পড়শি যদি আমায় ছুঁতো যম যাতনা সকল যেত দূরে: লালন সাঁই

পড়শি যদি আমায় ছুঁতো যম যাতনা সকল যেত দূরে: লালন সাঁই

hhhhhhhhhhhhhh

“পথিক, তুমি পথ হারাইয়াছ?”

  • 02 July, 2022
  • 0 Comment(s)
  • 564 view(s)
  • লিখেছেন : শঙ্কর রায়
বিজেপি-বিরোধী দলগুলো আজ পথহারা পথিক। তা না হলে এরা কংগ্রেসকে পায়ের তলায় রাখতে চাইছে কেন? এখন কি এর উপযুক্ত সময়! তৃণমূল কংগ্রেসের ডিক্টেটর ও পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, আম আদমি পার্টির সুপ্রিমো ও দিল্লির মুখ্যমন্ত্রী অরবিন্দ কেজরিওয়াল কংগ্রেসকে দাবিয়ে রাখতে চায়। বিজেপি-বিরোধী ব্যাপক ঐক্য গড়া যে সহজ নয়, তার প্রমাণ রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে ঝাড়খন্ডের মুখ্যমন্ত্রী হেমন্ত সোরেনের দ্রৌপদী মুর্মুকে সমর্থন।

“কতক্ষণ যে নবকুমার তীরে বসিয়া অনন্যমনে জলধিশোভা দৃষ্টি করিতে লাগিলেন, তদ্বিষয়ে তৎকালে তিনি পরিমাণ-বোধ-রহিত। পরে একেবারে প্রদোষতিমির আসিয়া কাল জলের উপর বসিল। তখন নবকুমারের চেতনা হইল যে, আশ্রম সন্ধান করিয়া হইবেক। দীর্ঘসনিশ্বাস ত্যাগ করিয়া গাত্রোত্থান করিলেন। দীর্ঘনিশ্বাস ত্যাগ করিলেন কেন, তাহা বলিতে পারি না–তখন তাঁহার মনে কোন্ ভূতপূর্ব সুখের উদয় হইতেছিল, তাহা কে বলিবে? গাত্রোত্থান করিয়া সমুদ্রের দিকে পশ্চাৎ ফিরিলেন। ফিরিবামাত্র দেখিলেন, অপূর্ব মূর্তি! সেই গম্ভীরনাদী বারিধিতীরে, সৈকতভূমে অস্পষ্ট সন্ধ্যালোকে দাঁড়াইয়া অপূর্ব রমণীমূর্তি! কেশভার–অবেণীসম্বদ্ধ, সংসর্পিচত, রাশীকৃত, আগুল্‌ফলম্বিত কেশভার; তদগ্রে দেহরত্ন; যেন চিত্রপটের উপর চিত্র দেখা যাইতেছে। অলকাবলীর প্রাচুর্য মুখমণ্ডল সম্পূর্ণপ্রকাশ হইতেছিল না–তথাপি মেঘবিচ্ছেদনি:সৃত চন্দ্ররশ্মির ন্যায় প্রতীত হইতেছিল। বিশাল লোচনে কটাক্ষ অতি স্থির, অতি স্নিগ্ধ, অতি গম্ভীর, অথচ জ্যোতির্ম্ময়; সে কটাক্ষ, এই সাগরহৃদয়ে ক্রীড়াশীল চন্দ্রকিরণলেখার ন্যায় স্নিগ্ধোজ্জ্বল দীপ্তি পাইতেছিল। কেশরাশিতে স্কন্ধদেশ ও বাহুযুগল আচ্ছন্ন করিয়াছিল। স্কন্ধদেশ একেবারে অদৃশ্য; বাহুযুগলের বিমলশ্রী কিছু কিছু দেখা যাইতেছিল। রমণীদেহ একেবারে নিরাভরণ। মূর্তিমধ্যে যে একটি মোহিনী শক্তি ছিল, তাহা বর্ণিতে পারা যায় না। অর্দ্ধচন্দ্রনি:সৃত কৌমুদিবর্ণ; ঘনকৃষ্ণ চিকুরজাল; পরস্পরের সান্নিধ্যে কি বর্ণ, কি চিকুর, উভয়েই যে শ্রী বিকসিত হইতেছিল, তাহা সেই গম্ভীরনাদী সাগরকূলে, সন্ধ্যালোকে না দেখিলে তাহার মোহিনী শক্তি অনুভূত হয় না।

