পড়শি যদি আমায় ছুঁতো যম যাতনা সকল যেত দূরে: লালন সাঁই

পড়শি যদি আমায় ছুঁতো যম যাতনা সকল যেত দূরে: লালন সাঁই

hhhhhhhhhhhhhh

জ্ঞানেশের আমড়াগাছি সংঘীদের আমলাতন্ত্র

  • 26 August, 2025
  • 0 Comment(s)
  • 453 view(s)
  • লিখেছেন : প্রশান্ত ভট্টাচার্য
নির্বাচন কমিশনকে সরাসরি কাজে লাগিয়ে মহারাষ্ট্র, হরিয়ানা, দিল্লি জয়টা নিশ্চিত করতে পেরেই ঝাঁপি খুলে দিল এসআইআর। ভোটার তালিকার নিবিড় সংশোধনীর নামে বেছে বেছে দলিত, সংখ্যালঘু, মূলনিবাসী, গরিব মানুষদের ভোটাধিকার কেড়ে নাও। এ শুধু বিহারেই থেমে থাকবে না, সব রাজ্যে হবে। পুরোনো ভোটার তালিকাকে খারিজ করে নতুন ভোটার তালিকা বানানোর প্রস্তুতিপর্ব। স্বৈরাচারী-গণতন্ত্রকে আশ্রয় করে এসআইআর গণতন্ত্রের ভিত নাড়িয়ে দিচ্ছে।


রাহুল বিহারে যাত্রা শুরু করছেই এটা যখন বোঝাপড়া হয়ে গেল, নির্বাচন কমিশন তখন বের করে ফেলল দাঁতনখ। প্রভুদের তুষ্ট করতে ঘোষণা করে সাংবাদিক বৈঠক। যাকে বলা যায় মোদী-শাহর মুখপাত্রর ভূমিকায় শ্রীশ্রী জ্ঞানেশ কুমার। ব্রিটিশ আমলে গঠিত ভারতের আমলাতন্ত্রর একটা গম্ভীর ব্যাপার ছিল। আগেকার আইসিএস, স্বাধীন দেশে আইএএস, আইপিএস তকমাধারীদের সম্পর্কে জনমনে সম্ভ্রমের ভাবটা ছিল স্বতঃস্ফূর্ত, স্বাভাবিক। ভারতীয় গণতন্ত্রের চারটি মূল স্তম্ভের মধ্যে প্রশাসনিক মশালটি ঔজ্জ্বল্য ছড়ায় আমলাকুলের সৌজন্যে। যাঁরা বলেন কম, করেন অনেক বেশি।
কর্তাভজা হতে গিয়ে নির্বাচন কমিশন তার আভিজাত্য হারিয়েছে। কেউ কেউ বলবেন নিরপেক্ষতা হারিয়েছে। আমি ব্যক্তিগতভাবে কোনো প্রতিষ্ঠানের নিরপেক্ষতায় বিশ্বাস করি না। রাষ্ট্র জন্মমাত্র যে ক'টি চিহ্ন ধারণ করেছে, তার মধ্যে নিরপেক্ষতা বা পবিত্রতা বলে কিছু নেই। যেটাকে আমরা নিরপেক্ষতা বলে ঠাউরে নিই, তা আসলে ভ্রম। রাষ্ট্র নিজেই এই ভ্রমটা নানান এজেন্সি দিয়ে আমাদের মধ্যে গেঁথে দিয়েছে। আমরা তাতে প্ররোচিত হই। শাসকের রাজনৈতিক দর্শন ও চরিত্র বিশেষে এই প্রতিষ্ঠানগুলোর নিরপেক্ষতার ডিগ্রির কমবেশি হয়। এই মুহূর্তে ভারতের নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা যে শূন্যে এসে দাঁড়িয়েছে, তার কারণ দেশের শাসনভার এখন যাদের হাতে, মতাদর্শগত ভাবে তারা প্রতিক্রিয়াশীলদের সবচেয়ে আগ্রাসী বাহিনী। ক্রোনি ক্যাপিটালিজমের একান্ত সেবক। তাই
