পড়শি যদি আমায় ছুঁতো যম যাতনা সকল যেত দূরে: লালন সাঁই

পড়শি যদি আমায় ছুঁতো যম যাতনা সকল যেত দূরে: লালন সাঁই

hhhhhhhhhhhhhh

এক যে আছে দেশ বিদেশী আকাশ

  • 01 January, 1970
  • 0 Comment(s)
  • 201 view(s)
  • লিখেছেন : বাসুদেব গুপ্ত
হুশ, হুউশ, হুউশশশশ—আমনের গাল ফুলে বেলুনের মত হয়ে গেছে। চশমার ওপরে ঝুঁকে পড়েছে অবাধ্য এক গোছা চুল। প্রীতির মনে হল কোথায় যেন দেখেছে এরকম একটি জন্তু। চটপট ফোনে জেমিনাইকে জিজ্ঞেস করতেই সে বলে দিল, পাফার ফিশ। প্রীতি ফিক করে হেসে উঠল পাফার ফিশ আকা বেলুন মাছের সঙ্গে আমনের মুখের সাদৃশ্য দেখে। এদিকে মোমবাতির নেভার কোন ইচ্ছেই নেই। যেই ফুঁ বন্ধ হচ্ছে অমনি আবার ফুরফুর করে জ্বলে উঠছে।

“ছেড়ে দাও তো, মোমটা আমাদের হেট করছে মনে হয়। হেট যেমন একবার মাথায় ঢুকলে আরবেরোয় না, এরও আগুন নিভবে না।“ পনেরো বছরের ছেলের মুখে এমন দার্শনিক কথা বেশ অদ্ভুত, কিন্তু আমনের সঙ্গে যাদের পরিচয় আছে তারা খুব জানে, ভবিষ্যতে ও গ্যালিলিও টাইপের কিছু না হয়ে যায় না। টেলিস্কোপ নিয়েই ওর সময় কাটে বেশি, তবুও এটা একটু বাড়াবাড়ি মনে হল অস্মির। বিশেষ করে আজকের দিনে, আমনের জন্মদিন। তার পর আবার প্রীতি আর ওর ফ্যামিলির বন ভয়েজ, দেশে যাচ্ছে দীপাবলির ছুটি কাটাতে, বেশ অনেকদিনের ছুটি। ডবল উদযাপন। প্রথমে প্ল্যান ছিল মোমবাতি দিয়ে সাজানো হবে প্রি দীপাবলি আলোকসজ্জা, কিন্তু কাঠের বাড়ি, মোমবাতি উলটে গেলে বিপদ হতে পারে তাই আকাশ ঝুঁকি নিল না। এদিকে সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝিতেই এবার বেশ ঠাণ্ডা, বাইরে যাওয়ার মত উৎসাহ কারো নেই।

 

দূরেপ্যাটেলজীর বাড়ি চীনা এলইডি-র চেইনের দীপমালা ঝলমল করছে। মিসেস প্যাটেল গত মাসেইইন্ডিয়া থেকে এনেছেন।ব্যবসায়ী পরিবার, প্রায় প্রতি মাসেই ভারত যান। কখনও কখনওনতুন লোকজনও আসে, কিছুদিন থাকে, তারপর কোথায়চলে যায়। জিজ্ঞাসা করলে মিসেস প্যাটেল হেসে বলেন,কাজ পেয়ে গেছে অন্য শহরে, চলা গিয়া।তাদের আর দেখা যায় না।

 

অস্মি এক কাপ জল এনে মোমবাতিটা তাতে ডুবিয়ে দেয়।“এই নাও, হেটফুলক্যান্ডেল, এই তোমার শাস্তি”। একটা ফুস করে আওয়াজ হয়, তারপর ধূসর ধোঁয়া উঠে ডিনার টেবিলের ওপরের আলো পর্যন্ত পৌঁছায়। দুষ্টু মোম চলে যায়ডাস্টবিনে।

 

লাইটিং হয় নি তাতে কি, ঘর ঝলমল করছে আলোয়। অস্মি, শান্তিলতা দুজনেই পরেছে ঝলমলে তারা লাগানো জরির শাড়ি।

