আমাদের বসবাস অসাম্যের শ্রেণিসমাজে। এখানে শ্রেণি স্বার্থের বাইরে গিয়ে গাছের পাতাও নড়ে না। যখন গাছের পাতার নড়া বন্ধ হয়ে যায় তখন তা শাসক ও শোষক শ্রেণির স্বার্থ পূরণে কাজ করে। অর্থাৎ গাছটি কাটা পড়ে। এখানে রাজনীতি, অর্থনীতি, সমাজনীতি --- সবই রয়েছে দুই ধরনের। এক দিকে শাসক ও শোষক শ্রেণি। অপর দিকে শোষিত ও সর্বহারা শ্রেণি। তাই যে কোন রাজনৈতিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক ঘটনাকে কেন্দ্র করে এই শ্রেণি দ্বন্দ্ব, সংঘাত, ঘাত-প্রতিঘাত চলতে থাকে। এর মধ্য দিয়ে এক শ্রেণি এগোয়, আরেক শ্রেণি পিছিয়ে পড়ে।
শাসক ও শোষক শ্রেণি প্রতিনিধিত্বকারী দল অনেক, তার হাতে ও স্বার্থে রাষ্ট্রযন্ত্র গতিময়। যারা শাসক ও শোষক শ্রেণি'র রাষ্ট্রযন্ত্রের নানা প্রতিষ্ঠানের পক্ষে কথা বলে, কথা না বললেও কাজে তাই করে, তারা প্রত্যেকেই শাসক ও শোষক শ্রেণির অংশ। আর যারা এই ধরনের যাবতীয় প্রতিষ্ঠানের বিপক্ষে রাজনৈতিকভাবে বিরোধিতা করে, এর বিকল্পে লড়াই করছে, বাস্তবে নানা কিছু গড়ে তোলে বা তুলতে পারে, কেবল তারাই শোষিত ও সর্বহারা শ্রেণির প্রতিনিধিত্ব করে। এখানে যে কোন সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক দাবি, স্লোগান বা বক্তব্য ইত্যাদি যে কোন একটি শ্রেণিস্বার্থে সমাজ থেকে উঠে আসে বা আসছে।
এখন ভারত রাষ্ট্রের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রক জানিয়েছেন, ২০২৬ সালের মার্চ মাসের ভেতরে শোষিত ও সর্বহারা শ্রেণি লড়াইগুলোকে রাষ্ট্র খতম করে দেবে, সামরিকভাবে। এর পোশাকি নাম দেওয়া হয়েছে, 'মাওবাদী দমন', 'অপারেশন কাগার' প্রভৃতি। এ যে শাসক ও শোষক শ্রেণির ফ্যাসিবাদী রাজনীতির উত্থান ঘটানোর লক্ষণ তা বর্তমানে দেশের দলিত, আদিবাসী, সংখ্যালঘু অঞ্চলগুলোর চিত্রই স্পষ্ট করে। কিন্তু ফ্যাসিবাদ যে কেবল সামরিক উত্থান ঘটিয়ে ক্ষান্ত থাকে না, বরং সমস্ত জায়গায় তার মতাদর্শগত রাজনীতি বিছিয়েও দখলদারিত্ব চালায়। ফ্যাসিবাদের আবির্ভাব ঘটে আগ্রাসী পুঁজির সংকট থেকে। এই দেশে যেহেতু সামন্ততান্ত্রিক বর্ণপ্রথা জীবিত রয়েছে সেহেতু ব্রাহ্মণ্যবাদী সামন্ততন্ত্রের সাথে বিদেশী আগ্রাসী পুঁজির অবৈরীমূলক সম্পর্কেই গোটা দেশ জুড়ে ফ্যাসিবাদের রাজনৈতিক উত্থান ঘটছে। এই ফ্যাসিবাদ আদপে ব্রাহ্মণ্যবাদী হিন্দুত্ব ফ্যাসিবাদ, এটির চরিত্র অন্যান্য পুঁজিবাদী দেশের থেকে অনেক বেশি হিংস্র এবং সামাজিক, রাজনৈতিক ভাবে আরও বেশি পাকাপোক্ত ও দীর্ঘস্থায়ী। ফ্যাসিবাদের সংজ্ঞা অনুসারে সাধারণত শাসক শ্রেণির মধ্যকার সবচেয়ে সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর একনায়কত্বকেই বোঝায়। এদেশের ফ্যাসিবাদী উত্থানের ক্ষেত্রে শাসক শ্রেণি'র প্রতিটি গোষ্ঠী হিংস্র, আপাতত প্রত্যেকের সাথে প্রত্যেকের পারস্পরিক সমঝোতায় ও মেলবন্ধনে কায়েম হওয়ার লক্ষ্যে এগিয়ে চলেছে শাসক শ্রেণি'র সমস্ত গোষ্ঠীর সম্মিলিত সন্ত্রাসী-একনায়কত্ব। কারণ, আগ্রাসী বিদেশি শক্তিগুলোর নিয়ন্ত্রণেই এদেশের আমলাতান্ত্রিক শাসক শ্রেণিগুলো পরিচালিত।
