পড়শি যদি আমায় ছুঁতো যম যাতনা সকল যেত দূরে: লালন সাঁই

পড়শি যদি আমায় ছুঁতো যম যাতনা সকল যেত দূরে: লালন সাঁই

hhhhhhhhhhhhhh

রত্নাকরের পিতা

  • 05 September, 2021
  • 0 Comment(s)
  • 321 view(s)
  • লিখেছেন : বিজন রায় চৌধুরী
“তপু আজও ফিরে নাই- মিনু দেখল বাবার গলার স্বর ক্রমশ অস্পষ্ট হয়ে আসছে। দু’চোখের পাতায় ঘুম এলিয়ে পড়েছে। তপু বা তপন জগদীশের ছেলে, মিনুর একমাত্র দাদা। পারিবারিক দোকানের মাল সওদা করতে সদরে গেছে দিন সাতেক হল। এখনও ফেরেনি, দিন দুয়েক ধরে বৃদ্ধ দিনে অন্তত বার চার পাঁচেক ছেলের কথা জিজ্ঞেস করে। ওষুধ খাওয়ানো হয়ে গেছে। এখন মিনু তোয়ালে দিয়ে বাবার মুখ মুছিয়ে সাদা চাদরটা বুক বরাবর তেনে দিল। বাবার মাথায়, কপালে হাত বুলিয়ে মমতার গলায় বলল – লক্ষীছেলের মতো ঘুমিয়ে পড় –”

“লুকায়। আমার কাছে সব লুকায়। বিছানায় পইড়্যা আছি বইল্যা ভাবে আমি কিছু টেইর পাইনা, জানি না-

জগদীশের ঠোঁটের কোণে বিষণ্ণ এক হাসির রেখা ফুটে ওঠে ।

গত পাঁচ বছর ধরে জগদীশ শয্যাশায়ী। অজানা এক নার্ভের রোগ তাকে পুরোপুরি বিছানায় পেড়ে ফেলেছে। খাওয়া দাওয়া প্রাকৃতিক কাজকর্ম সব বিছানাতেই। বাবাকে দেখভালের জন্য তপন একজন মহিলাকে রেখেছে। নাম কমলা , তপন ডাকে কমলাদি বলে।ঘরদোর পরিষ্কার রাখা, রান্নাবান্না সবই কমলাদির দায়িত্বে।

মানুষের এক অঙ্গ অচল বা শক্তিহীন হলে অন্য অঙ্গগুলির কর্মতৎপরতা বৃদ্ধি পায়। ইদানীং জগদীশের শ্রবন শক্তির তীক্ষ্ণতা বেড়েছে, বেড়েছে অনুভবের গভীরতা। অনেক কিছুই আগের থেকে আঁচ করতে পারে। বেশ কিছুদিন ধরেই বুঝতে পারছিল এ বাড়িতে যা চলছে তার লক্ষণ খুব ভালো নয়।তপুর মা বেঁচে থাকতে তাকেও তার সন্দেহের কথা জানিয়েছিল।চল্লিশ বছর ধরে মুদিখানার ব্যবসা চালিয়েছে। ব্যবসাটা সে ভালোই বোঝে। তাই বছর চার-পাঁচের মধ্যেই ব্যবসার এতখানি শ্রীবৃদ্ধি তার চোখে যেন অন্য রকম ঠেকে; ঝক ঝক করা নতুন রঙের দেওয়াল, ঘরের দরজা জানালায় দামী পর্দা –রঙিন টিভি- জগদীশের কেমন অস্বস্তি লাগে। তার জন্য এই ব্যয়বহুল চিকিৎসার আয়োজন নাকি মুদিখানার আয়ে চলছে জেনে জগদীশ অবাক হয়ে গিয়েছিল। শুনেছে তপু নাকি সাবেক মুদিখানাটা নতুন করে সাজিয়েছে। এখন আর মুদিখানা নয়,মর্যাদা বাড়িয়ে এখন ষ্টেশনারী । মেয়েদের সাজসজ্বার রকমারি জিনিষপত্র , বেবিফুড, তার উপর সদ্য বিস্কুট কোম্পানীর এজেন্সি নিয়েছে। মায়ের নামে দোকানের নতুন নাম ‘ কুমুদিনী স্টোরস’।