রাষ্ট্রর আরেক সেবক সুপ্রিম কোর্ট গত ১২ আগস্ট  ভোটারতালিকার 'বিশেষ নিবিড় সংশোধনী' বা এসআইআর মামলার শুনানিতে মন্তব্য করে, 'দেখে শুনে মনে হচ্ছে, নির্বাচন কমিশনের ওপর অবিশ্বাস বা বিশ্বাসের ঘাটতি দেখা দিয়েছে।' আমরা বিচারাধীনদের মুখে একথা শুনে আহ্লাদিত। কিন্তু ভুলে গেলাম, এই নির্বাচন কমিশনের সদস্যদের  নির্বাচন প্রক্রিয়ার কথাটা। যার মধ্যেই ধরা আছে, বর্তমান মুখ্য নির্বাচন কমিশনারসহ ৩ নির্বাচন কমিশনারের আনুগত্যর দিকটি। অনুপ বারানওয়াল বনাম ভারত সরকার মামলায় ২০২৩ সালের ২ মার্চ  সুপ্রিম কোর্টের  বিচারপতি কে এম জোসেফ, বিচারপতি অজয় রাস্তোগি, বিচারপতি অনিরুদ্ধ বোস, বিচারপতি হৃষীকেশ রায়, বিচারপতি সি টি রবিকুমারের সাংবিধানিক বেঞ্চ এক যুগান্তকারী রায়ে বলে, সংসদে নতুন আইন না হওয়া পর্যন্ত নির্বাচন কমিশনের ৩ সদস্য নির্বাচন করবেন প্রধানমন্ত্রী, লোকসভার বিরোধী দলনেতা আর দেশের প্রধানবিচারপতি। এই রায়ের পিছনে ছিল, আমাদের 
সংবিধানের স্পিরিট মেনে কমিশনের স্বাধীনতা, নিরপেক্ষতা, পূর্ণ স্বচ্ছতা যেন বজায় থাকে। কোনো  চাপের কাছে নতি স্বীকার না করে, পক্ষপাতদুষ্ট না হয়ে সংস্থা স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারে। আমাদের মনে রাখতে হবে এর আগেই ঘটে গেছে অশোক লাভাসার ঘটনা। ২০১৯ সালের লোকসভা ভোটের সময় থেকে নির্বাচন কমিশন ভারতীয় গণতন্ত্রর রক্ষাকবচ না হয়ে বিজেপির রক্ষাকবচে পরিণত হয়েছে। বিরোধীরা যাতে বিজেপিকে কিছুতেই ঘায়েল করতে না পেরে, তা নিশ্চিত করার দায়িত্বই নিয়েছে কমিশন। যার মুখ্য ভূমিকা নিয়েছিলেন তখনকার মুখ্যনির্বাচন কমিশনার সুনীল অরোরা। লক্ষ্য করবেন, ওই সময় থেকে এখন পর্যন্ত দু'জন নির্বাচন কমিশনার বেনজির ভাবে মাঝপথে সরে গিয়েছেন।    একজন অশোক লাভাসা, দুই অরুণ গোয়েল । ওইবার লোকসভা নির্বাচনের প্রচারে প্রধানমন্ত্রী ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বিরুদ্ধে আদর্শ বিধিভঙ্গের অভিযোগে ব্যবস্থা নিতে চেয়েছিলেন লাভাসা। অন্তত ৬টি অভিযোগের ক্ষেত্রে মোদীকে শাস্তি দেওয়ার পক্ষে ছিলেন লাভাসা, কিন্তু মুখ্যনির্বাচন কমিশনার অরোরা আর অন্য কমিশনার সুশীল চন্দ্র রাজি হননি।
তাঁর মতামতকে উপেক্ষা করেই সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে অন্য দুই নির্বাচন কমিশনারের সিদ্ধান্তকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। আর প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীকে ক্লিনচিট দেওয়া হয়েছে। যদিও অভিযোগগুলির সত্যতা নিয়ে জনমানসে তেমন একটা কোনো সংশয় ছিল না। এর পর থেকে নির্বাচন কমিশনের বিধিভঙ্গের অভিযোগ সংক্রান্ত কোনো বৈঠকে লাভাসা উপস্থিত থাকেননি। লাভাসার এই অবস্থানের জন্য প্রতিহিংসা পরায়ণ বিজেপি সরকার তাঁর গোটা পরিবারকে নানা কেস দিয়ে তদন্তকারী সংস্থার খপ্পরে ফেলে দিল। যাঁর হওয়ার কথা ছিল মুখ্যনির্বাচন কমিশনার, তিনি ইস্তফা দিয়ে বাঁচলেন। 
