পড়শি যদি আমায় ছুঁতো যম যাতনা সকল যেত দূরে: লালন সাঁই

পড়শি যদি আমায় ছুঁতো যম যাতনা সকল যেত দূরে: লালন সাঁই

hhhhhhhhhhhhhh

রাফেল বিমান খরিদ ও আম্বানি-প্রেমের কথা দোসর পুঁজির খেলা পর্ব ৯ দোসর পুঁজির কিস্যাঃ

  • 19 June, 2021
  • 0 Comment(s)
  • 491 view(s)
  • লিখেছেন : শুভাশিস মুখোপাধ্যায়
নরেন্দ্র মোদি সাহেব ভারতের প্রধানমন্ত্রী হলেন। এক বছর যেতে না যেতেই এক বছরের মাথায় তিনি স্লোগান দিলেন, “মেক ইন ইন্ডিয়া”!। শ্লোগানটি রূপায়ণের জন্য তিনি এবং তাঁর ঘনিষ্ঠ সুহৃদ, শ্রী অনিল আম্বানি মহাশয় মার্চ ৫, ২০১৫ এক “ব্রেন-স্টর্মিং” অধিবেশনে মিলিত হয়ে কীভাবে “মেক-ইন-ইন্ডিয়া” পরিচালিত করা যায়, তা নিয়ে মাথা খুঁড়তে বসেন। জ্যোতিষ মতে তখন আম্বানির শনির দশা – সিবিআই আম্বানির কোম্পানির বিরুদ্ধে টুজি স্পেক্ট্রাম কেলেঙ্কারিতে সরকারি চাকুরেদের ঘুষ দিয়ে অন্যায্য সুবিধা আদায়ের অভিযোগের তদন্ত চালাচ্ছে এবং প্রাথমিক তদন্তে এই অভিযোগের সপক্ষে প্রমাণও মিলেছে, আম্বানির কোম্পানিও ঋণ-খেলাপি মামলায় জর্জরিত।

জনপ্রিয় সিনেমায় একজন নায়ক আর একজন খলনায়ক থাকে। মহান টাইপের সিনেমায় দেখা যায় শেষ পর্যন্ত বহু কসরত করে খলনায়ক নায়কে কাছে পরাজিত হয়। সত্যমেব জয়তে! কিন্তু এখানে গল্প আসলে দুই খলনায়কের, অনিল আম্বানি এই কাহিনীর একজনগুরুত্বপূর্ণ খল নায়ক আর দ্বিতীয় খলনায়ক আমাদের বিমান-বিহারী, অধুনা করোনা-কারণে গৃহবাসী প্রধানমন্ত্রী শ্রী নরেন্দ্র দামোদর মোদি। এখানে দুই খলনায়ক পেটাচ্ছে নায়ককে, আমাদের, দেশের আম-জনতাকে।

নরেন্দ্র মোদি সাহেব ভারতের প্রধানমন্ত্রী হলেন। এক বছর যেতে না যেতেই এক বছরের মাথায় তিনি স্লোগান দিলেন, “মেক ইন ইন্ডিয়া”!। শ্লোগানটি রূপায়ণের জন্য তিনি এবং তাঁর ঘনিষ্ঠ সুহৃদ, শ্রী অনিল আম্বানি মহাশয় মার্চ ৫, ২০১৫ এক “ব্রেন-স্টর্মিং” অধিবেশনে মিলিত হয়ে কীভাবে “মেক-ইন-ইন্ডিয়া” পরিচালিত করা যায়, তা নিয়ে মাথা খুঁড়তে বসেন। জ্যোতিষ মতে তখন আম্বানির শনির দশা – সিবিআই আম্বানির কোম্পানির বিরুদ্ধে টুজি স্পেক্ট্রাম কেলেঙ্কারিতে সরকারি চাকুরেদের ঘুষ দিয়ে অন্যায্য সুবিধা আদায়ের অভিযোগের তদন্ত চালাচ্ছে এবং প্রাথমিক তদন্তে এই অভিযোগের সপক্ষে প্রমাণও মিলেছে, আম্বানির কোম্পানিও ঋণ-খেলাপি মামলায় জর্জরিত।

