পড়শি যদি আমায় ছুঁতো যম যাতনা সকল যেত দূরে: লালন সাঁই

পড়শি যদি আমায় ছুঁতো যম যাতনা সকল যেত দূরে: লালন সাঁই

hhhhhhhhhhhhhh

ঘোড়ার ডিমের গল্প

  • 01 January, 1970
  • 0 Comment(s)
  • 201 view(s)
  • লিখেছেন : দেবাশিস রায়চৌধুরী
কার্তিক মাসের শেষ সপ্তাহ। সকালের বাতাসে হিমের ছোঁয়া, শীতের আগমনী বার্তা। রাস্তার দু’পাশে ধানগাছগুলোতে সোনালি রং লেগেছে, যেন মাটির বুক জুড়ে কেউ সোনার চাদর বিছিয়ে দিয়েছে। এবারের ফলন ভালোই হয়েছ,বেশ খুশি মনে হারান পুকুরের দিকে যাচ্ছিল।

পুকুরপাড়ে গিয়ে সে হতভম্ব হয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল। চোখ কচলালেও দৃশ্য পাল্টালো না। সত্যি! একটা ঘোড়া। সাদা ধবধবে। পুকুরের জল খাচ্ছে। তেলচকচকে শরীরে হাত দিলে পিছলে যাবে।
হারান হাঁ করে তাকিয়ে রইল। এদিকে তো কারও ঘোড়া নেই। তাছাড়া, ঘোড়া তো একা আসে না—তার মালিক নিশ্চয় কোথাও আছে। চারদিকে তাকাল, কাউকে দেখা গেল না। রাস্তায় উঠে এল হন্তদন্ত হয়ে। চারপাশে শুধু  কুয়াশা ভাসছে।
ঘোড়াটাকে আবার ভালো করে লক্ষ্য করল। মাদি ঘোড়া। অনেকক্ষণ তাকিয়ে থাকাতে সে বুঝতে পারল —ঘোড়াটা পোয়াতি! 

ঘোড়াটা জল খেয়ে গ্রামের পুরনো বটগাছতলায় এসে শুয়ে রইল। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে কৌতূহলবশে অথবা মজা দেখতে লোকজন এসে ভিড় জমাল। সবাই বলাবলি করতে থাকল যে এই ঘোড়া কোনও সাধারণ ঘোড়া নয়। মন্দিরের পুরোহিত বলল, "এটা নিশ্চয় উচ্চৈঃশ্রবা ঘোড়া। দেবরাজ ইন্দ্রের বাহন।" মসজিদের ইমাম বললেন, "না, না, তা কেন হবে? এ হল বোররাক।" আশপাশে দাঁড়ানো কয়েকজন নানা রকম সবজি, ফলমূল ছুঁড়ে দিল। কিন্তু ঘোড়া সেদিকে ফিরেও তাকাল না।
কয়েকটা ছেলে দল বেঁধে দৌড়ে কাছের চায়ের দোকানে চলে গেল। সেখান কেউ বিস্কুট কেউ লজেন্স আবার কেউ চিপস কিনল। দাশুর কাছে কাছে পয়সা ছিল না। তার মাথায় দুষ্টু বুদ্ধি খেলে গেল, সে দোকানের উনুনে আঁচ দেওয়ার জন্য যে কয়লার বস্তা আছে তার থেকে কয়েক টুকরো তুলে নিল। 
ছেলের দল ঘোড়ার কাছে ফিরে এসে বিস্কুট, লজেন্স, চিপস সবই দিল।ঘোড়া একবার তাকিয়ে নির্লিপ্তভাবে শুয়ে থাকল। বিচ্ছু দাশু তার হাতের কয়লার টুকরোগুলো ছুঁড়ে মারল। উপস্থিত সকলেই হাঁ হাঁ করে উঠল। দাশুকে বকা দিল। আশ্চর্যজনকভাবে ঘোড়াটা তখন উঠে দাঁড়াল, ফোঁস করে দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে কয়লার টুকরোগুলো চিবোতে থাকল।
এইবার ভিড়ের মধ্যে গুঞ্জন উঠল। ঘোড়া কয়লা খাচ্ছে! সকলে বলাবলি করতে লাগল এমন অনাসৃষ্টি কান্ড তারা জীবনে দেখেনি। পুরোহিত বলল,"সবাই বাড়ি চলে যাও। এ ঘোড়া শয়তানের। এটাকে গ্রাম থেকে তাড়াতে হবে নয়তো গ্রামে ঘোর অমঙ্গল ঘটবে!" ইমামসাহেব এই ব্যাপারে সহমত হলেন। তিনি বললেন," আল্লার গজব নেমে আসবে।"
এইসব কথাবার্তা শোনবার পরে কেউই সেখানে থাকতে উৎসাহী হল না। ঘোড়ার মালিক হয়তো কাছাকাছি থাকলেও  থাকতে পারে সুতরাং এখন যেরকম আছে সেরকম থাকুক। এইখানে বেশিক্ষণ থাকা উচিত নয় এই সিদ্ধান্ত নিয়ে যে যার কাজে চলে গেল। 

