বিষয়ে পুরুষের সমকক্ষ, কেবল মদ্যপানে নয় তোমার কি মনে হয়? মেয়েরা সকল বিষয়ে যদি পুরুষের সমকক্ষ, তা হলে পুরুষের প্রতি বিধাতার অবিচার বলতে হয়' রবীন্দ্রনাথ রমাবাঈ-এর বক্তৃতা 'উপলক্ষ্যে', বহুবারের মতো, আবারও একবার লিখেছিলেন, সন্তান পালনার্থে, সংসার রক্ষার্থে নারীর কল্যাণী যে ভূমিকা, তার অব-নির্মাণ মেনে নেওয়া যাবে না।

নারীর 'স্বাধীনতার লড়াই' তাই চিরকালই দ্বিবিধ। ঘরের আর বাইরের। স্বাধীনতার ৭৫ তম বছরে এ লেখা লিখতে বসলাম বটে, কিন্তু রাজনৈতিক ভাবে রাষ্ট্রের স্বাধীনতা নারীর স্বাধীনতার একটি একক হতে পারে বড়জোর। 'রাজনৈতিক' কথাটিও নারীবাদের আওতায় এলে অর্থের সম্প্রসারণ ঘটায়, কারণ সেখানে 'ব্যক্তিগতও রাজনৈতিক'। অতএব খাতায় কলমে ভারত রাষ্ট্রের স্বাধীনতা যে নারীর স্বাধীনতার সমার্থক নয়, তা বলাই বাহুল্য। ঠিক যেমন খাতায় কলমে নানা আইনি বা সাংবিধানিক অধিকার থাকলেই নারীর অধিকার নিশ্চিত হয় না৷

তবে একথা অনস্বীকার্য যে যখনই তথাকথিত মূলধারার রাজনৈতিক আন্দোলনের ডাক এসেছে, তখন তা মেয়েদেরও ঘর থেকে বাইরে টেনে এনেছে। আগল ভেঙেছে, ত্বরাণ্বিত হয়েছে নারীর আত্মিক মুক্তি। বাইরে বেরিয়ে আসা নারী প্রশ্ন করেছে শুধু রাজনৈতিক ক্ষমতাতন্ত্রকে না, পরিবারের মধ্যে থাকা পিতৃতন্ত্রকেও। সেদিক থেকে দেখতে গেলে স্বাধীনতার আন্দোলন ও উত্তর-ঔপনিবেশিক নানা তথাকথিত মূলধারার আন্দোলন নারী-আন্দোলনকে উস্কে দিয়েছে ও নারীর মধ্যে জাগিয়েছে স্বাধীনতার স্পৃহা। গান্ধিজী মেয়েদের অহিংস অসহযোগ আন্দোলনে যুক্ত হওয়ার ডাক দেন। সত্যাগ্রহ ও আইন অমান্য আন্দোলনেও মেয়েরা অগ্রণী ভূমিকা পালন করে। কিছুটা হলেও পর্দা হঠেছিল এর ফলে। কমলা দাশগুপ্ত জেলখানার ভিতর বিরাট হল্লাহাটির বর্ণনা দিয়েছেন, যা যুগের বিচারে 'অ-নারীসুলভ'। '১৯৩২ এর পয়লা মার্চ আমাকে গ্রেপ্তার করে নিয়ে গেল প্রেসিডেন্সি জেলে৷ রোজই সেখানে আসে কংগ্রেসের আইন-অমান্যকারী বন্দী মেয়েরা...জেলখানা ফাটিয়ে ধ্বনিত হতে লাগল বন্দেমাতরম৷ জমাদারনী, মেট্রন যে যেখানে ছিল, ছুটে এল৷ কেড়ে টেনে ছিঁড়ে ফেলল জাতীয় পতাকা বাইরে গেল বিপদের জরুরী বার্তা৷ জেলখানা তোলপাড়' (রক্তের অক্ষরে: ১৯৯৫) সেই ১৯৩২ সালেই সশস্ত্র বিপ্লবী দলের বীণা দাস কলকাতা হাইকোর্টে স্টেটমেন্ট দিচ্ছেন যে গুলি তিনিই চালিয়েছেন উপাচার্য তথা গভর্নর জেনারেলকে লক্ষ্য করে। তার একবছর আগে শান্তি আর সুনীতি নামে দুই পঞ্চদশী-ষোড়শী পিস্তল হাতে খুন করে এসেছে ডিস্ট্রিক্ট ম্যাজিস্ট্রেট স্টিফেন্সকে। তা করতে গিয়ে তাদের নিজের দলের মধ্যেই বহু বাদানুবাদ করতে হয়েছে। 'আমরা কি শুধু চিঠিপত্র বওয়ার জন্য আছি, আসল কাজের জন্য নয়?' -বলতে হয়েছে তাদের। অর্থাৎ ভাঙতে হয়েছে লিঙ্গভূমিকা। মাস্টারদা সুর্য সেনের চট্টগ্রামের দলের বিপ্লবী কল্পনা দত্ত স্মৃতিচারণ করেছেন- '...জামিনে মুক্ত হয়ে আসার পর দু-একদিনের মধ্যে মাষ্টারদার চিঠি আসে পলাতক হওয়ার নির্দেশ নিয়ে৷ অদ্ভুত আনন্দ হয়েছিল সেই দিন৷ সন্ত্রাসবাদী দলে এককালে মেয়েদের আসা নিষিদ্ধ ছিল' (চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার লুণ্ঠনকারীদের স্মৃতিকথা, ১৯৪৬) এইসব নিষেধের বেড়া টপকানোও কিন্তু স্বাধীনতার ছোট ছোট ধাপ।