অনলাইনে কলামন্দির থেকে কেনা, আমেরিকায় দেসি বিউটিদের জন্য আদর্শ বস্ত্রালয়। অস্মি, আমনের মা, বাঙালি পরিশীলিত, সুমার্জিত আদর্শ রমণী। ঠিকঠাক ওজন, প্রোটিন, ফ্যাট, কারব সব মেপে মেপে। ঘর সানন্দা পত্রিকার ছবির মত নিখুঁত সাজানো। যার সঙ্গে যেমন তেমনি ব্যবহার, মেপে মেপে হাসি, ঠোঁটের ভঙ্গী। রবীন্দ্রসঙ্গীত গায় নিখুঁত গায়কীতে, একটা নোটেশান এদিক ওদিক হয় না। আজরমন ফ্যমিলিরনিমন্ত্রণ তাই অস্মি ঘর সাজিয়েছে সাউথ ইন্ডিয়ান থিমে। ছিমছাম, বাহুল্যবর্জিত, ঐতিহ্য যেন এসেবসেছে সারা ঘরে । ফলস পারসিয়ান কার্পেটে ঢাকা পুরো লিভিং রুম, তাতে সাজানো গোল করে চারটি মোড়া, মোড়ার কভারে তাঞ্জোর প্রভাবিত ময়ূরের নকশা। আর ভারী ডিপ সোফা সেট, একটিতে বসে আমনের বাবা আকাশ, সম্পর্কে রমনের ইমিডিয়েট বস, রমনের সঙ্গে আলোচনায়ব্যস্ত।

 

অস্মি আজ সারা দিন ধরে গেস্টদের জন্য সাউথ ইন্ডিয়ান ডিনার বানিয়েছে, ডাইনিং টেবলে থরে থরে সাজানো কোসাম্বারী, রসম, সম্বর, তাতে বড় বড় সব্জির টুকরো সাঁতার কাটছে, কোড়াম্বু, গাজর আর বাঁধাকপির পোড়িয়াল, এক বড় স্টীলের টিফিন কৌটোয় জমানো দই, সোনা মুসুরি চালের ভাত, আর বাসমতী চালের ভেজ পোলাও। বাঙ্গালিয়ানার পরিচয় শুধু শুক্ত আর পটল ভাজা দিয়ে।আমনের ননভেজ ছাড়া মুখে রোচে না, ভাত মানেই ওর কাছে চিকেন বিরিয়ানী। কিন্তু ওও আজ ভালো ছেলে হয়ে মেনে নিয়েছে এই মেনু। অবশ্য তার জন্য ক্ষতিপূরণ করা হবে কাল লাঞ্চে, ইটালিয়ান রেস্টুরেন্ট লায়লা লিলাতে। সারাদিন অস্মির গাইড হিসেবে হাতে হাতে লাগিয়ে কাজ করেছে শান্তিলতা। শান্তিলতারডায়াবেটিস ও রক্তচাপ দুইই আছে, চেহারাটা ভারীর দিকে, কাজেই একটু ক্লান্ত দেখাচ্ছে। কিন্তু অস্মির সঙ্গে ফিসফিস করা আর মাঝে মাঝে হেসে ওঠাতে কোন কমতি নেই। হঠাৎ খেয়াল হল, আমনের জন্য আইস্ক্রীম কিনেছিল রাস্তায়, আনা হয়েছে তো? এক দৌড়ে ফ্রিজটা খুলে দেখে নিশ্চিন্ত হয়ে আবার বসে হাঁফাতে লাগল।

 

প্রীতি, রমনের মেয়ে, আমনের সমান সমান। অস্মি আন্টির সঙ্গে খুব ভাব। একবার এসে কানে কানে বলে গেল, ‘আমনকে ঠিক পাফার ফিস লাগছিল, ফুঁ দেবার সময়”। অস্মি শুনে জোর হেসে উঠতে, শান্তি কাছে এসে ঝুঁকে জানতে চাইল জোকসটা কি। পাফারটাফার এতসব ওর জানা নেই, ও মৃদু ধমক লাগালো, ডু নট লাফ এট আমান, হ্যাভ ইউ সিন হিস সেমেস্টার গ্রেডস?”প্রীতি জিভ ভ্যাঙ্গায়, “হ্যাস হি সিন মাই ম্যাথস স্কোর?” প্রীতির ম্যাথসে এবারে ১০০তে ১০৫ পেয়েছে, কোন অদ্ভুত নিয়মে, তাই নিয়ে ওর গর্বের আর শেষ নেই।

 

শান্তি মাথা নাড়ে, অস্মির সমর্থনের আশায় ক্ষোভ জানায়, “বলো অস্মিজি, শুধু ম্যাথস দিয়ে কিছু হয় আজকাল? সব সাব্জেক্টেই ভাল হতে হবে, নইলে বি গ্রেড কলেজে এডমিশান পাবে, বুঝতেই চায় না। সবসময় ম্যাথস নিয়ে বসে থাকে, আর আজকাল কি যে হয়েছে এ আই, রাত জেগে নাকি ট্রেনিং দেয় কম্পিউটারকে, ম্যাথস শেখায়। আমার তো মাথায় কিছু ঢোকে না”

