পড়শি যদি আমায় ছুঁতো যম যাতনা সকল যেত দূরে: লালন সাঁই

পড়শি যদি আমায় ছুঁতো যম যাতনা সকল যেত দূরে: লালন সাঁই

hhhhhhhhhhhhhh

কলোনি ডায়েরি

  • 17 April, 2022
  • 0 Comment(s)
  • 425 view(s)
  • লিখেছেন : মধুময় পাল
এই লেখা একটি ডায়েরির কয়েক পৃষ্ঠা৷ ডায়েরির লেখক অতুলকথা বাঙাল৷ কারও কৌতূহল হতে পারে এমন অদ্ভুত নাম কেন? পূর্ববঙ্গের কিশোরগঞ্জে তিনপুরুষের ভিটে থেকে উচ্ছেদ হবার পর নলিনীকুমার বসু ভারতে আশ্রয় নেন৷ বিখ্যাত কোনো নেতা বা গুরুর আশ্রয় নেওয়ার মতো নয় একেবারেই৷ প্রাণ হাতে নিয়ে পালিয়ে শেয়ালদা স্টেশনে লক্ষ দেশভিখারির ল্যাপটালেপটি ভিড়ে নিজেদের কোনোরকমে গুঁজে দেওয়া৷ ‘নিজেদের” মানে নলিনীকুমার, তাঁর স্ত্রী, কন্যা ও নাতি৷ পালানোর সময় নাতির বয়স ছিল চারমাস৷ এই স্টেশনেই দীনভিখারি-অনুষ্ঠানে নামকরণ হয় তার৷ কোটালিপাড়ার ডাকসাইটে ব্রাহ্মণ পরিবারের সন্তান অব্যয়ানন্দ শিশুর নাম রাখেন ‘অতুলকথা’৷ আর নলিনীকুমার নতুন পদবি দেন ‘বাঙাল’৷ ছিলেন “বসু’৷ যার দেশ যায়, তার সব যায়৷ পুরোনো পদবি থাকে কীভাবে? তাছাড়া, এরপর তো সবাই “বাঙাল’ ডাকবে, শোনার অভ্যাস হয়ে যাক শিশু থাকতেই৷ অব্যয়ানন্দও খেদা-খাওয়া৷ তিনি ১৯৫২ সালে নলিনীকুমারের কাছ থেকে দু-টাকার পুরোহিত-প্রণাম আদায় করেন এই নামকরণের জন্য৷ ডায়েরিতেই একথা লিখিত আছে৷ অতুলকথার ডায়েরি তিরিশ পরিচ্ছেদের৷ এখানে তার একটি দেওয়া গেল৷ নামকরণ স্বয়ং অতুলকথার৷

ক্যামোন আছিলেন গনা জামাদার লেনে? ক্যামোন আছিলেন জগু ট্যান্ডাল লেনে? মনে আছে? বর্ষা পড়তে না-পড়তেই পাড়া-কে-পাড়া গলি পুখর নালা নর্দমা একাকার৷ ওই আপনেরা য্যান কী কন, মিলমিশ৷ কী ভাসে? নরক ভাসে৷ মলমূত্রের সোরোত৷ বর্জবাসী সাহার ছুচিবাতিকের উঠানে গু ভাসে৷ তুলসীতলায় ন্যাড় নড়ে৷ আপনের ঘরের সামনে, আমি দেখছি যজ্ঞেশ্বরবাবু, আপনের ঘরের সিঁড়িতে মাইয়ামানষের নুংরা ন্যাকড়া৷ মিলমিশে ভাসে৷ মনে পড়ে? আপনেগো ‘মিলমিশ” শব্দটা খুব সুন্দর৷ কলোনিতে মিলমিশে থাকার বাণী কত দিছেন আপনেরা ৷