তপনের নতুন মোটর সাইকেল কেনার খবর জানতে পেরে জগদীশ স্তম্ভিত হয়ে গিয়েছিল। কত টাকা আয় হচ্ছে দোকান থেকে? সোজা পথে এত তাড়াতাড়ি এত টাকা রোজকার করা যায়? তপুর মা তখন বেঁচে। নিজের সন্দেহের কথা প্রকাশ করতেই কুমুদিনীর গলায় অসন্তুষ্টির ভাব প্রকাশ পেয়েছিল- বিয়ের পর থেকেই তো শুধু অভাব আর অভাব। যা হোক এতদিন পর তবু একটু সুখের মুখ দেখছি। সইছে না! ভাব তো, তোমার চিকিৎসার ব্যাপারে কোন ত্রুটি আছে? তবুও সন্দেহ!

তবু একটা অস্বস্তির কাঁটা তাকে সব সময় খোঁচা মারে। নিজেকে বড় অপরাধী,সুবিধাবাদী মনে হয়। সংসারে যে চট জলদি সমৃদ্ধি নিয়ে তার সন্দেহ বা আশংকা – ভোগ করার ক্ষেত্রে সেও তো তার একজন অংশীদার। যে সুখ- স্বাচ্ছন্দ্য উপভোগ করছে এবং ক্রমশঃ অভ্যস্ত হয়ে উঠছে , তাকে নিয়ে প্রশ্ন তোলাও তো এক ধরণের দ্বিচারিতা।

দিন গুনছে জগদীশ। সাতদিন পেরিয়ে গেছে, তপু এখনও ঘরে ফেরেনি, দোকানের ঝাঁপ বন্ধ হয়ে আছে। তার মনে কু-ডাক ডাকে।

বাবার ঘর ছেড়ে বাইরে বেরিয়েই মিনু বিকাশকে দেখতে পেল। লম্বা বারান্দার শেষে ছাদে যাবার সিড়ির মুখেই মোটা থামের গায়ে শরীর এলিয়ে বিকাশ দাঁড়িয়ে আছে। দূর থেকেই বোঝা যাচ্ছে মানুষটা খুব ক্লান্ত – শুধু দৈহিক নয়, মানসিকও । ভয়ে , আশংকায় মিনুর বুকটা ধ্বক করে উঠল।

পিছনের ঘরের দিকে একবার সতর্ক দৃষ্টি ফেলে মিনু খুব মৃদু প্রায় ফিসফিস গলায় বিকাশকে শুধাল – খবর পেলে?

মাসে-দু’মাসে তপন কে সদরে যেতে হয়, কখনও বা কলকাতায়। পাইকারি রেটে মালপত্তর কিনতে হয়, কোম্পানীর লোকদের সঙ্গে দেখা করতে হয়। বাবার বিছানায় স্থায়ী হয়ে যাওয়াটাই বোধহয় শাপে বর হয়ে গেছে তার। বছর পাঁচেকের মধ্যে পারবারিক সাধাসিধে মুদির দোকানটা তার হাতে পড়ে এই অঞ্চলের মধ্যে সবচেয়ে চালু ষ্টেশনারী দোকানে পরিণত হয়েছে। এই সেদিনও বোন মিনুকে তার ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার কথা বলছিল তপন – টাকা চাই, বুঝলি মিনু, প্রচুর টাকা। এখন ইলেক্ট্রনিক্সের বাজার, ভাবছি এবার অই লাইনেই যাব ।

প্রতিবার বাইরে যাবার সময় মিনুকে বলে যায় – দিন দুয়েকের জন্য যাচ্ছি। শুধু কমলাদির উপর ভরসা রেখে বাবাকে তো একলা ছেড়ে যাওয়া যায় না, তুই একটু দেখিস।

মিনুকে তাই প্রায়শই শ্বশুর বাড়ি ছেড়ে এই বাড়িতে চলে আসতে হয়।

বিকাশ মাঝে মাঝেই কপট নিঃশ্বাস ছেড়ে তপন কে বলে – বিয়ে তো করলেন না দাদা, বিয়ে করা নতুন বৌ কে ছেড়ে থাকা যে কি কষ্টের বুঝবেন কি করে! বিরহ বোঝেন বিরহ?

