পড়শি যদি আমায় ছুঁতো যম যাতনা সকল যেত দূরে: লালন সাঁই

পড়শি যদি আমায় ছুঁতো যম যাতনা সকল যেত দূরে: লালন সাঁই

hhhhhhhhhhhhhh

হিন্দুধর্মের ইতিহাস, হিন্দুত্বের রাজনীতি প্রথম পর্ব

  • 01 January, 1970
  • 0 Comment(s)
  • 200 view(s)
  • লিখেছেন : শুভজিৎ বসাক
হিন্দুধর্ম ও হিন্দুত্বের পার্থক্য বুঝতে হলে প্রথমেই ইতিহাসের একটি মৌলিক প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হবে: হিন্দুধর্ম বলতে আমরা ঠিক কী বুঝি? এটি কি কোনও একজন ধর্মপ্রবর্তকের প্রতিষ্ঠিত, একটি নির্দিষ্ট ধর্মগ্রন্থে সংজ্ঞায়িত, অভিন্ন নিয়মে পরিচালিত ধর্ম? নাকি বহু শতাব্দী ধরে বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর বিশ্বাস, দর্শন, উপাসনা, আচার, সামাজিক রীতি ও সাংস্কৃতিক আদানপ্রদানের মধ্যে দিয়ে গড়ে ওঠা একটি বিস্তৃত ধর্মীয় ঐতিহ্য?

উত্তরাখণ্ডের অঙ্কিতা ভান্ডারী, একজন নারী খুন হয়েছিলেন আপোষ না করে। মনুস্মৃতি (অধ্যায় ১, শ্লোক ৯১; অধ্যায় ১০, শ্লোক ১২১-১২৩; অধ্যায় ৮, শ্লোক ৪১৩) ও যাজ্ঞবল্ক্য স্মৃতির (অধ্যায় ১, শ্লোক ১২০) একাধিক বিধানে শূদ্রের জন্য দ্বিজ, বিশেষত ব্রাহ্মণের সেবাকে কর্তব্য হিসেবে নির্ধারণ করা হয়েছে। অন্যদিকে, মনুস্মৃতির কয়েকটি শ্লোকে স্ত্রীকে স্বামীর প্রতি আনুগত্য ও সেবার মধ্যে নারীর ধর্মীয় কর্তব্য পালন করতে বলা হয়েছে (অধ্যায় ৫, শ্লোক ১৫৪-১৫৫)। এই বিধানগুলির মধ্য দিয়ে প্রাচীন ধর্মশাস্ত্রের একটি অংশে বর্ণভিত্তিক ও লিঙ্গভিত্তিক কর্তব্যের যে অসম কাঠামো দেখা যায়, তাকে প্রশ্ন করা জরুরি। অঙ্কিতা হয়তো মানতে পারেননি এই অসম কাঠামো। অভিযোগ যে এই খুনের সিবিআই চার্জশিটে নাম আছে (কীভাবে এবং কেন আছে জানা নেই) এক পুরুষ (তাই শ্রেষ্ঠ!) ভিভিআইপির। তিনি ইমপিউনিটি লাভ করেছেন রাজ্যপাল হয়ে। ইন্ডিয়া গেটে প্রোটেস্ট থেকে অঙ্কিতার মা-বাবাকে তুলে নিয়ে গেছে অ্যাসপিরান্ট হিন্দু রাষ্ট্রের পুলিশ (পুরুষ)। পশ্চিমবঙ্গীয় স্মার্তঃ শাক্তব্রাহ্মণ সঙ্গতি তার সোশ্যাল অ্যাকাউন্ট পেজে দিয়েছে, “চোরবাগানে ১৬ জন শূদ্র মরেছে আর একজন ব্রাহ্মণ মরেছে। ঘোর কলিতে দুর্গার চোখে কারা বেশি পাপিষ্ঠ বুঝে নাও তবে”! শূদ্র মরেছে। ব্রাহ্মণ কম মরেছে। পাপিষ্ঠ। নারী খুন হয়েছে। এখানেই হিন্দুধর্মের ইতিহাস, নারীর অধিকার এবং হিন্দুত্বের রাজনীতি নিয়ে আলোচনার প্রয়োজনীয়তা সামনে আসে।