নীলসাধু ওরফে সাধুচরণ ঘোষ তক্তপোশের ওপর টানটান বসে৷ হাড় পাঁজর কণ্ঠা চোয়াল করোটির ঘি-চকচকা জীবিত কঙ্কাল যেন৷ পরনে নীল কাপড়৷ পর্দার কাপড়ের মতো মোটা, লুঙ্গির মতো করে পরা৷ ঘরে একটা প্রদীপ জ্বলছে৷ কামাখ্যার তান্ত্রিকের বিধান৷ প্রাণের আলো, যেইটা ঈশ্বর দিছেন, ইলেক্ট্রিকের বাত্তিতে দূষিত হয়৷ আয়ু ক্ষীণ হয়৷ আয়ুরেখা মুছামুছা হয়৷ প্রদীপের আলো রাখো ঘরে৷ সারাদিন সারারাত৷ মরণরে ঢুকতে দিয়ো না দুয়ারে৷ কামাখ্যার তান্ত্রিক, যা বলে নির্ভুল৷ পাথর তার হাতে ভরা যুবতির বুকের মতো নরম লাগে৷ প্রদীপ বসানো পশ্চিমে, পুবমুখো করে৷ নীলসাধু বসে পুবে, পশ্চিমমুখো হয়ে৷ দেওয়ালে গাঁথা বিরাট কুশন৷ নীলসাধু কখনো টানটান বসে, কখনো হেলানে৷ এ সবই তান্ত্রিকের বিধান৷ জন্মমুহূর্ত থেকে প্রাণ পশ্চিমের দিকে হাঁটে৷ যেমন সূর্য৷ সূর্যের পূর্বমুখী যাত্রা হয় অন্ধকারে৷ দিনমান আলোয় যাত্রা পশ্চিমমুখী৷ রাত পার হলে তুমি জেগে উঠবে পূর্বে৷ অন্ধকারে প্রাণ নিজের আলোয় নতুন প্রাণের পথে চলে নিত্যদিন৷ আমরা কেউ বিশ্ববিধানের বিপক্ষে যেতে পারি না৷ গেলে সর্বনাশ৷ সর্বনাশ হাত রাখে বীর্য থেকে পদ্মে৷ তখন তোমার জীবনে যোনি নাই, জন্ম নাই৷ তুমি মৃত৷ প্রদীপে মুখ রেখে পশ্চিমে বসো৷ নীল মানে কী, আকাশ৷ এই আকাশে তুমি আছো৷ তান্ত্রিকের কথা ফ্যালনা নয়৷

আপনেরা কন ক্যামোন আছিলেন৷ নীলসাধু আপনেগো উপকার করছে, না করে নাই? সইত্য করিয়া কইবেন৷ গনা জমাদার লেন ভালো? জগু ট্যান্ডাল লেন ভালো? না আঠাইশঘরের কলোনি ভালো? কন বাণীভূষণবাবু৷

কুশনে নীলসাধুর ছায়া নড়ে৷

তান্ত্রিক বলেছে, এই দেহ মাটির পাত্র৷ মাটি মানে পৃথিবী৷ মাটি জন্ম দেয়. ধারণ করে৷ পৃথিবীর সব প্রাণ মাটির ধারণ৷ তোমার প্রাণের আলো মাটির ধারণ৷ মাটির প্রদীপে সর্বপ্রহর আলো জ্বলবে৷ নীলসাধুর ঘরের প্রদীপ বেশ বড়ো, ভারি, বুক গভীর, সলতে পুরু৷

যজ্ঞেশ্বরবাবু, কী বলেন? আপনে তো উচ্চুশিক্ষিত৷ আঠাইশঘরে আইসা ভালো হইছিল কিনা বলেন? ভুষা মণ্ডলের বাগান কাইট্যা সাফ কইরা আঠাইশঘর যে বানান হইল, আপনেরা আইলেন, সেইটা ভালো কি মন্দ হইল? আপনেরা সকলেই শিক্ষিত৷ কেউ উচ্চু, কেউ নিম্নু৷ বলেন আপনেগো মত৷

বাইরে মেঘের শব্দ৷ জোরালো৷ জানালায় দূরবিদ্যুতের ঝলসানি৷ নীলসাধুর ঘরের ভেতর যেহেতু অন্ধকারের গরিষ্ঠতা, বাইরের আলো দেদার হয়, এবং ঘি-মাখা শরীর ক্ষণে ক্ষণে মুহূর্তের জন্য রুপোলি হয়ে ওঠে৷ ভেজা হাওয়া আসে৷ শেষআশ্বিনের গুমোট গরমে ঠাণ্ডা প্রলেপ লাগে৷ হাওয়ায় প্রদীপের শিখা টলমল করে৷