ব্রাহ্মণ্যবাদের নীতিগত অবস্থান ব্রাহ্মণতন্ত্রের উপরে কাউকে যেতে না দেওয়া, কাঁকড়ার মত টেনে ধরা এবং পিছিয়ে পড়া জাতি ও জনগণকে সমাজ বহির্ভূত করে রাখা। ব্রাহ্মণ্যবাদী হিন্দুত্ব ফ্যাসিবাদী রাজনীতির প্রতিনিধিত্বকারী প্রধান দল আর.এস.এস জন্মলগ্ন থেকে ঘোষণা করেছে যে, তাদের লক্ষ্য 'রাজনীতির ব্রাহ্মণ্যবাদীকরণ ও হিন্দুত্বের(সমাজ) সামরিকীকরণ'। সেই লক্ষ্যেই এদেশের মাটিতে বিদেশি আগ্রাসী পুঁজি নিয়ন্ত্রণকারী ব্রাহ্মণ্যবাদী হিন্দুত্ব ফ্যাসিবাদের উত্থান ঘটছে। ঐতিহাসিক চরিত্র অনুযায়ী এ লক্ষ্যেই বিদেশি আগ্রাসী পুঁজির টিকে থাকাও সম্ভব ভারতের বাজারে।
এমন লক্ষ্য পূরণে রাষ্ট্র যেমন যৌথতার সাথে দলিত, আদিবাসী, সংখ্যালঘু জনগণের উপরে সামরিক আক্রমণ নামিয়ে আনছে, তেমন ব্রাহ্মণ্যবাদী হিন্দুত্ব ফ্যাসিবাদের মতাদর্শগত প্রসার নানা জায়গায় নানাভাবে দ্রুত গতিতে ঘটছে। যা এই সময় রাষ্ট্রের নানা প্রতিষ্ঠান, সমাজের নানা অংশ, আন্দোলন, শাসক শ্রেণির নানা রাজনৈতিক দলগুলোতে ঘটতে বাধ্য। তা এ রাজ্যেই স্পষ্টভাবে লক্ষ্যনীয়, আর.জি.কর আন্দোলনের একটা সময়ের পর থেকে। যেখানে প্রতিষ্ঠান বিরোধী, রক্ত ঝরানো নিরন্তন লড়াইয়ের স্লোগানগুলোর সংস্কার ঘটলো 'বিচার চেয়ে'। কিসের বিচার, কীভাবে আসবে সেই বিচার, তার পথ কেমন হলে 'আর একটিও অভয়া ঘটবে না'? সেইসব প্রশ্ন ভ্রান্ত, কারণ রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান বিরোধী শোষিত ও সর্বহারা শ্রেণি'র দর্শনের সংস্কার ঘটানোর চেষ্টায় স্লোগানেরও সংস্কার ঘটছে। কে করবে প্রশ্ন? বদলে নানা কার্যকলাপের মাধ্যমে দেখানো হচ্ছে যে, গুণগতমানের রাজনীতি প্রধান নয়, প্রধান 'সংখ্যা', 'ঐক্য'। ফলে শোষিত ও সর্বহারা শ্রেণি'র 'লড়াই করে বাঁচতে চাই' স্লোগান রাজনৈতিক সীমাবদ্ধতার স্বীকার হল, শাসক শ্রেণি'র সংস্কারে 'লড়াই করে বিচার চাই'-এ আটকা পড়লো। স্লোগান, দাবি প্রভৃতি যে কোন আন্দোলনের মধ্য থেকে উঠে আসে, তাতে যে শ্রেণি'র মানুষেরা প্রতিনিধিত্ব করছেন তাঁদের দর্শন-বোধ থেকে উঠে আসে। আবার এটি আন্দোলনের ভবিষ্যতের দিকও নির্ধারণ করে, এর দ্বারাই বোঝা যায় কোন দিকে আন্দোলন বইছে বা ভবিষ্যতে বইতে পারে। এ আন্দোলনে স্বাস্থ্যক্ষেত্রে ব্রাহ্মণ্যবাদীকরণ ও আগাসী পুঁজির অনুপ্রবেশের বিরোধিতা ন্যূনতম লক্ষ্য করা যায়নি। উল্টে যখন আন্দোলনকে সমাজবদ্ধ করবার দরকার ছিল তখন তা চূড়ান্তভাবে রাজনৈতিক সীমাবদ্ধতার শিকার হয়েছে। ফ্যাসিস্ট গেস্টাপো বাহিনী 'এন.