কমিউনিস্ট দলে মেয়েরা যখন কাজ করেছেন, তখনও তাঁরা ভালোই বুঝেছেন, লড়াই শুধু বাইরে না, ঘরেও। কমরেড বাণী দাশগুপ্ত বলেন-

'আমাদের তৎকালীন অবিভক্ত বাংলাদেশে কমিউনিস্ট পার্টিতে যোগ দিয়ে কাজ করাটা অনেক পরিবারে শরমের ব্যাপার বলে গণ্য হত….পরিবারের লোকেরা ভয় পেত-... ছেলের মা হতে সমস্যা হবে ইত্যাদি...শেষ পর্যন্ত বাড়ি ছাড়তে বাধ্য হলাম' (মণিকুন্তলা সেনের স্মৃতিচারণার বাণী দাশগুপ্ত: জনজাগরণে, নারীজাগরণে-মণিকুন্তলা সেন) আবার অকালে বিধবা হওয়া বিমলা মাজী তেভাগা আন্দোলনে জড়িয়ে পড়ে রীতি-নীতি চুলোয় যাওয়ার কথা বলেন: '১৯৪১ বিধবা আমি রঙিন পাড় কেটে নেওয়া সাদা শাড়ি পরি৷ দাদারা আমাকে কড়া পাহারার মধ্যে রাখে...মণিদির ( মণিকুন্তলা সেন) সোনার কাঠির স্পর্শে আমার দ্বিতীয় জন্ম ঘটল...মণিদির সঙ্গে দুধকেন্দ্র, রিলিফ সেন্টারে ঘুরে বেড়াতে শুরু করলাম আমি রঙিন শাড়ি পরেই ঘুরি, কাজ করি' (তেভাগা, মেদিনীপুরের আন্দোলন, ২০০৬)। অর্থাৎ বিপ্লবের ডাক এলোমেলো করে দিচ্ছে পিতৃতন্ত্রের নিদানকেও।

অথচ এই তেভাগা আন্দোলন, তারপর খাদ্য-আন্দোলন যখন লাগামছাড়া হল, তখন নেতারা পুরুষ কর্মীদের বললেন শহরে ফিরতে। আর নারীকর্মীদের কী বললেন? বললেন, রান্নাঘরে ফিরে যেতে। যার শিকল একবার ভেঙেছে, তার পক্ষে ঘরের চারদেওয়ালে ফেরা কি এতই সহজ? 'রান্নাঘরেই' বা কেন ফিরতে হবে? তাহলে কি নারীর এই 'স্বাধীনতা' ক্ষণিকের জন্য অনুমোদন করা হয়েছিল সমষ্টির স্বার্থে? সেই সমষ্টির একজন কি নারী নিজেও, নাকি তা সে নয়? কার স্বার্থে তাকে আবার সেই রবীন্দ্রনাথ বর্ণিত কল্যাণী মূর্তি ধারণ করে অধীনতাতেই মুক্তি খুঁজতে হবে?

যাইহোক, স্বাধীনতা পরবর্তী কালে, কংগ্রেসের AICW বা কমিউনিস্ট পার্টির মহিলা শাখা ন্যাশানাল ফেডারেসন অফ ইন্ডিয়ান উওমেন কাজ চালিয়ে যায়। শুরু হয় হিন্দু কোড বিল ঘিরে শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় প্রমুখ ডামপন্থী নেতাদের সঙ্গে মণিকুন্তলা সেনদের সংঘাত। হিন্দুদের বহু-বিবাহ ও বাল্যবিবাহ বন্ধ করা, হিন্দু নারীর ডিভোর্স ও খরপোশ চাওয়ার অধিকার নিশ্চিত করা, নারীর পৈত্রিক সম্পত্তিতে অধিকার নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে ভূমিকা নিয়েছিল 'হিন্দু কোড বিল'। মণিকুন্তলা সেনের বক্তব্য এই প্রসঙ্গে উল্লেখ করার লোভ কিছুতেই সংবরণ করতে পারছি না।

'এই বিলের নিরিখে দেখার সুযোগ পেলাম নামি ও দামি লোকেরাও সমাজ চেতনায় কত সংকীর্ণমনা এবং কত রক্ষণশীল...

আমরা প্রখ্যাত আইনজ্ঞ অতুল গুপ্ত মহাশয়ের কাছে গেলাম তাঁর কাছ থেকেই আমরা সংগ্রহ করতে পারলাম আমাদের প্রচারের মালমশলা নানা জায়গায় তাঁর বক্তৃতার জন্য আমরা মহিলা ও ভদ্রলোকদের নিয়ে ঘরোয়া সভারও আয়োজন করেছিলাম ...