নীলসাধু ডাকে, লতার মা, সইলতাটা উসকাইয়া দাও৷ আসো৷ হাওয়ায় নিবে নিবে৷ তেলও দিতে হইব৷ আসো৷ শিবহরিবাবু, আপনে বলেন৷ শচীনের গমকলের পাশে জঞ্জালের পাহাড়ের পাশে আপনেগো বস্তি ছিল৷ দুই পায়ে রোগশোক মাইখ্যা ঘরে ঢুকতেন৷ সেইটা ভালো ছিল, না আঠাইশঘর ভালো হইছিল? আপনে শিক্ষিত মানুষ৷ আপনেরা সবাই৷ কেউ উচ্চু, কেউ নিম্নু৷ আমি ল্যাখাপড়া জানি না৷ ভাষা শিখলাম আপনেগো লগে মিইশ্যা৷ জঙ্গল সাফ করতে কত খাটছি৷ তখন জুয়ান ছিলাম৷ ভুষা মণ্ডলের গুন্ডাগো লগে লড়াই দিছি৷ দুই-চারিটার ঠ্যাং ভাঙছি৷ নিজের কান্ধের হাড্ডি ভাঙছে৷ বাণীভূষণবাবু অবইশ্য পরে আইলেন৷ মাইরপিট দ্যাখেন নাই৷ মশালের ছুটাছুটি দেখেন নাই৷ রক্ত দেখেন নাই৷ মজুর লাগাইয়া জমি সাফ করাইলেন৷ জমিদারের নায়েবের বংশ৷ লোক খাটানের পুরানা অভ্যাস৷ আপনেরা গায়েগতরে সুন্দর, খাটনের ক্ষমতা কম৷ কিছুমাত্র মনে কইরেন না৷

বাজের শব্দ কাছাকাছি হচ্ছে৷ হাওয়ায় ঝড়ের টান৷ প্রদীপের শিখা এদিক ওদিক টাল খায়৷

চিৎকার করে নীলসাধু৷ কই গেলা, লতার মা? পোরদিপ নিভলে কি তোমার শান্তি হয়? স্বামী মরলে সুবিদা হয়? ঘরে জুয়ান ঢুকাইতে চাও৷ বুড়ায় তো পারে না!

দ্রুতপায়ে এক নারী ঘরে ঢোকে৷ প্রদীপের সামনে বসে৷ নিচু গলায় বলে, চুপ যান৷ চুপ যান৷ এইসব কথা কন ক্যান? লোকে কী ভাবে? আমারে ডাকেন৷ কইছি তো যখনই দরকার, আমারে ডাকবেন৷ মরণের কথা মুখ আনতে নাই৷ আমি আছি তো৷

সে কই গেল?

ঘরেই আছে৷ যাইব কই? তাড়াতাড়ি চলতে পারে না৷ পায়ের ব্যথাটা বাড়ছে৷

বইস্যা বইস্যা খাইলে ব্যথা আরো বাড়ব৷ গতর নাড়াইতে লাগে৷ নিজের জামাকাপড় নিজের হাতে কচলাইয়া ধুইতে হয়৷ ছাদে মেলতে হয়৷ তিনি তো সেই কামটুকুও করেন না৷ সুখের কপাল বুকের ব্যথা ডাকে৷

আপনে চুপ যান৷ সে শুনলে কষ্ট পাইব৷ এতকাল তো একাহাতে সংসারটারে টানছে৷ আপনের মতো মানুষরে সামলাইছে৷

আসলে তুমিই হইলা নষ্টের গোড়া৷ তারে কাম করতে দাও না৷ রানির মতো বসাইয়া রাখো৷ অনেক কপাল কইরা তোমার মতো একটা বইন পাইছিল সে৷