সন্ধ্যার দিকে ঘোড়াটা হাঁটতে হাঁটতে বিষ্টুর চায়ের দোকানের সামনে গিয়ে দাঁড়াল। বিষ্টু হ্যাট হ্যাট করল। কিন্তু ঘোড়াটা গেল না। খদ্দেরেরা বলল, "খিদে পেয়েছে মনে হয়। ওকে কিছু খেতে দাও। চলে যাবে।" বিষ্টু একটা গোটা পাউরুটি দিল বটে, কিন্তু সে খেল না। এদিক ওদিক তাকিয়ে উনুনের পাশে রাখা কয়লার বস্তার মধ্যে মুখ ঢুকিয়ে কয়লা খেতে লাগল। বিষ্টু এবং তার খদ্দেররা এতটাই অবাক হয়েছে যে তারা কিছুই বলতে পারল না। কিছুক্ষণ পরে আবার হাঁটতে হাঁটতে বটতলার দিকে চলে গেল। 
পরদিন ভোরে সবার আগে হারান আবার ছুটে এল বটতলায়। বটতলায় পৌঁছে আজও সে গতকালের মত হতভম্ব হয়ে দাঁড়িয়ে থাকল। আজ ঘোড়াটার কোনও চিহ্ন নেই।  ঘাসের ওপর পড়ে আছে এক বিশাল ডিম। সাধারণ কোনও ডিম নয়—তরমুজের চেয়েও বড়, ডিম থেকে হালকা নীল আভা ছড়াচ্ছে। 

এই কথা চাউর হতে বেশি সময় লাগল না। আবার সারা গ্রাম ভেঙ্গে পড়ল বটতলায়, সকলে সবিস্ময়ে তাকিয়ে থাকল ওই ডিমের দিকে। বেশিরভাগ মানুষ বলতে থাকল এটা ওই সাদা ঘোড়াটার ডিম। দু'একজন অবশ্য একটু সংশয় প্রকাশ করল। স্থানীয় স্কুলের বিজ্ঞান শিক্ষক বললেন, "ঘোড়ার ডিম বলে কিছু হয় না।" অন্যরা প্রশ্ন করল, "তাহলে বলুন এটা কিসের ডিম?" 
শিক্ষক বললেন, "এটা যে ডিম তার প্রমাণ কী?"

শোরগোল পঞ্চায়েত অব্দি পৌঁছাল। পঞ্চায়েত প্রধান দলবল নিয়ে এলেন। সকলের সাথে কথা বললেন। তারপর জানালেন, "এখন যেখানে আছে সেখানেই থাকুক। নাড়াচাড়া করার দরকার নেই। ডিম না বোমা কিছুই বোঝা যাচ্ছে না। আমি থানায় খবর দিচ্ছি।" কিছুক্ষণ পর পুলিশ এল। থানা থেকে বাঁশ দিয়ে জায়গাটা ঘিরে দেওয়ার ব্যবস্থা করা হল। পঞ্চায়েত থেকে আলোর ব্যবস্থা করা হল। চব্বিশ ঘন্টা পাহারায় দু'জন সিভিক ভলান্টিয়ার থাকবে এটাও ঠিক হল। 

পরদিন থেকে গ্রামে মেলা বসে গেল। চারপাশের গ্রাম, দূরের শহর থেকে মাঠঘাট ভেঙে দলে দলে লোক আসতে শুরু করল। হাজার হাজার লোকের পায়ের তলায় পিষে গেল গ্রামের বেশির ভাগ পরিপক্ক হয়ে ওঠা ধানগাছগুলো। মাথা চাপড়ানো ছাড়া হারান বা অন্যদের কিছু করার থাকল না। রাস্তার দু'ধারে মিষ্টির দোকান,  পাঁপড়ের দোকান, খেনলার দোকান, নানা ধরনের অস্থায়ী দোকান বসে গেল। শহর থেকে মিডিয়ার লোকজন চলে এল। যেহেতু হারান প্রথম ঘোড়া এবং ডিম দুটোকেই দেখেছিল সেজন্য মিডিয়ার কাছে হারানের গুরুত্ব বেড়ে গেল। যদিও সবাই প্রায় একই প্রশ্ন করছিল, "ঘোড়ার গায়ের রং কেমন ছিল?", "ঘোড়াটা বসে জল খাচ্ছিল নাকি দাঁড়িয়ে জল খাচ্ছিল?","আপনার কী মনে হয় ডিমটাকে সিদ্ধ নাকি অমলেট করে খাওয়া উচিত ?"
প্রশ্নে নাজেহাল হারান বাড়ি ফিরে গেল।