হিন্দুধর্ম ও হিন্দুত্বের পার্থক্য বুঝতে হলে প্রথমেই ইতিহাসের একটি মৌলিক প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হবে: হিন্দুধর্ম বলতে আমরা ঠিক কী বুঝি? এটি কি কোনও একজন ধর্মপ্রবর্তকের প্রতিষ্ঠিত, একটি নির্দিষ্ট ধর্মগ্রন্থে সংজ্ঞায়িত, অভিন্ন নিয়মে পরিচালিত ধর্ম? নাকি বহু শতাব্দী ধরে বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর বিশ্বাস, দর্শন, উপাসনা, আচার, সামাজিক রীতি ও সাংস্কৃতিক আদানপ্রদানের মধ্যে দিয়ে গড়ে ওঠা একটি বিস্তৃত ধর্মীয় ঐতিহ্য? ইতিহাসের দিকে তাকালে দ্বিতীয় ব্যাখ্যাটিই অনেক বেশি গ্রহণযোগ্য। কারণ হিন্দুধর্মের এমন কোনও একক প্রতিষ্ঠাকাল, প্রতিষ্ঠাতা বা কেন্দ্রীয় ধর্মীয় কর্তৃপক্ষ নেই, যাঁর নির্দেশকে তার সমস্ত সম্প্রদায়ের জন্য সর্বকালের বাধ্যতামূলক বিধান বলে দেখানো যায়। হিন্দুধর্মের বিভিন্ন ধারার মধ্যে যেমন মিল রয়েছে, তেমনই রয়েছে মতপার্থক্য, বিরোধ, পরিবর্তন ও নতুন বিশ্বাসের সংযোজন। এই ইতিহাস না বুঝে হিন্দুধর্মকে একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক পরিচয়ের সমার্থক করে তুললে ধর্মটির প্রকৃত বৈচিত্র্যই আড়ালে চলে যায়।

‘হিন্দু’ শব্দটির ইতিহাস এবং হিন্দুধর্মের ইতিহাসকে একই সময়ের ঘটনা বলে ধরে নেওয়াও ভুল। প্রাচীন পারস্যের ভাষায় সিন্ধু নদ ও তার আশপাশের ভূখণ্ডের পরিচয় দিতে ‘হিন্দু’ বা তার কাছাকাছি শব্দের ব্যবহার দেখা যায়। অর্থাৎ, শব্দটির প্রাথমিক ব্যবহারের সঙ্গে ভৌগোলিক পরিচয়ের সম্পর্ক ছিল। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই শব্দের অর্থ ও প্রয়োগ বদলেছে। বিভিন্ন শাসনব্যবস্থা, ভাষা, ধর্মীয় সম্প্রদায় এবং সামাজিক সম্পর্কের মধ্যে দিয়ে ‘হিন্দু’ পরিচয় ক্রমশ নানা অর্থ অর্জন করেছে। আজ যে অর্থে আমরা হিন্দুধর্মকে একটি নির্দিষ্ট ধর্মীয় পরিচয় হিসেবে বুঝি, সেই অর্থকে প্রাচীন যুগের প্রতিটি মানুষের ওপর একইভাবে আরোপ করা যায় না। ঐতিহাসিক অড্রে ট্রুশকের গবেষণার গুরুত্ব এখানেই: অতীতের পরিচয়কে বর্তমানের পরিচয়ের সঙ্গে হুবহু এক করে না দেখে তার পরিবর্তনের ইতিহাস বুঝতে হয়। কোনও শব্দ বহু পুরনো হলেই সেই শব্দের আধুনিক রাজনৈতিক অর্থও সমান পুরনো হয়ে যায় না।

