পড়শি যদি আমায় ছুঁতো যম যাতনা সকল যেত দূরে: লালন সাঁই

পড়শি যদি আমায় ছুঁতো যম যাতনা সকল যেত দূরে: লালন সাঁই

hhhhhhhhhhhhhh

ঘরে ঘরে তিরঙ্গা না সবার জন্য ঘর?

  • 15 August, 2022
  • 0 Comment(s)
  • 1105 view(s)
  • লিখেছেন : সঙ্ঘমিত্রা চ্যাটার্জী
প্রধানমন্ত্রী বর্তমানের দায়বদ্ধতার কথা বলছেন, বলছেন ঘরে ঘরে তেরঙা পতাকা তুললে পতাকার সাথে একাত্মতা বাড়বে। কেন্দ্র সরকারের যে কোনও প্রকল্পের মতোই বিজ্ঞাপনী প্রচার-ট্যুইট-মার্কেটিং এর কোনও অভাব নেই এবারও। বিজেপি'র নেতা মন্ত্রীরা কোমর বেঁধে নেমে পড়েছেন দেশবাসীকে দায়িত্ববান নাগরিক করে তোলার কাজে। প্রশ্ন হচ্ছে, ভারতবাসী যে ঘরে ঘরে পতাকা তুলবেন, প্রত্যেক নাগরিকের জন্য সেই ঘরের ব্যবস্থা মোদী সরকার করতে পেরেছে কি?

স্বাধীনতার পঁচাত্তর বছর পূর্ণ হওয়ার মুখে দেশবাসীকে ঘরে ঘরে জাতীয় পতাকা উত্তোলনের আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। কেন্দ্রীয় সরকারের দেশব্যাপী 'আজাদি কা অমৃত মহোৎসব' এর অঙ্গ হিসাবেই এই 'হর ঘর তিরঙ্গা'র পরিকল্পনা এবং প্রচার। প্রধানমন্ত্রী বলেছেন - 'এই জাতীয় পতাকা শুধু তিনটে রং এর সমাহার নয়, এই পতাকায় প্রতিফলিত হয়েছে আমাদের অতীতের গর্ব, বর্তমানের দায়বদ্ধতা এবং ভবিষ্যতের স্বপ্ন। এই পতাকা ভারতবর্ষের সংহতি, ঐক্য এবং বৈচিত্র্যের প্রতীক।' স্বাধীনতা দিবসে জাতীয় পতাকা উত্তোলন কোনও নতুন জিনিস নয়। বিভিন্ন ক্লাবে,পাড়ায়, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে প্রতিবছর ১৫ আগস্ট নিয়ম করে জাতীয় পতাকা তোলা হয়। স্বাধীনতা সংগ্রামের বীর যোদ্ধাদের স্মরণ করে নিজস্ব উদ্যোগেও কিছু মানুষ, সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংস্থা নিজের মতো করে দিনটি পালন করেন। প্রশ্ন হচ্ছে, সিনেমা হলে জাতীয় সঙ্গীত বাধ্যতামূলক করার মতো করে ঘরে ঘরে জাতীয় পতাকা তুলে, প্রোফাইলে তেরঙা টানিয়ে দেশভক্তির প্রমাণ দিতে হবে কেন? ভক্তরা বলবেন, এতে আপত্তি কোথায়? স্বাধীনতার পঁচাত্তর বছরে দেশবাসী পতাকা তুলবেন, সে তো ভালো কথা। উত্তরে বলব, আপত্তি আছে। আপত্তির কারণগুলো এরকমঃ