আই.এ' রাজ্যের শ্রমিক সংগঠক, রাজনৈতিক কর্মী, সামাজ কর্মী ও ফ্রিল্যান্স সাংবাদিকের বাড়িতে 'মাওবাদী' সন্দেহে আক্রমণ চালালেও তা নিয়ে ন্যূনতম মন্তব্য শোনা যায়নি(১ লা অক্টোবর, ২০২৪)। যার মাধ্যমে আদতে অভয়া'র ন্যায় বিচারের আন্দোলনকে রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে নীতিগতভাবে আরও মজবুত করা যেত, নানা দিকে তার প্রসার ঘটতো, ভবিষ্যতে এই আন্দোলনকে উৎপাদনের সংগ্রামের সাথে যুক্ত করার সম্ভবনা দেখা যেত। এরকম আটকে রাখবার রাজনীতির দ্বারাই ব্রাহ্মণ্যবাদী হিন্দুত্ব ফ্যাসিবাদের মতাদর্শগত প্রসার আরও কয়েক ধাপ লক্ষ্য করা গেল, যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র আন্দোলনেও। যে বিশ্ববিদ্যালয় সেই সত্তর দশক থেকে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান বিরোধী দর্শন বহন করে আসছে, সেই বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীরা কেবল সাময়িক সময়ের কথা ভেবে, রাজ্য সরকারের প্রতি রাগ, আক্রোশে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন, একক ব্যক্তিকে(শিক্ষামন্ত্রী) গ্রেফতারির দাবি জানিয়েছেন। অথচ এসময় শোষক ও শাসক শ্রেণি'র যে কোন প্রতিষ্ঠান, রাজনৈতিক দল ইত্যাদির উপর ন্যূনতম নির্ভরশীলতার জায়গায় আসলে(সরাসরি গ্রেফতারের দাবি জানানোর গভীরতায় রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের প্রতি নির্ভরশীলতার দর্শন-বোধ কাজ করে।), সমাজের বুকে এরকম দাবি জানালে আখেরে রাজনৈতিকভাবে লাভ ঘটবে সেই শ্রেণি'র যে শ্রেণি'র স্বার্থে রাজ্য থেকে কেন্দ্র সরকার ও তাদের স্বঘোষিত বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো প্রতিনিধিত্ব করতে নেমেছে। আসলে এই বিশ্ববিদ্যালয়ের উপরে বহু দিন ধরেই রাষ্ট্রের ক্ষোভ, কারণ সত্তর দশক থেকে এই বিশ্ববিদ্যালয় রাষ্ট্র তথা রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর অত্যাচার, রাজনৈতিক দলগুলোর নিপীড়ন ইত্যাদির বিরুদ্ধে মতাদর্শগত বিরোধিতা করেছে, এখানকার ছাত্রছাত্রীরা সশরীরে শোষক ও শাসক শ্রেণির বিরুদ্ধে শোষিত ও সর্বহারা শ্রেণির লড়াইয়ে সামিল হয়েছেন, যে কোন শাসকের আমলে।
এই সময় যে কোন আন্দোলন, প্রতিরোধের জায়গায় ব্রাহ্মণ্যবাদী হিন্দুত্ব ফ্যাসিবাদের আগ্রাসন মূলত দুই দিক থেকে নামছে, একদিক সামরিক, অপরদিক রাজনৈতিক। সর্বত্রই এটি পারস্পরিক ভাবে এগিয়ে চলেছে। