সাংবাদিক গৌরী লঙ্কেশকে ২০১৭ সালে ৫ই সেপ্টেম্বর নিজের বাড়ির সামনে গুলি করে হত্যা করে উগ্ৰ হিন্দুত্ববাদীরা। নির্ভীক সাংবাদিক গৌরীর কলমে বারবার উঠে আসে মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকারের লড়াই, কট্টর হিন্দুত্ববাদীদের সাম্প্রদায়িক রাজনীতির কঠোর সমালোচনা। আজকের সাংবাদিকতায় কিন্তু প্রথম রঙিন শব্দ 'গেরুয়া' নয়—বহুল পরিচিত শব্দ হল 'ইয়েলো জার্নালিজম'—সাংবাদিকতার সেই কদর্য রূপ যা পাঠ্যবই পেরিয়ে এখন গেরুয়া সন্ত্রাসের প্রধান মুখপত্রিকা হয়ে উঠেছে। এই গেরুয়া ত্রাসের প্রধান বিষয়গুলিই হল, যা-কিছু এক স্বাধীন দেশের মানুষের গণতান্ত্রিক পরিসরকে খর্ব করে, তার প্রসার এবং প্রচার। সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা, বর্ণবৈষম্য, জাতিবৈষম্যকে লালিত করে সেখানে নিজেদের সাম্রাজ্য গড়ে তোলাই হল ক্ষমতাসীন বিজেপি-আরএসএস-এর উদ্দেশ্য। দেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে যারা ব্রিটিশদের পদলেহন করে, সেই শ্যামাপ্রসাদ, সাভারকারদের উত্তরসূরী এই ফ্যাসিস্ট-দাঙ্গাবাজদের দল। যাদের বিরুদ্ধে আওয়াজ তুলেছিল গৌরী লঙ্কেশ। সাংবাদিক গৌরী কিন্তু কোনো রাজনৈতিক দলের সদস্য ছিলেন না, তিনি ছিলেন একজন সচেতন সমাজকর্মী। তাঁর সাহসী কলম গর্জে উঠত দক্ষিণপন্থী উগ্ৰ হিন্দুত্ববাদের বিরুদ্ধে। ২০১২ সালে ম্যাঙ্গালোরে সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠীগুলিকে নিষিদ্ধ করার জন্য একটি সভা হয়, যেখানে তিনি বলেন, "হিন্দু ধর্ম কোনো ধর্ম নয় এটি ব্রাহ্মণ্যবাদী আধিপত্য পরম্পরা"। যা আমরা বিশিষ্ট ইতিহাসবিদ্ উমা চক্রবর্তীর বই 'Brahminical Patriarchy' পড়তে গিয়েও দেখি। সমাজের চোখে মহিলাদের অবস্থান, মেয়েদের দেখার দৃষ্টিভঙ্গি কীভাবে সুযোগ বুঝে পাল্টাতে থাকে, সেই পিতৃতান্ত্রিক সমাজের কঠোর সমালোচনার পথ দেখান গৌরীর মতো সচেতন মানুষেরা। গৌরী বলতেন, তিনি কোনো উৎসবের বিরোধী নন। কিন্তু ধর্ম যখন রাজনৈতিক অস্ত্র হয়ে ওঠে এবং অন্য ধর্মের বিরুদ্ধে ঘৃণা ছড়ানোর মাধ্যম হিসেবে ব্যবহৃত হয়, তখন সেই রাজনীতির বিরোধিতা করা তাঁর কাছে রাজনৈতিক কর্তব্য হিসেবে বিবেচিত হয়।
আজকের দিনে দাঁড়িয়ে প্রথম শ্রেণীর সংবাদপত্র যখন ডিম থেরাপিকে জনরোষ বলে সমর্থন করে, ধর্ষণের ঘটনার রাজসাক্ষীকে যখন রাতের অন্ধকারে এনকাউন্টার করে হত্যা করা হয়; তখন মুখে কুলুপ এঁটে রাখা সংবাদমাধ্যমকে প্রশ্ন করতে শেখায় গৌরীর মতো মহিলা সাংবাদিকেরা। গৌরী লঙ্কেশদের মৃত্যু হয় না। যেখানে যত শ্রমিক-কৃষক আন্দোলন করছে, ছাত্ররা প্রতিবাদে রাজপথে নামছে, শাসকের মারের প্রতিবাদে গলা তুলছে, তাদের সবার কন্ঠস্বর হয়ে আছে গৌরী লঙ্কেশ। ১৯৪৭ সালে দেশ স্বাধীন হওয়ার এতবছর পরেও, সাংবাদিকের আগে স্বাধীন, সাহসী এই বিশেষণগুলো আলাদা করে বসাতে হয়। ২০২৬ সালের ওয়ার্ল্ড প্রেস ফ্রিডম ইনডেক্সে ১৮০টি দেশের মধ্যে ভারতের স্থান ১৫৭।
এমতাবস্থায়, পথশিশুর দুধটুকু কেড়ে নিয়ে রাস্তাঘাটে জঞ্জাল সাফ হচ্ছে—তবে নাকি বিনিয়োগ আসবে! মিডিয়া চুপ। তারা যেন মেগা সিরিয়ালের সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ দৃশ্যটা উপভোগ করছে। তাদের এতটুকু প্রশ্ন করার অধিকার নেই যে ওই ফুটপাতে থাকা গরীব মানুষগুলোর অন্ন-বস্ত্র-বাসস্থান জোটানোর ক্ষেত্রে শাসকের ভূমিকা কী?