 

দুই পুরুষমানুষ সোফায় বসে জমিয়ে আলোচনা লাগায়। দুই মিসেস ব্যস্ত হয়ে পড়ে ফ্রেন্ডস সারকেল নিয়ে চর্চায়।আমন প্রীতিকে বলে “কই দেখি কি প্রেজেন্ট আমার জন্য এনেছিস?”

 

“আমি আর কি আনবো, আমার কি পয়সা আছে না তেরে জ্যায়সা পকেট মানি মিলতা। এই একটা ছোট্ট গ্লোব আর একটা বই ব্যাস। তোর পছন্দ হলে নিস নইলে আমাজনে রিটারণ।“

 

কারটন খুলে বেরোল বই, নীল গ্রাস টাইসনের মারলিন্স ট্যুর অফ দি ইউনিভারস। আর বেরোল একটা ক্রিস্টালের গ্লোব, তার ভিতরে সোলার সিস্টেম, সূর্যের চারদিকে ঘুরছে সব গ্রহ তাদের কক্ষ পথে। আর বাকী সব শূন্য ভরে আছে আকাশ ভরা তারায়।

 

আমনের আকাশ দেখাই হবি। পড়াশোনা শেষ হলেই সে বসে পড়ে খুঁজতে গ্রহ নক্ষত্র, ছায়াপথের অলিতে গলিতে।

প্রীতি মাঝে মাঝে স্টার টক দেখে, এই পর্যন্ত ওর জ্ঞান।

“থ্যাঙ্ক ইউ। ভেরি বিউটিফুল গিফট। কিন্তু এই সোলার সিস্টেমের মধ্যে ঢুকে পড়েছে মহাকাশের আগন্তুক, ডু ইউ নো?

চল দেখি দেখা যায় কিনা।“

 

 

 

আকাশ আর রমন সোফায় বসে, সামনে বিশাল ১০০ ইঞ্চি টিভি—আকাশ এই দীপাবলিতে কিনেছে। আকাশ জমি, সোনাদানা, শেয়ার এসবে টাকা খরচ করে না, কিন্তু নতুন ইলেকট্রনিক গ্যাজেট দেখলেই নিজেকে আর সামলাতে পারে না। “আমি জন্মগতভাবে টেকনিক্যাল,”—এটাই তার যুক্তি। এই টিভি একটু বেশীই দামি,ইএমআই-তে কিনেছে।তাদের কোম্পানি নতুন AI প্রোডাক্ট লঞ্চ করছে, আর রমন সেই টিমের গুরুত্বপূর্ণ সদস্য। এখন এ আইএর বাজার, ও জানে ওর ভবিষ্যৎ নিরাপদ। ইএমআই জমছে, কিন্তু শোধ করা যাবে।

 

টিভিতে কিছু চলছিল, কিন্তু ওরা আসলে কিছুই দেখছিল না। গভীর আলোচনা চলছিল তাদের নতুন AI সফটওয়্যার নিয়ে, যেখানে দুজন গত ছমাস ধরে প্রাণ ঢেলে কাজ করছে। ওরা জানে, AI-ই ভবিষ্যৎ, আর এখনই না মানলে কোম্পানি টিকবে না। এত উন্নত প্রযুক্তিতে কাজ করতে পারা সৌভাগ্যের, আর USA-তে না থাকলে এটা সম্ভব হত না। দুজনেই খুব গর্বিত, ভারতীয় ছাত্র-ইঞ্জিনিয়াররা USA-কে প্রযুক্তিতে শীর্ষে পৌঁছাতে সাহায্য করছে।

 

“দেখো, ABC-তে কী বলছে,” রমন টিভির দিকে ইঙ্গিত করল, যেখানে এক বিরক্ত মুখের সংবাদ পাঠক সন্ধ্যার ব্রেকিং নিউজ পড়ছিল।

 

“আমেরিকান বিশ্ববিদ্যালয়ে বিদেশি ছাত্রের সংখ্যা ব্যাপকভাবে কমানো হচ্ছে। সর্বাধিক ১৫%, আর কোনো দেশের ছাত্রদের জন্য সর্বোচ্চ ৫% ক্যাপ।”