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ও তাই ঘটছে। এই সামরিক আগ্রাসন প্রতিহত করতে ছাত্রছাত্রীরা ঐক্যবদ্ধ হয়েছেন। অনেক বিশেষজ্ঞ একে 'বামঐক্য' বা 'প্রকৃত ফ্যাসিবাদ বিরোধী ঐক্য' ইত্যাদি নানা কিছু বলছেন। কিন্তু এই ঐক্যবদ্ধতার ভিত্তি হওয়া প্রয়োজন ছিল কেবল, শোষিত ও সর্বহারা শ্রেণির মতাদর্শ, ঐতিহাসিকভাবে যে মতাদর্শ এই সমাজের কৃষক, শ্রমিক, মধ্যবিত্ত, ছোট-মাঝারি ব্যবসাদার ও পিছিয়ে পড়া জাতি এবং জনগণের মুক্তির কথা বলেছে। সেই মতাদর্শের জায়গা এই ঐক্যে একদম ন্যূনতম থাকায় আজ আজাদী স্লোগান, ছবি, মাওবাদী ইত্যাদি নিয়ে রাষ্ট্রের প্রোপাগান্ডাধারীদের বিরুদ্ধে তেমন কোন বিকল্প রাজনৈতিক উত্তরও নেই। শুধু আরএসএফ ছাত্র সংগঠনটির ফেসবুক পেজ থেকে কয়েকটি যৎসামান্য লেখাপত্র প্রকাশিত হয়েছে। কিন্তু উচিৎ ছিল বিভিন্ন ছাত্র সংগঠনের ঐক্যবদ্ধ(তাহলে খানিকটা হলেও বোঝা যেত, এটি বাম ঐক্য, ফ্যাসিবাদ বিরোধী ঐক্য)হয়ে প্রোপাগান্ডার বিরুদ্ধে সঠিক রাজনৈতিক জবাবের। কেন আজাদী স্লোগান, কেন কাশ্মীরি, মণিপুর ইত্যাদি জাতির আত্মনিয়ন্ত্রণের প্রশ্ন আজও উঠছে, তার সঠিক রাজনৈতিক ব্যাখ্যা দেওয়া সাধারণ জনগণের কাছে। উল্টে এসব থেকে পাশ কাটিয়ে বেরোনোর প্রবণতা সিংহ ভাগের। যাঁরা এখন অনেকে মিছিলে সরাসরি বলে দেন, জাতির আত্মনিয়ন্ত্রণ নিয়ে স্লোগান দেওয়া যাবে না, নিপীড়িত জাতির 'আজাদী' চাওয়াই নিষিদ্ধ। এমনকি ভারতের বাইরে প্যালেস্তাইনের আজাদীর স্লোগানও বাদ রাখতে হবে। কিন্তু এসমস্ত দাবি, স্লোগান তো রাজনৈতিক, নীতিগত অবস্থানের জায়গা। যদি এমনি হয়ে চলে তাহলে আরএসএসের লক্ষ্য পূরণ হতে বাধ্য, সমাজ থেকে শোষিত ও সর্বহারা শ্রেণি মতাদর্শগত অবলুপ্তি ঘটতে পারে, বলা বাহুল্য। আসলে এসব বলবার মধ্য দিয়ে তারা আবার ঘুরিয়ে, চুরি পরার 'আজাদী' স্লোগান, শাড়ি পরার 'আজাদী' স্লোগান দেওয়াতেও বাহবা দেন, সেগুলোকে প্রসারিত করেন। যা আবার সমাজের বুকে ব্রাহ্মণ্যবাদী হিন্দুত্ব ফ্যাসিবাদের এজেন্ডাগুলোকে এক ধাপ এগিয়ে দেয়। অথচ এদেশে আজাদী স্লোগানের উৎপত্তি ঐতিহাসিক ভাবে ভারত রাষ্ট্র নিপীড়িত জাতিসত্ত্বাগুলোর কারাগার, এই হিসেবে। প্রশ্ন, যদি ন্যায়ের সমাজ গড়ে তোলার পক্ষে কোন আন্দোলন হয় তাহলে সমাজে ইতিহাস ও বর্তমানে ঘটে চলা সর্বত্র রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে আওয়াজ না তুলে, সেগুলোর রাজনৈতিক বিরোধিতা না করে ন্যায় পাওয়া, ন্যায়ের সমাজ গড়া সম্ভব বাস্তবে? মনে রাখতে হবে যে, যে কোন আন্দোলনে এ ধরনের কার্যকলাপই(দাবি, স্লোগান প্রভৃতি) সেই আন্দোলনের ভবিষ্যতের দিক নির্দেশ করে থাকে ও সমাজের বুকে নতুন ধরনের দ্বন্দ্বের সৃষ্টি করে। যা শ্রেণি সমাজে একটি শ্রেণি লাভ ও অপর শ্রেণি'র ক্ষতি, এর দ্বারাই জনগণের চেতনার মানের পরির্বতন ঘটে থাকে, উত্থান ও পতন ঘটতে পারে। এসময় এক্ষেত্রে অবশ্যই ক্ষতি শোষিত ও সর্বহারা শ্রেণি'র। অর্থাৎ লাভ শাসক ও শোষক শ্রেণি'র, যা ব্রাহ্মণ্যবাদী হিন্দুত্ব ফ্যাসিবাদী উত্থানকারীদের পুষ্ট করতে পারে।