নবকুমার অকস্মাৎ এইরূপ দুর্গমমধ্যে দৈবী মূর্ত্তি দেখিয়া নিস্পন্দশরীর হইয়া দাঁড়াইলেন। তাঁহার বাকশক্তি রহিত হইল;-স্তব্ধ হইয়া চাহিয়া রহিলেন। রমণীও স্পন্দহীন, অনিমেষলোচনে বিশাল চক্ষুর স্থিরদৃষ্টি নবকুমারের মুখে ন্যস্ত করিয়া রাখিলেন। উভয়মধ্যে প্রভেদ এই যে, নবকুমারের দৃষ্টি চমকিত লোকের দৃষ্টির ন্যায়, রমণীর দৃষ্টিতে সে লক্ষণ কিছুমাত্র নাই, কিন্তু তাহাতে বিশেষ উদ্বেগ প্রকাশ হইতেছিল।

অনন্তর সমুদ্রের জনহীন তীরে, এইরূপে বহুক্ষণ দুইজনে চাহিয়া রহিলেন। অনেক্ষণ পরে তরুণীর কণ্ঠস্বর শুনা গেল। তিনি অতি মৃদুস্বরে কহিলেন, “পথিক, তুমি পথ হারাইয়াছ?”

এই কণ্ঠস্বরের সঙ্গে নবকুমারের হৃদয়বীণা বাজিয়া উঠিল। বিচিত্র হৃদয়যন্ত্রের তন্ত্রীচয় সময়ে সময়ে এরূপ লয়হীন হইয়া থাকে যে, যত যত্ন করা যায়, কিছুতেই পরস্পর মিলিত হয় না। কিন্তু একটি শব্দে, একটি রমণীকণ্ঠসম্ভূত স্বরে সংশোধিত হইয়া যায়। সকলই লয়বিশিষ্ট হয়। সংসারযাত্রা সেই অবধি সুখময় সঙ্গীতপ্রবাহ বলিয়া বোধ হয়। নবকুমারের কর্ণে সেইরূপ এ ধ্বনি বাজিল।

“পথিক, তুমি পথ হারাইয়াছ?” এ ধ্বনি নবকুমারের কর্ণে প্রবেশ করিল। কি অর্থ, কি উত্তর করিতে হইবে, কিছুই মনে হইল না। ধ্বনি যেন হর্ষবিকম্পিত হইয়া বেড়াইতে লাগিল; যেন পবনে সেই ধ্বনি বহিল; বৃক্ষপত্রে মর্মারিত হইতে লাগিল; সাগরনাদে যেন মন্দীভূত হইতে লাগিল। সাগরবসনা পৃথিবী সুন্দরী; রমণী সুন্দরী; ধ্বনিও সুন্দর; হৃদয়তন্ত্রীমধ্যে সৌন্দর্য্যর লয় মিলিতে লাগিল।

রমণীকোন উত্তর না পাইয়া কহিলেন, “আইস |” এই বলিয়া তরুণী চলিল; পদক্ষেপ লক্ষ্য হয় না। বসন্তকালে মন্দানিল-সঞ্চালিত শুভ্র মেঘের ন্যায় ধীরে ধীরে, অলক্ষ্য পাদবিক্ষেপে চলিল; নবকুমার কলের পুত্তলীর ন্যায় সঙ্গে চলিলেন। এক স্থানে একটা ক্ষুদ্র বন পরিবেষ্টন করিতে হইবে, বনের অন্তরালে গেলে, আর সুন্দরীকে দেখিতে পাইলেন না। বনবেষ্টনের পর দেখেন যে, সম্মুখে কুটীর।” (মুল বানান অপরিবর্তিত)