এমনই প্রেক্ষাপটে অনুপ বারানওয়ালের করা জনস্বার্থ মামলায় এই ঐতিহাসিক রায় দিয়েছিল সাংবিধানিক বেঞ্চ। এই রায়ের ৬ মাসের মধ্যে নরেন্দ্র  মোদী সরকার সংসদের ভিতরে ও বাইরে  প্রবল বিরোধিতাকে যথারীতি উপেক্ষা করে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে এক নতুন আইন প্রণয়ন করে। তাতে বলা হয়, প্রধানমন্ত্রী, বিরোধী দলনেতা ও কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভার একজন ( পড়ুন মোদীর আস্থাভাজন) মিলে ঠিক করবেন নির্বাচন কমিশনের ৩ কমিশনারকে। অর্থাৎ প্রধান বিচারপতিকে কাঁচি করা হল। যার অনিবার্য ফল একেবারে আরএসএসের মতাদর্শে লালিত  তিনজনকে বসিয়ে দেওয়া হল। এখানে স্মরণ করার, শাসকদল বিজেপিরই ঘনিষ্ঠ এক আমলা অরুণ গোয়েলের কথা। সরকার তাঁকে ২০২২ সালের ১৮ নভেম্বর একদিনের মধ্যে স্বেচ্ছা অবসর করিয়ে, তৎসংক্রান্ত ফাইলপত্র সই সাবুদ করিয়ে তার পরদিনই কমিশনের সদস্য করল। আবার কোনো অদৃশ্য কারণে ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচন ঘোষণার ঠিক আগে আগেই ৯ মার্চ তিনি পদত্যাগ করলেন। অনেকটা এমনই হয়েছে জগদীপ ধনখড়ের। গোয়েলের মতো তারও ঝটিকা আগমন আচমকা বিদায় বেশ রহস্যাবৃত। মজার কথা নির্বাচন কমিশনার পদে অরুণের নিয়োগ নিয়েও সুপ্রিম কোর্টে মামলা হয়েছিল। নির্বাচন কমিশনার পদে এত তাড়াহুড়ো করে কেন নিয়োগ করা হচ্ছে, তা নিয়ে সেই সময় শীর্ষ আদালতে কেন্দ্রীয় সরকার প্রশ্নর মুখেও পড়েছিল। গোয়েলের মেয়াদ ছিল ২০২৭ সাল পর্যন্ত অর্থাৎ তার পরের বছর রাজীব কুমারের অবসর গ্রহণের পর তিনি মুখ্যনির্বাচন কমিশনার হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের যোগ্য ছিলেন। অরুণ গোয়েলের বিদায়ের পর রাজীব কুমার একাই নির্বাচন কমিশন। লোকসভা নির্বাচন ঘোষণা হল। এখন এসআইআরের নামে বর্তমান নতুন ফুল বেঞ্চের (২৬তম মুখ্যনির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারসহ) নতুন একগুচ্ছ নির্দেশিকার মুখোমুখি হল বিহার তথা ভারতের নাগরিকরা। যা আসলে একটা ভুল সংশোধন করতে গিয়ে আরও ১০টা ভুলের জন্ম দিল। 
নির্বাচন কমিশনের ওপর খবরদারি করা বিজেপির একটি বহু চর্চিত পথ। পাঠক এখানে মনে করিয়ে দিই