এই সময় ভারতের প্রধানমন্ত্রী স্বয়ং আম্বানির হয়ে একই সঙ্গে ব্যাটিং এবং আম্পায়ারিং-এর দায়িত্ব নেন। নিন্দুকেরা বলে, মোদিজির সঙ্গে আলোচনার প্রেক্ষিতে আম্বানি “আচমকা” প্রতিরক্ষার সঙ্গে যুক্ত, অতি উচ্চ-দক্ষতা-সম্পন্ন একটি কোম্পানি খোলার উদ্যোগ নেন। এই কোম্পানির মাধ্যমে আম্বানি ভারত সরকারের সহায়তায় এবং ভারত সরকারের হয়ে বিদেশি প্রতিরক্ষা-সংক্রান্ত দ্রব্যের ব্যবসায়ীদের ভারতীয় অংশীদার হতে চান। মোদির সঙ্গে আলোচনার ঠিক আগের দিন, মার্চ ৪, ২০১৫ আম্বানি সংস্থা “পিপাভাভ ডিফেন্স এন্ড ইঞ্জিনিয়ারিং” নামে একটি অখ্যাত সংস্থার ১৭.৭৭ শতাংশ শেয়ার কিনে নেয় এবং টি-২০-র দ্রুততায় এরপর খেলা শুরু হয়ে যায়।। সমস্যা হলো, মাত্র ১৭ শতাংশের কিছু বেশি শেয়ারের মালিক আম্বানিকে প্রতিরক্ষা বিষয়ে বিদেশি সংস্থার দেশি অংশীদার হওয়ার যোগ্যতা দেয়নি। সংস্থাটির নিয়ন্ত্রণ করার মত প্রয়োজনীয় শেয়ারের পরিমাণ, ৩৬ শতাংশ। অনেক কাঠ-খড় পুড়িয়ে আম্বানি তা কিনতে সক্ষম হয় জানুয়ারি ১৬, ২০১৬। সংস্থাটির শেয়ার কেনার প্রায় এক বছর পর আম্বানি এই সংস্থাটির নাম পরিবর্তন করে রাখে “ রিলায়েন্স নাভাল এন্ড ইঞ্জিনিয়ারিং” এবং ভারতীয় প্রতিরক্ষা বিষয়ক দ্রব্যাদি ভারতীয় সামরিক বাহিনীকে সরবরাহ করার যোগ্যতা না থাকা সত্তেও কোম্পানিটি ভারতীয় নৌ-সেনা বাহিনীকে “ নাভাল অফসোর প্যাট্রল ভেহিকিলস” সরবরাহ করার বরাত হস্তগত করে, সামরিক বাহিনীর আপত্তি সত্তেও এবং প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরের প্রত্যক্ষ হস্তক্ষেপে, অর্থাৎ প্রধানমন্ত্রী এখানে আমপায়ারের ভূমিকা গ্রহণ করেন! যথারীতি, এই বিষয়ে প্রয়োজনীয় দক্ষতার অভাবে আম্বানির এই সংস্থাটি সেই বরাত সরবরাহে ব্যর্থ হয়। এই ব্যর্থতার কারণে তিন ধরণের মানুষ ও সংস্থা বিপদে পড়ে; ভারতীয় নৌবাহিনী, রিলায়েন্স যে সব ঠিকাদারদের নিয়োগ করেছিল এবং সরকারি চাপের কাছে নতি স্বীকার করে যে ঋণদাতা সংস্থাগুলি রিলায়েন্সের এই সন্দেহজনক সংস্থাকে ঋণ দিয়েছিল। অবশেষে সংস্থাটি দেউলিয়া ঘোষণার মত অবস্থার সন্মুখীন হয়। এই সংস্থার ঋণদাতারা এই সংস্থাকে দেউলিয়া ঘোষণা করে সংস্থার সম্পত্তি অধিগ্রহণের জন্য পদক্ষেপ করে।