“শিট!”—আকাশ বলে উঠল, বলেই আশেপাশে কেউ শুনল কিনা দেখে নিল একবার। অস্মি ভাষার পরিচ্ছন্নতায় কঠোর, অশ্লীলতা একেবারেই বরদাস্ত করে না। ওর ধারণা ছেলেকে এভাবেই এত ভদ্র, মার্জিত করে বড় করেছে অস্মি। সামাজিক অনুষ্ঠানে আমনের মত ভাল শিষ্ট ছেলে আর হয় না আর এর পুরো কৃতিত্বটাই অস্মি নিজের বলতে দাবী করতে ছাড়ে না।

 

“প্রথমে ভিসা কন্ট্রোল, এখন ছাত্র কন্ট্রোল,কী করতে চাইছে এরা?” আকাশতিনটে কাজু নিয়ে জাগলিং করতে চাইল, একটা পড়ে গড়িয়ে গেল সোফার নীচে, অসহায় ভাবে একবার আড়চোখে আকাশ তাকালো,না অস্মি দেখছে না।

 

“ওদের দেশ, ওরা ওদের সমস্যার সমাধান জানে, আমরা কী বলব? ভালো লাগল, H1B এক্সটেনশনের জন্য কোনো ফি লাগবে না বলে পরিষ্কার করেছে। না হলে আমি তো বসে থাকতাম।” রমন সাতে পাঁচে থাকতে ভালোবাসে না।

 

“ওদের দেশ, কিন্তু গড়ে তোলে কে? তুলোক্ষেতের কুলি থেকে ব্রুকলিন ব্রিজের নির্মাতা, সবই তো বিদেশী অভিবাসীদের বুকের রক্ত দিয়ে গড়া। আজকের এই সফটওয়্যার সাম্রাজ্যআমাদের ভারতীয়দের হাতেই গড়া।” আকাশের বাঙালি বিপ্লবিয়ানা মুখ বাড়ায়।

 

আমন প্রীতিকে নিয়ে গেল তার ছোট অবজারভেটরিতে, ডেকের ওপর।যেতে যেতে প্রীতি জিজ্ঞেস করল,

“জানতে পারি সেই মহাকাশের আগন্তুকটি কে? কোন এঞ্জেল নয় তো? মাম্মির মহাকাশে তো শুধু গডস আরে গডেসেস বাস করে।“

“এর নাম ৩ আই/এটলাস। ইন্টারস্টেলার অব্জেক্ট, আমাদের কোর্ট ইয়ারডে ঘুর ঘুর করেছে।“

 

“ইন্টারস্টেলার, সেই মুভির মত, আমাদের এখানে এলিয়েন ভিসিটর এসেছে। কি মজা”, প্রীতি হাততালি দিয়ে ওঠে।

কাজের ব্যাপারে আমন হাসাহাসি পছন্দ করে না। ও গম্ভীর হয়ে যায়।

“ইন্ডিপেন্ডেন্স ডে দেখেছ? এলিয়েনরা আমাদের বন্ধু নয়। এর ভিতর কি আছে বোঝা যাচ্ছে না, হাব ভাব খুবই সন্দেহজনক। আগে থেকেই তাই আমরা সব এমেচার এস্ট্রনমাররা ফলো করছি এই অবজেক্টকে। “

প্রীতির মনে হয় আমন ওর ক্লাসমেট নয়, এক সুপারহিরো, সেভিং দি ওয়ারল্ড, ভাবতে গিয়ে আবার হাসি পেয়ে যায়। কোনমতে হাসি চাপতে গিয়ে গলায় কাশি এসে যায়।

“ঠান্ডা লাগলে একটা হুডি চাপিয়ে আয়, সময় লাগবে সেট আপ করতে”, আমনের গলায় এবার অভিভাবকের সুর।

 

ডেকে একটি বড় ছয়-ইঞ্চি টেলিস্কোপ বসানো হয়েছে, আমনের আশা ভাগ্য ভাল থাকলে এটা দিয়েই৩আই/আটলাসের মতো কিছু দেখা যাবে। তাদের অ্যাপার্টমেন্ট কমিউনিটির চারপাশে গভীর অন্ধকার, দুপাশের বাউন্ডারী ওয়ালের বাইরে জংগল। বাইরের বাতাস স্থির।সিসিটিভি ক্যামেরায় কিছুদিন আগেও দেখা যেত চাঁদের আলোয় হরিণরা ঘুরছে, কি খুঁজছে কে জানে। সেইহরিণেরালুকিয়ে গেছে এখন, ম্যাপল গাছগুলোর পাতায় রঙের বিস্ফোরণ, সেই রঙ ঝরে যাচ্ছে, আর ঝরে যাচ্ছে পাতা।