গুজরাত দাঙ্গার পর রাজ্য প্রশাসন ভোটারতালিকা সংশোধনের অজুহাতে মুসলিমদের নাম নির্বিচারে বাদ দেওয়ায় তখনকার মুখ্যনির্বাচন কমিশনার জে এম লিংডো গুজরাত বিধানসভার নির্বাচন পিছিয়ে দিয়েছিলেন। সেসময় ওই রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন নরেন্দ্র দামোদরদাস মোদী। তখন তাঁর দিক থেকে লিংডো আর কমিশনকে আক্রমণ এক কুৎসিত রূপ নিয়েছিল। বিবাদ গড়িয়ে ছিল সুপ্রিম কোর্ট পর্যন্ত।  শীর্ষ আদালতের অভিমত ছিল, সংবিধানের ৩২৪ নম্বর ধারানুযায়ী ভোটার তালিকা তৈরি, সংশোধন, নির্বাচনের দিনক্ষণ নির্ধারণে কমিশনই শেষ কথা। এটা তাদের সার্বভৌম ক্ষমতা। পিছু হঠতে বাধ্য হয় গুজরাত সরকার। তখন থেকেই বিজেপির মাথায় ছিল এই অসীম ও প্রশ্নাতীত সার্বভৌম ক্ষমতার অধিকারী সংস্থাটির নিয়ন্ত্রণ করে এমন লোকদের আনতে হবে, যাঁদের আরএসএসের প্রতি আনুগত্য সর্বদা অটুট, অন্য ভাষায় বিজেপিকে ক্ষমতায় আনা বা ক্ষমতাসীন বিজেপিকে ক্ষমতায় থাকতে সাহায্য করাটাই কাজ হবে। সে ধারাই চলছে ২০১৯ সাল থেকে। সেই ভাবধারা থেকেই উদ্ভূত প্রশ্নর জবাব এড়িয়ে জ্ঞানেশের বাণী-- ' সচ সচ হোতা হ্যায় (সত্যি সত্যিই হয়)... সূর্য পূর্ব দিকেই ওঠে। কারো কথায় পশ্চিম দিকে ওঠে না।' আর ঠিকানা ০ ভোটারদের হদিশ দিতে মুখ্যনির্বাচন কমিশনারের দাবি, ‘অনেক লোকেরই ঘর নেই। রাতে তারা কখনো রাস্তার ধারে, কখনো ব্রিজের নীচে বা ল্যাম্পপোস্টের পাশে ঘুমোয়। তাদের ভুয়ো ভোটার বলা গরিবদের প্রতি অবিচার করা। এই দেশে কোটি কোটি বাড়ির ০ নম্বর আছে। কারণ পঞ্চায়েত বা পুরসভা তাদের বাড়ির কোনো নম্বর বরাদ্দ করেনি। শহরাঞ্চলে অননুমোদিত কলোনিগুলিতেও বাড়ির কোনো নম্বর থাকে না।' কী রকম সন্ত সন্ত মার্কা কথা! এখানেও লক্ষ্য করুন, আক্রান্ত রাজ্য সরকার ও আঞ্চলিক সরকার। কই, এতদিন তো এপিক কার্ডে ঠিকানা শূন্য বাড়ি পাওয়া যায়নি! আমরা তো জানি এপিক কার্ড নিয়ে এসেছিলেন টি এন শেসন। সেসময় এপিক কার্ড সর্ম্পকে নির্বাচন কমিশন কর্তৃক প্রকাশিত  Handbook For Electoral Registration Officers'- এ ঘোষণাটা ছিল, এপিক বৈধ ভোটারের চিরস্থায়ী পরিচয়পত্র 'EPIC, once issued, is valid for lifetime.' ওই Handbook-এর ৭৬-৭৭ পাতায় বলা আছে, '...EPIC Number is designed to act as the permanent unique identity for every elector'. সোজা অর্থ, এপিক কার্ড বহনকারী বৈধ ভোটার স্বয়ংক্রিয়ভাবে ভারতের নাগরিক। তা কোনো অবস্থাতেই এই নথি ফর্ম ভরতির  সময় বাদ যাবে না ( পৃ ২০-২১)। তাহলে কী উদ্দেশ্যে ও কেন ভোটার তালিকায় নাম তোলার ক্ষেত্রে