তিনদিন পার হয়ে গেল ডিমটা যেমন ছিল সেই অবস্থাতেই রয়েছে।  প্রতিদিনই ভিড় বাড়ছে। এখন দূরদূরান্ত থেকেও লোক আসা শুরু হয়েছে। গ্রামে ঢোকার মুখে পঞ্চায়েত বাঁশ দিয়ে ঘিরে উচু ব্যারিকেড তৈরি করেছে। গ্রামে ঢোকার জন্য ব্যারিকেডের পাশে গেট তৈরি হয়েছে। গেটের পাশে টিকিট কাউন্টার, জনপ্রতি দশ টাকা টিকিট। হাজার হাজার লোক লাইন দিয়ে টিকিট কাটছে। থানা থেকে অতিরিক্ত পুলিশ এবং পঞ্চায়েতের লোকজন ভিড় সামলাচ্ছে।   
খবরের কাগজ, টিভি, নানা ধরনের হট্টগোলে ঘোড়াটার কথা সবাই ভুলে গেছে। তাকে নিয়ে কোনও রকম আলোচনা হয় না। তবে পরের সপ্তাহে ঘোড়াটা নিজেই আবার আলোচনায় ফিরে এল।

হারানদের গ্রাম থেকে প্রায় ত্রিশ কিলোমিটার দূরের
মফস্বল শহরে হরিপদর বিল্ডার্সের ব্যবসা। বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা নামছে। হরিপদ অফিস ঘরে ধূপ ধুনো দিয়ে বাইরে বালি,স্টোনচিপসের সামনে ধূপ দিতে এল।আবছা আলোতে হরিপদ দেখল একটা সাদা ঘোড়া আপন মনে বালি আর স্টোনচিপস খেয়ে যাচ্ছে। হরিপদ নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারছিল না। খানিকক্ষণ স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে থাকল।  এবার ঘোড়াটা হরিপদকে দেখতে পেল। তবে গুরুত্ব দিল না। বালির মধ্যে মুখ ডুবিয়ে আরও কিছুটা বালি মুখের মধ্যে ঢুকিয়ে চিবোতে চিবোতে ধীরেসুস্থে রাস্তা দিয়ে হেঁটে চলে গেল। হরিপদ মোবাইল অন করে ভিডিও করল বটে, কিন্তু আলো কম থাকার জন্য ভিডিও হল না।  ব্যাপারটা এখানে থেমে থাকল না। হরিপদ হাঁকডাক করে লোক জড়ো করে ফেলল। পাড়ার লোকজন এদিক ওদিক খোঁজাখুঁজি শুরু করলেও ঘোড়াটাকে আর দেখা গেল না। 

অন্যদিকে ঘোড়ার ডিমে চোখে পড়ার মতো কোনও পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে না। শুধু নীলচে আভা সামান্য কমে এসেছে, ভালো করে লক্ষ্য করলে বোঝা যায় ডিমের গায়ে কালচে রং লেগেছে। প্রতিদিন ভিড় বাড়ছে সেই সঙ্গে টিকিট বিক্রিও বেড়ে চলেছে। পঞ্চায়েত থেকে মাইকে ঘোষনা চলছে, "সকলে টিকিট কেটে প্রবেশ করুন। সারিবদ্ধ ও শান্তি শৃঙ্খলা বজায় রেখে অশ্বডিম্ব দর্শন করুন। কেউ ডিমের কাছে যাওয়া বা স্পর্শ করার চেষ্টা করবেন না।"
ঘোড়াটা কিন্তু এই গ্রামের দিকে আর ফিরে আসে নি। তাকে নিয়ে নানান গুজব ছড়াচ্ছে। জনগণের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি হয়েছে। 
বিরোধী দলনেতা বলেছেন এটা সনাতনী পক্ষীরাজ। এবার থেকে যেখানেই দেখা যাবে সেখানেই পুজোপাঠের আয়োজন করা হবে। 