আম্বানির সঙ্গে যখন পর্দার আড়ালে এই সমস্ত সন্দেহজনক সমঝোতা চলছে, তখন দ্বিতীয় ইউপিএ আমলে শুরু হওয়া ফরাসি যুদ্ধবিমান কেনার আলোচনা, যা ২০০৭ সালে শুরু হয়েছিল, তা মার্চ ২০১৫-এ প্রায় চূড়ান্ত পর্যায়ে উপনীত হয়। ২০০৭ সালের আলোচনার নির্যাসঃ ভারত সরকারের পক্ষ থেকে ফ্রান্সের ডাসল্ট এভিয়েশনের কাছ থেকে ১২৬টি “মিডিয়াম মাল্টি-রোল কম্বাট বিমান” কেনা হবে। এই কেনাকাটার বিষয়ে দুপক্ষের মধ্যে যে সমঝোতা হয়েছিল, তাতে একেবারে স্পষ্ট করে উল্লেখ কারা ছিল যে এই কেনা-কাটাতে “ খরিদের প্রাথমিক দাম (cost of initial purchase), প্রযুক্তি হস্তান্তর (of transfer of technology), লাইসেন্স প্রদান (licensed production) সহ অন্যান্য বিষয় অন্তর্ভুক্ত থাকবে।“

ভারতীয় বায়ুসেনা সব দিক বিবেচনা করে ২০১১-তে মতামত দেয় যে ডাসল্টের রাফেল ও ইউরোফাইটার জিএমবিএইচ-এর টাইফুন ফাইটার বিমান বায়ুসেনার প্রয়োজনের জন্য যথেষ্ট এবং সেই মত ২০১২ সালে ডাসল্ট-প্রদত্ত দরপত্র সর্বনিম্ন বলে দেখা যায় এবং এই কোম্পানি এবং ভারত সরকারের মধ্যে আলোচনার চূড়ান্ত অংশের সূত্রপাত ঘটে মার্চ ১৩, ২০১৪।

ভারতের পক্ষ থেকে হিন্দুস্থান এরোন্যটিক্যাল লিমিটেড বা এইচএএল এবং ডাসল্টের মধ্যে কাজের ভাগাভাগি সংক্রান্ত যে চুক্তি হয় তাতে ভারতে যে সব এই জাতীয় বিমান নির্মিত হবে তার ফরাসি কোম্পানি ডাসল্টের ভাগে পড়ে ৭০ শতাংশ কাজ আর ভারতীয় সংস্থা, এইচএএল-এর ভাগে পড়ে ৩০ শতাংশ কাজ। এই সমঝোতা হওয়ার পর ডাসল্টের সিইও মন্তব্য করেন, “ আমি আশাবাদী যে এই চুড়ান্ত বিষয়টি দ্রুত সাক্ষরিত হবে”। (I strongly believe that contract finalisation and signature would come very soon.”)

যে দ্রুতগতিতে এ যাবৎ এই আলোচনা চলছিল, কোনো অজ্ঞাত কারণে তার গতি শ্লথ হয়ে যায়। ক্রিকেট=প্রেমীরা এই সব ক্ষেত্রে “গট-আপ গেম”-এর গন্ধ পান। পরবর্তী কালে এই শ্লথ গতির অবশ্য একটা যথেষ্ঠ “সন্তোষজনক” ব্যাখ্যা মেলে। যখন এই বরাতের বিষয়টি নিয়ে আর কোনো বকেয়া আলোচ্য কিছু থাকেনা, সেই সময় নাগাদ, মার্চ ২৮, ২০১৫-এ শ্রী অনিল আম্বানি “রিলায়েন্স ডিফেন্স লিমিটেড” নামে একটি কোম্পানি নথিভুক্ত করেন। ভারত সরকার, প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরের নির্দেশে ডাসল্টের সঙ্গে চূড়ান্ত চুক্তির সময় পেছিয়ে দেয় এপ্রিল ১০, ২০১৫ পর্যন্ত। এ কথা মনে করা কি অসঙ্গত যে আম্বানি সংস্থা ভারতের প্রশাসনের সর্বোচ্চ স্তর থেকে এই প্রতিরক্ষা বিষয়ক বরাত সম্পর্কে সম্যকভাবে অবগত হয়েই এই বরাতের অংশীদার হওয়ার জন্য ঘুঁটি সাজানোর কাজটি শুরু করে দেয়?