হিন্দুধর্মের ঐতিহাসিক বিকাশের অন্যতম প্রাচীন উৎস বৈদিক সাহিত্য। ঋগ্বেদের স্তোত্রগুলিতে ইন্দ্র, অগ্নি, বরুণ, সোমসহ বিভিন্ন দেবতার উদ্দেশে প্রার্থনা করা হয়েছে। বৃষ্টি, পশুসম্পদ, খাদ্য, যুদ্ধজয়, নিরাপত্তা ও সমৃদ্ধির মতো বাস্তব জীবনের বিষয় সেখানে গুরুত্বপূর্ণ। যজ্ঞ ও মন্ত্র ছিল সেই ধর্মীয় জগতের উল্লেখযোগ্য অংশ। কিন্তু পরবর্তী সময়ে ভারতীয় ধর্মীয় চিন্তা শুধু যজ্ঞ ও দেবতার উদ্দেশে প্রার্থনার মধ্যে আটকে থাকেনি। উপনিষদে এসে আত্মা, ব্রহ্ম, জ্ঞান, মৃত্যু, পুনর্জন্ম এবং মুক্তির মতো দার্শনিক প্রশ্ন গুরুত্ব পেয়েছে। বাহ্যিক আচার পালন করাই কি ধর্মের মূল, নাকি মানুষের অস্তিত্বের গভীর সত্যকে উপলব্ধি করাই প্রধান—এই ধরনের প্রশ্ন ভারতীয় দর্শনের ভিতরেই আলোচিত হয়েছে। অর্থাৎ, ধর্মীয় চিন্তার পরিবর্তন বাইরে থেকে এসে কেবল চাপিয়ে দেওয়া হয়নি; তার ভিতরেও নিজস্ব অনুসন্ধান, মতভেদ ও আত্মসমালোচনার ধারা ছিল।

এরপর মহাকাব্য, পুরাণ, মন্দিরকেন্দ্রিক উপাসনা, ভক্তি আন্দোলন এবং আঞ্চলিক ধর্মীয় ঐতিহ্য হিন্দুধর্মের পরিসরকে আরও বিস্তৃত করেছে। শিব, বিষ্ণু, কৃষ্ণ, রাম, দুর্গা, কালী ও অন্যান্য দেবদেবীকে কেন্দ্র করে নানা উপাসনা-পদ্ধতি তৈরি হয়েছে। শৈব ধারায় শিবকে কেন্দ্র করে ভিন্ন ভিন্ন দর্শন ও সাধনার বিকাশ ঘটেছে; বৈষ্ণব ধারায় বিষ্ণু ও তাঁর অবতারদের উপাসনা বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে; শাক্ত ধারায় দেবী ও শক্তির উপাসনা প্রধান স্থান অধিকার করেছে। আবার বিভিন্ন অঞ্চলের লোকদেবতা, গ্রামীণ আচার এবং স্থানীয় সংস্কৃতিও বৃহত্তর ধর্মীয় ঐতিহ্যের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে। কোনও কোনও ধারায় নিরাকার পরমসত্তার অনুসন্ধান প্রধান, কোনও ধারায় মূর্তির মাধ্যমে উপাসনা, কোথাও জ্ঞান, কোথাও ভক্তি, কোথাও কর্ম ও আচারকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এই সমস্ত ধারাকে (শাক্ত, বৈষ্ণব, গাণপত্য, কামাচারী, বামাচারী, তান্ত্রিক, সহজিয়া, নেড়ানেড়ি, কত্তাভজা, বৈদান্তিক, অদ্বৈতবাদী, নাস্তিক) একটি মাত্র মতবাদের মধ্যে সম্পূর্ণভাবে মিশিয়ে দেওয়া যায় না। প্রাচীন ভারতের ধর্মীয় ইতিহাস নিয়ে গবেষণার একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হল, হিন্দুধর্মকে একটি স্থির কাঠামো হিসেবে নয়, বরং পরিবর্তনশীল ও বহুস্তরীয় ঐতিহ্য হিসেবে বুঝতে হবে।