আর.এস.এফ ছাত্র সংগঠনের কর্মী ইন্দ্রানুজ, ছাত্র সংসদ নির্বাচনের দাবিতে আন্দোলন করায় শিক্ষামন্ত্রী ব্রাত্য বসু'র গাড়ির চাকায় খুন হওয়ার মুখ থেকে বেঁচে ফিরেছেন, সেই ছাত্র ও তার সংগঠনের রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে নানা প্রশ্ন উঠছে। কী অপরাধ? সে ও তার সংগঠন কোন একটি বিশেষ রাজনৈতিক দলের নীতিগত সমর্থক, যে রাজনৈতিক দলটি শাসক ও শোষক শ্রেণি'র এই ব্রাহ্মণ্যবাদী হিন্দুত্ব ফ্যাসিবাদের সামরিক ও রাজনৈতিক আগ্রাসনের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়ে, আটকে রাখবার রাজনৈতিক সীমাবদ্ধতা ভেঙে বিকল্পে 'নয়া গণতান্ত্রিক' সমাজ গড়ে তোলার কথা কেবল খাতায় বলেনি, বাস্তবে তা গড়ে তুলেছে। অনেক লেখকের মতো এই নিয়ে লেখিকা অরুন্ধতী রায় একটি বইও লিখে ফেলেছিলেন, 'অপারেশন গ্রিন্ট হান্ট'-এর সময়। সেটি পড়লে দেখা যায়, ১৯৪৭ সালের পর থেকে রাষ্ট্র আজও যা পারেনি করতে এই 'নিষিদ্ধ' রাজনৈতিক দলটি তা করে দেখিয়েছে। সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণের পেটে দুবেলা খাবারের জোগান কী ভাবে দিতে হয়, তাঁদের প্রকৃত অর্থে স্বনির্ভর কীভাবে করা যায়, নারী ও পুরুষের সমানাধিকারের রাজনৈতিক অর্থনীতি কী হতে পারে, তা সবটাই দেখিয়েছে। এরপরেও শোষক ও শাসক শ্রেণি'র প্রোপাগান্ডায় রাষ্ট্রযন্ত্রে যখন 'আইনি' ও 'বেআইনি' এবং 'দেশদ্রোহিতা'র প্রসঙ্গ উঠে আসে তখন এদেশের মাটির চরিত্র, ইতিহাসকে প্রশ্ন করতে হয়, কারা এসবের বিরুদ্ধে কাজ করে আসছে? কারা আদতে দেশের জনগণের বিরুদ্ধে কাজ করছে? এসবের উত্তর বাস্তবের মাটিতে দেশের শ্রমজীবী মানুষের কাছে রয়েছে, সেখান থেকে কেবল সঠিক উত্তর পাওয়া যায়। আদপে দেশের মাটির বিরুদ্ধে যারা কাজ করছে, যারা দেশের ইতিহাসের বিরুদ্ধে কাজ করছে, যারা দেশের সম্পদ বিদেশে পাচার করছে, যারা এদেশে বিদেশি আগ্রাসী পুঁজির নীতিমালা নির্ধারণ করছে, বিদেশি আগ্রাসী পুঁজি দ্বারাই এদেশের নির্বাচন পরিচালনা করছে, দেশের জনগণের সম্পদ লুঠ করছে, তারাই যে প্রকৃত দেশদ্রোহী, এ কথা একটি নিষ্পাপ শিশুও বোঝে। এর জন্য খুব রাজনৈতিক হতে হবে যে এমনটাও নয়।
আজ রাজ্য তথা দেশ এমন এক ভয়াবহ অবস্থার সম্মুখীন যে, প্রগতিশীল শক্তিগুলোর প্রতিটি রাজনৈতিক পদক্ষেপ সামাজিক দ্বন্দ্বগুলোকে পরীক্ষা নিরীক্ষা করে ভেবে চিন্তে নেওয়া প্রয়োজন। বর্তমানের একটি পদক্ষেপও শোষিত ও সর্বহারা শ্রেণি রাজনৈতিক মতাদর্শের বিপক্ষে গেলে তার সুদ সমেত ফায়দা গুণবে শাসক ও শোষক শ্রেণি। পাশাপাশি সমাজের নানা অংশে ব্রাহ্মণ্যবাদী হিন্দুত্ব ফ্যাসিবাদের উত্থান ঘটবে এই আটকে রাখবার রাজনীতিকে পক্ষে নিয়ে।