তপন হাহা হেসে মোটর সাইকেল চালু করে – ফিরে আসি, তোমার কাছে বুঝে নেব ।

আসলে বিকাশ ও বোনের শ্বশুর বাড়ির লোকজন তপন কে খুব পছন্দ করে। শুধু পছন্দ নয় বোধহয় কিছুটা সমীহও করে। পাঁচ বছরের মধ্যে এতখানি উত্তরণ – ভাবা যায় ? বাবার এমন ব্যয়বহুল চিকিতসা, পুরনো বাড়িটাকে ভেঙ্গে চুরে এমন ঝকঝকে করে গড়ে তোলা, এমন জাঁকজমক করে বোনের বিয়ে –

মিনুর বিয়েটা তো একটা ইতিহাস। বিকাশরা এই অঞ্চলের এক বর্ধিষ্ণু পরিবার। বিকাশ তখন সদ্য চাকরি পেয়েছে সরকারি উচ্চ মাধ্যমিক স্কুলে। ইতিহাসের মাস্টার। আজকাল স্কুল মাস্টারদের মাইনে-কড়ি ভালো, তার উপর বিকাশ চুটিয়ে টিউশনি করত দু বেলা।

ছেলের বিয়ের সম্বন্ধের ব্যাপারে বিকাশের বাবার তীব্র আপত্তি ছিল।‘’ দোকানদারের’ মেয়ে, আত্মীয়স্বজনরা কি বলবে ! আত্মীয় স্বজনরাও বিরুপ মন্তব্য করেছিল – মেয়ে শুধু সুন্দরী হলেই তো চলবে না, পরিবারটাও তো দেখতে হবে।

তপন এঁদের সমস্ত বিরোধিতার মুখ বন্ধ করে দিয়েছিল। টাকাতে কি না হয়। বন্ধ মুখ খুলে যায়, আবার খলা মুখ বন্ধ হয়ে যায়। ফ্রীজ, রঙিন টিভি, গয়না-গাটি, নগদ টাকা- ছেলের বাড়ির চাহিদার প্রায় দ্বিগুন দিয়ে ভরিয়ে দিয়েছিল। তাই আজকাল তপন যখন বোনের শ্বশুর বাড়িতে যেত তখন তার অন্য রকম সমাদর। মিনুকেও বাবার দেখভাল করবার জন্য শ্বশুরবাড়ি ছেড়ে বারে বারে বাপের বাড়িতে আসতে কোনরকম আপত্তির মুখোমুখি হতে হয় না। বরং শ্বশুর মশাই নিজেই আগ্রহ দেখিয়ে ছেলের বউকে বাপের বাড়ি পাঠিয়ে দেন।

‘’ নিশ্চিন্তে যাও বৌমা । বুড়ো বয়সে মানুষটার তো একটু যত্নআত্তির প্রয়োজন ! তোমার মা আর সুধাই এদিক টা সামলে নেবে

সুধা মিনুর একমাত্র অবিবাহিত ননদ ।

দিন তিনেক ধরে মিনুর একটা অস্বস্তি হচ্ছিল।চিন্তাও ।দাদা এখন ফিরছে না, আর কতদিন এ বাড়ি পাহারা? তার তো সংসার আছে-শ্বশুর-শাশুড়ি, দেওর, ননদ, সর্বোপরি স্বামী বিকাশ।

বিকাশ মিনুর কথার কোন জবাব দেয় নি। নিজের থেকেও কোন কথা বলছে না,শুধু স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে রয়েছে মিনুর দিকে। বিকাশ কে ভালো করে লক্ষ করল মিনু,- থমথমে মুখ, প্রচন্ড এক ঝড় যেন তার উপর দিয়ে বয়ে গেছে। তবে কি জনার্দন কাকার দেখাটাই ঠিক ?