কিন্তু বহুত্বের এই ইতিহাসের পাশাপাশি আরেকটি সত্য রয়েছে। হিন্দুধর্মের সামাজিক ইতিহাসে বর্ণব্যবস্থা, জাতিভেদ, নারী-পুরুষের অসম অধিকার এবং ধর্মীয় কর্তৃত্বের অসম বণ্টনও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। ধর্মীয় গ্রন্থের ব্যাখ্যা দেওয়ার অধিকার সব মানুষের হাতে সমানভাবে ছিল না। সংস্কৃত শাস্ত্রের জ্ঞান, আচার পরিচালনা এবং ধর্মীয় বিধানের ব্যাখ্যার ওপর নির্দিষ্ট সামাজিক গোষ্ঠীর প্রভাব ছিল। ফলে ধর্মীয় ব্যাখ্যা কেবল আধ্যাত্মিক বিশ্বাসের বিষয় ছিল না; তার সঙ্গে সামাজিক মর্যাদা, সম্পত্তির অধিকার, পারিবারিক সম্পর্ক এবং ক্ষমতার প্রশ্নও যুক্ত হয়ে পড়েছিল। কোনও বিধানকে শাস্ত্রসম্মত ঘোষণা করা হলে তা সামাজিক নিয়ন্ত্রণের হাতিয়ার হয়ে উঠতে পারত। আবার সেই শাস্ত্রেরই অন্য ব্যাখ্যা দিয়ে প্রচলিত প্রথার বিরোধিতা করা সম্ভব ছিল। তাই শাস্ত্রে কোনও কথা লেখা আছে বলেই তা সর্বকালে, সর্বত্র, সব মানুষের কাছে একইভাবে গৃহীত হয়েছে—এমন সিদ্ধান্ত ইতিহাসের সঙ্গে মেলে না।

সতীদাহের ইতিহাস এই বিষয়টি বোঝার একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ। সতীদাহ বলতে স্বামীর মৃত্যুর পর তাঁর চিতায় বিধবার আত্মাহুতি দেওয়ার প্রথাকে বোঝানো হয়, এই প্রথাকে সমর্থন করার জন্য পরবর্তী সময়ে কিছু ধর্মশাস্ত্রীয় ব্যাখ্যায় বৈদিক সাহিত্যের উল্লেখ করা হয়েছিল। কিন্তু অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি প্রেস থেকে প্রকাশিত “উইডোজ আন্ডার হিন্দু ল” গ্রন্থের ‘সতীদাহ’ বিষয়ক সামারি অধ্যায়ের ২০১ নং পৃষ্ঠায় দেখানো হয়েছে, প্রাচীন ধর্মশাস্ত্রের (ধর্মসূত্র, মনুস্মৃতি, যাজ্ঞবল্ক্য ও নারদ-সম্পর্কিত) বহু গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থে সতীদাহের উল্লেখ নেই। পরবর্তী কয়েকটি স্মৃতিগ্রন্থে (বিষ্ণুস্মৃতি, পরাশর স্মৃতি, বৃহস্পতি স্মৃতি, দক্ষস্মৃতি) সতীদাহের উল্লেখ দেখা যায়। গবেষণাটিতে ধর্মশাস্ত্রীয় ঐতিহ্যের মধ্যে সতীদাহ সম্পর্কে নিষেধ থেকে অনুমোদনের দিকে ধীরে ধীরে পরিবর্তনের কথাও আলোচনা করা হয়েছে। অর্থাৎ, সতীদাহকে বৈদিক যুগ থেকেই হিন্দুধর্মের অপরিবর্তনীয় ও বাধ্যতামূলক বিধান বলে দাবি করার পক্ষে পর্যাপ্ত ঐতিহাসিক ভিত্তি নেই।