আম্বানির সঙ্গে যে ভারত সরকার কোনো অনৈতিক সমঝোতায় যেতে চলেছে, তা ভারত সরকারের পররাষ্ট্র মন্ত্রক পর্যন্ত জানত না। এই সিদ্ধান্তে পৌঁছনর জন্য আমরা ভারত সরকারের পররাষ্ট্র সচিবের অনেক মন্তব্যের মধ্যে থেকে একটার উল্লেখ করি। ভারতের পররাষ্ট্র সচিব, শ্রী এস জয়শঙ্কর, এপ্রিল ৮, ২০১৫ বিবৃতি দিয়ে বলেন যে ভারত সরকার এইচএএল এবং ডাসল্টের মধ্যে যে সমঝোতায় পৌঁছেছে, তা এক-দু দিনের মধ্যেই চূড়ান্ত হয়ে যাবে। জয়শঙ্করের এই বক্তব্য থেকে স্পষ্ট যে এই শেষ পর্যায়ে আর নতুন কোনো আলোচনার বিষয়, তা সে টেকনিক্যাল বা অন্যান্য যাই হোক, সেই সব বিষয়ের অন্তর্ভুক্তির পরিসর তৈরি হওয়ার কোনো স্থান ছিলনা।

দু-একটি সন্দেহজনক বিষয় এতটাই সন্দেহজনক যে, সেগুলো একেবারে পস্পরের সঙ্গে সম্পর্কহীন, এমন কথা ভাবার কোনও রাস্তাই নেই। ভারতের প্রধানমন্ত্রী ও ফরাসি প্রধানমন্ত্রীর মধ্যে আলোচনায় সব ধরণের কূটনৈতিক রীতি ভঙ্গ করে ভারতের বিদেশ মন্ত্রী, প্রতিরক্ষামন্ত্রী অনুপস্থিত ছিলেন। এই বরাত চূড়ান্ত করার বিষয়টি এতটাই গোপনীয়তার সঙ্গে ঘটেছিল যে ভারতের প্রতিরক্ষামন্ত্রী এই রকম একটি গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা চূড়ান্তকরণের দিনে গোয়াতে একটি একেবারেই এলেবেল এক মৎস্য প্রকল্প উদ্বোধনে ব্যস্ত ছিলেন! তাই এ প্রশ্ন তো উঠবেই, যেদিন এই চূড়ান্তকরণ হবে এবং কী শর্তাবলী প্রযোজ্য হবে তা জানতেন একমাত্র ভারতের প্রধানমন্ত্রী স্বয়ং, এবং এমনকি হতে পারে যে তাঁর মাধ্যমে প্রতিরক্ষার মত একটি স্পর্শ-কাতর বিষয়ে গোপন খবর জানতে পারেন প্রাণের দোসর, অনিল আম্বানি? পরবর্তী ঘটনাবলী কিন্তু সেদিকেই ইঙ্গিত দিচ্ছে।

এমনকি মোদির দুই প্রাক্তন সহযাত্রী এবং এনডিএ আমলের বিজেপির প্রাক্তন প্রতিরক্ষামন্ত্রী শ্রী যশোবন্ত সিনহা এবং শ্রী অরুণ শৌরি মহাশয়দ্বয় এই মর্মে ভারতের সুপ্রীম কোর্টে মোদির বিরুদ্ধে এই অভিযোগ তুলে কিন্তু মামলা করেছেন!