ইতিহাস বলছে, আজকের বিজেপি'র যেসব জনক সংগঠন, সেই আরএসএস-হিন্দু মহাসভা-জনসংঘ আগাগোড়া বৃটিশ সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী স্বাধীনতা আন্দোলনের বিরোধিতা করে এসেছে। শুধু বিরোধিতাই নয়, বৃটিশ শাসকের নির্লজ্জ তাঁবেদারি, বৃটিশকে সহযোগিতা করে নিজেদের সাংগঠনিক সুবিধা আদায় করা, পরাধীন ভারতবাসীর বিদ্রোহ-বিক্ষোভ দমনে বৃটিশের দমননীতিকে সমর্থন করার অজস্র নজির আছে এই সব হিন্দুত্ববাদী সংগঠনের ইতিহাসে। এমনকী যে ত্রিবর্ণ পতাকা নিয়ে মোদীজি'র এত আস্ফালন, তাকেও কোনওদিন এইসব সংগঠনগুলো স্বীকৃতি বা সম্মান দেয়নি।
শুরু করা যাক দুটি পিটিশনের কথা দিয়ে। দুটিই পরাধীন ভারতবর্ষে বসে বৃটিশ সরকারের উদ্দেশ্যে লেখা। একটি লিখেছিলেন শহীদ-ই-আজম ভগৎ সিং। জেলে বসে তাঁর শেষ লেখা। ২৩ বছর বয়স্ক ভগৎ সিং সেই পিটিশনে তাঁর এবং তাঁর সহযোদ্ধাদের উদ্দেশ্য ও আদর্শের কথা বলছেন, শুধুমাত্র বৃটিশ শাসক নয়, ভারতবর্ষের পুঁজিমালিকদের বিরুদ্ধেও স্পষ্ট অবস্থান নিচ্ছেন, পুঁজিবাদী শোষণের অবসান সম্পর্কে প্রত্যয় প্রকাশ করছেন, এবং বৃটিশ রাজের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণার অভিযোগ সগর্বে স্বীকার করে আর্জি জানাচ্ছেন, বৃটিশ সরকার যেন ফাঁসির পরিবর্তে যুদ্ধাপরাধীদের মতোই ভগৎ সিং ও তাঁর সহযোদ্ধাদের গুলি করে মারার হুকুম দেন। সেই চিঠির অংশ বিশেষঃ
"The days of capitalist and imperialist exploitation are numbered. The war neither began with us nor is it going to end with our lives. It is the inevitable consequence of the historic events and the existing environments.
Our humble sacrifices shall be only a link in the chain that has very accurately been beautified by the unparalleled sacrifice of [Jatin] Das and most tragic but noblest sacrifice of Comrade Bhagawati Charan and the glorious death of our dear warrior [Chandrashekhar] Azad.

...We wanted to point out that according to the verdict of your court we had waged war and were therefore war prisoners. And we claim to be treated as such, i.e., we claim to be shot dead instead of to be hanged." ( সূত্রঃ The Wire, March 2022: Bhagat Singh and Savarkar, Two petitions that tell us the difference between Hind and Hindutva)
দ্বিতীয় পিটিশন ভি.ডি. সাভারকর এর। ভগৎ সিং এর ফাঁসির সাত বছর আগে জেল থেকে ছাড়া পেয়েছিলেন সাভারকর। ১৯১১ সালে আন্দামানের সেলুলার জেলে যাওয়ার পর থেকে তিনি বৃটিশের কাছে ক্ষমাভিক্ষা করে চিঠির পর চিঠি লিখেছিলেন, যার মূল বক্তব্য ছিল, এইবারটি বৃটিশ প্রভু দয়া করে তার এই বিপথে চলে যাওয়া সন্তানটিকে মুক্তি দিন। একবার জেল থেকে বেরোতে পারলে ভুলেও আর তিনি বৃটিশবিরোধিতার পথে হাঁটবেন না, বরং বৃটিশ সরকারের একান্ত অনুগত ভক্ত এবং সেবক হয়ে থাকবেন। ১৯১৩ তে সাভারকরের এরকম একটি পিটিশনের অংশবিশেষঃ
"Therefore if the government in their manifold beneficence and mercy release me, I for one cannot but be the staunchest advocate of constitutional progress and loyalty to the English government which is the foremost condition of that progress.

...Moreover my conversion to the constitutional line would bring back all those misled young men in India and abroad who were once looking up to me as their guide. I am ready to serve the Government in any capacity they like, for as my conversion is conscientious so I hope my future conduct would be. By keeping me in jail nothing can be got in comparison to what would be otherwise.

The Mighty alone can afford to be merciful and therefore where else can the prodigal son return but to the parental doors of the Government." (সূত্রঃ ঐ)

বিজেপি'র হিন্দুত্ব আইকন, হিন্দু মহাসভা'র প্রতিষ্ঠাতা, 'হিন্দুত্ব' গ্রন্থের রচয়িতা এবং দ্বিজাতিতত্ত্বের অন্যতম প্রবক্তা সাভারকর, বৃটিশের দয়ায় কারামুক্তির পর বাকি জীবন অক্ষরে অক্ষরে তার কথা রেখেছিলেন। সম্প্রতি মোদীর ভারতবর্ষে, এই সাভারকরকে 'বীর নায়ক' বানিয়ে একটি ছবিও মুক্তি পেয়েছে।