আমরা সেই সময় প্রচারমূলক কর্মসূচীর সমাপ্তি উপলক্ষ্যে ইউনিভার্সিটি ইনস্টিটিউট হলে একটা জনসভা ডেকেছিলাম প্রধান বক্তা শ্রীযুক্তা সরোজিনী নাইডু আর সভানেত্রী ছিলেন প্রভাবতী দেবী সরস্বতী

মিটিং-এর ঘন্টাখানেক আগে আমরা হলের দুয়ারে গিয়ে তাজ্জব হল তখন পরিপূর্ণ রাস্তা বা গেট দিয়ে প্রধান বক্তা বা সভানেত্রীকে নিয়ে আমরা ঢুকতেই পারছি না ভিড়ের ঠেলায় ভাবলাম হয়তো আমাদের মিটিং শুনতেই এত লোকের আগমন ... কিন্তু তাদের চেহারা আর হাবভাব দেখেও কেমন সন্দেহ হচ্ছিল'

না, শ্যামাপ্রসাদরা মিটিং করতে দেননি সেদিন। মণিকুন্তলা সেন আরও লিখছেন, 'খোঁজ নিয়ে জেনেছিলাম, গাড়ি গাড়ি মেয়ে আনা হয়েছিল পাথরেঘাটা থেকে এবং তাদের বলা হয়েছিল সমস্ত হিন্দুকে মুসলমান করে দেবার আইন বন্ধ করার জন্য তোমাদের যেতে হবে বেচারারা মুসলমান হওয়ার ভয়ে এসে হল্লা করে গেল দুটো করে টাকাও নাকি প্রত্যেকে পেয়েছিল'

আরএসএস তো বটেই, কংগ্রেসের কট্টর নেতারাও হিন্দু কোড বিলের বিরোধিতাই করেছিলেন। যুক্তি ছিল সেটাই, যা সতীদাহ, বিধবাবিবাহ থেকে শুরু করে শবরীমালা অবধি অপরিবর্তিত আছে- তা হল 'ট্র্যাডিশন'। এ আসলে হিন্দুধর্মের ওপর আঘাত, নারী অধিকার পেলে সমাজ ধ্বংস হয়ে যাবে।

এদিকে তেভাগার পরে যাদের রান্নাঘরে ফিরে যেতে বলা হল, তাঁরাও বা তা পারলেন কই? তাঁরা জড়ালেন খাদ্য আন্দোলনে। তারপর কেউ কেউ নকশাল আন্দোলনে। বিপ্লবের পথেও স্বাধীনতা পেলেন কি? 'আমরা তো এসেছিলাম নারী-পুরুষে, ধর্মে ধর্মে জাতিতে জাতিতে কোনও বিভেদ থাকবে না এটা জেনেই যা কিছু সামন্ততান্ত্রিক, তাকে দূর করবে আমাদের এই রাজনীতি কিন্তু যখন বুঝিয়ে দেওয়া হল, আমরা নারী, এখানে একটা লক্ষণরেখা টানা আছে আমাদের জন্য, তখন মনে হল তাহলে কি বাড়ি-ঘর ছেড়ে ভুল করলাম?', বলেছেন নকশাল কর্মী কৃষ্ণা বন্দ্যোপাধ্যায়, 'নক্সাল আন্দোলনে মেয়েরা' বইতে। বিপ্লবের ময়দানে সূক্ষ্ম কী কী বৈষম্য থেকে গেল, তা বিশদে আলোচনা করা যায়। কিন্তু আন্ডারগ্রাউন্ড জীবনের থেকে যেহেতু সধারণ জীবনে নারীর স্বাধীনতাই এখানে মূল আলোচ্য, তাই বরং সে বিষয়েই বলি। 'চারু মজুমদারের স্ত্রী' যেমন বিমা কোম্পানির কাজ করতেন সংসার ভরণপোষণের জন্য, ঠিক সেভাবেই সেলাইকল চালাতেন, নার্সিং করতেন নকশাল বাড়ির বহু মেয়ে-বউরা। তা বহিরঙ্গে হয়ত নারীর অর্থনৈতিক স্বাধীনতার দ্যোতক। এমনকি উপার্জমক্ষম নারী ও অর্থনৈতিক ভাবে নির্ভরশীল রাজনৈতিক কর্মী পুরুষের সমীকরণটি দেখলে তাকে জেন্ডার বেন্ডারের উলটপুরাণও মনে হতে পারে। কিন্তু বিষয়টি আরেকটু জটিল। উপার্জন তাঁরা করতেন বটে, কিন্তু সেটা গার্হস্থ্য-প্রতিপালনেরই প্রবর্ধিত রূপ। সংসার, শিশু, বৃদ্ধদের দেখাশোনা ও সেই সঙ্গে সংসারের জন্য প্রয়োজনীয় উপার্জনটুকু করা- এই পুরো দায়িত্বটিকেই 'মেয়েলি' কাজ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছিল। সক্রিয় রাজনীতি থেকে অনেকেই আস্তে আস্তে অদৃশ্য হয়েছেন। যে রাজনৈতিক মতাদর্শ তাত্ত্বিকভাবে দাঁড়িয়ে আছে শ্রমের মূল্যের ওপর, সেইখানেও যদি গার্হস্থ্য শ্রমকে 'শ্রম' না বলে কখনও বলা হয় 'আত্মত্যাগ', কখনও 'সহিষ্ণুতা', তা হলে তার মাধ্যমে নারীর স্বাধীনতা আসে কীভাবে? আসেওনি।