 

প্রীতি চারপাশে পড়ন্ত পাতাগুলো দেখছিল আর ভাবছিল, “কীভাবে ম্যাথস দিয়ে আমাদের পৃথিবীতে এত বিস্ময়কর আকৃতি তৈরি হয়। প্রীতির আইকন রামানুজন, ওও চায় ওরকম গণিতজ্ঞ হতে। তাই সব কিছুতেই ও গণিত খুঁজে যায়।

 

 “হ্যাঁ, গণিতই ঠিক করে দেয় কীভাবে তারারা আকাশে ঝুলে থাকে আর গ্রহগুলো তাদের হাইওয়ে দিয়েএকদম ট্রাফিক রুল মেনে চলে, কখনও একে অপরের সঙ্গে এক্সিডেন্ট হয় না, কোন ট্রাফিক জ্যাম হয় না।” আকাশ গম্ভীরভাবে উত্তর দিয়ে প্রীতির দিকে তাকায়।

 

আবছা অন্ধকারে দুজনের মুখেই হাল্কা হাসি ফুটে ওঠে, কিন্তু দেখা যায় না। কিন্তু দুজনেই অনুভব করে একটা হাল্কা কাঁপন, শীতের না ম্যাথসের কোন এক ক্যাল্কুলাসের ফাংশান যার ডেরিভেটিভ এখনো কষা হয় নি।

 

আমন টেলিস্কোপ সেট করে আইপ্যাড দেখে দেখে এঙ্গেল ঠিক করছিল, যেদিকে ৩আই কে পাওয়া যেতে পারে। করতে করতে ভাবে, থ্রী আই, তৃতীয় নয়ন, একটা অন্যরকম মানে আছে এই নামের মধ্যে।

 

“শিট”—আমন বলে উঠল, তার হাত থেকে একটা স্ক্রু পড়ে গেল আর অন্ধকার ডেকে হারিয়ে গেল। প্রীতি হেসে উঠল, তারপর অস্মিকে নকল করে বলল, “তুমি সত্যিই বড় স্কাফ হচ্ছো আমন।” আমনের মা তাকে অগোছালো, অশিক্ষিত বলেন, কিন্তু এই ‘স্কাফ’ শব্দটা শুধু পনেরো বছর বয়সীরা ব্যবহার করে। আমন পাত্তা দিল না, স্ক্রু খুঁজতে ব্যস্ত হয়ে পড়ল।

 

প্রীতি ডেকের কিনারায় গিয়ে পড়ন্ত পাতা দেখছিল, অন্ধকারে হারিয়ে যাচ্ছে। সে রবার্ট ফ্রস্টের কবিতা আওড়াল, “The woods are dark and deep…”

আমন উত্তর দিল, “Light years to go before I sleep…”

 

 

“এদিকে সব পরিষ্কার, রেডি,”অস্মি আলেক্সায় ব্রডকাস্ট করল, “যারা ভক্তিমূলক গান শুনতে চায়, তারা মিউজিক রুমে আসতে পারে।“ রমনদের বাড়িতে মিউজিক রুম আর পূজা রুম একই। কিন্তু আকাশের বাড়ি কোন পূজা রুম নেই। শান্তিলতার আনা চন্দন ধূপ জ্বালিয়ে দেওয়া হল গেস্ট রুমে, শান্তিলতা পিয়ানোতে বসলেন,অস্মিবসল ইলেক্ট্রনিক তানপুরা আর তবলাটা অন করে।

 

“বাচ্চারা কোথায়?”

“ওদের ছেড়ে দাও, ওরা টেলর সুইফট আর লিল বেবি ওইসব ভুলভাল জিনিসে মগ্ন”—শান্তি বললেন।

 

“সব সময় না। আমি দেখেছি, আমনAI-জেনারেটেড পিয়ানো শুনছিল, বলল মানুষের চেয়ে ভালো বাজাচ্ছে”—অস্মি বলল।

 

“পশ্চিমী সংগীত তো গাণিতিক, ফর্মুলার মতো নোটেশন। AI সহজেই নকল করতে পারে। কিন্তু ভারতীয় সংগীত তো সৃজনশীলতা, ইম্প্রোভাইজেশন—AI কখনও পারবে না। কী বলেন মিস্টার সেনগুপ্ত আর AIGuruji?”—শান্তি রমনকে ইঙ্গিত করল, নাম ধরে ডাকে না, সেটা শুধু ঘনিষ্ঠ মুহূর্তের জন্য।