এবার এমএস গোলওয়ালকর, হেডগেওয়ার এর পর যিনি ছিলেন 'রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘ'র দ্বিতীয় সরসংঘচালক, হিন্দুত্ববাদী রাজনীতির অন্যতম তাত্ত্বিক নেতা। গোলওয়ালকর তার ১৯৬৬ তে প্রকাশিত 'বাঞ্চ অব থটস' বইয়ে লিখছেন - " আঞ্চলিক জাতীয়তাবাদ এবং সর্বজনীন বিপদের তত্ত্ব থেকে আমাদের জাতিত্বের ধারণা তৈরি হয়েছে। এর ফলে আমাদের প্রকৃত হিন্দু জাতিত্বের সদর্থক অনুপ্রেরণা থেকে আমরা বঞ্চিত হয়েছি এবং আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রামের বহু আন্দোলনই নিছক ব্রিটিশ-বিরোধী আন্দোলনে পরিণত হয়েছে। ব্রিটিশ বিরোধিতার সঙ্গে দেশপ্রেম, জাতীয়তাবাদকে সমার্থক করে দেখা হয়েছে। আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রাম, তার নেতৃবর্গ এবং সাধারণ মানুষের ওপরে এই প্রতিক্রিয়াশীল মতের প্রভাব সর্বনাশা হয়েছে।" (সূত্রঃ 'খাকি প্যান্ট গেরুয়া ঝান্ডা', ওরিয়েন্ট লংম্যান। ) অর্থাৎ, জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে ভারতবর্ষের যে বৃটিশ সাম্রাজ্যবাদবিরোধী আন্দোলন, (অবশ্যই মনে রাখা দরকার, এ আন্দোলনের পুরোভাগে থাকা কংগ্রেসের গান্ধীবাদী নেতৃত্ব ধর্মনিরপেক্ষতার আদর্শকে অনুসরণ করেননি এবং তাঁদের ভূমিকা বৃটিশ পুঁজি চলে গিয়ে ভারতীয় পুঁজির শাসন কায়েম করতেই সাহায্য করেছে, কিন্তু এর বিপরীতে হাজার হাজার ভারতবাসীর যে মুক্তি-আকাঙ্ক্ষা ভগৎ সিং-নেতাজী সুভাষচন্দ্র'র মধ্য দিয়ে মূর্ত হয়েছিল তার চরিত্র ছিল মূলত ধর্মনিরপেক্ষ।) গোলওয়ালকরের কাছে তা ছিল ক্ষতিকর, প্রতিক্রিয়াশীল, যেহেতু তা হিন্দুত্বের ধারণার ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠেনি। ১৯৪৬ এর ১৪ জুলাই, নাগপুরে গুরুপূর্ণিমার একটি সমাবেশে এই গোলওয়ালকর বলছেন, "গেরুয়া পতাকাই সামগ্রিক ভাবে ভারতীয় সংস্কৃতির প্রতিনিধিত্ব করে। এই পতাকায় ঈশ্বর অধিষ্ঠান করছেন। আমরা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি যে, শেষপর্যন্ত সমগ্র জাতি একদিন এই গেরুয়া পতাকার সামনেই নত হবে।"(Golwalkar, M.S. “Shri Guruji Samagar Darshan” [collected works of Golwalkar in Hindi], Bhartiya Vichar Sadhna, Nagpur, nd., volume 1, p. 98.) । স্বাধীনতার প্রায় প্রাকমুহূর্তে, ১৯৪৭ এর ১৪ আগস্ট আরএসএস এর ইংরাজি মুখপত্র 'অর্গানাইজার' লিখেছিলঃ