ঋগ্বেদের দশম মণ্ডলের অষ্টাদশ সূক্তের সপ্তম মন্ত্রকে সতীদাহের পক্ষে ব্যবহার করার বিষয়টি আরও তাৎপর্যপূর্ণ। মন্ত্রটির একটি গুরুত্বপূর্ণ শব্দ ‘অবিধবা’, যার অর্থ বিধবা নন এমন নারী। একই সূক্তের অষ্টম মন্ত্রে মৃতের পাশে থাকা নারীকে জীবিতদের জগতে ফিরে আসার আহ্বান জানানো হয়েছে। গবেষকদের ব্যাখ্যায়, এই অংশটি প্রাচীন অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার এমন একটি রীতির সঙ্গে যুক্ত হতে পারে, যেখানে মৃতের পাশে সাময়িকভাবে শোয়ার পর বিধবাকে আবার জীবিতদের মধ্যে ফিরিয়ে আনা হতো। পরবর্তী কয়েকজন ধর্মশাস্ত্রকার সপ্তম মন্ত্রটিকে সতীদাহের সমর্থনে ব্যাখ্যা করেছিলেন। ‘অগ্রে’ শব্দের পরিবর্তে ‘অগ্নে’ বা ‘অগ্নেঃ’ পাঠ ব্যবহারের সম্ভাব্য পরিবর্তন নিয়েও গবেষণা হয়েছে। তবে পাঠের এই পরিবর্তনকে সব ক্ষেত্রে পরিকল্পিত জালিয়াতি বলে ঘোষণা করা যায় না; পাণ্ডুলিপির ভুল, পাঠভেদ ও ব্যাখ্যাকারীদের উদ্দেশ্য—সবই বিবেচনা করতে হয়। গবেষণাটির মূল বক্তব্য হল, এই মন্ত্রকে সতীদাহের বৈদিক অনুমোদনের নির্ভরযোগ্য প্রমাণ হিসেবে ব্যবহার করা অত্যন্ত দুর্বল যুক্তি।

এখানে একটি বিষয় স্পষ্ট করা জরুরি। কিছু ধর্মীয় ব্যাখ্যাকারী যখন কোনও সামাজিক প্রথাকে বৈধতা দেওয়ার জন্য শাস্ত্রের নির্দিষ্ট অংশকে নিজেদের পক্ষে ব্যবহার করেছেন, তখন সেই ব্যাখ্যার সামাজিক উদ্দেশ্য ও ফলাফল পরীক্ষা করা ইতিহাসের কাজ। সতীদাহের ক্ষেত্রে বৈদিক মন্ত্রের এমন ব্যবহার তার উদাহরণ। কিন্তু এই তথ্য থেকে সব ব্রাহ্মণ একই উদ্দেশ্যে কাজ করেছেন, অথবা প্রত্যেক ব্রাহ্মণ সতীদাহ সমর্থন করেছেন—এমন সিদ্ধান্ত টানা যায় না। বরং ইতিহাসে দেখা যায়, ধর্মীয় কর্তৃত্বের পরিসরের মধ্যেই বিভিন্ন মত ছিল। সতীদাহের বিরুদ্ধে রাজা রামমোহন রায় ধর্মীয় গ্রন্থের ব্যাখ্যা ব্যবহার করে যুক্তি দিয়েছিলেন। ১৮২৯ সালে সতীদাহ নিষিদ্ধ করার আইন প্রণীত হয়। পরে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের উদ্যোগে ১৮৫৬ সালে হিন্দু বিধবা পুনর্বিবাহ (পরাশর সংহিতা—“নষ্টে মৃতে প্রব্রজিতে ক্লীবে চ পতিতে পতৌ।/ পঞ্চস্বাপৎসু নারীণাং পতিরন্যো বিধীয়তে”।) আইন পাশ হয়। এই ঘটনাগুলি দেখায়, ধর্মীয় ঐতিহ্যের ব্যাখ্যা নিয়ে সমাজের ভিতরে সংঘাত ছিল এবং সামাজিক সংস্কারের প্রশ্নে শাস্ত্রের ব্যাখ্যাও রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগ্রামের অংশ হয়ে উঠেছিল।