সেই নারী, যার বয়স পঁচিশ কি বড়োজোর তিরিশ হবে, শরীরের বাঁধন বয়সকে দূরে রাখে, প্রদীপের শিখা উসকে দিয়ে জানালা বন্ধ করে৷ বলে, দরজাটা বাইরে থেইকা বন্ধ করি৷ আমারে ডাইকেন৷ পাশের ঘরে আছি৷ একটা কথা, ঘি আর এক হাঁড়ি আছে৷ সাতদিন চলব৷ যোগীঠাকুররে খবর দেন তিন হাঁড়ি যেন আনে৷

নারী চৌকাঠের ওপারে গিয়ে দরজার পাল্লা টানে৷

নীলসাধু বলে, খাড়াও৷ এনারা হইলেন আঠাইশঘরের নামী মানুষ৷ সবাই উচ্চুশিক্ষিত৷ কেউ কেউ নিম্নু৷ নমস্কার করো৷ সেই কলোনি পত্তনের সময় থিকা একলগে ছিলাম৷ চল্লিশ বছর হইব৷

নারী নমস্কার করে দরজা টেনে চলে যায়৷

শিবহরিবাবু, চল্লিশ বছর হইল কি? দিন যায় না জল যায়৷ লতার মায়ের লগে আছি পাচ্চল্লিশ বছরের বেশি৷ তখন সে ষোলো বছরের মাইয়া৷ ময়মনসিংয়ে খেইলা বেড়ায়৷ বিজয়দা কইল, বিয়া করবি নাকি? তর বাপেরে কই৷ আমাগো হরেনের ভাইস্তি৷ বাপের ব্যবসা আছে৷ সাজাইয়া দিব মাইয়ারে৷ তুইও পাবি৷ হরেনে কইছে৷ ঢাকা থেইকা বিয়া করতে গেলাম৷ মাইয়ার নাম ধরনা৷ প্রথমে সে লতার মা হইল৷ তখন পাকিস্তানে৷ পরে রতনের মা৷ তখন ইন্ডিয়ার বনগার ক্যাম্পে৷ পরের বছর বিকাশ হইল৷ তখন আমরা গোলামের বস্তি দখল কইরা আছি৷ বিকাশ মারা গেল পুখরে ডুইবা৷ তখন মাত্র এক বছর৷ সেই শোক লতার মায়ে কোনোদিন কাটাইয়া উঠতে পারে নাই৷ এরপর আঠাইশঘর৷ সোরোতের মতো দিন যায়৷ হিসাব কি ঠিক বললাম? আঠাইশঘরে মাথা গুজনের জয়গা বানানোর কয়েক বছর পর বিয়া দেই লতারে৷ যদিও বিয়ার বয়স হয় নাই তখনও তার৷ কয়েকটা পোলা পিছনে লাগছিল৷ আমার মাইয়াও সুবিদার নয়৷ ছেমরির ছোকছোকানি পোলাগো আসকারা দেয়৷ আপনেরা জানছেন রতনের বিয়া টিকে নাই৷ তার স্বভাবও সুবিদার নয়৷ কাজকামে মতি বসাইতে বিয়া দিলাম৷ বুঝি নাই যে সে নষ্টপাড়ার এক ছেরির লগে আটকাইছে৷ লতার মায়ে আমার কিছু কয় নাই৷ সে সব জানত৷ চুপ থাকছে৷ স্বামীর কাছে গোপন রাখছে৷ আপনেরা জানছেন তবু কই, এই সেই মাইয়া৷ নাম নিশা৷ রতনের বউ হইয়া আসছিল৷ এখন আমার ছোটো বউ৷ বড়ো সুন্দর৷ ঠ্যাটা না৷ মাগ্গভরা গোসা নাই৷ সবার খেয়াল রাখে৷ আমি যে বাইচ্যা আছি তা এই নিশার জইন্য৷ যোগীঠাকুরের ঘিয়ের খোজ তো সে-ই আনল৷ এই বিয়া লইয়া আপনেরা ঘরে বাইরে খুশিমতো তামাশা করছেন৷ কে যেন গান বানাইছিল ‘পোলার জইন্য বউ আনে ঢাক ঢোল দিয়া/পোলায় যখন গোসা করে নিজেই করে বিয়া৷/ হাটু কাপে বুড়াসাধুর দুই পা চলিতে/ রসে ভরা টাকলা বুড়া হাসে ফোকলা মাড়িতে৷” বলেন, গানটা আপনেরা গাইছেন কিনা৷ আমি তখন জবাব দেই নাই৷ এখন বলি, অনেক ঘর দেইখা বিচার কইরা নিশারে পছন্দ করছিলাম রতনের জইন্য৷ তখন আঠাইশঘরে মিউনিসিপালটির জলের কল বসছে৷ কত চিঠি ল্যাখাইছি শিক্ষিত লোকেরে ধইরা৷ নিজে দৌড়াদৌড়ি করছি৷ দল বাইন্ধা অফিসে গেছি৷ কমনিস্টিগো লগে আমাগো ভাব-ভালোবাসা হইছে বইলা কংগ্রেসিরা কাগজপত্তর ফালাইয়া দিছে৷ শেষপর্যন্ত কলোনিতে জল আইনা ছাড়ছি৷ রতনের লেইগ্যা সুন্দরী নিশারেও আনছি৷ বিয়ার সাতদিন যাইতে না-যাইতে রতনে নিশা সম্পর্কে উলটাপালটা কয়৷ নিশা ভুষাকালা৷ হাবা ল্যাবা৷ সারা শরীরে প্যাচড়া৷ রাত ভইরা চুলকায়৷ নিশা শুইতে পারে না৷ এইটা ঠিক নিশার গায়ের রং চাপা৷ কিন্তু ভালো শোয়৷ রতনের প্যাকনা বুঝলাম পরে৷ সে আগে দুই-চাইরাটা মাইয়ার লগে ফষ্টিনষ্টি করছে৷ মাইরগুতাও খাইছে৷ নিশারে বিয়া করার পরে তার পিছে গুন্ডা লাগাইছে কোনো বাজারি ছেরি৷ ভাদাইম্মাটা পলাইল৷ রিফুজি বইলা এমনিতেই আমাগো ঘিন্না করে৷ পুলিশে জানাইলে তারা আমারে হাজতের ভয় দেখায়৷ নিশারে পরিস্থিতি কইলাম৷ সে বুদ্ধিমতী৷ বলল, আমার আপত্তি নাই৷ আপনে যদি গোরহন করেন, আমি আছি৷ সমইস্যাটা বুঝছেন, বাণীভূষণবাবু৷ আপনেরা টিটকারি দিছেন, টিপ্পনি কাটছেন পোচুর৷ নিশার কথা ভাবেন নাই৷