১৯৭৪ সালে প্রকাশিত হয় ‘Towards Equality Report’। সংবিধানের লিঙ্গসাম্যের প্রতিশ্রুতি ও বাস্তব অবস্থার মধ্যে আকাশ-পাতাল ফারাকটা চোখে পড়ে তখন। শিক্ষা, রাজনীতি, সমাজ সর্বক্ষেত্রে নারীর পরাধীন অবস্থারই দলিল এই ঐতিহাসিক রিপোর্ট। 'নারী স্বাধীনতা' নিয়ে যে আলাদা করে রব তোলা দরকার, তা যে অন্যান্য রাজনৈতিক আন্দোলনের বাই-প্রোডাক্ট হিসেবে শুধু মান্য হতে পারে না, তা মনে হয় তখনই বোঝা গেল। নারী সংগঠনগুলো ধর্ষণ, পণ, ভ্রুণহত্যা ও ঘরোয়া হিংসার মত বিষয়গুলি নিয়ে সরব হল। সত্তরের দশকের শেষভাগ থেকে পরিবারের ভিতর নারী নির্যাতনকে 'পারিবারিক সমস্যা বা ব্যক্তিগত বিষয়' না বলে সামাজিক সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করা হল। পণপ্রথার বিরুদ্ধে জনমত গঠন শুরু হল। ১৯৮০ সালে মথুরা রেপ কেসের পর ধর্ষণের বিরুদ্ধে সরব হল মেয়েরা। ১৯৮৩ সালে এল গৃহহিংসা বিরোধী ও পণ নির্যাতন বিরোধী ৪৯৮ক ধারা, সেই 'পুরুষখেকো' 'পক্ষপাতদুষ্ট' ধারা যা নারীর বেঁচে থাকার জন্য প্রয়োজন ছিল। তখনও মানসিক নির্যাতন বা অর্থনৈতিক নির্যাতনের ধারণাই গড়ে ওঠেনি। শুধু দৈহিক নির্যাতন ও খুন থেকে বধূকে বাঁচানোই উদ্দেশ্য ছিল। তাতেও এত সমালোচনা। 'প্রবাসী' পত্রিকা ১৩৩৬, শ্রাবণ-এ লেখা হচ্ছে- 'চাকরাণীর উপর এরূপ অত্যাচার করিলে সে কাজ করিবে না৷ কিন্তু বধূ ক্রীতদাসীর অধম তাহাকে কিনিতে টাকা লাগে না...একটি বউ মরিলে, তাহাকে মারিয়া ফেলিলে, অন্য বউ পাওয়া যায়' আর ২০০৫ সাল গড়িয়ে যাচ্ছে শারীরিক, মানসিক, যৌন, অর্থনৈতিক হিংসাকে 'গৃহহিংসা' নাম দিয়ে তাকে দেওয়ানি আইনের আওতায় আনতে। একে মনে হয় রাষ্ট্রের সদিচ্ছার উদাহরণ বলা যায় না।

উনিশশো সত্তর থেকে নারী নিজের শরীরের উপর অধিকার সম্পর্কে সচেতন হওয়ায়, বৈবাহিক ধর্ষণ বা যৌনকর্মীর ধর্ষণ বা জন্মনিয়ন্ত্রণের মতো বিষয়গুলিও গুরুত্ব পেল। কিন্তু এটাও উল্লেখযোগ্য যে দলিত নারীরা এরকম কিছু প্রশ্ন অনেক আগেই তুলেছিলেন। ১৯৪২ সালে ২০ জুলাই ঐতিহাসিক 'সর্বভারতীয় বঞ্চিত শ্রেণীর মহিলা সম্মেলনে' (AIDCW) সভাপতিত্ব করতে গিয়ে সুলোচনা ডংরে জন্মনিয়ন্ত্রণের পক্ষে, নারীর নিজের শরীরে নিজের অধিকারের পক্ষে সওয়াল করেন। যাইহোক, এই ধরনের বিষয় নিয়ে আন্দোলন স্বাধীনতা সংগ্রামের পর্যায়ের থেকে আলাদা ছিল, তা ছিল একান্তই নারীদের দাবি। কিন্তু স্বাধীন দেশেও নারী আন্দোলনের বিভিন্ন পর্যায়ে অন্যান্য খণ্ডপরিচয়ের বিতর্কে ও ভোটব্যাংকের চাপে নারীর দাবি পর্যদুস্ত হয়েছে। যেমন, ১৯৮৫ সালে শাহবানু মামলায় সুপ্রিম কোর্ট পঁচাত্তর বছরের শাহবানুর রক্ষণাবেক্ষণের ভার তার স্বামীকে নিতে বাধ্য করলেও একদিকে অভিন্ন দেওয়ানি বিধির দাবি, অপরদিকে ধর্মীয় স্বাতন্ত্র্য বজায় রাখার লড়াইয়ের মধ্যে নারীর অধিকারের প্রশ্ন গৌণ হয়ে গেল। আবার ১৯৮৭ সালে রাজস্থানে রূপ কানোয়ারের সতীদাহের ঘটনা আবারও গোষ্ঠীর স্বায়ত্তশাসন বনাম নারীর অধিকারের বিতর্ক তৈরি করল। অথচ সতীদাহ নাকি রদ হয়েছিল ১৮২৬ সালেই! দেখা গেছে, ইতিহাসের নানা বাঁকে এমন পরিস্থিতি সৃষ্টি হলে নারীর দাবি পিছু হটেছে ভোটব্যাংকের চাপে, বা নারী নিজেই নিজের ধর্মীয় বা জাতিগোষ্ঠীর স্বার্থে নিজের অধিকারের প্রশ্নকে মুলতুবি রেখেছে৷