আজ কি বিজেপি-বিরোধী দলগুলি (বিশেষত আঞ্চলিক দলগুলির নেতৃত্ব) পথহারা পথিক? নাহলে এরা ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসকে পায়ের তলায় রাখছে কেন? এখন কি এই অবস্থানের উপযুক্ত সময়। তৃণমূল কংগ্রেসের ডিক্টেটর ও পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, আম আদমি পার্টির সুপ্রিমো ও দিল্লির মুখ্যমন্ত্রী অরবিন্দ কেজরিওয়াল কংগ্রেসকে দাবিয়ে রাখতে চায়। বিজেপি-বিরোধী ব্যাপক ঐক্য গড়া যে সহজ নয়, তার প্রমাণ আসন্ন রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে ঝাড়খন্ডের মুখ্য মন্ত্রী ও ঝাড়খন্ড মুক্তি মোর্চার (জে এম এম) নেতা হেমন্ত সোরেনের এককভাবে বিজেপি প্রার্থী দ্রৌপদী মুর্মুকে সমর্থন জ্ঞাপন। নিজের দলে আলোচনা না করে ঘোষণা আভাস দিচ্ছে যে তিনি সেন্ট্রাল ব্যুরো অফ ইনভেস্টিগেশ্যন (সিবিআই) ও এনফোর্সমেন্ট ডাইরেক্টরেটের ভয়ে এ কাজ করেছেন। তাঁর পরিবারের যাঁরা ঝাড়খণ্ডে মাইনিং লিজ নিয়েছে, সেজন্য তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদ (অবশ্যই কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী ও প্রধান মন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর বশংবদ অনিলচন্দ্র অমিত শাহ-র নির্দেশে ব্ল্যাকমেল করা) করতে পারে এই আশঙ্কায় তড়িঘড়ি করে শ্রীমতী মুর্মুকে সমর্থন করেছেন। দলের মধ্যে আলোচনা করার প্রয়োজন বোধ করেন নি। ওড়িশার মুখ্য মন্ত্রী ও বিজু জনতা দলের (বিজেডি) ডিক্টেটর নবীন পট্টনায়েকও সমর্থন করেছেন। তিনি রাজ্যে নির্বাচনে বিজেপি সাথে সমর্থন করলেও প্রকাশ্যভাবে মোদীজির সমালোচনা করেন নি কখনো।

ওড়িশায় নিয়মগিরিতে বক্সাইট খনি বেদান্ত গোষ্ঠীর হাতে তুলে দিতে নবীনবাবুর সরকার সর্বাত্মক প্রয়াস নিয়েছিল, আদিবাসী ও দলিত সমাজের প্রবল প্রতিবাদ গ্রাহ্যই করেন নি। দক্ষিণ কোরিয়ার অতিকায় ইস্পাত কোম্পানী পস্কোকে জগৎসিংপুরে ১২০০ কোটি মার্কিণ ডলার বিনিয়োগ করতে ২০০৫ সাল থেকে ২০১৫ অব্দি নানা চেস্টা করে ১ কোটি ২০ লক্ষ টন ইস্পাত উৎপাদন ক্ষমতাসম্পন্ন কারখানা স্থাপন করতে চেয়েছিল, কিন্ত ধিঙ্কিয়া, নুয়াগাঁও ও গদাকুজং এর অধিবাসীরা (যাদের ৮০ শতাংশের বেশি আদিবাসী ও দলিত) লাগাতর প্রতিবাদের ফলে পস্কো হাল ছেড়ে দেয়, যদিও আবার নতুন করে চেস্টা চালাচ্ছে। এমন নবীনবাবুকে ২০২৪এ লোক সভা নির্বাচনে বিজেপি-আরএসএস-চালিত মোদী সরকারকে অপসারণের যৌথ প্রয়াসে পাওয়া যাবে এমন প্রত্যাশা অলীক।

কিন্তু রাহুল গান্ধীকে ৫১ ঘণ্টা জিজ্ঞাসাবাদ (পড়ুন উদ্দেশ্যপ্রণোদিত হয়রানি ও ভীতি সঞ্চার) করলেও তিনি একটুকুও বিচলিত হন নি, বরং প্রকাশ্যে মোদী-শাহ-র কড়া সমালোচনা করে বলেছেন সিবিআই ও ইডি-র জিজ্ঞাসাবাদকে কাপুরুষোচিত ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলেছেন।