"The people who have come to power by the kick of fate may give in our hands the Tricolour but it will never be respected and owned by Hindus. The word three is in itself an evil, and a flag having three colours will certainly produce a very bad psychological effect and is injurious to a country."­ অর্থাৎ তাদের স্পষ্ট বক্তব্য ছিল, এই ত্রিবর্ণ জাতীয় পতাকা দেশের পক্ষে অত্যন্ত অশুভ এবং হিন্দুরা কখনোই একে সম্মান জানাবেন না। আরএসএস এবং শাখাসংগঠনগুলি সংঘের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী স্বাধীনতা দিবসও পালন করে এসেছে গেরুয়া পতাকা'র মাধ্যমে, জাতীয় পতাকা উড়িয়ে নয়। এই ধারাবাহিকতার সাথে খাপে খাপে মিলে যায় আজকের বলিউডি ছবির গৈরিক ধারা, যেখানে গেরুয়া ধ্বজা বা ভগওয়া ধ্বজকে শুধুমাত্র হিন্দুত্বের প্রতীকই নয়, দেশপ্রেম এবং স্বাধীনতার সমার্থক করে তোলা হয়।
হিন্দুত্ববাদী রাজনীতির আর এক আইকন ভারতীয় জনসংঘের প্রতিষ্ঠাতা শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়। '৪২ এর আগস্ট অভ্যুত্থানের প্রাক্কালে, ১৯৪২-এর ২৬ জুলাই, তিনি বাংলার গভর্নর জন হার্বার্টকে এক চিঠিতে লিখেছিলেন, ‘আপনাদের এক জন মন্ত্রী হিসেবে, আমি পূর্ণ সহযোগিতা জানাচ্ছি। …(শ্যামাপ্রসাদ তখন ফজলুল হক মন্ত্রীসভার সদস্য) যুদ্ধ চলার সময়ে যদি কেউ জনতার আবেগ উস্কে দেওয়ার চেষ্টা করে, অভ্যন্তরীণ শান্তি ও নিরাপত্তায় বিঘ্ন ঘটায়, সরকার যেন তার প্রতিরোধ করে।’ ভারত ছাড়ো আন্দোলন সম্পর্কে তিনি বললেন, ‘আমি মনে করি না, গত তিন মাসের মধ্যে যেসব অর্থহীন উচ্ছৃঙ্খলতা ও নাশকতামূলক কাজ করা হয়েছে, তার দ্বারা আমাদের দেশের স্বাধীনতা লাভের সহায়তা হবে’ (সূত্রঃ গণদাবী পত্রিকা)।
শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য থাকাকালীন, বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠা দিবসে (২৪ জানুয়ারি, 1936) একটি মার্চ পাস্টের সময় ছাত্রদের বৃটিশ পতাকা ইউনিয়ন জ্যাককে স্যালুট জানাবার আদেশ দেন। ছাত্রদের মধ্যে প্রবল বিক্ষোভ দেখা দেয়, বিদ্যাসাগর কলেজের একজন ছাত্র স্যালুট জানাতে অস্বীকার করলে তাকে চাবুক মারা হয়। এর প্রতিবাদে যখন বিক্ষুব্ধ ছাত্ররা ধর্মঘট ডাকে, তখন শ্যামাপ্রসাদ দু'জন ছাত্রনেতা ধরিত্রী গাঙ্গুলি এবং উমাপদ মজুমদারকে বহিষ্কারের নোটিশ দেন।(সূত্রঃ দ্য টেলিগ্রাফ)
নরেন্দ্র মোদী আজ যতই অতীতের গর্বের কথা বলুন, এই হচ্ছে তাঁর সংগঠনের লজ্জাজনক অতীত ইতিহাস। এই জাতিগত বিদ্বেষ এবং উগ্র হিন্দুত্ববাদের ধারাই গত আট বছরের বিজেপি জমানারও বৈশিষ্ট্য। কাজেই, জাতীয় পতাকা'র সাথে যদি ভারতবর্ষের স্বাধীনতা সংগ্রাম, বৃটিশের অত্যাচারের বিরুদ্ধে ভারতবাসীর লড়াই, আত্মবলিদানের কোনও সম্পর্ক থেকে থাকে, সেই পতাকাকে সম্মান জানানোর বা দেশবাসীকে সম্মান জানাতে বলার কোনও অধিকার সাভারকর-গোলওয়ালকর-শ্যামাপ্রসাদের উত্তরসূরীদের আছে কি?