কমিশন এপিক'কে বাদ দিচ্ছে? আবার কমিশন জানাচ্ছে, ভোটার তালিকায় নাম না থাকা ব্যক্তি মানেই যে তিনি ভারতের নাগরিক নন, তা নয়। এর অর্থ, কমিশন দু' ধরনের নাগরিকত্বের স্তর সৃষ্টি করছে (ভোটাধিকারসহ নাগরিক আর এপিক থাকা সত্ত্বেও ভোটাধিকারবিহীন নাগরিক), যা সংবিধান বিরোধী। প্রশ্নটা এখানেই-- জ্ঞানেশ কুমারের নেতৃত্বাধীন নির্বাচন কমিশন এমন কোনো পদ্ধতি আবিষ্কার করে চাপিয়ে দিতে পারে কিনা যার পরিণতি ৬৫ লাখ নাগরিকের ভোটাধিকার কেড়ে নেওয়া। দেশের সব নাগরিককে সম্ভাব্য সন্দেহভাজন হিসেবে দেখা যা সংবিধান বা জনপ্রতিনিধিত্বমূলক আইনের লক্ষ্য ছিল না, আজও নেই। কমিশনের এই বিষাক্ত বিকৃত দৃষ্টিভঙ্গি বিপুল সংখ্যক নাগরিকের ভোটাধিকার কেড়ে নিয়ে সর্বজনীন ভোটাধিকারের মূলে আঘাত করছে। ভোটাধিকার থেকে বাদ যাওয়া মানেই অসমের ধাঁচে ডি-ভোটার ক্যাটাগরির সৃষ্টি করা। আর তা কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রকের হাতে তুলে দেওয়া। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রক সক্রিয় হয়ে উঠবে, তাদের বিদেশি পঞ্জীভুক্ত আইনের আওতায় এনে দেশ থেকে গণবিতাড়নের প্রকল্প নেওয়া শুরু করবে কিম্বা 'উইপোকা'র মতো মারবে। আর আমরা তো শুনলাম অনুপ্রবেশ কত ক্ষতি করছে -- সে আওয়াজ প্রধানমন্ত্রী স্বাধীনতা দিবসে লালকেল্লা থেকে দিয়ে দিয়েছেন। জানিয়ে দিয়েছেন, 'ভিশন ডেমোগ্রাফি'। 
আরএসএসের সব অ্যাজেন্ডা পূরণের জন্য বিজেপির ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচন জিতে দিল্লির মসনদে বসাটা জরুরি ছিল। কাঙ্ক্ষিত ৪০০ পূরণ হবে না বুঝেই দরকার ছিল জালিয়াতি। দেশের অর্থমন্ত্রীর স্বামী পরাকল প্রভাকর, যিনি নিজেও একজন বিদগ্ধ অর্থনীতিবিদ ও রাজনৈতিক ভাষ্যকার, তাঁর সাফ কথা, ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে রিগিং না হলে বা ভোট চুরি না হলে ইন্ডিয়া জোট ৩১৬, এনডিএ জোট ২১৩ আসন পেত। দেশের ৭৯ টি লোকসভা আসনে ভোট জালিয়াতি হয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন পরাকল প্রভাকর। তাঁর ভাষায়, 'If there was no rigging in the Lok Sabha elections, the All India Alliance (INDIA Bloc) would have won 316 seats'। চব্বিশের লোকসভা ভোটের ফল দেখেই বিজেপির শীর্ষ নেতৃত্ব বুঝে গেল, নিজেদের এলেম, ক্যরিশ্মা আর হিন্দি-হিন্দুত্বর ধ্বজা উড়িয়ে বেশিদিন মসনদে থাকা যাবে না। নয়া কৌশল নিতে হবে। নির্বাচন কমিশনকে সরাসরি কাজে লাগিয়ে মহারাষ্ট্র, হরিয়ানা, দিল্লি