আগেও একাধিকবার লিখেছি (অন্যত্র) যে কংগ্রেসই একমাত্র রাজনৈতিক দল যা পরোক্ষভাবেও বিজেপি বা পূবর্তন ভারতীয় জনসঙ্ঘের সাথে হাত মেলায় নি।কেউ বলতে পারেন যে লালু যাদবের রাষ্ট্রীয় জনতা দল ও মুলায়ম সিং যাদব-এর সমাজবাদী পার্টিও বিজেপি-র সাথে হাত মেলায় নি। কিন্তু জয়প্রকাশ নারায়ণের (জেপি) ইন্দিরা-স্বৈরতন্ত্রের বিরুদ্ধে ও ভ্রস্টাচারের বিরুদ্ধে আন্দোলনে শামিল ছিলেন, যে আন্দোলনের জনসমাবেশে সবচেয়ে বড় জমায়েত করেছিল আর এস এস।বিহারে জেপি-র আন্দোলনে শামিল হয়েছিলেন নকশালপন্থী ডঃ বিনয়ন ও তাঁর দলবল। তেমনই সক্রিয় ছিলেন মুলায়ম সিং যাদব এবং তিন গলায় গলায় বন্ধু নীতিশ কুমার, লালু যাদব ও আর এস এস-এর সূশীল মোদী। আর পশ্চিম বঙ্গে যে জনতা দলের সাথে ভোট-সমঝোতা করেছিল ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (মার্ক্সবাদী) তথা সিপি আই(এম) বিপ্লবী সমাজতন্ত্রী দল (আরএসপিঁ) ও ফরোয়ার্ড ব্লক , তার মধ্যে ছিল জনসঙ্ঘীরা। তবু জেএমএম, তৃণমুল কংগ্রেস (যে দলটি ভারতে প্রথম বিজেপিঁ-নেতৃত্বাধীন কেন্দ্রীয় মন্ত্রীসভায় ছিল, ২০০৪-এও নির্বাচনী জোট বেঁধেছিল) বলবে কংগ্রেসকে বিশ্বাস করা যায় না, তার শক্তিও ক্রমহ্রাসমান এবং কংগ্রেসের নেতৃত্বে বিরোধী মোর্চা মানবে না। অথচ কংগ্রেসই বিজেপি-আর এস এসের বিরুদ্ধে আপোষহীন দল।

রাজস্থানের উদয়পুরে কংগ্রেসের তিন দিনের চিন্তন শিবিরের উদ্বোধনী ভাষণে সনিয়া গান্ধী নরেন্দ্র মোদীর সরকারকে তুলোধোনা করেছেন। মোদীর শাসনে মুসলমানেরা চরম নির্মমতার শিকার এবং দেশকে খোলাখুলিভাবে ধর্মীয় মেরুকরণের দিকে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে। সেজন্যে সবার এককাট্টা হতে হবে। যে দলগুলি চায় কংগ্রেস পদানত থাকুক, সেগুলো প্রত্যেকটিই আঞ্চলিক দল। এরাই নেতৃত্ব দিতে চায়। এদের মধ্যে আছে তৃণমুল কংগ্রেস ও (মুখে না বললেও) আম আদমি পার্টি। আর এদের তোল্লাই দিচ্ছে কিছু কলমচি ও সাংবাদিক (কারো কারো কথাবার্তায় সবজান্তা মনোভাব ফুটে ওঠে। কেউ বলছেন, ভাবা গিয়েছিল উদয়পুরে নব কংগ্রেসের উদয় হবে। একজন লিখেছেন চিন্তনশিবির থেকে নিদেন পক্ষে এমন আভাস অন্তত মিলবে। অথচ বাস্তবে কংগ্রেস তার ত্রিসীমানা দিয়ে গেল না। এই কলমচি ও রাজনৈতিক ব্যাখ্যাকারেদের বেশির ভাগ কিন্তু চান কংগ্রেস চাঙ্গা হোক, কিন্তু সেটা যে মন্ডল-কমন্ডল রাজনীতির দৌরাত্ম্যে জটিল ও কঠিন হয়ে দাঁড়াচ্ছে (অন্তত এই প্রতিবেদকের ধারণা, যা ভুলও হতে পারে) , সেটা দেখতে পাচ্ছেন না।