 

“আরে, আমাদের দিকে আঙুল তুলো না, গান শুরু করো। আমরা তো ইঞ্জিনিয়ার, জিনিস বানাই, দেশ বা পৃথিবীর ভাগ্য ঠিক করি না”—রমন বলল।

 

“ঠিকই। আমাদের হাতে কিছু নেই। যা বলা হয়, তাই করি। আর কেউ কোথাও বসে আমাদের ভাগ্য ঠিক করে”—আকাশ বলল, “শান্তি ভাবী ইউ স্টারট”।

শান্তিতার বরাবরের মত বর্ণমদিয়ে শুরু করল, ঘরটা দীপাবলির ফুলঝুরির মতো সুরে ভরে উঠল। তারপর অস্মি ধরল “আকাশ আমার ভরলো আলোয়”।

 

রাতের খাওয়া শেষ হল, সন্ধ্যা গড়িয়ে রাত এল, রমনের বিদায়ের সময়। সে ইতিমধ্যে দূর থেকে গাড়ির ইঞ্জিন চালু করেছে, তাপমাত্রা নেমে গেছে সাত ডিগ্রিতে, মানে এবার শীত একটু আগেই আসবে।

 

“তুমি এবার আমাদের জন্য কী আনবে?”—অস্মি শান্তিলতার হাত ধরল, দু’জনেই যেন কান পাতল বাইরের কুয়াশার শব্দে। অথবা, নারীদের চোখের জল সবসময় প্রস্তুত থাকে, আর তারা সেটা খুব ভালোভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে জানে।

 

“তাঞ্জোর থেকে একটা হাতি নিয়ে আসব, তোমার ছোট্ট ছেলেটা যাতে চড়তে পারে।” শান্তি চোখ টিপে জানাল।

 

“আমি আমদানি করার আগে দেখে নেব, আমনের জন্য সবচেয়ে নিরাপদ হাতিটা বেছে নেব”—প্রীতি হেসে উঠল, “তোমাদের এখানে সবই আছে আন্টি, আবার কী আনতে হবে?”

 

“তুমি বুঝবে না, চুপ করো”—শান্তি বলল, অস্মির দিকে তাকিয়ে আবার জিজ্ঞাসা করল,

 

“কি?”

 

“ঠিক আছে বাবা, কুর্গ থেকে ভালো ফিল্টার কফি আনো, কেরালা থেকে একদম টাটকা কাজুবাদাম আনো, আর…”

 

“আর একটা দারুণ সিল্ক শাড়ি, যেটা T Nagar-এ পাওয়া যায়, তাই তো?”

 

আমন আর প্রীতি চোখ বড় বড় করে এসব কথা শুনছিল। এবারওরাপনেরো বছরের অজানা কোন সাইন ল্যাংগোয়েজে বাই বাই করল।আকাশ রমনের সঙ্গে হাত মেলাল, “ভালোভাবে যেও, এখানে ওখানে জল খাবে না, আর ইডলি খাওয়ায় একটু সাবধান। রেগুলার টিমসে চোখ রেখো, এদিকে কি হচ্ছে না হচ্ছে জানতে থাকবে।”

 

“নিশ্চয়ই, আকাশভাই। মনে রাখব। আর আমরা প্রোডাক্ট নিয়ে তেড়ে লাগব, ফিরে এসে। ততদিন…”

 

“So long…”—আকাশ গাড়ির জানালা ছেড়ে দিয়ে সরে এল, রমনদের গাড়ীর টেল লাইট লাল থেকে ধীরে ধীরে অদৃশ্য হয়ে গেল।

 

 

কয়েকদিন পরে। রমনের কাছ থেকে ফোন আসে—তার ভিসা এক্সটেনশন বাতিল হয়েছে,  সে আর ইউএসএফিরতে পারবে না।

 

আকাশWorld AI Conference থেকে হোটেলে ফিরেছে, সান হোসে-তে। সে এই বড় বড় জমায়েত, পার্টি, রাত জাগা, ভ্রমণ, আর সারাদিন প্রদর্শনী হলে দাঁড়িয়ে থাকা একদম পছন্দ করে না। রাতে ঘুমাতে কষ্ট হয়, পিঠে কোমরে ব্যথা। অস্মি বলে জিমে যেতে, কিন্তু সময় কোথায়!