এপ্রিল ১০, ২০১৬ ও তারপরের কাহিনি

ভারতের বায়ুসেনা কমব্যাট বিমান কেনার সময় একেবারেই সামরিক যুক্তি দিয়ে পরিচালিত হয়েছি। সেই সামরিক যুক্তি থেকেই ১২৬টি কমব্যাট বিমান ভারতের পক্ষ থেকে এইচএএল এবং ফ্রান্সের পক্ষ থেকে ডাসল্ট-এর কাছ থেকে কেনার কথা চূড়ান্ত করার কথা ভাবা হয়। কী সেই গুরুত্বপূর্ণ সামরিক যুক্তি? সংক্ষেপে তা এই রকম। ভারতের বায়ুসেনার কাছে যুদ্ধবিমানের বৈচিত্র বিপুল, ফলে রক্ষণাবেক্ষণের দৃষ্টিকোণ থেকে এই বৈচিত্র্যপূর্ণ বিমানের জন্য যন্ত্রাংশের সংখ্যাও সেই অনুপাতে বিপুল হতে বাধ্য। ব্যবস্থাপনা বিজ্ঞানের প্রেক্ষিতে এই অবস্থাটি অনভিপ্রেত। তাই জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদ সিদ্ধান্তে আসে যে খণ্ড খণ্ড, যখন যেমন তখন তেমন এই ভিত্তিতে প্রতিরক্ষা সংক্রান্ত কেনা-কাটা না করে সমতা রক্ষা করা সম্ভব এমন সমাধান খোঁজার পাশাপাশি একই সঙ্গে কারিগরি হস্তান্তরের বিষয়টিও মাথায় রাখা প্রয়োজন। এই বৈজ্ঞানিক সিদ্ধান্তের ভিত্তিতেই এক লপ্তে ১২৬টি বিমান এবং তার পাশাপাশি কারিগরি হস্তান্তরের বিষয়টি নিয়ে আলোচনা চালিয়ে এই ফরাসি বিমানটিকে নির্বাচিত করা হয়।

কিন্তু...। এপ্রিল ১০, ২০১৫, ভারতের প্রধানমন্ত্রী এযাবৎ অনুসৃত যাবতীয় ন্যায়নীতি বিসর্জন দিয়ে সংশ্লিষ্ট সব দপ্তরকে এড়িয়ে গিয়ে, সম্পূর্ণ একক সিদ্ধান্তে পূর্বের আলোচনা ও সমঝোতা বাতিল করে ১২৬টি বিমানের পরিবর্তে মাত্রও ৩৬টি বিমান কেনার জন্য চুক্তি চূড়ান্ত করেন। যে পুরনো সমঝোতাকে বাতিল করে মোদিজি এই নতুন চুক্তি এবং সমঝোতায় পৌঁছোলেন, সেখানে ভারতীয় সংস্থা, এইচএএল আর ভারতে তাদের টেকনিক্যাল অংশীদার রইলো না এবং ভারতে এখন ডাসল্টের জন্য “নতুন অংশীদার” খোঁজার প্রয়োজন পড়লো। এখনেই প্রবেশ ঘটলো দোসর পুঁজির, অর্থাৎ এখন ঘটলো ভারতীয় রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থা, এইচএএল-র প্রস্থান ও আম্বানির প্রবেশ- কিন্তু মঞ্চ প্রস্তুত করার সম্পূর্ণ প্রক্রিয়াটি দেশের প্রতিটি চালু আইন ও পদ্ধতিকে এড়িয়ে গিয়ে করা হয়েছে। মোদিজির করা এই “নতুন” চুক্তির মূল কথা সংক্ষেপে এই রকমঃ

১। ১২৬টির পরিবর্তে ৩৬টি বিমান কেনা, ভারতে ঐ বিমানের যন্ত্রাংশ তৈরির যে বাধ্যতামূলক শর্ত ছিল তার বিলোপ, কোনো প্রযুক্তি হস্তান্তর হবেনা, এইচএএল-এর পরিবর্তে আম্বানির সংস্থা এখন থেকে আগামী ৪০ বছর ডাসল্টের সঙ্গে ভারতের হয়ে প্রযুক্তি-অংশীদার হবে। বলে রাখা দরকার যে এই সব সিদ্ধান্ত নেওয়ার একক এক্তিয়ার ভারতের প্রধান মন্ত্রীর নেই। যে সাংবিধানিক প্রক্রিয়া অক্ষরে অক্ষরে মেনে চলবেন বলে মোদিজি ঈশ্বরের নামে প্রত্রিশ্রুতিবদ্ধ হয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রী পদে আসীন হওয়ার সময়, সেই সংবিধানকে মান্যতা দিয়ে তাঁকে আগের সিদ্ধান্ত বদল করতে গেলে সাংবিধানিক পদ্ধতি মেনে যা করতে হত তা এই রকমঃ