আজকাল সাধারণ মানুষ যেমন মিডিয়ার ওপর আস্থা হারাচ্ছে, এদেশের স্বয়ং প্রধানমন্ত্রীও মিডিয়াকে বিশেষ পাত্তা দিচ্ছে না বোধহয়। নরেন্দ্র মোদী জনসংযোগ করছেন সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে। পথশিশুর মুখ থেকে দুধ ছিনিয়ে নেওয়া নগরমন্ত্রীও ক্ষমা চাইছেন সোশ্যাল মিডিয়ায়। মন্ত্রীরা বন্যা কবলিত এলাকা দেখতে যাচ্ছেন স্পিডবোটে করে। সেইসমস্তএলাকার সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়ে 'সুজলাং-সুফলাং' গেয়ে শোনাচ্ছেন। কান পাতলেই শোনা যাচ্ছে, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় 'ভয়ঙ্কর সুন্দর ' কথাটা এই মুহুর্তের কথা ভেবেই লিখে রেখে গেছিলেন। আমরা খবরের চ্যানেলে এসবই দেখছি। এছাড়াও মিডিয়া কিছু গুরুত্বপূর্ণ কাজ করছে। রাত-বিরেতে বুলডোজার দিয়ে গরীবের ঘর-দোকান ভাঙলে তারা পৌঁছতে পারছে না ঠিকই। অথচ, প্রধানমন্ত্রী কবে কোথায় ঝালমুড়ি খাচ্ছেন, মুখ্যমন্ত্রী কার বাড়িতে পোলাও-মাংস খাবেন, সেই খবরাখবর একদম গৃহস্থের রান্নাঘর অবধি পৌঁছে গিয়ে কভার করছে। পাশাপাশি, কিছু স্বাধীন ছোট মিডিয়া অনেক বড়ো বড়ো কাজ করছেন তারা তুলে ধরছেন ফ্যাসিবাদ আগ্ৰাসনের রূপরেখা। তাদের এই স্বাধীনভাবে সততার সাথে পথচলা ইতিহাসের দলিল হয়ে থেকে যাবে। গোদী মিডিয়া শাসকের চোখরাঙানির কাছে প্রতিনিয়ত মাথানত করলেও কিছু ইনপেনডেন্ট মিডিয়া আমাদের এখনও আশা জাগায় গণতন্ত্রের চতুর্থ স্তম্ভ পুরোপুরি ভেঙে পড়েনি। তারা শাসকের চোখরাঙানিকে ভয় পায়না, সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার বিরুদ্ধে প্রশ্ন করতে ভয় পায়না প্রকৃত অর্থেই তারা স্বাধীনভাবে সত্যকে তুলে ধরার সাহস দেখায়। দিল্লির জেনজি আন্দোলন, হকার উচ্ছেদে হকারের অনিশ্চিত জীবন, বন্ধ হয়ে যাওয়া সরকারি স্কুল প্রতিমুহূর্তে স্বাধীন মিডিয়ার ক্যামেরা আমাদের সামনে তুলে ধরছে।
ব্রিটিশের বুটের কাছে মাথা নত করেনি আমাদের রবীন্দ্রনাথ নেতাজী ভগত সিং প্রীতিলতা বেগম রোকেয়া সাবিত্রী বাই ফুলের দেশ। এই দেশের মাটি গৌরী লঙ্কেশ, সুজাত বুখারী, নরেন্দ্র দাভোলকর, গোবিন্দ পানসারে এবং কালবুর্গির মতো শহীদের। কালবুর্গিকে হত্যা প্রসঙ্গে গৌরী লঙ্কেশ লেখেন, "কালবুর্গির হত্যাকাণ্ডে কার অর্থনৈতিক লাভ হবে তা কেউ জানেনা, কিন্তু এটা পরিষ্কার যে বসবন্ন বা কালবুর্গির মতো সংস্কারবাদী কষ্টগুলোকে যখন নির্মমভাবে স্তব্ধ করে দেওয়া হয়, তখন মতাদর্শগতভাবে লাভবান হয় উগ্ৰ দক্ষিণপন্থী ফ্যাসিবাদী শক্তিগুলো। মনে রাখা দরকার, মুক্তচিন্তা ও ধারণাকে কখনো হত্যা করা যায় না।"