অতই সোজা কি কংগ্রেসকে চাঙ্গা করা। এই কলমচি ও সংবাদ ভাষ্যকারদের যেন জানা আছে কিভাবে কংগ্রেসকে চাঙ্গা করা যায়। কেন গত নয় বছরে বিজেপি প্রার্থীদের কাছে শতকরা ৮০ ভাগ আসনে হেরে গেছে, যার প্রধান কারণ মনে হয় সাম্প্রদায়িক মেরুকরণ। যেদিন থেকে বিজেপি’র জন্ম, সেদিন থেকেই সঙ্ঘ পরিবার সাম্প্রদায়িক মেরুকরণের রণনীতি রূপায়নের ক্রমান্বিত প্রয়াস চালিয়ে যাচ্ছে।

চিন্তন শিবিরে সমাপ্তি ভাষণে রাহুল গান্ধী বলেছেন, কংগ্রেস ক্রমশঃ জনবিচ্ছিন্ন হচ্ছে। কীভাবে মানুষকে দলের ছাতার তলায় ফেরানো যায়, সেই পথের অনুসন্ধান করতে হবে। একজন প্রশ্ন তুলেছেন , প্রাক্তন কংগ্রেস সভাপতি কি কখনও বোঝার চেষ্টা করেছেন তাঁর কর্মকাণ্ড এই পরিস্থিতির জন্য কতটা দায়ী? অর্থাৎ যেন রাহুল গান্ধীর জন্যই কংগ্রেস জনবিচ্ছিন্ন। কিসের ভিত্তিতে একথা বললেন। যে দলটি মূলত সাম্প্রদায়িকতা বিরোধী ও ধর্মনিরপেক্ষতাবাদী রাজনীতি করে এসেছে, সেই দলটি পারেনি মন্ডল-কমন্ডল রাজনীতির সাথে খাপ খাওয়াতে, এটা এই পন্ডিতেরা (ঠাট্টা করছি না, এরা পন্ডিতই) ভেবে দেখছে না। আর এই মন্ডল-কমন্ডল রাজনীতির বিষবৃক্ষ রোপণ করেছিলেন মোরারজী দেশাই, যখন তিনি প্রধান মন্ত্রী ছিলেন। তিনিই ১৯৭৯ সালে বিন্ধেশ্বরী প্রসাদ মন্ডলকে চেয়ারম্যান করে মন্ডল কমিশন গঠন করেন। বিশ্বনাথ প্রতাপ সিং সেই মন্ডল কমিশনের সুপারিশগুলি মেনেছিলেন। এর মধ্যে বিশ্বনাথ প্রতাপ সিং এর দোষটা কোথায়? সরকার-গঠিত কোন কমিশ্যনের রিপোর্টের সুপারিশগুলি মানবে, এটাই স্বাভাবিক। কেউ অবশ্য বলতে পারেন, যে রণকৌশলগতভাবে অন্তত তখন মন্ডল কমিশনের রিপোর্টের সুপারিশ রূপায়ন করা মস্ত বড় ভুল। কিন্তু জেপি-র নির্দেশে হওয়া প্রধান মন্ত্রী মোরারজী কেন মন্ডল কমিশন গঠন করলেন? প্রধানত রাজনৈতিক ফয়দা লুটল সঙ্ঘ পরিবার। আর তার উচ্ছিষ্ট পেয়ে মদত পেলো কাঁসিরাম-মায়াবতীর বহুজন সমাজবাদী পার্টি (বিএসপিঁ), সমাজবাদী পার্টি ও আরজেডি। কংগ্রেস খাপ খাওয়াতে পারল না, পারতে পারে না।