জনার্দন কাকার সোনার দোকান। অনেক পুরনো। এই অঞ্চলের বেশির ভাগ বিয়ে-শাদির গয়নাপত্রের অর্ডারও কাকার দোকানেই আসে। মিনুর বিয়ের গয়নাও। জনার্দনই খবর দিয়েছিল বিকাশকে। খানা জংশনে জি,আর,পি অফিসের বারান্দায় শোয়ানো আছে তিন্টে রেল ডাকাতের লাশ। ট্রেনের প্যসেঞ্জারদের হাতে ধরা পড়ে গিয়েছিল। তারপর যা হয়, মার মার,- ভেন্ডার কামরার গোয়ালারা বাঁশের বাক দিয়ে পিটিয়েছে। কেউ কেউ ইট দিয়ে থেঁতলে দিয়েছে দেহগুলো। রক্তাক্ত, বিকৃত চেহারা, বীভৎস – চেনা যায় না।

বিকাশ জনার্দন কাকার কথা বিশ্বাস করতে চায় নি। তপনদা রেল ডাকাত? অসম্ভব! তবু জনার্দন কাকা কে পালটা জিজ্ঞেস করতে গলা কেঁপে গিয়েছিল – তুমি চিনলে কি করে?

মিনুর বিয়ের গয়না বানাতে দেবার সময় তপন নিজের জন্য একটা রপোর পদক বানিয়েছিল। পদকের মাঝখানে বড় করে লেখা ‘মা’ । অই পদক টা সবসময় তার ডান হাতের উপরের দিকে বাঁধা থাকত।

জনার্দন উত্তর দিয়েছিল- ওটা তো আমারই হাতে তৈরি , আমার চোখ কি করে ভুল করে।

মিনু হাউ হাউ করে কেঁদে ফেলে- জনার্দন কাকাই তা’হলে ঠিক।

বিকাশ চাপা স্বরে ধমক দিল – চুপ, আদিখ্য্যেতা কর না।

বিকাশের গলায় স্পষ্টতই রুক্ষতার আভাস। বিকাশের বলার ভঙ্গীতে স্তম্ভিত হয়ে গেল মিনু। শুধুমাত্র একটা মৃত্যু সংবাদ নিমেষে একটা মানুষের ব্যবহারে এত পরিবর্তন এনে দিল।

‘ন্যাকাপনা করে কাদতে বসেছে – বিকাশ বিকৃত কন্ঠে বলে – বুঝতে পারছ কি হতে চলেছে! ভবিষ্যৎটা কি?

বিকাশ কি নিজেই বুঝতে পেরেছিল প্রথমে। বুঝতে পারল নিজের বাবাকে খবর দিতে এসে। প্রাথমিক অবস্থায় বিরাট একটা ধাক্কা খেয়েছিল মনে। ধূপের গন্ধের মতো পবিত্র অথচ বিষাদময় একটা শোকানুভুতির সঞ্চার হয়েছিল মনে।খুব বিব্রত বোধ হচ্ছিল। বৃদ্ধ শ্বশুরমশাই কি করে খবর এই ভেবেই সে দিশাহারা হয়ে যাচ্ছিল। বাবাই তার ভুল ভাঙাল । একটা মৃত্যু যে দীঘির শান্ত জলের মতো জীবন ধারায় এত আলোড়ন তুলতে পারে এ তার ধারণার অতীত ছিল।

‘’ তোর মা বলেছিল সোনার টুকরো ছেলে।‘’ তপনদার একান্ত গুণগ্রাহী বাবার কন্ঠে তীব্র শ্লেষ – কোথায় সোনা? এ তো পুরোটাই খাদ।

মা ভয়ে আশঙ্কায় ডুকরে উঠেছিল – কি হবে গো!

বাবা হিস হিস শব্দ তুলে ধমকে উঠেছিল- ন্যাকামো করো না । তখনই বারণ করেছিলাম, শুনলে না। দোকানদারের বংশ আর কত ভাল হবে।

বিকাশের খুব অস্বস্তি হচ্ছিল। এই সেদিনও যাবার আগে মা সামনে বসে তপনদা কে খাইয়েছিল । বাবা তো রীতিমতো সমীহ করে কথা বলত তপনদার সঙ্গে। তপনদাকে উদাহরণ করে কতবার বিকাশের বেকার ভাইটার উদ্দেশ্যে চোখা চোখা বাক্যবান নিক্ষেপ হত- পরিশ্রম আর আর নিষ্ঠা থাকলে কোথার থেকে কোথায় ওঠা যায় তোমার বউদির দাদাকে দেখে শেখ’’।