প্রধানমন্ত্রী বর্তমানের দায়বদ্ধতার কথা বলছেন, বলছেন ঘরে ঘরে তেরঙা পতাকা তুললে পতাকার সাথে একাত্মতা বাড়বে। কেন্দ্র সরকারের যে কোনও প্রকল্পের মতোই বিজ্ঞাপনী প্রচার-ট্যুইট-মার্কেটিং এর কোনও অভাব নেই এবারও। বিজেপি'র নেতা মন্ত্রীরা কোমর বেঁধে নেমে পড়েছেন দেশবাসীকে দায়িত্ববান নাগরিক করে তোলার কাজে। প্রশ্ন হচ্ছে, ভারতবাসী যে ঘরে ঘরে পতাকা তুলবেন, প্রত্যেক নাগরিকের জন্য সেই ঘরের ব্যবস্থা মোদী সরকার করতে পেরেছে কি? ২০১৯ এর পরিসংখ্যান বলছে, বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম জনসংখ্যার দেশ ভারতে অন্তত ১৮ লক্ষ মানুষের মাথার ওপর কোনও ছাদ নেই। বৈষম্যের বিচারেও ভারত গোটা বিশ্বের দ্বিতীয় স্থানে, যেখানে দেশের মোট আয়ের ৫৫ শতাংশ চলে যাচ্ছে জনসংখ্যার একেবারে ওপর তলার ১০ শতাংশের হাতে। করোনা বিপর্যয়ে যখন চিকিৎসার অভাবে, অক্সিজেনের অভাবে মানুষের শোচনীয় মৃত্যু ঘটছে, দেশে গণচিতা জ্বলছে, পরিকল্পনাহীন লকডাউনে মাইলের পর মাইল হেঁটে বাড়ি ফিরছেন এবং মারা যাচ্ছেন সেইসময়, বেকারত্বের হার যখন পঁয়তাল্লিশ বছরের রেকর্ড ভেঙে দিচ্ছে সেই সময়, আম্বানি আদানি সহ এই ওপরতলার পুঁজিমালিকদের আয় এবং মুনাফা কয়েকশো গুণ বেড়েছে। তার সাথে যুক্ত হয়েছে রান্নার গ্যাস সহ নিত্যপ্রয়োজনীয় সমস্ত জিনিসের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি, ৮০০ টি জীবনদায়ী ওষুধের দাম নতুন করে বাড়িয়েছে মোদী সরকার। সুতরাং, স্বাধীন ভারতবর্ষের পূর্বতন সরকারগুলোর মতোই, বরং আরও তীব্র মাত্রায়, এই সরকারের একমাত্র দায়বদ্ধতা একচেটিয়া পুঁজিমালিকদের প্রতি, দেশের মানুষের টাকায় তৈরি রেল-ব্যাংক-বিমা'র মতো রাষ্ট্রীয় সম্পত্তি তাদের কাছে বেচে দিয়ে সেই বিশ্বস্ততার প্রমাণ রাখছে সরকার। বৃটিশ এর তৈরি রাষ্ট্রদ্রোহ আইন প্রয়োগ করে যে কোনও প্রতিবাদ, বিদ্রোহ, বিরুদ্ধ স্বরকে দমন করছে আইনকানুনের তোয়াক্কা না করে। দেশের 'ঐক্য-সংহতি-বৈচিত্র' মোদী জমানায় কতটা রক্ষিত হচ্ছে তা তো প্রতি মুহূর্তে হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছেন সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মানুষ, প্রান্তিক মানুষ। কাজেই, 'অচ্ছে দিন', 'সবকা বিকাশ' এর প্রতিশ্রুতি প্রহসনে পরিণত হওয়ার পর, রুজিরুটির সমস্যা থেকে মানুষের নজর ঘুরিয়ে দিতে, নিজেদের কলঙ্কিত ইতিহাস চাপা দিতে এবং মানুষের মনে জমে ওঠা প্রবল বিক্ষোভ চাপা দিতে আজ নতুন করে 'দেশপ্রেমিক' সাজার প্রয়োজন পড়েছে। সুতরাং,আপত্তি এই নির্লজ্জ মিথ্যাচারেও। স্বাধীনতার স্বপ্ন বলতে যদি গণমুক্তির স্বপ্ন বুঝি, তার সাথে কোনও সম্পর্ক নেই এই চাপিয়ে দেওয়া দেশভক্তির। যে স্বাধীনতার জন্য রামপ্রসাদ বিসমিল-আসফাকউল্লা কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে লড়েছিলেন, যে স্বাধীনতার লক্ষ্যে নেতাজী তাঁর আজাদ হিন্দ ফৌজে সব ধর্মের সেনার একত্রে খাওয়া চালু করেছিলেন, আখলাক-তবরেজ-পহেলু খান' এর হত্যাকারী বিজেপি সেই স্বাধীনতার স্বপ্নকে মর্যাদা দিতে পারে না।

'হর ঘর তিরঙ্গা'র প্রবক্তাদের এই স্বরূপ চিনে নেওয়া এবং চেনানো, দুটোই আজ সময়ের প্রয়োজন। গরিব মানুষের শ্রম চুরি করে মুনাফার পাহাড় বানানো সরকার, একচেটিয়া পুঁজির পরম বন্ধু সরকার, সাম্প্রদায়িক রাজনীতির কারবারি সরকার এর কাছ থেকে দেশপ্রেম শিখবে না দেশের মানুষ।

0 Comments

Post Comment