চিন্তন শিবিরের উদ্দেশ্য ছিল সাংগঠনিক পুনর্জাগরণের পথ অনুসন্ধান। সেটা যে একটি কয়েক দিনের শিবিরে সম্ভব নয়, এটা স্বীকার করতে হবে। এইখানে প্রশান্ত কিশোরের মত ভোটকুশলীর প্রয়োজন ছিল। তা তো আর হয়ে উঠল না। কিন্তু সেটা কেন হল না, তা আজও পরিষ্কার হয় নি। কংগ্রেস এতদিনে যা হারিয়েছে, তা ফিরে পাওয়া কঠিন, হয়ত তার অংশত পুনরুদ্ধার সম্ভব। তাই হোক না কেন।

রাহুল গান্ধী কিছুদিন আগে প্রবীণ কংগ্রেস নেতা সলমন খুরশিদের বই উদ্বোধন উপলক্ষে বলেছিলেন, হিন্দুত্ব আর হিন্দুইজম এক নয়। প্রথমটি সঙ্ঘ পরিবার সৃষ্ট ধারণা। আর দ্বিতীয়টি হল হিন্দুদের ধর্মাচরণের সাবেক সংস্কৃতি ও রীতি। ইসলামিক সন্ত্রাসবাদীরা যেমন ইসলাম-কোরাণের মুখোশ পরে রাজনৈতিক ইসলাম তত্ব তুলে ধরে, যার সাথে ইসলামের প্রায় সম্পর্ক নেই। তেমনই হিন্দুত্ব আসলে রাজনৈতিক হিন্দুয়ানা, যার সাথে হিন্দু ধর্মের সম্পর্ক অত্যল্প। এ প্রসঙ্গে সংবাদ মাধ্যম ও সাংবাদিকদের চয়ন করা ‘সফট হিন্দুত্ব’র কথা আলোচিত হওয়া দরকার। সফট হিন্দুত্ব এই অসংজ্ঞায়িত ধারণা। মন্দিরে রাজনৈতিক গেলেই তাকে সফট হিন্দুত্ব বলতে হবে। তাহলে তো হিন্দু ধর্মটাকেই সফট হিন্দুত্ব বলতে হয়।

যারা বিজেপির রাজনীতির ধর্মকেন্দ্রিক সংস্কৃতির সঙ্গে কংগ্রেস নেতার দলীয় কর্মসূচির ফারাক নেই এবং বিজেপি সভাপতি জয় প্রকাশ নাড্ডার রাজনৈতির সূচির সাথে কংগ্রেসের পার্থক্য নেই, তারা ভেবে দেখছেন না, যে সঙ্ঘ পরিবারের ধর্মকেন্দ্রিক সংস্কৃতি আসলে বাহ্যিক ধর্মকেন্দ্রিক সংস্কৃতি। এটা রাজনৈতিক হিন্দুয়ানা ছাড়া কিছু না, ছদ্ম-হিন্দুয়ানাও বলা যেতে পারে। মোদী, শাহের মতো কোনও না কোনও মন্দির সফর রাহুল গান্ধীর কর্মসূচিতেও থাকেই এই যুক্তির ধার নেই আদৌ। এদের অনেকে বলছেন সঙ্ঘ পরিবারের (বিশেষ করে মোদীজির) মন্দির সফরেরসঙ্গে কংগ্রেসের কোনও বিরোধ নেই। অতীতেও নেতারা যেতেন। কিন্তু রাহুল গান্ধী ও তাঁর অনুচররা এটাকে দলের সংস্কৃতি করে তুলেছেন সেই পরিস্থিতি আগে ছিল না। এই কথার মধ্যে আংশিক সত্য আছে। কিন্তু এটাকে ফুলিয়ে-ফাঁপিয়ে দেখার কারণ নেই।

