৩
চিরস্থায়ী বন্দোবস্তে জমিদারদের অধীনে কোনো নির্দিষ্ট বা আইন করে বাঁধা সংখ্যার অধস্তন কর্মী থাকত না; কর্মীর সংখ্যা নির্ভর করত জমিদারির আকার, আয়তন এবং মৌজার সংখ্যার ওপর। তবে ছোট বড় প্রতিটি জমিদারিতেই রাজস্ব আদায়, হিসাবরক্ষণ এবং লাঠিয়াল বাহিনী পরিচালনার জন্য একটি অত্যন্ত সুসংগঠিত এবং কঠোর প্রশাসনিক কাঠামো বা ‘আমলা’তন্ত্র ছিল। একটি আদর্শ জমিদারির কাছারি বাড়িতে প্রধানত ৩টি স্তরে নীচের অধস্তন কর্মীরা কাজ করতেন। এক, উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা। বড় বড় জমিদাররা নিজেরা কলকাতায় বা শহরে বিলাসবহুল জীবনযাপন করতেন, যাদের ‘অনুপস্থিত জমিদার’ বা Absentee Landlord বলা হতো। তাই জমিদারি পরিচালনার মূল দায়িত্বে থাকতেন দেওয়ান বা ম্যানেজার। ইনি ছিলেন জমিদারির সর্বোচ্চ কর্মকর্তা। সমগ্র এস্টেটের আয়-ব্যয় এবং আইনি বিষয় দেখভাল করা তাঁর প্রধান কাজ ছিল। নায়েব ছিল দেওয়ানের ঠিক নিচের পদ। নির্দিষ্ট কোনো পরগনা বা অঞ্চলের প্রধান কাছারির সর্বময় কর্তা ছিলেন নায়েব। খাজনা আদায়ের মূল তদারকি তিনিই করতেন।
দ্বিতীয়, রাজস্ব আদায়কারী স্তর। এরা সরাসরি গ্রামে গ্রামে গিয়ে কৃষকদের কাছ থেকে খাজনা আদায় এবং হিসাব রাখার কাজ করতেন। গোমস্তা বা তহশিলদার। নায়েবের অধীনে থাকা এই কর্মচারীরা সরাসরি মাঠে নেমে প্রজাদের কাছ থেকে নগদ টাকা বা ফসল হিসেবে খাজনা আদায় করতেন। কৃষকদের কাছে গোমস্তারা ছিলেন মূর্তিমান আতঙ্ক। কারকুন বা মুহুরি। এরা কাছারির হিসাবরক্ষক ছিলেন। কার জমি, কার কত খাজনা বাকি, তার পুঙ্খানুপুঙ্খ খতিয়ান বা ‘চিটা’ (নথিপত্র) এরা তৈরি করতেন। আমিন, নতুন জমি পরিমাপ করা বা সীমানা বিরোধ মেটানোর দায়িত্বে থাকতেন।
তৃতীয় স্তর হতো, গ্রামীণ ও লাঠিয়াল বাহিনী। খাজনা আদায়ে জোরজুলুম করা এবং কাছারির নিরাপত্তা রক্ষার জন্য এই বাহিনী ব্যবহৃত হতো। পাইক, বরকন্দাজ ও লাঠিয়াল ছিল জমিদারের নিজস্ব লাঠিয়াল বা সশস্ত্র বাহিনী। কোনো প্রজা খাজনা দিতে দেরি করলে বা অস্বীকার করলে, এদের পাঠিয়ে প্রজার ওপর শারীরিক অত্যাচার করা, তুলে আনা, গরু-বাছুর বা ফসল ক্রোক করে নিয়ে আসা হতো। চৌকিদার ও দফাদার ছিল গ্রামীণ পাহারাদার, যারা গ্রামে কোনো নতুন ঘটনা ঘটলে বা ফসলের ক্ষতি হলে গোমস্তাকে খবর দিত। মণ্ডল বা প্রধান তার সঙ্গে। প্রতি গ্রামের একজন প্রভাবশালী কৃষককে জমিদাররা ‘মণ্ডল’ বানিয়ে রাখতেন, যিনি সাধারণ কৃষকদের কাছ থেকে খাজনা সংগ্রহ করে গোমস্তার হাতে তুলে দিতে সাহায্য করতেন। বড় বড় জমিদারি এস্টেটে (যেমন—বর্ধমান রাজ, নাটোর রাজ বা রাজশাহী জমিদারি) এই কর্মচারীদের সংখ্যা কয়েক হাজার পর্যন্ত হতো। অন্যদিকে, অত্যন্ত ছোট ছোট তালুকদার বা জমিদারদের অধীনে মাত্র ৫ থেকে ১০ জন কর্মী (একজন নায়েব, দু-তিনজন গোমস্তা ও কয়েকজন পাইক) থাকত।