ক) বায়ুসেনার জন্য নতুন করে কোনো বরাত চূড়ান্ত করতে গেলে প্রথমে সেই চাহিদাটি বায়ুসেনা সার্ভিস হেড কোয়ার্টার থেকে লিখিতভাবে জানাতে হয়। সেই চাহিদাটি অতঃপর সার্ভিস কোয়ালিটেটিভ রিকোয়ারমেন্ট মারফৎ বিধিবদ্ধ করতে হয়।

খ) এরপর সেটি যায় সামরিক বাহিনীর “ক্যাটেগোরাইসেজন কমিটি”-র কাছে, যারা ঠিক করে এই কেনা-কাটা কেমনভাবে হবে ( অর্থাৎ কেমনভাবে দরপত্র আহ্বান করা হবে)।

গ) এরপর “ডিফেন্স একুইজিসন কাউন্সিল” একটি “ এক্সেপ্টেন্স অফ নেসেসিটি” (ক) এবং (খ) বর্ণিত পদ্ধতির মান্যতা বিচারের পরে বিধিবদ্ধ করবে।

ঘ) এরপর এই সব কিছু নিয়ম-মাফিক হলে তবে তা প্রয়োজনীয় বিজ্ঞপ্তি দিয়ে এর জন্য যে নির্দিষ্ট ক্যাবিনেট কমিটি রয়েছে, তার কাছে অনুমোদনের জন্য যাবে।

বলাই বাহুল্য, দোসর পুঁজির স্বার্থে এত সব প্রক্রিয়ার কোনো একটিও এক্ষেত্রে মানা হয়নি। এটা যদি দুর্নীতি না হয় তো “দুর্নীতি” সম্পর্কে আমাদের ধারণারই পরিবর্তন করতে হয়! এদিকে, ভারত থেকে এই বরাত হস্তগত হয়েছে ধরে নিয়ে ফরাসি সংস্থাটি অনেক লগ্নি করে ফেলেছে। এই অবস্থায় যদি তার বরাত বাতিল হয়, তাহলে সংস্থাটিকে তার ঝাঁপ বন্ধ করে দিতে হয়। অতএব ফরাসি সংস্থাটিরও বাধ্যবাধকতা ছিল যেভাবেই হোক এই বরাতটি পাওয়া। এমন এক দেওয়ালে পিঠ ঠেকা অবস্থায় ফরাসি সংস্থাটিকে প্রযুক্তি সম্পর্কে অজ্ঞ, টেকনিক্যাল দক্ষতাহীন, প্রতিরক্ষা-বিষয়ে অভিজ্ঞতাহীন একটি সন্দেহজনক কোম্পানিকে ভারতীয় প্রশাসনের সর্বোচ্চ ক্ষমতাধরের চাপাচাপিতে মেনে নিতে হয়েছে, যেটি আম্বানির ভুঁইফোড় সংস্থা। ফরাসি সংস্থার এক উচ্চপদের প্রতিনিধি এই কথা ফরাসি টেলিভিসনে সর্বসমক্ষে স্বীকার করেছেন। এই বরাতের বিষয় যে ফরাসি রাষ্ট্রপতির আমলে চূড়ান্ত রূপ পেয়েছিল, সেই শ্রী হলান্দে বলেছেন যে আম্বানির বিষয়ে তাঁদের বিশেষ কিছু বলার সুযোগই ছিলনা।

তাঁর ভাষায় উদ্ধৃটি দেওয়া যাক। “We didn’t have any say in this matter,” Hollande told Mediapart. “It is the Indian government which had proposed this service group, and Dassault who negotiated with Ambani. We didn’t have the choice, we took the interlocutor who was given to us.”