কিছুদিনের মধ্যে ঘোড়াটাকে  আবার দেখা গেল। এবার দিনের বেলায় জেলা শহরে। মিরাজ বিদ্যালয় পরিদর্শকের অফিসে চতুর্থ শ্রেণীর কর্মী। প্রতিদিন সকালে  এসে অফিসের তালা খুলে অফিসের সব চেয়ার টেবিল মুছে, সাহেবের ঘরে এক গ্লাস জল রেখে আসে।  
আজ দরজা খুলে সে চমকে উঠল। ঘরের মাটিতে একটা সাদা ঘোড়া দাঁড়িয়ে আছে। মিরাজ বুঝে উঠতে পারছিল না যে, বাইরে থেকে দরজা বন্ধ, তাহলে ঘোড়া ঘরে ঢুকল কেমন করে? রেকর্ড সেকশনের দিকে তাকিয়ে সে চমকে উঠল। ঘরটা তছনছ হয়ে আছে। কম্পিউটারগুলো ভেঙে চুরমার। বিভিন্ন স্কুলের নথিপত্র, শিক্ষকদের চাকরি,বদলি সংক্রান্ত ফাইলগুলো তখনও ঘোড়াটা চিবিয়ে চিবিয়ে খাচ্ছে। মিরাজ চিৎকার করে আশেপাশের লোকজন জড় করল। 
আর সঙ্গে সঙ্গে ঘোড়াটাও দিব্যি বাইরে বেরিয়ে এল। কেউ তাকে লাঠি দিয়ে পিছন থেকে মারল। ঘোড়াটা একবার ঘুরে তাকাল তারপর রাস্তায় উঠে ছুটতে শুরু করল। অনেক বাইক নিয়ে তার পিছনে ছুটল। কিন্তু অবিশ্বাস্য দ্রুত গতিতে সবাইকে পিছনে ফেলে নিমেষের  মধ্যে কোথায় হারিয়ে গেল! 

এই ঘটনার পর সরকার বেশি কালক্ষেপ না করে  সাংবাদিক সম্মেলন করল। এই সম্মেলনে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী , সমস্ত রাজ্যবাসীর কাছে রহস্যময় ঘোড়া নিয়ে অযথা আতঙ্কিত না হবার আবেদন করলেন। তিনি আরও জানালেন  যে, প্রতিবেশী রাজ্য থেকে চক্রান্ত করে, বিশৃঙ্খলা তৈরীর জন্য এই রাজ্যে ঘোড়া ঢুকিয়ে দেওয়া হয়েছে। সরকার সর্বশক্তি নিয়ে দ্রুত রহস্য সমাধান করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনবে। আগামীকাল প্রাণীসম্পদ উন্নয়ন মন্ত্রী ওই অঞ্চলের বিধায়ককে নিয়ে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করতে যাবেন।"

পরদিন সকাল থেকে হারানদের গ্রামে সাজসাজ রব  পড়ে গেল। কমব্যাট ফোর্স পুরো গ্রাম ঘিরে ফেলল। গ্রামের একমাত্র স্কুল ছুটি দিয়ে দেওয়া হল।পঞ্চায়েত থেকে গ্রামে ঢোকার মুখে গেট এবং টিকিট কাউন্টারের পাশে বড় নোটিশ টাঙিয়ে দেওয়া হল, "আজ 'অশ্বডিম্ব প্রদর্শনী' বন্ধ থাকবে।" মন্ত্রী আসবেন শুনে হারান এবং অনেক কৃষক তাদের পরিশ্রমের পাকা ধান নষ্ট হয়েছে এই কথা মন্ত্রীকে জানাবে ঠিক করল। পঞ্চায়েত প্রধান তাদের বোঝাল এই ভিড়ের মধ্যে মন্ত্রীর সঙ্গে কথা বলা যাবে না। গ্রামের লোকেরা বরং একটা দরখাস্ত লিখে প্রধানের হাতে দিক, সে মন্ত্রীকে দরখাস্ত পৌঁছে দেবে। হারানরা এই প্রস্তাবে খানিকটা নিমরাজি হল, কারণ তারা ভেবে দেখল সত্যি সত্যিই মন্ত্রীর কাছে পৌঁছানো তাদের পক্ষে সম্ভব না। তাই তারা নষ্ট ফসলের ক্ষতিপূরণের আবেদন করে একটা দরখাস্ত প্রধানের হাতে তুলে দিল। 