সহিংসতার বিরুদ্ধে আওয়াজ তোলায় সুজাত বুখারীকে হত্যা করা হয় ২০১৮ সালের ১০ জুন। মহারাষ্ট্রের প্রখ্যাত বামপন্থী নেতা গোবিন্দ পানসারে অসংগঠিত শ্রমিকের অধিকার নিয়ে কাজ করতেন। তিনি শিবাজীর ইতিহাসকে উগ্ৰ হিন্দুত্ববাদী ব্যাখ্যার বাইরে এনে তাঁর ধর্মনিরপেক্ষ রাজনৈতিক চরিত্র তুলে ধরেন এবং টোল-ট্যাক্স বিরোধী আন্দোলনের নেতৃত্ব দেন। উগ্ৰ হিন্দুত্ববাদীরা হত্যা করেন গোবিন্দকে।
মুক্তচিন্তক নরেন্দ্র দাভোলকর কুসংস্কার ও অন্ধবিশ্বাসের বিরুদ্ধে কাজ করতেন। তিনি 'অ্যান্টি সুপারস্টিশন ল' পাশ করানোর জন্য লড়াই করেন। তাঁর এই অন্ধবিশ্বাস ও ধর্মীয় ভন্ডামির বিরুদ্ধে ধারালো অবস্থানে ভয় পেয়ে যায় উগ্ৰ হিন্দুত্ববাদীরা এবং তাঁকেও ২০১৩ সালে হত্যা করা হয়। এই মৃত্যুগুলো আমাদের শেখায় ফ্যাসিস্টরা আসলে ভয় পায় মুক্ত চিন্তাকে অর্থাৎ 'দিমাগ'কে। এইবছর স্বাধীনতা দিবসের দিন প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যে উঠে আসে 'দিমাগী নকশাল'দের কথা—যা মুক্ত চিন্তার আঁতুরঘর। যাকে ভেঙে ফেলতে চেয়ে কখনও ফ্যাসিস্টদের একাডেমি অফ ফাইন আর্টসের দেওয়ালে গেরুয়া রঙ করতে হয়—দেশের ছাত্র-যুবদের দেশদ্রোহী বলতে হয়—কখনও যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে রাতে ঢুকে ছাত্রদের গায়ে আগুন কিংবা পাথর ছুঁড়তে হয়—ঐতিহ্যবাহী নন্দলাল বসুর নকশা করা এমবেল্ড ভেঙে ফেলতে হয়—প্রথম শ্রেণীর সংবাদপত্র 'আনন্দবাজার পত্রিকা'র অফিসে গেরুয়া রঙ করে তাদের 'গেরুয়া-গুন্ডামি'র পরিচয় দিতে হয়—তেতাল্লিশের মন্বন্তরের জ্যান্ত চিত্র তুলে ধরা চিত্তপ্রসাদ ভট্টাচার্যের ছবি মুছে ফেলতে হয়। চিত্তপ্রসাদ তেতাল্লিশের মন্বন্তর ঘিরে গোটা হিন্দু সম্প্রদায়িক শক্তি এবং সংবাদমাধ্যমের একটি প্রভাবশালী অংশ, শ্যামাপ্রসাদের একটি দেবতা রূপ তুলে ধরতে চেয়েছিল। চিত্তপ্রসাদের শিল্প সেই অন্যায় অপপ্রচারের বিরুদ্ধে কথা বলে। ফ্যাসিস্টদের বিরুদ্ধাচারণের এক এবং অন্যতম উপায় হল অনর্গল একনাগাড়ে বারবার আওয়াজ তোলা, প্রতিরোধ গড়ে তোলা এবং প্রশ্ন করে যাওয়া। প্রশ্নের ভয়ে দেশ-নেতা প্রেস কনফারেন্স না-ই করতে পারেন কিন্তু তাকে উত্তর দিতে রিল বানাতেই হবে।
ফ্যাসিস্টদের বিরুদ্ধে এই লড়াইয়ে আমাদের পথ দেখাবে গৌরী লঙ্কেশ, সুজাত বুখারী, গোবিন্দ পানসারের মতো সাহসীরা। যাদের হত্যাকাণ্ডের আজও কোনো সুরাহা হয়নি। গৌরী লঙ্কেশের হত্যাকারী শ্রীকান্ত পাঙ্গরকর ২০১৪ সালে মহারাষ্ট্রের জালনা পুরসভার নির্দল প্রার্থী হিসেবে জয়ী হন। আর সুজাত বুখারী, কালবুর্গি, দাভোলকর, গোবিন্দ পানসারের হত্যাকাণ্ডের ফাইল এখনও প্রমাণের অভাবে বন্ধ হয়ে আছে। দেশের মানুষের সাথে আছে তাদের দেখানো পথ, যা আমাদের অনুপ্রেরণা দেবে। আমরা এই লড়াই লড়বো, জিতবো। একদিন এই দেশ হবে ফ্যাসিস্টমুক্ত। ততদিন রাজপথে, সোশ্যাল মিডিয়ায়, অন্দরে-বন্দরে সর্বত্র বিদ্রোহ ছড়িয়ে পড়ুক।