এখন বিকাশকে কাছে ডেকে বললেন –চেপে যাও। এ নিয়ে আর বেশি খোঁচাখুঁচি করবার দরকার নেই। ডেলিকেট ব্যাপার। থুথু উপরে ছুঁড়লে নিজের গায়েই পড়বে। জনার্দন কে মুখে কুলুপ আঁটতে বল। পুলিসের ব্যাপারটা আমি দেখছি।

বিকাশ কোন কথা বলে নি। নীরবে শুধু মাথা নেড়ে গেছে। সে জানে বাবা চাপা দেবার যতই চেষ্টা করুক আজ হোক কাল হোক ঘটনা প্রকাশ পাবেই। তখন কি হবে! বিরাট এক ঝড় আসতে চলেছে । সেই ঝড় তাদের সুখে ভরা সংসার, তাদের পারিবারক সম্মান সবকিছু তছনছ করে দিয়ে যাবে । কি হবে তার নিজের ভবিষ্যত? তার স্কুল, লোভনীয় টিউশানি –বিকাশ ভাবতে পারে না,তার বুক জুড়ে কাঁপুনি ওঠে।

বাবা বলে- বউমাকে নিয়ে এস আর কতদিন পরের সংসার সামলাবে ।

ভবিষ্যৎ! কথাটা মিনুকে একটা ঝাঁকুনি দিল। ভয় নয় তার চেয়েও তীব্র একটা আতঙ্কবোধ তার শরীর জুড়ে ছড়িয়ে পড়ল । একটা প্রচন্ড বিস্ফোরন ঘটে গেছে। সুখ, সম্মান সমৃদ্ধিসহ তার স্বপ্নেগড়া সংসারের বুনিয়াদটা ভেঙ্গে ঝুর ঝুর করে ঝরে পড়ছে। মুদি খানার মালিকের কন্যা থেকে উদ্যোগপতি যুবক তপনের ভগিনীর ভুমিকায় তার যে সম্মানজনক উত্তরন, এক ধাক্কায় তাকে নেমে আসতে হচ্ছে অনেক অনেক নিচে- রেল ডাকাতের বোন।

মিনুর সারা শরীরটা থর থর করে কাপছে। শীতের কাঁপন লাগার মতো এলোমেলো অবিন্যস্ত গলায় মিনু শুধাল – এবার কি হবে?

বিকাশ নিরাসক্ত গলায় বলল – চেপে যাও। লোকজনকে জানাবার মতো ব্যাপার নয় এটা।

তারপর হঠাৎ মিনুর দিকে তাকিয়ে হিংস্র গলায় বলল – আমিও তাই বলি, ব্যবসা করে রাতারাতি এত টাকা আসে কোথার থেকে?

মিনু কোন উত্তর দেয় না। দেবারই বা কি আছে তার ।

বিকাশ আদেশের সুরে বলে – গোছগাছ করে নাও, তোমাকে ফিরে যেতে হবে ।

ফিরে যেতে হবে? বাবাকে একলা এই অবস্থায় রেখে? চটজলদি এত কঠিন সিদ্ধান্ত ।

মিনু অবশ্য জানে এই মুহূর্তে তার সব রকম প্রতিবাদই নিরর্থক । সমস্থ রকম অধিকারই সে হারিয়েছে। মিনু নিখাদ অনুনয়ের সুরে বলল – কিন্তু বাবা ?

- জানানোর প্রয়োজন নেই’’। চিরটাকাল শান্ত বিকাশের গলায় কতৃত্বের সুর – উনি নাহয় জানবেন ছেলে তার আর ফেরেনি কিংবা হারিয়ে গেছে …..