পরবর্তীকালে ফরাসি রাষ্ট্রপতি আরও বলে যে তাঁরা ভারতের এই “part of the new formula of the Indian Government.”, বা “ভারতের এই নয়া ফর্মুলা” তাঁরা মেনে নিতে “বাধ্য” হয়েছেন।

তবে ঘটনার শেষ এখানেই নয়। ভারতের বায়ুসেনার বেশ কয়েকজন প্রাক্তন উচ্চপদস্থ সেনানায়ক একবাক্যে বলেছেন যে এই বরাতে আম্বানি গোষ্ঠীকে সাথে নেওয়ার জন্য এদেশে ঐ বিমানের যন্ত্রাংশ তৈরির অংশটি চুক্তি থেকে ছেঁটে দেওয়ায় ভারতের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা দুর্বল হয়ে পড়বে। অর্থাৎ, যে যুক্তিতে, যা কিনা বলা হয়েছিল যে এই কেনাকাটা ভারতের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে সবল করবে, এই কেনাকাটা দেখিয়ে দিল আসল উদ্দেশ্য দোসর পুঁজিকে কিছু পাইয়ে দেওয়া।

এইচএএল-এর প্রাক্তন অধিকর্তা বলেছেন যে আম্বানি সংস্থা যে সব প্রযুক্তি দিয়ে সাহায্য করবে বলছে, সে বিষয়ে তাদের দক্ষতার কোনো প্রমাণ তারা এখনও দিতে পারেনি। পক্ষান্তরে, সারা পৃথিবীতে এইচএএল-এর এই দক্ষতা প্রমাণিত। হয়ত ভবিষ্যতে ভারত সরকার আম্বানিকে এই সব প্রযুক্তি দিয়ে দেওয়ার জন্য এইচএএল-কে চাপ দিতে পারে।

এই বরাতের বিষয়টি চূড়ান্ত হয়ে যাওয়ার পর প্রতিরক্ষা সংক্রান্ত একটি ফরাসি ওয়েবসাইট মন্তব্য করে যে এই সিদ্ধান্ত মোদির এবং তা আম্বানির জন্য, কেননা মোদি এই গোষ্ঠীর ঘনিষ্ঠ।

ইতিমধ্যে আম্বানি আর একটি কোম্পানি ফেঁদে বসে, যার নামকরণ হয় “রিলায়েন্স এরোস্ট্রাকচার লিমিটেড”। এই নতুন ভুঁইফোঁড় সংস্থাটিও এপ্রিল ২০১৫-এই ডাসল্টের সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ হয়ে পড়ে। তার “জিও বিশ্ববিদ্যালয়ের” মত এই নতুন কোম্পানিটির না ছিল কোনো জমি, না ছিল কোনো বিমান বানানোর কারখানা! কিন্তু মোদির আশীর্বাদে এসব “তুচ্ছ” বিষয় প্রতিরক্ষার মত বিরাট বিষয়ের পথে অন্তরায় হিসেবে দেখা দেয়নি। হ্যাঁ, এই কোম্পানি আজ পর্যন্ত প্রতিরক্ষা-বিষয়ক কোনো দ্রব্যাদি উৎপাদন করেনি এবং আগামী বেশ কিছু বছর সেই কাজটি করার মতন অবস্থায় নেই! যে আদি বরাতের কথা হয়েছিল সেটির মৃত্যু ঘটে জুন ২৪, ২০১৫, যেদিন সেই পুরনো বরাতটি প্রত্যাহার করে নেওয়া হয়।

জানুয়ারি ২৪, ২০১৬। এইবার রিলায়েন্স সংস্থা সিনেমা ব্যবসায় পা রাখে এবং সেই ব্যবসার জন্য একেবারে আন্তর্জাতিক অংশীদারের সঙ্গে – অংশীদারটি হেঁজিপেঁজি কেউ নয়, প্রাক্তন ফরাসি রাষ্ট্রপতি হলান্দের পার্টনার, জুলি গায়ের সংস্থা, রুজ ইন্টারন্যাশানালের সঙ্গে। জোট বাঁধার কারণ- যৌথ ভাবে একটি চলচিত্রর প্রযোজনা করা। শেষ পর্যন্ত এই অংশীদারিত্বের দায় হিসেবে আম্বানি ঐ সংস্থাকে ১৪.৮ লক্ষ ইউরো দেয় এবং ঠিক তার দুদিন পর, জানুয়ারী ২৬, ২০১৬, মোদি এবং হলান্দে ৩৬টি রাফাল বিমান কেনার এবং আম্বানিকে এইচএএল-এর পরিবর্তে নিয়োগ করার চুক্তিতে সই করেন। কুলোকে বলেছে যে ফরাসি দেশের দালালদের ঘুরপথে দালালির টাকা না দেওয়া পর্যন্ত এই চুক্তি চূড়ান্ত হওয়া দুস্কর ছিল!