মন্দিরেপুজো দিয়ে দলীয় কাজ শুরু করায় তো তৃণমুল কংগ্রেসও পিছিয়ে নেই। দলের আসাম রাজ্য দফতরের উদ্বোধন করতে গুয়াহাটি যাবার আগে দলের সাধারণ সম্পাদক ও সাংসদ অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় বিমানবন্দর থেকে আগে কামাখ্যা মন্দিরে গিয়ে পুজো দিয়ে এসেছিলেন। অরবিন্দ কেজরিওয়াল তো খোলাখুলি বলেন ‘আমি হিন্দু, হিন্দু মন্দিরে যাবই।’ এটা তো সাম্প্রদায়িক মেরুকরণের অন্ধকার সড়কে ঢুকে পড়া। এই সব কাজকর্ম তো হিন্দুত্ব ফ্যাসিবাদকে প্রশ্রয় দেওয়া!।

কিন্তু ছত্তীসগড়ে কংগ্রেসী মুখ্য মন্ত্রী ভূপেশ বাঘেল আদিবাসীদের কেড়ে নেওয়া জমি ফিরিয়ে দেওয়া তারিফ যোগ্য হলেও এক বিপজ্জনক হিন্দুয়ানার পথে হাঁটছেন । তাঁর অনুগামীরা বলে বেড়াচ্ছেন, রাম বিজেপির, এই ধারণায় বদল আনাই লক্ষ্য কংগ্রেস সরকারের। তাই অনেক কর্মসূচিতেই থাকছে রাম ভজনার আয়োজন করেছেন। অযোধ্যার বাইরে ১৪ বছর বনবাসে থাকাকালে রাম অনেকটা সময় আজকের ছত্তীসগড়ের বিভিন্ন এলাকায় নাকি দিনযাপন করেছেন। কাজেই যে পথে রাম-লক্ষ্মণ-সীতার আগমন ঘটেছিল সেই পথ ও আশপাশের এলাকাকে পর্যটনের রাম সার্কিট হিসেবে গড়ে তোলার কাজ আগেই শুরু করেছে বাঘেল সরকার। ‘রাম বন গমন ট্যুরিজম সার্কিট’ নামে ওই পর্যটন রুটের আশপাশে ৭৫টি মন্দির সংস্কারের কাজ পুরোদমে চলছে। এ নিয়ে কংগ্রেসের কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের নীরবতা অবোধ্য। একাজ গুলি তো হিন্দুত্বের অনুশীলন।

রাহুল গান্ধী কে যখন ‘ন্যাশনাল হেরাল্ড’ মামলায় জিজ্ঞাসাবাদ (আসলে হেনস্থাও ভীতি প্রদর্শন) করা হচ্ছিল, তখন কংগ্রেস কর্মী ও সমর্থকদের উত্তাল বিক্ষোভ একদিকে যেমন ঔচিত্যবোধের অভিব্যক্তি, তেমন সাংগঠনিক দিক থেকে প্রেরণাদায়ক। রাহুল গান্ধীর সিবিআই ও ইডিকে (পড়ুন অমিত শাহকে) বিন্দুমাত্র ভয় না পাওয়া ও ফ্যাসিস্ত মোদী সরকারের তীব্র সমালোচনা জীইয়ে রাখা কংগ্রেসের এই প্রতিবাদ কর্মসূচির অনুঘটকের কাজ করেছে। অমিত শাহ-র পুলিশ দিল্লিতে ২৪ আকবর রোডে সম্পূর্ণ বে-আইনীভাবে ঢুকে পড়ে কর্মী ও কর্মকর্তাদের প্রহার মোদী-শাহ সরকারের কাপুরুষতার প্রতিফলন। ভেবে পাচ্ছি না সুপ্রিম কোর্ট কেন দিল্লি পুলিশের কমিশনার-এর বিরুদ্ধে সুও মটো মামলা দায়ের করছে না। এটা না করা মানে কি হিন্দুত্ব ফ্যাসিবাদকে প্রশ্রয় দেওয়া নয়?