 

ঘুমের মধ্যে মনে পড়ল,কিছু মেসেজ এসেছিল, দেখা হয়নি। তখন ওনতুন চিপ আর তার ফার্মওয়্যার নিয়ে ব্যখ্যা দিচ্ছিল, যাতে এ আইএর স্পীড একশো গুণ বেড়ে যেতে পারে।WhatsApp খুলল, দেখল রমনের অনেকগুলো মেসেজ, আর একটা অস্মির। অস্মি, যথারীতি, কোম্পানির ডিনারে বেশি খাওয়া নিয়ে চিন্তিত, বলেছে এক গ্লাসের বেশি ওয়াইন না খেতে। রমনের মেসেজটা বড়, আর সেটা পড়ে আকাশ একেবারে উঠে বসল, সাইড লাইট জ্বালাল। AC একটু বেশী ঠাণ্ডা, কমফর্টারটা গায়ে টেনে নিয়ে বসল।মেসেজটা জ্বলজ্বল করে উঠল চোখের সামনে—

 

‘খারাপ খবর। ভিসা অফিস থেকে লিখছি। আমার ভিসা স্ট্যাম্পিং বাতিল হয়েছে, শান্তি আর প্রীতিরও। মাথা কাজ করছে না। কোনো আপিল নেই। আমি—cked।’

 

রাত ১১টা পেরিয়ে গেছে, HR বা অ্যাডমিনের কাউকে যোগাযোগ করার উপায় নেই। আর কীই বা জিজ্ঞাসা করবে? ভিসা বাতিল মানে ভিসা বাতিল, কোনো আপিল নেই, কোনো কারণও নেই। আর এতে রমন আগামী তিন বছর একই ভিসার জন্য আবেদন করতে পারবে না। আকাশের মাথা ঘুরে উঠল।দু’গ্লাস ওয়াইন আজ খাওয়া হয়ে গিয়েছিল, রোজে ওয়াইনটা দারুণ ছিল।

 

এখন কী হবে? তার কাজের কী হবে? এই চিন্তা মাথায় এল প্রথমে। হয়তো রিমোট কাজ করে সামলানো যাবে। কিন্তু বাড়ি? ছেলের পড়াশোনা? অসংখ্য ইএমআই? আকাশের মনে হল, রমন আর তার পরিবার যেন ভারত মহাসাগরে নাক ডুবিয়ে ভাসছে। রমনকে ফোন করাও সম্ভব নয়, কী বলবে? মাথাটা গরম হয়ে গেল রমনের নির্বুদ্ধিতার কথা ভেবে ।

 

রমন, অতিরিক্ত উৎসাহী, ধর্মভীরু, কোনো পরিকল্পনা নেই। এমনটা হতে পারে ওর জানা উচিত ছিল। আকাশ বলেছিল, এবার না যেতে, দীপাবলি বা এমন উৎসবের জন্য এমন গোলমেলে সময়ে ইন্ডিয়া না যেতে। কিন্তু রমন শুনল না। তাকে গ্রামে আত্মীয়দের সঙ্গে দেখা করতে হবে, অনেক ধোসা-ইডলি খেতে হবে, শান্তি আর অস্মির জন্য নল্লি-র সিল্ক শাড়ি কিনতে হবে। আর এখন কী হবে? ফেটে গেল তো, রমনের পৃথিবী দুম ফটাস।

 

“আমি শকড। মাথা ঠান্ডা করে চল এই দুঃসময়ে। ভয় পেও না। কাল কথা বলব।”—আকাশ আস্তে টাইপ করল, সাইড লাইট বন্ধ করল, মাথা বালিশে গুঁজে ক্লান্তি কাটাতে চেষ্টা করল। হালকা একটা টিং শব্দ শুনল, রমন তার টেক্সট পড়েছে, তারপর আর কিছু না। স্বপ্নে দেখল, অটো রিকশার লাইন, India India India। অটোতে বসে প্রেসিডেন্ট আর প্রধানমন্ত্রী, ছোট আর্মার্ড গাড়ির মতো। আকাশ ইমিগ্রেশন লাইনে, নীল কুয়াশা ঢাকা মোটা কাঁচ। ড্রাইভাররা জানালায় উঠে টোকা দিচ্ছে। আকাশ লাইনের বাইরে যেতে পারছে না। সামনে দশজন, নার্ভাস নতুন দম্পতি, একটু বিরক্ত ভারতীয়, বৃদ্ধ বাবাকে ধরে, কাউন্টারে কী জিজ্ঞেস করলে কি বলবে তা বলে যাচ্ছে। হঠাৎ দু’জন ইউনিফর্ম পরা লোক এসে বৃদ্ধকে ইন্টারোগেশন চেম্বারে নিয়ে গেল। তারপর আকাশের ফোনে কল এল। তার বাবার কাছ থেকে। কিন্তু বাবা তো দুই বছর আগে মারা গেছে। এখন কী চান? আকাশ ফোন ধরল না। আবার কল এল। আবার।