ভারতের দিকে একটু তাকানো যাক। যখন আম্বানির সঙ্গে ডাসল্টের যৌথ কাজের চুক্তি হয়, তখন নিয়মানুসারে ভারতের চুক্তিবদ্ধ সংস্থাটির কারখানার জন্য নিজস্ব জমি, প্রতিরক্ষা-সরঞ্জাম নির্মাণের পরিকাঠামো, প্রযুক্তি এবং দক্ষ মানব-সম্পদ বাধ্যতামূলকভাবে থাকা দরকার। কিন্তু আম্বানির না ছিল জমি, না ছিল কারখানা, ফলে বাকিগুলো থাকার কোনও প্রশ্নই নেই। তাছাড়া সে ঐ সময়ে তার দেখান কোম্পানিটির নিয়ন্ত্রক মালিকও ছিলনা ( তার হাতে নিয়ন্ত্রণ করার জন্য প্রয়োজনীয় শেয়ারের অংশ ছিলনা)। ছিল শুধু প্রধান মন্ত্রীর “আশীর্বাদ”। যখন আম্বানির বিমান রক্ষ্ণণাবেক্ষণের দক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে, তখন আম্বানি বলে যে তারা “ফ্যালকন জেট বিমানের” পাখা নির্মাণ করবে। কিন্তু গোলমাল অন্য জায়গায় – এই ফ্যালকন জেট বিমান অসামরিক যাত্রিবাহী বিমান, তার সঙ্গে সামরিক যুদ্ধ বিমানের কোনো সম্পর্কই নেই এবং এই অভিজ্ঞতা নিয়ে সামরিক যুদ্ধ বিমান রক্ষণবেক্ষণ করার কথা সারা পৃথিবীতে কেউ কখনো শোনেনি।

ভারত সরকারের একজন “অফসেট পার্টনার” প্রয়োজন পড়ে কেননা ভারত সরকার চাইছিল যে বিদেশ থেকে আমদানি করা প্রতিরক্ষা-সরঞ্জাম যেন এদেশেই তৈরি হতে পারে এবং তাদের রক্ষণাবেক্ষণের ভার এদেশের প্রযুক্তিবিদরাই নিতে পারে। এই দুটি বিষয়েই আম্বানির সংস্থা সব দিক থেকে অযোগ্য এবং অকেজো। বর্তমান প্রতিরক্ষামন্ত্রী শ্রীমতি নির্মলা সীতারামণ বাণিজ্য মন্ত্রী থাকার সময় আম্বানির একের পর এক ভুয়ো প্রতিরক্ষা-সংক্রান্ত সংস্থাকে লাইসেন্স এবং জমি জলের দরে দিয়েছেন। ২০১৮ সালের অর্থবর্ষের শেষে এসে দেখা যাচ্ছে যে আম্বানির এই সব সংস্থার কারুরই “নেট এসেট” বা মোট সম্পত্তির মূল্য ১ লক্ষ টাকা ( ঠিকই পড়েছেন, এক লক্ষ টাকা) ছাড়ায়নি। এই নির্মলা সীতারমণ আজকে আম্বানির গুণগান গাইছেন দেশের সংসদে। এছাড়াও ভারত আগে যে দামে ১২৬টি বিমান কিনছিল, এখন মাত্রও ৩৬টি বিমান কেনায় বিমান পিছু দাম বেশি পড়ছে। আর, আম্বানি জমি বাবদ সরকারকে দেয় টাকা ছাড়া আজ পর্যন্ত এই প্রকল্পে একটি পয়সাও লগ্নি করেনি। বিশ্বায়ন-পরবর্তী ভারতে এইটিই সম্ভবত সবচেয়ে বড়ো প্রতিরক্ষা-বিষয়ক জোচ্চুরি।

দোসর পুঁজির কারসাজিতে আমাদের নির্বাচিত সরকার ব্রিটেনের ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানিকেও হার মানিয়েছে সন্দেহ নেই।

0 Comments

Post Comment