দুপুরে পাইলটগাড়ির সাইরেনের শব্দ গ্রামকে সচকিত করে বিরাট কনভয় ঢুকল। মন্ত্রী, বিধায়ক, পুলিশকর্তা, অনান্য আধিকারিকরা পঞ্চায়েত অফিসে ঢুকলেন। প্রধান গ্রামবাসীদের দরখাস্তটা মন্ত্রী মহাশয়ের হাতে দিলেন, তিনি সেটা না দেখেই তার সেক্রেটারির হাতে তুলে দিলেন। এরপর সবাই বটতলার দিকে রওনা হল। বটতলায় প্রথম থেকেই ডিমের চারপাশে বাঁশের ব্যারিকেড ছিল। আজ সেই ব্যারিকেডের বেশ খানিকটা আগে পুলিশ ঢাল সহ বৃত্তাকারে আর একটা ব্যারিকেড তৈরি করেছে। গাড়ি থেকে নেমে মন্ত্রী বিধায়ক সকলে গ্রামবাসীদের দিকে হাতজোড় করে পুলিশবৃত্তের মধ্যে ঢুকে পড়লেন।

তারা ব্যারিকেডের বাইরে থেকে ডিমটা কিছুক্ষণ দেখলেন। বিধায়ক, মন্ত্রী, পুলিশকর্তা,প্রধানের জন্য ব্যারিকেডের গেট খুলল। তারা ডিমের কাছে গিয়ে  ঝুঁকে দেখতে থাকলেন। পুলিশকর্তা বিধায়ককে বললেন, "একবার ছুঁয়ে দেখবেন নাকি স্যার?"  বিধায়ক উত্তর দিলেন, "ছুঁয়ে দেখাইতো উচিত।   আমরা জনপ্রতিনিধি, এলাকার মানুষের ভয় ভীতি, কুসংস্কার দূর করা আমাদের দায়িত্ব।" মন্ত্রী মশাই কিছু বলতে যাচ্ছিলেন, "তার আগেই বিধায়ক নিচু হয়ে আঙুল দিয়ে ডিমটাকে আলতো স্পর্শ করলেন। সঙ্গে সঙ্গেই অদ্ভুত কান্ড ঘটল ডিমের ভেতর থেকে ফোয়ারার মত তীব্র বেগে কালো দুর্গন্ধযুক্ত তরল বেরোতে থাকল। সবাই সঙ্গে সঙ্গে সরে আসলেন বটে কিন্তু নিচু হয়ে থাকার জন্য চারজনের মুখে আলকাতারার মত কালো চটচটে তরল লেগে গেল। সকলের মুখের অবস্থা অত্যন্ত হাস্যকর হয়ে পড়ল। গ্রামের মানুষ কেউ কেউ হাততালি দিয়ে উঠল, কেউ কেউ সিটি বাজাল। 

এর মধ্যে মিডিয়া এগিয়ে এল।তাদের মধ্যে একজন বিধায়ককে জিজ্ঞেস করল, "স্যার ওই তরল কি আপনার মুখের ভেতরে ঢুকেছে? ঢুকলে তার স্বাদ কী রকম?" অত্যন্ত রেগে ছিলেন বিধায়ক। এই প্রশ্ন শুনে তেলে বেগুনে জ্বলে উঠে দাঁত কিড়বিড় করে বললেন, " শুয়োরের বাচ্চা ইয়ার্কি মারছো? নিজে চেটে দেখো।" ( শুয়োরের বাচ্চা অংশটি টেলিভিশনে সম্প্রচারের সময় বিপ বিপ শব্দ জুড়ে দেওয়া হয়েছিল।ফলে অনেকে ওটা চার অক্ষর ভেবে নিয়েছিল।) একজন মন্ত্রীকে জিজ্ঞাসা   করল , "স্যার ঘটনাটা কী বুঝলেন?" আর একজন প্রশ্ন করল, "গ্রামের ফসল অর্ধেক নষ্ট হয়ে গেছে। চাষিরা ক্ষতিপূরণ পাবে?"  এইসব প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার মতো অবস্থায় তারা কেউ ছিলেন না। তারা তড়িঘড়ি গাড়িতে উঠে পড়লেন। 

মিডিয়ার লোক হারানকে অবাক হয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে তাকেই জিজ্ঞাসা করল, "আপনি প্রথম দিন থেকে পুরো গল্পের সাক্ষী। দর্শকদের গল্পটা সংক্ষেপে বলবেন কি?"
হারান মুহূর্ত থমকাল তারপর, "গল্প!" বলে ডান হাতের বুড়া আঙুল দেখিয়ে ফিক করে হেসে বলল, "ঘোড়ার ডিম।"

0 Comments

Post Comment