নব্বই-এর দশকে গড়ে ওঠে খণ্ডপরিচয় ও নারীপরিচয়কে মেলানোর বা ইন্টারসেকশনালিটিকে প্রাধান্য দেওয়ার চেষ্টা। এ'দশকে আসে কর্মক্ষেত্রে নারীর সুরক্ষা নিশ্চিত করতে বিশাখা রায়। ভাঁওরি দেবী তো ধর্ষিতা হয়েছিলেন স্রেফ নিজের কাজটুকু করতে গিয়েই। গ্রামের ঘরে-ঘরে গিয়ে বাল্যবিবাহের কুফল, অনুপযুক্ত শৌচব্যবস্থা, মেয়েদের সর্বক্ষেত্রে অধিকারের সীমাবদ্ধতা ইত্যাদি বোঝানোই ছিল তাঁর কাজ। গ্রামের অবস্থাপন্ন গুজ্জর রামকরণের এক বছরেরও কমবয়সি মেয়ের বিয়ে আটকাতে গিয়েছিলেন। সেদিনের মতো বিয়ে ঠেকানো গেলেও পরদিন পুলিশের উপস্থিতিতেই বিয়ে হয় ও ভাঁওরি দেবীকে গণধর্ষণ করা হয় ১৯৯২ সালের ২২ সেপ্টেম্বর। পুলিশ হেনস্থা করে, সমাজ একঘরে করে- স্বাধীন ভারতেই ঘটেছে এসব ত্রিশ বছর আগে। ভাঁওরি দেবী অবশ্য প্রথমে নিম্ন ও উচ্চ-আদালতে যান। তাঁর কেসের ফলেই ১৯৯৭ সালে কর্মক্ষেত্রে যৌন হয়রানি মোকাবিলায় তৈরি হয়েছিল ‘বিশাখা গাইডলাইনস’। ২০১৩ সালে সেটিই যৌন হয়রানি বিরোধী আইনে রূপান্তরিত হয়। অথচ কার্যক্ষেত্রে সেই আইনের ঢিলেমির কারণে একবিংশ শতকেও মিটু আন্দোলনে যৌন অপরাধীর খাতায় একের পর এক বিদগ্ধজনের নাম ওঠে।

নব্বই দশকের আরেকটা গুরুত্বপূর্ণ দাবি ছিল রাজনীতিতে মহিলা আসন সংরক্ষণ। শাসনব্যবস্থায় অংশীদারিত্বও নারী-স্বাধীনতার একটি সূচক হিসেবে স্বীকৃত। ১৯৯৬ সালে এই বিল প্রথম উত্থাপিত হয়, আজও লোকসভায় তা পাশ হয়েনি। পঞ্চায়েত ব্যবস্থায় নারীর জন্য আসন সংরক্ষণ হয়েছে৷ কিন্তু ক্রমশ পিতৃতন্ত্র বের করে নিয়েছে অন্য ফিকির। দলের সক্রিয় মেয়েদের বাদ দিয়ে নেতার বউ-বোনকে টিকিট দেওয়া হচ্ছে। পঞ্চায়েতের ক্ষমতাও হ্রাস করা হচ্ছে। সংসদে মহিলা আসন সংরক্ষণ হলেও হয়ত বের করে নেওয়া হবে এমন কোনো ফন্দি, যাতে নারী-স্বাধীনতা হালে পানি না পায়।

একবিংশ শতকে ২০১২ সালে নির্ভয়া আন্দোলনের পর এসেছে ধর্ষণ আইনে সংশোধন। ধর্ষণের সংজ্ঞার সম্প্রসারণ হয়েছে। কিন্তু কার্যক্ষেত্রে পুলিশ-প্রশাসনের মানসিকতা, ধর্ষিতার সঙ্গে আচরণ পাল্টেছে কি? বৈবাহিক ধর্ষণকেও 'সংস্কৃতির' দোহাই দিয়ে আইনের আওতার বাইরে রাখা হয়েছে। ২০১৫ সালে ছাত্রীদের হস্টেলে ফেরার সময়কে কেন্দ্র করে পিঞ্জরা তোড় আন্দোলন, ২০১৮ সালে স্যানিটারি ন্যাপকিনে জিএসটি ছাড়ের আন্দোলন বা শবরীমালা মন্দিরে মহিলাদের প্রবেশাধিকারের আন্দোলন তো মূলধারার নারীবাদী আন্দোলনই, কিন্তু সেগুলি ঘটেছে বিক্ষিপ্ত ভাবে। ২০১৯ সালে শাহিনবাগ আন্দোলন আবারও, সেই স্বাধীনতা আন্দোলনের যুগের মতো, কমিউনিস্ট আন্দোলনের যুগের মতো, তথাকথিত মূলধারার আন্দোলনের সঙ্গে নারী-আন্দোলনকে মেলালো। নাগরিকত্ব হারানোর ভয়ে খোলা আকাশের নিচে জড়ো হলেন সেই মেয়েরা, যাঁরা হয়ত কোনোদিনও পর্দা ছেড়ে বেরোননি, রাত করে নাইটশো দেখে বাড়িও ফেরেননি। অচলায়তন কি ভাঙবে একটু হলেও? আগেই বলেছি, ঝঞ্ঝার কালে একবার নারী বাড়ি ছেড়ে বেরোতে বাধ্য হলে তাকে ঘরে ফেরানো সহজ হয়নি। তাহলে কি আশা করতে পারি যে নিজের ধর্মীয় সম্প্রদায়ের নাগরিকত্বের দাবি পূরণ হয়ে গেলে যদি এই মেয়েদের 'রান্নাঘরে ফেরত যাও' বলা হয়, তাহলে তাঁরা নতমুখে আদেশ পালন করবেন না? বরং নতুন নতুন প্রশ্ন তুলবেন পিতৃতন্ত্রের উদ্দেশ্যে? বর্তমান কৃষক আন্দোলনেও রয়েছে মেয়েদের অবিসংবাদিত ভূমিকা। এঁরা দিল্লির সড়কে আজও রাত কাটাচ্ছেন নিজের পেশাগত সম্প্রদায়ের স্বার্থ বুঝে নিতে। এঁদের নিজস্ব যা কিছু দাবিদাওয়া ছিল, তার মধ্যে মুখ্য ছিল চাষের জমিতে নারীর মালিকানা। এই মুহূর্তে সেই দাবি চলে গেছে পিছনের সারিতে। কৃষি-আইন বাতিল যদি হয় শেষমেশ, এঁরা নিজেদের অধিকার পাবেন তো? এসবের উত্তর পেতে অপেক্ষা করতে হবে আরও কিছু কাল। আশার কথা এটুকুই যে আন্দোলনে ব্যাপক হারে নারীর অংশগ্রহণ নারীর দৃষ্টিকোণ থেকে সমস্যাকে দেখতে বা আন্দোলনের গতিপথকে লিঙ্গসাম্যের দিকে নিয়ে যেতে সাহায্য করে। এর একটা বড় উদাহরণ বোধহয় স্বাধীনতার আন্দোলনে নারীর প্রবল অংশগ্রহণের ফলে সংবিধানে লিঙ্গসাম্যের অঙ্গীকার, যদিও কার্যক্ষেত্রে তার যথাযথ প্রয়োগ হয়নি।