রামায়ণের খাদ্যাভ্যাস-সংক্রান্ত উল্লেখও একইভাবে ঐতিহাসিক পাঠের গুরুত্ব বোঝায়। আজকের জনপ্রিয় ধর্মীয় কল্পনায় রামকে অনেক সময় এমন এক আদর্শ হিসেবে তুলে ধরা হয়, যার সঙ্গে নিরামিষ খাদ্যাভ্যাসকে অবিচ্ছেদ্য বলে ধরে নেওয়া হয়। কিন্তু বাল্মীকি রামায়ণের অযোধ্যাকাণ্ডের ২.৫৬.২২ শ্লোকে রামের মুখে বলা হয়েছে—

“ঐণেয়ং মাংসমাহৃত্য শালাং যক্ষ্যামহে বয়ম্।/ কর্তব্যং বাস্তু-শমনং সৌমিত্রে চিরজীবিভিঃ॥”

এখানে ‘সৌমিত্রে’ বলতে লক্ষ্মণকে সম্বোধন করা হয়েছে। ‘ঐণেয়ং মাংসম্’ বলতে কৃষ্ণসার বা এক ধরনের হরিণের মাংস বোঝানো হয়েছে। ‘আহৃত্য’ অর্থ নিয়ে এসে এবং ‘যক্ষ্যামহে’ অর্থ আমরা পূজা বা যজ্ঞ করব। অর্থাৎ, কুটিরে বসবাসের আগে গৃহদেবতার উদ্দেশে আচার সম্পন্ন করার জন্য হরিণের মাংস আনার কথা বলা হচ্ছে। পরবর্তী শ্লোকগুলিতেও হরিণ শিকার করে আনার নির্দেশের উল্লেখ রয়েছে। বাল্মীকি রামায়ণের পাঠে এই অংশের উপস্থিতি প্রমাণ করে যে প্রাচীন মহাকাব্যের ধর্মীয় ও আচারগত জগতে মাংসের উল্লেখ ছিল। তবে একটি শ্লোকের ভিত্তিতে সমগ্র রামায়ণ বা সমস্ত হিন্দু সম্প্রদায়ের খাদ্যাভ্যাস সম্পর্কে একটিমাত্র চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত টানা যাবে না। বিভিন্ন পাঠ, অধ্যায় ও পরবর্তী ব্যাখ্যার পার্থক্য বিবেচনা করেই সিদ্ধান্ত নিতে হবে।

এই উদাহরণটির তাৎপর্য শুধু রামের খাদ্যাভ্যাস নিয়ে বিতর্কে সীমাবদ্ধ নয়। প্রশ্নটি হল, কোনও ধর্মীয় গ্রন্থের একটি নির্বাচিত অংশকে সামনে রেখে একটি নির্দিষ্ট খাদ্যাভ্যাসকে চিরন্তন ধর্মীয় পরিচয়ের শর্ত হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা যায় কি না। হিন্দুধর্মের বিভিন্ন ধারায় খাদ্যাভ্যাস, উপাসনা ও আচার নিয়ে বহু পার্থক্য রয়েছে। বাংলার শাক্ত ঐতিহ্যের কোনও কোনও ধারায় মাছ ও মাংসের ব্যবহার ধর্মীয় আচার ও সামাজিক সংস্কৃতির সঙ্গে যুক্ত; অন্যদিকে বহু হিন্দু সম্প্রদায় নিরামিষ খাদ্যাভ্যাসকে ধর্মীয় অনুশীলনের অংশ হিসেবে গ্রহণ করেছে। এক পক্ষের রীতিকে অন্য পক্ষের তুলনায় বেশি হিন্দু বলে ঘোষণা করার জন্য ইতিহাসকে বেছে বেছে ব্যবহার করলে এই বৈচিত্র্যকে অস্বীকার করা হয়। কোনও ধর্মীয় সম্প্রদায়ের খাদ্যাভ্যাস নিয়ে ব্যক্তিগত বিশ্বাস থাকতে পারে, কিন্তু সেই বিশ্বাসকে অন্য সব মানুষের ওপর রাজনৈতিক বা সামাজিক বাধ্যবাধকতা হিসেবে চাপিয়ে দেওয়ার প্রশ্নটি আলাদা।

0 Comments

Post Comment