এত বিস্তৃত করে লেখার কারণ হচ্ছে, আজকে যারা বিত্তশালী তাদের মধ্যে অনেকেই সরাসরি এইসব লোকদের বংশ থেকে এসেছে। আবার এই সব বংশ থেকে আসা লোকেদেরও বিত্তের পতন ঘটেছে কদাচিৎ। কিন্তু এরা এই ইতিহাস ভুলে যায়। ভুলে যায় আইনের খেলায় এবং সাম্রাজ্যের শোষণ যন্ত্রের কল্যাণে এদের উৎপত্তি ও বিকাশ। এমনকি কলকাতা শহরেও বসতি করা। নইলে তিনটে গ্রামের কত আর বাসিন্দা ছিল? বিভিন্ন পর্যায়ে গ্রাম-মফস্বল থেকে কলকাতায় এলে মেস থেকে সস্তার হোটেল, ট্রেনের হকারের থেকে রাস্তার ফিরিওয়ালা, হকার আর ভাড়াটে বাড়ি ইত্যাদি সবের মধ্য দিয়েই এদের মধ্যে কমবিত্তশালী পূর্বজদের জীবন গিয়েছে। এইভাবে সম্পদের ও শোষণের আইনে বৈধ-অবৈধ বিচার করতে হলে তাঁরা টিকতেন কেউ? যে টাকায় ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের দ্বিতীয়নগরীতে বাঁচা যেত খেয়ে-দেয়ে (দুর্ভিক্ষ-যুদ্ধাদি ব্যতীত) এবং এখনো, এতো বেপরোয়া ও বিপুল মূল্যবৃদ্ধি, টাকার পতন, মূদ্রাস্ফীতির পরেও বাঁচা যায়, অন্যত্র যায় না। কারণ এখানে খাবার থেকে নানা পর্যায়ের নানা পণ্যের হকারেরা বাঁচিয়ে রাখেন সাধারণ জনগণকে, ব্র্যান্ডের চড়াবাজারের এবং কালোবাজারের থেকে। এর বাইরে উদ্বাস্তু হয়ে আসা একটা অংশ অন্তত বিত্তশালী হয়েছে। কিন্তু তাদেরও একটা বড় অংশ শ্রেণী অবস্থান পাল্টে ফেলেছে। তারাও এখন মনে করে রেল-হকার থেকে এমনি হকার উচ্ছেদ অবশ্য কর্তব্য, শুধু কলকাতায় যেখানে-সেখানে বেআইনি গাড়ি পার্কিং উচ্ছেদ কর্তব্য নয়। আর আছে সেই অংশ যারা দলান্ধ, দল যা করে তাই ঠিক। তারাও এই উচ্ছেদের সমর্থক।
বৈধতার কোনো স্থির-নিশ্চিত চিরন্তন সংজ্ঞা নেই। হামুরাবির আমলে শাসকের যে অধিকার 'বৈধ' বলে কথিত, আজ তাকে 'বৈধ' বলে মানা চলে না। যেমন ভবঘুরেমি যদি ঐচ্ছিকও হয়, তাকেও অবৈধ বলা চলে না। উৎপাদনের সঙ্গে সে কেমন ভাবে জড়াবে সে স্বাধীনতা তার আছে। কিন্তু হেনরির কালের লন্ডন বা ইংল্যান্ড ভবঘুরেদের অবৈধ, অনৈতিক, বিপজ্জনক, রোগ আর অনৈতিকতা ছড়ানোর দল বলেই ভাবত তার ইতিহাস-অর্থনীতি-রাজনীতি ইত্যাদি না বুঝেই। বা বুঝেও। সেই সঙ্গে সেকালের লন্ডনের হকারদেরও। লাইসেন্স প্রাপ্ত, স্থায়ী দোকানদারদের সঙ্গে তো শত্রুতা থাকতোই, কর দেয় না এবং নকল পণ্য বেচে বাজারের সুবিধে নেয় বলে। তারা ভুলেই যেত যে হকারটিকে নিজের এবং পরিবারের জন্য যা যা কিনতে হয় তার জন্য সে আসলে পরোক্ষে কর দিয়েই থাকে। তার অংশও কম নয়। বাকী উচ্চ ও মধ্যবিত্তের একাংশের সঙ্গেও থাকত বিরোধ। তাদের চলার পথ পরিস্কার নয় হকারদের জন্য। ঘোড়াগাড়ি থেকে মোটরের যাতায়াতের সমস্যাতে বিরোধ আরো বাড়ে। তাছাড়া হকারদের ক্রেতা টানতে চিৎকার-চেঁচামেচিও তাদের সহ্য হত না। অতএব 'অবৈধ'-দের বিপক্ষে তারা।
আজও এমন লোকেরাই রেল-হকার এবং সামগ্রিকভাবে হকার ও দরিদ্রের বিরুদ্ধে। এখন নব্য সাম্রাজ্যের আমল। অর্থনৈতিক সাম্রাজ্যবাদ সব চালায়। মধ্যবিত্তের সংখ্যা কমেছে নগরে। যা আছে তার বৃহদাংশই বিচ্ছিন্ন জনগণের থেকে উচ্চ-মধ্যবিত্ত হয়ে। তারা আর পাড়া ব্যবস্থাতেও সন্তুষ্ট নয়। আলাদা নিরাপত্তারক্ষী সমেত গেটেড কমিউনিটি, যেখানে আসলে কমিউনিটি বলে কিচ্ছু নেই, আছে সুবিধে কেনাকাটা, সেখানে থাকতে চায় সব সুবিধে সমেত। উচ্চবিত্ত একা এখনো জমিদারীর পন্থায় বাঁচতে পারে, উচ্চ-মধ্যবিত্ত পারে না। তাই সে নতুন জমিদারী বানিয়ে নিয়েছে তার অমন গেটেড কমিউনিটিতে। আরো অর্থ বাড়লে এই বাধ্য হয়ে ভাগ করা সুবিধে ছেড়ে সে নিজের প্রাসাদ বানিয়ে নেবে। বা ডুপ্লেক্স কিনবে গেটেড কমিউনিটিতে। এই সব কারণে পাশাপাশিই বদলে গিয়েছে রেলব্যবস্থাও। তার যে লাভ-লোকসানের অঙ্ক আমাদের দেখানো হয় তার বাইরেও এই ব্যবস্থার সমস্যার আসল কারণগুলোর কিছুটা অন্তত জানার দরকার আছে। এবারে আমরা সেদিকেই যাব।