নারীশিক্ষা আর নারীর কর্মজগৎ নিয়েও একবিংশ শতকের ভারত টালমাটাল। সেই ইতিহাসও ফিরে দেখা যাক। বিদ্যাসাগর কলকাতায় শুধু নয়, জেলায় জেলায় মেয়ে-স্কুল স্থাপন করছেন যখন, তখনও শিক্ষয়িত্রী নিয়োগ করতে চাননি। নারীশিক্ষা নিয়েই সমাজের এত আপত্তি, এর পর তারা পেশা বেছে নেবে, ইস্কুলে পড়াবে...বিদ্যাসাগরের মনে হয়েছিল, দেশবাসীর পক্ষে এতদূর মেনে নেওয়া সম্ভব নয়। প্রাচীনপন্থীদের মত ছিল, লেখাপড়া শিখলে নারী বিধবা হয়, কিংবা অলস, গৃহকর্মবিমুখ, পটের বিবি হয়ে যায়। জ্ঞানদানন্দিনী দেবী 'পুরাতনী'তে বর্ণনা করছেন তাঁর মায়ের লুকিয়ে লেখাপড়া করার কথা। শান্তা দেবী বর্ণনা করছেন, হেঁটে ইস্কুল থেকে বাড়ি ফেরার পথের কত বিদ্রুপ, কত টিটকিরি!

অন্যদিকে নারীশিক্ষার প্রগতিশীল প্রবক্তারা দাবি করছিলেন, 'সুগৃহিনী হতে গেলে সুশিক্ষিতা হওয়া প্রয়োজন।' আয়-ব্যয়ের হিসেব রাখা, পরিমাণ বুঝে খরচ করা এবং মার্জিত বুদ্ধির প্রয়োগে গুরুজনদের সঙ্গে সু-ব্যবহার করতে পারার জন্য, তথা সুমাতা হওয়ার জন্য নারীর শিক্ষিত হওয়া প্রয়োজন৷ ঠিক কতটুকু পড়লে সুগৃহিণী বা সুমাতা হয়? 'স্ত্রীশিক্ষা' প্রবন্ধে রবীন্দ্রনাথও বলেছেন—

'মেয়েদের মানুষ হইতে শিখাইবার জন্য বিশুদ্ধ জ্ঞানের শিক্ষা চাই, কিন্তু তার উপর মেয়েদের মেয়ে হইতে শিখাইবার জন্য যে ব্যবহারিক শিক্ষা তার একটা বিশেষত্ব আছে'

তাঁর বিপ্রতীপ মেরুতে দাঁড়িয়ে বেগম সাখাওয়াৎ হোসেন ঝাঁঝিয়ে উঠলেন 'মতিচূর' গ্রন্থে-

'উপার্জন করিব না কেন? আমাদের কি হাত নাই, পা নাই, না বুদ্ধি নাই? কি নাই? যে পরিশ্রম আমরা স্বীয় গৃহকার্য্যে ব্যয় করি, সেই পরিশ্রম দ্বারা কি স্বাধীন ব্যবসা করিতে পারি না?' অর্থাৎ শুধু শিক্ষা নয়, পেশা নির্বাচনের দাবি! রোকেয়া আরও বললেন- 'কন্যাগুলিকে সুশিক্ষিত করিয়া কার্যক্ষেত্রে ছাড়িয়া দাও নিজেরা অন্নবস্ত্র উপার্জন করুক'

ঠাকুরবাড়ির মেয়েরা-বউরা যতই বিলেতে যান, জ্ঞানদানন্দিনীরা যতই গাড়ি চালান, নতুন কায়দায় শাড়ি পরুন, তাঁরা যতই লেখালেখি করুন আর কঠিন পরীক্ষায় বসার কথা ভাবুন, জীবিকা অর্জনের কথা তাদের চিন্তায় স্থান পেত না। সরলা দেবী যখন মহীশূরের মহারানী গার্লস কলেজে সুপারিন্টেনডেন্ট হলেন, তখন ঠাকুরবাড়ি টলে গিয়েছিল। পার্টিশনের পর ওপার থেকে আসা মেয়েরা সংসারের প্রয়োজনেই অবশ্য বাধ্য হয়েছিল উপার্জনশীল হতে।