বামপন্থীরাও একটা সুযোগ হারালো। তারা রাহুল গান্ধীকে হেনস্থা করার প্রতিবাদে অবস্থান বিক্ষোভ স্থলে গিয়ে সংহতিজ্ঞাপন করে আসতে পারত। কেন সিপিআই (এম) এর সাধারণ সম্পাদক সীতারাম ইয়েচুরি ও সিপিআই এর সাধারণ সম্পাদক ডোরাইস্বামী রাজার মাথায় এলো না জানি না। অন্তত একটি বিবৃতি তাঁরা যৌথভাবে দিতে পারতেন।

অগ্নিপথ প্রকল্প নিয়ে উত্তাল বিক্ষোভ মোদী-শাহ সরকারের বিরুদ্ধে জনসাধারণের অনাস্থা জ্ঞাপনের বহিঃপ্রকাশ। বিজেপি-বিরোধী দলগুলির যে নিঃশর্তে এককাট্টা হওয়ার সময় এসে গেছে, এই বিক্ষোভ তারই ইঙ্গিত। কেন্দ্রের মোদি সরকারের অগ্নিপথপ্রকল্প বাতিলের দাবি জানাল সিপিএম (CPIM) । সিপি আই(এম)-এর পলিটব্যুরো ঐ প্রকল্প বাতিলের দাবি জানিয়ে বিচক্ষণতার পরিচয় দিয়েছে। শতাধিক ট্রেন বাতিল করতে হয়েছে। বিক্ষোভকারীরা অনেক ট্রেনে অগ্নিসংযোগ করা সমর্থনযোগ্য না হলেও এ পথে ঠেলে দিয়েছে মোদী-শাহ সরকার। অমিত শাহ-র অধীন কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা দপ্তর নাকি এক রিপোর্টে বলেছে যে প্রতিবাদীদের সিংহভাগ সেনাবাহিনীতে কর্মসংস্থানকামী এবং তারা প্রধাম মন্ত্রীর বাসভবন ঘেরাও করতে পারে। অগ্নিপথ প্রকল্প মোদী-শাহ সরকার ছেলেখেলার পর্যায়ে নামিয়ে এনেছে। প্রথমে বলল যাদের নেওয়া হবে তাদের ১০ শতাংশকে চার বছর মেয়াদ শেষে স্থায়ী চাকরী দেওয়া হবে। প্রতিবাদের ব্যাপ্তি ও তাগদ দেখে তা বাড়িয়ে ২৫ শতাংশ করা হয়েছে। তার মানে তিন-চতুর্থাংশ ১৭ থেকে ২৩ বর্ষীয় যুবকদের আবার বেকারত্বের অন্ধকারে নিক্ষেপ করা হবে। ছ্যাবলামোরও একটা সীমা থাকা উচিৎ।

মনে পড়ছে ১৯৮৫ সালে কলকাতায় সিপিআই(এম)-এর পার্টি কংগ্রেসে কংগ্রেস চলাকালীন মধ্যাহ্ন ভোজের বিরতির সময় এক সাংবাদিক স্মম্লনে পার্টির তাত্বিক ও পলিটব্যুরো সদস্য প্রয়াত ম্যাক্কিনেনি বাসবপুন্নাইয়ার কথা। তখন সিপি আই(এম) কংগ্রেসের ঘোর বিরোধী। বাসবপুন্নাইয়া বলেছিলে, দেশের স্বার্থে কংগ্রেসীদের উপদলবাদ থেকে দূরে থেকে ঐক্যবদ্ধ হওয়া, তিনি সঠিক ভাবেই হিন্দুত্বের উত্থানের পদধ্বনি শুনতে পেয়েছিলেন।

‘পথিক তুমি কি পথ হারাইয়াছো?’ সে পথিক অ-কংগ্রেসী বিজেপি-বিরোধী দলগুলির ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে হেমন্ত সোরেনের দ্রৌপদী মুর্মুর প্রতি সমর্থন তার ইঙ্গিত। যখন ছত্তীশগড়ে পূর্বতন বিজেপি মুখ্য মন্ত্রী ডঃ রমন সিং-এর আমলে সম্পূর্ণ বে-আইনীভাবে সশস্ত্র পুলিশের সাহাজ্যে শত শত আদিবাসী জমি কেড়ে নিয়ে ভূমিহীন করে দেওয়া হচ্ছি, তখন শ্রীমতী মুর্মু কেন নীরব ছিলেন, এ প্রশ্ন অন্তত এখন তাঁর মনে আসছে না।

0 Comments

Post Comment