 

চরম বিরক্ত, ক্লান্ত আকাশ ফোনটা ধরল।

 

আকাশ ঘুম থেকে উঠে দেখল, মোবাইল স্ক্রিনে অস্মির নতুন ডিপি—অস্মি আর শান্তি, দু’জনেই কাঞ্জিভরম শাড়ি আর মাল্লিকা ফুল পরে হাসছে।

ইতিমধ্যে তিনটি মিসড কল। অস্মি জানে তারা তিন ঘণ্টা এগিয়ে, আর কখনও অদ্ভুত সময়ে ফোন করে না। সে খুবই নিয়মিত।

 

“কি হয়েছে? ফোন ধরছো না? আবার বেশি ওয়াইন খেয়েছো?”—অস্মির গলা রুক্ষ, কিন্তু আকাশ টের পেল, ভেতরে একটু ভয়ও আছে। সে কারণটা আন্দাজ করল, তবুও নিরীহভাবে উত্তর দিল,

 

“দুঃখিত, এখন মাত্র ৫টা। গত রাতে কোনো ওয়াইন খাইনি, প্রেজেন্টেশনে ব্যস্ত ছিলাম, তাড়াতাড়ি ডিনার করে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম।”

 

“জানি এখন ৫টা, তবুও ফোন করলাম। জরুরিফোন হলেও ধরবে না? এ কেমন ঘুম!”—অস্মি তার স্বভাবসিদ্ধ প্রশ্ন-উত্তর শুরু করল, আকাশ জানে, এখন চুপ থাকাই ভালো। সে শুনতে লাগল।

 

“রমনের খবর শুনেছো? ওদের ভিসা দেয়নি। তোমার প্রিয় প্রেসিডেন্ট এমন করতে পারে, যখন আমরা শরীর-মন দিয়ে ওদের দেশ গড়ে দিচ্ছি?”

 

আকাশ ক্লান্তির মধ্যেও হাসতে চাইল। সংক্ষেপে বলল,

 

“হ্যাঁ, ও ফোন করেছিল। তখন ঘুমাচ্ছিলাম।”

 

“সবসময় ঘুম, ঘুম আর ঘুম? বাড়ি আর আমার জন্য কোনো সময় আছে? আমাদেরও যদি বের করে দেয়, তখন কী হবে?”

 

“শান্ত হও, অস্মি। ৫০ লাখের বেশি ভারতীয় আমেরিকায় কাজ করে, ১০ লাখের বেশি ইঞ্জিনিয়ার। আমরা কোথাও যাচ্ছি না। USA দেশটাআমাদের ছাড়া চলবে না। আর আমাদের গ্রিন কার্ডের আবেদন চলছে, আমরা আর কখনও ভারতে ফিরছি না।”

 

“তোমার আত্মবিশ্বাস কদিন থাকবে কে জানে! হ্যাঁ, আমাদের দু’জনেরই বেঁচে থাকা বাবা-মা নেই, তাই প্রতি দীপাবলি, দুর্গাপুজোতে যেতে হয় না। তবুও আমি ভয় পাচ্ছি।”

 

“আমনের কী খবর?”

 

“সে ৩আই/আটলাস খুঁজছে। বলে, আরেকটা ইন্টারস্টেলার আসছে। বাইরের কিছুতেই তার মাথাব্যথা নেই।”

 

“ভালোই তো। দেখো, চিন্তা করো না, আমরা ঠিক আছি। আমি রমনের মতো বোকা নই। রিল্যাক্স। আই লাভ ইউ।”

 

অস্মির কান্না চেপে রাখার শব্দ শোনা গেল। আকাশ জানে, এটাই রুটিন।

 

“এখন কি আমি আরও দুই ঘণ্টা ঘুমাতে পারি? দশ ঘণ্টা দাঁড়িয়ে ছিলাম, ব্যথা করছে।”

 

“ঠিক আছে। বেশি পেইনকিলার খেয়ো না। বাই।”

আকাশের আর ঘুম এলো না। কখন যে সকাল হয়ে গেল, ফ্লাইট ধরতে হবে।

 

 

 

 

0 Comments

Post Comment