আজ সর্বশিক্ষা অভিযানের কুড়ি বছর হল। শিক্ষার অধিকার আইনও এসেছে বারো বছর। ৬ থেকে ১৪ বছরের মেয়েরা স্কুলের অঙ্গনে এসে পৌঁছেছিল কি লকডাউনের আগেও? সর্বশিক্ষা অভিযান যে ২০১০ সালের মধ্যে তাদের স্কুলে আনার সময়সীমা ধার্য করেছিল, তা তো কবেই অতিবাহিত! আর লকডাউনের ফলে যে কত মেয়ে স্কুলছুট হল! তাদের ফেরানো কি সম্ভব হবে? কতজন যে মেয়ে বলেই মোবাইল ফোনে অধিকার পেল না! কতজন হারিয়ে গেল নিষিদ্ধপল্লির গলিতে! এসবের সঠিক পরিসংখ্যান কি কখনও মিলবে?

এদিকে মেয়েদের উচ্চশিক্ষার হার বাড়ছে, অথচ মেয়েরা আসছে না কাজের জগতে। অতিমারিতে যত পুরুষ কাজ হারিয়েছে, মেয়েরা হারিয়েছে তার কয়েকগুণ। আজ ভারতে বড় জোর ২১ শতাংশ কর্মক্ষম মেয়ে শ্রমবাহিনীর অংশ, অথচ ১৯৯০ সালেই ভারতের কর্মক্ষম মেয়েদের প্রায় ত্রিশ শতাংশ কাজের জগতে ছিল! চাকরি করার পর রোজকারের অর্থই বা নিয়ন্ত্রণ করে কে? পিতা, স্বামী, শ্বশুরের কাছে এটিএম কার্ড বা পাসবই গচ্ছিত রাখার বিরুদ্ধে তো আইন করা যায় না। তাই 'মেয়েরা হিসেব বোঝে না'- এই অজুহাতে অর্থনৈতিক স্বাধীনতাও হরণ করা যায়। সেই পাসবই, সেই এটিএম কার্ড ফেরত পাওয়ার লড়াইটা ঘরের লড়াই, বাইরের নয়।

আজ হিন্দু কোড বিলে বর্ণিত অধিকার স্বীকৃত হয়েছে। তা সত্ত্বেও ভারতে নাকি বিবাহবিচ্ছেদের হার পৃথিবীর মধ্যে সবচেয়ে কম, মাত্র ১%। আজও বিবাহ-বিচ্ছেদ একটু ট্যাবু বিষয় এ'দেশে। পিতার সম্পত্তিতে আইনি অধিকার পাওয়া গেছে, কিন্তু তা দাবি করে কজন মেয়ে? দাবি করলে সমালোচনা হয়। সেই সমালোচনাকে পাত্তা না দেওয়ার লড়াইটাও ঘরের। যে শ্বশুরবাড়িকে 'নিজের বাড়ি' ভাবতে শেখানো হয়, সেখানকার সম্পত্তিতে মেয়েদের অধিকার নেই কেন? আইনি অধিকার যেখানে নেই, তা 'নিজের বাড়ি' হয় কীভাবে? সম্পদে অধিকার এবং অর্থনৈতিক স্বাধীনতাই সার্বিক স্বাধীনতার প্রথম ধাপ। তার জন্য, দুর্ভাগ্যবশত নারীকে লড়তে হয় শুধু রাষ্ট্রের সঙ্গে নয়, পরিবারের সঙ্গেও।

গৃহশ্রমের পারিশ্রমিকহীন দায়িত্বের দাস হয়ে, শখ-পেশা-স্বাধীনতা বিসর্জন দেওয়া মেয়েরা স্রেফ ঘরের লড়াইকে, আপনজনের সঙ্গে লড়াইকে 'অহেতুক' ভেবে পরাধীনতা মেনে নেয় আজও। শরীর, শ্রম, অর্থ- সব কিছুর স্বত্ত্ব ছেড়ে দেয়, কারণ 'ওরা তো পরিবার, ওরা তো আপনজন।' তাই পরিবার টিকে থাকে, কিন্তু 'নারী স্বাধীনতা' কথাটি বাগাড়ম্বর হয়ে যায়। আজও উদারমনা শ্বশুরবাড়িরা প্রাপ্তবয়স্ক বধূকে পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার, চাকরি করার বা পছন্দের পোষাক পরার 'অনুমতি' দেন শুনতে পাই। বেশিরভাগ অবশ্য তা-ও দেন না। অর্থনৈতিক চাপে লিঙ্গভিত্তিক শ্রমবিভাজন কিছুটা ধাক্কা খেয়েছে। বাড়ির পুরুষটি গৃহকাজেও হাত লাগান কোনো কোনো পরিবারে। কিন্তু সেটিকে তাঁর মহত্ত্ব হিসেবে দেখা হয়, কর্তব্য হিসেবে নয়। আগে বলা হত 'মেয়েরা সব পারে'। অধুনা ভাষায় বলা হয় 'মাল্টিটাস্কার'৷ ভবি তাতে ভোলেও। নারীবাদ আজকাল 'ইন থিং', সেও এক মুশকিল। শহুরে পুরুষদের মধ্যেও লিঙ্গসাম্য-অভিলাষী হিসেবে প্রতিষ্ঠা পাওয়া এক অভীষ্ট। কিন্তু 'সঠিক' ও 'বেঠিক' নারীবাদ নিয়ে মাতব্বরি করার গুরুদায়িত্ব কাঁধে নিয়ে ফেলার অভ্যাস রবীন্দ্রনাথের উত্তরসূরিরা আজও ছাড়তে পারেননি। নারী-আন্দোলনের ক্যাপিটালিজম দ্বারা গ্রস্ত হওয়ার ভয়ও ফিরে ফিরে আসে। ভয় করে 'হোয়াই শুড বয়েজ হ্যাভ অল দ্য ফান' ধরণের 'ফেমিনিস্ট' বিজ্ঞাপন দেখলে। কারণ লক্ষ্য ছিল গোষ্ঠীর মুক্তি, ব্যক্তির ফূর্তি নয়। ক্যাপিটালিজম নিও-লিবারেলিজমের অবতারে এসে ব্যক্তিস্বাতন্ত্র‍্যর বুলি আওড়ায়। তাকে নারী-স্বাধীনতা বলে ভুল না হয়!