জয়টা নিশ্চিত করতে পেরেই ঝাঁপি খুলে দিল এসআইআর। ভোটার তালিকার নিবিড় সংশোধনীর নামে বেছে বেছে দলিত, সংখ্যালঘু, মূলনিবাসী, গরিব মানুষদের ভোটাধিকার কেড়ে নাও। এ শুধু বিহারেই থেমে থাকবে না, সব রাজ্যে হবে। পুরোনো ভোটার তালিকাকে খারিজ করে নতুন ভোটার তালিকা বানানোর প্রস্তুতিপর্ব। স্বৈরাচারী-গণতন্ত্রকে আশ্রয় করে এসআইআর গণতন্ত্রের ভিত নাড়িয়ে দিচ্ছে। রাষ্ট্রবিজ্ঞানী তথা সমাজকর্মী যোগেন্দ্র যাদব যাকে বলছেন, '...it is not just a revision or rewriting of the voters list, it is a tectonic shift in the architecture of universal adult franchise in India.' এক কথায় নির্বাচন কমিশনের মাধ্যমে দিনের শেষে প্রতিষ্ঠানের ক্ষমতায় বলিয়ান ব্যক্তিরা ঠিক করেন কী করবেন, কী করবেন না। এখানে মনে করিয়ে দিই এমন আশঙ্কা সংবিধান রচনাকালেই ছিল। আমাদের সংবিধান রচনার দায়িত্বপ্রাপ্ত গণপরিষদের দুই সদস্য -- অধ্যাপক শিব্বান লাল সাক্সেনা ও হৃদয়নাথ কুঞ্জরু ১৯৪৯ সালেই বারবার সতর্ক করে দিয়েছিলেন, অনুচ্ছেদ ৩২৪ অনুসারে কমিশনের স্বাধীনতা বজায় রাখতে গেলে সরকার ও শাসকদলের রাজনীতির বিরুদ্ধে কমিশনকে 'fully insulated' হতে হবে। ১৯৯০ সালে দীনেশ গোস্বামী কমিশন আর ২০১৫ সালের আইন কমিশনের ২৫৫তম রিপোর্টও একই কথা বলেছিল। শাসকদলের নিজস্ব লোক বসালে স্বাধীন সংস্থাটি অচিরেই তার চরিত্র হারাবে। মহাজনদের সেই আশঙ্কা আজ বাস্তব হয়ে উঠেছে। মুখ্যনির্বাচন কমিশনারের ৮০ মিনিটের সাংবাদিক সম্মেলনকে মনে হচ্ছে বিজেপির জাতীয় মুখপাত্রর প্রেস ব্রিফিং। 


মনে রাখতে হবে, আইনপ্রণেতারা বিভিন্ন রাজনৈতিক দর্শনের ধারক ও বাহক। কিন্তু আইন বা আইনসভায় গৃহীত সিদ্ধান্ত কার্যকর করতে নিয়োজিত আমলাকূলের মন্তব্য বা আচরণে সেই সংস্কৃতির প্রতিফলন কাম্য নয়। আলটপকা মন্তব্য তো বটেই, রাজনৈতিক অভিযোগের জবাব দিয়ে এই প্রশাসনিক শ্রেণিকে ইতিপূর্বে কখনও নিজেদের লঘু করতে দেখা যায়নি। আমলাদের এই স্বাভাবিক ভাবমূর্তি ও মর্যাদা দেখতে অভ্যস্ত ভারতবর্ষ হঠাৎ ব্যতিক্রমী নজিরের সাক্ষী হল জাতীয় নির্বাচন কমিশনের সর্বশেষ সাংবাদিক বৈঠকে। মনে পড়ছে ভারতের মুখ্যনির্বাচন কমিশনার টি এন শেসনের একটি কথা ---  I am not part of Indian Government, I am part of the structure of the Indian Nation. রাহুল গান্ধীর নেতত্বে বিরোধীদের চাপে পড়ে জ্ঞানেশ কুমার সেখানে সেখানে ভারত সরকারের অংশই শুধু হননি, সরাসরি মোদী সরকারের আমড়াগাছি করছেন।

0 Comments

Post Comment