কি সহজ সমাধান! মিঠু ঠোঁট শক্ত করে কোন রকমে কান্না রোধ করল। সব কিছু হারিয়ে মিনু এই মুহূর্তে নিঃস্ব, অসহায়। অনেকটা ভিখারির মতো ভঙ্গিতে বিকাশ কে বলল - কেমন করে বাবাকে ফেলে যাব ।

-‘’ কেন তোমাদের কমলাদি তো রইল – বিকাশ নীরস গলায় বলে-খরচের টাকাটা মাসে মাসে আমিই দেব। তোমার দাদা যখন তোমাকে গছিয়ে দিয়ে গেছে টাড় বাপের বোঝা তো আমাকে টানতেই হবে ।

কোন কিছুই কি বিকাশকে স্পর্শ করছে না। কোন দুঃখ , বেদনা,কোন রকম সহানুভূতি। রাতারাতি বিকাশ কি এত নির্দয় হয়ে গেল।

পিতা বর্তমানে আপনি বৃদ্ধ , অশক্ত-কর্মে অপারগ । তাই উপযুক্ত পুত্র রূপে আমি আপনাদিগকে প্রতিপালনের দায়িত্বগ্রহন করিয়াছি। আপনাদিগকে সাধ্যমত স্বাচ্ছন্দে রাখিবার প্রচেষ্টায় আমি সতত সচেষ্ট থাকি। পৃথিবীর কোন সুখই বোধকরি অপরের দুঃখ বৃদ্ধি ব্যতীত লব্ধ হয় না। তাই আপনাদিগকে প্রতিপালনের নিমিত্ত আমাকে যে বৃত্তি গ্রহন করিতে হইয়াছে তাহাতে আমাকে বিবিধ অপ্রিয় কর্ম করিতে হয়। যাহা অপরের দুঃখের কারণ হয়। আমার বৃত্তি আমাকে অপরের সম্পদ লুন্ঠন করিতে বাধ্য করে। প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে আমি বহু নরহত্যার জন্য দায়ী। ইহা কি অপরাধ ? আমি যাহা করিতেছি তাহা আপনাদিগকে সুখে রাখিবার কারণে । আমার দ্বারা অর্জিত সম্পদেই আপনারা প্রতিপালিত। সুতরাং আমার কর্মের বিনিময়ে যদি কোন পাপ আমাকে স্পর্শ করে তাহা আপনাদিগকে স্পর্শ করিবে না কেন? এই পাপের ভার আমি একাকি কেন বহন করিব? সুতরাং যেহেতু এই অর্জিত সম্পদ আপনাদিগকে প্রতিপালনের উদ্দ্যেশে ব্যবহ্রত হইয়াছে, তাই ইহার কিয়দাংশ দায়ভার গ্রহণ করা আপনাদের নৈতিক কর্তব্য ।

কি উত্তর দিবেন রত্নাকরের পিতা। তোমার বৃত্তি সম্পর্কে আমি অবগত নই। ইহা তো অসত্য রূপে পরিগনিত হইবে। মিথ্যাচারণের অপরাধে অপরাধী হইবেন । তিনি প্রবীণ বহুদর্শী , দীর্ঘকালীন অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে তিনি অনুমান করিতে পারেন নাই যে এই সুসজ্জিত হ্রম্য, প্রাচুর্যের সমাহার- দুগ্ধফেনশোভিত বিলাসী শয্যা, মহার্ঘ খাদ্যবস্তু , সুচিকিতসা, খুব সরল পথে অর্জিত হয় নাই। তিনি নিশ্চয় সঠিক অনুমান করিয়াছিলেন অথচ উপভোগ করা হইতে বিরত হন নাই।

মানুষ যখন যুক্তি ও রুঢ় বাস্তবতার নিকট পরাজয়ের সম্মুখীন হয়, সে তখন যুক্তিহীন অসার কিছু শাস্ত্রের অধীনতা স্বীকার করে।রত্নাকরের উদ্দ্যেশে পিতা কহিলেন- পুত্র। শাস্ত্রনুযায়ী পরিবারের বৃদ্ধ, অশক্ত, ও অসহায় স্ত্রী- পুরুষদের ভরণ- পোষণের দায়িত্বভার গ্রহণ উপযুক্ত পুত্রের নৈতিক কর্তব্য , তাহা কি প্রকারে বা কি বৃত্তি অবলম্বন বা অনুসরণ করিতে হইবে তাহা একান্তই তাহার নিজ বিচার্য বিষয় । সুতরাং পুত্রের কর্ম দ্বারা অর্জিত পাপসমুহের ভার গ্রহণের প্রস্তাব এমত ক্ষেত্রে অবান্তর।