তদুপরি বাইরের লড়াইটিও পেকে উঠেছে ইদানিং। রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় আসীন হিন্দু-ব্রাহ্মণ্যবাদী একটি দল। তারা গো-মাংস রান্না করলে অভিনেত্রীকে গণধর্ষণের হুমকি দেয়। হাফপ্যান্ট বা রিপড জিন্স পরা নিয়ে প্রকাশ্য অসন্তোষ প্রকাশ করে। তারা আট বছরের আসিফার ধর্ষণ ও মৃত্যুর পর ধর্ষকের সমর্থনে মিছিল করে। মেয়েরা যে কেবল পুরুষের সন্তান উৎপাদন, যৌনসুখ প্রদান এবং গৃহকর্মের সাধনের জন্য, এই মনোভাব বিজেপির আদর্শগত উৎসমুখ আরএসএস কখনও গোপন করেনি৷ আরএসএস যে দুর্গাবাহিনী পরিচালনা করে, বিজেপির আছে যে মহিলা মোর্চা, তা নারীর এই সনাতনী রূপকেই তার শক্তির উৎস বলে মানে। আরএসএস-এর বর্তমান প্রধান মোহন ভাগবত তো বলেছেনই, 'ছেলেরা বিবাহ করে সুখ পাওয়ার জন্যে, আর মেয়েরা বিয়ে করে ছেলেদের সুখ দেওয়ার বিনিময়ে নিজেদের পেট চালানোর জন্য...মেয়েদের বাড়ির মধ্যেই থাকা উচিত ও বাড়ির কাজই করা উচিত'

এরা সংবিধানে ভরসা না রেখে মনুবাদী ভারত গড়তে চায়। মনুশাস্ত্রে নারী হচ্ছে পুরুষের ইচ্ছাধীন যন্ত্র। সাক্ষী মহারাজ থেকে সাধ্বী প্রজ্ঞা সবাই বলেন হিন্দু নারীকে চার-পাঁচটি সন্তান উৎপন্ন করতে হবে মুসলমানদের ঠেকাতে। মোহন ভাগবত বলেন ধর্ষণ হল বিদেশি সংস্কৃতি ও নারী-স্বাধীনতার ফল। একই কথা আদিত্যনাথের, 'মেয়েদের রক্ষা করতে হবে, স্বাধীনতা দেওয়া অবান্তর তাঁরা পুরুষের অধীনে থাকবে' আদিত্যনাথের নিজের রাজ্য উত্তর প্রদেশে, অথচ, ধর্ষণ পরিসংখ্যান হাড় হিম করা। উন্নাওতে বিজেপি এমএলএ নিজেই ধর্ষক। হাথরসে দলিত মেয়েকে নিজের জায়গা চেনাতে ধর্ষণ করে শিরদাঁড়া ভেঙে জিভ উপড়ে নিয়েছে উচ্চবর্ণের পুরুষ, আর পুলিস দায়িত্ব নিয়ে জ্বালিয়ে দিয়েছে মৃতার শরীর রাতারাতি। এসবের বিহিত করার বদলে বিজেপি এনেছে লাভ জিহাদ অর্ডিনান্স, যা শুধু সাম্প্রদায়িক নয়, নারীর সঙ্গী-নির্বাচনের স্বাধীন সিদ্ধান্তের ধারণার বিরুদ্ধে। আজ মুসলমানকে বিয়ে করায় মানা হলে, কাল অসবর্ণে বিয়ে না করার আইন আসবে। আমরা কি পিছন দিকে হাঁটছি?

ঘরে ও বাইরে স্বাধীনতার লড়াই তাই ৭৫ বছরের মাথায় থামেনি, কমেনি, বরং আরও ঘনিয়ে উঠেছে। দেশ মানে তো নিজস্ব আকাশ, নিজস্ব ঘর এক টুকরো। এতটুকুর জন্যই ঘর ও বাহিরময় যুগ যুগের এত লড়াই। স্বাধীন দেশে স্বাধীনতার এ লড়াই নিরন্তর৷ পাথর যে জগদ্দল। তদুপরি আবার সে যে কোনো মুহূর্তে গড়িয়ে আসতে পারে পিছনে। ইঞ্চি ইঞ্চি সে পাথর সরানোর কাজ বড় বেশি ধৈর্য, সময় ও মনোবল দাবি করে।

0 Comments

Post Comment