ঔষধের প্রতিক্রিয়ায় সঞ্চারিত নিদ্রাজনিত আচ্ছনতায় আক্রান্ত জগদীশের দুই নয়ন নিমীলিত, অথচ মানস- চক্ষুর ক্রমশ উন্মোচন ঘটিতেছে।। তিনি অনুভব করিলেন –

বাতাস গতি হারাইয়া নিথর হইয়া গেল। বৃক্ষ, শাখা, প্রশাখা ও পল্লবদলসহ স্পন্দনহীন। বিহঙ্গের কলকাকলিতে মুখরিত অরণ্য হঠাৎ স্তব্দ হইয়া গেল। যেন আসন্ন কোন প্রলয়ের আবির্ভাব আশঙ্কায় ধরণী উতকন্ঠিত। পাপ মুক্তির প্রত্যাশায় রত্নাকর সমাধিস্ত হইলেন

‘’- প্রভু আমি ক্ষমা প্রার্থী, আমায় পাপমুক্ত কর, নবজন্ম দাও।

অমনি রাশি রাশি বল্মিক পতঙ্গ অগ্নিশিখার ন্যায় রত্নাকরের দেহকে আবৃত করিল। যেন কালনাগিনীর ন্যায় সহস্র ফনা দীর্ঘ হইতে দীর্ঘতর রূপ পরিগ্রহণ করিয়া এক মন্দিরের চূড়ার রূপ ধারণ করিল। সেই অগ্নিবর্ণের গহ্বরে রত্নাকরের অবয়ব ক্রমশ বিলীয়মান। নয়নের সম্মুখ হইতে অবসৃত হইবার ঠিক পুর্ব মুহুর্তে স্তম্ভিত বিস্ময়ে লক্ষিত হইল সুঠাম দক্ষিন হস্তের বাহুমুল সংলগ্ন অঞ্চলে রজতশোভিত এক অলঙ্কার। তাহার উপর উজ্জ্বল জ্যোতিষ্কের ন্যায় একটি মাত্র অক্ষর জাজ্বল্যমান ‘মা’।

বিকাশ মিনুকে থামাবার চেষ্টা করল – তোমার সবটাতে বাড়াবাড়ি। ক’দিন আর বাচবেন, নাইবা জানালে সত্যি কথাটা। মিনুর গলায় দৃঢ়তা- না সত্যিটা প্রকাশ হওয়া প্রয়োজন ।

বিকাশ রাগত ভঙ্গীতে বলল- বুড়ো মানুষটা অনর্থক কষ্ট পাবেন। না জানালে পৃথীবিটা উল্টে যাবে না ।

‘’কোন পৃথিবীর কথা বলছ – বিকাশের দিকে তাকিয়ে মিনু অদ্ভুত ভঙ্গীতে হাসল। বিকাশ অস্বস্তিতে চোখ সরিয়ে নিল।

জগদীশ বিছানায় শুয়ে আছে, চোখ দুটো বোজা, দুজনের পায়ের শব্দ পেয়ে চোখ খুলে গেল।

‘’- বাবা –‘’

ব্যাস! আর কিছু বলতে পারল না মিনু। শোক,অপমান, অভিমান আর আশঙ্কা মিশ্রিত তীব্র একটা কম্পন তার সারা শরীরে ছড়িয়ে পড়ল। কান্নার দমকে মিনু তখন কাঁপছে ।

জগদীশ তার মেয়ের দিকে বিন্দুমাত্র নজর দিল না। শুধু জামাই বিকাশকে কাছে আসার ইঙ্গিত কুরল।

- তোমার স্কুলে ইতিহাস আর পুরান তো তোমার বিষয় ?

এই পরিবেশে এই ধরণের জিজ্ঞাসা বড় অদ্ভুত, বড় বেমানান। বিস্মিত বিকাশ মাথা নেড়ে সায় দিল।

-‘’ তুমি কি বলতে পার রত্নাকরের বাবার শেষ পরিণতি কি।‘’

…………………………………….

0 Comments

Post Comment