কুশনে হেলান দিয়ে নীলসাধু দম নেয়৷ জানালার দিকে মুখ করে বলে, আমাগো চা দিবা, নিশা৷ চাইর কাপ৷ কারো স্যাকারিন লাগে?

বাইরে থেকে চিৎকার ভেসে আসে, তরে কতবার কইছি, আমারে না বইলা দিনে ওই ঘরে যাবি না, তর কানে ঢোকে না আবাগি, বাইরের লোক দেইখা তর চুদুরবুদুর বাড়ছে, একদিন ঠ্যাং ধইরা ফাইড়া ফালামু, বুঝবি সুড়সুড়ানির মজা৷ খেলনা বন্দুকের মতো ক্যারক্যার আওয়াজে একনিশ্বাসে বলে এক নারীকণ্ঠ৷

নীলসাধু বলে, বড়ো বউ৷ লতার মা৷ মুখ না তো বিরটিশ কামান৷ আগুনের গোলা ছোড়ে৷ বাদ দ্যান৷ আপনেগো ক্যান আইজ আমার বাড়িতে আইতে কইছি সেইটা বলি৷ আইজ আঠাইশঘর কলোনির পোরতিষ্ঠার দিন৷ এই দিনে কলোনির খুটি পুতছিল রামদাস দত্ত৷ কংগ্রেস নেতা৷ তখন আমরা কংগ্রেসের লগে৷ কমনিস্টি ছিল দুই-চাইরটা৷ কোনো কামে লাগে না৷ রামদাসরে লোকে পিছনে কইত রামবাশ৷ গরমেন্টের লগে কথা কইল সে৷ ভুষা ঘোষের বাগান দখল করাইল৷ অরে যে রামবাশ কয়, খামকা না৷ নিজের জমি বাচাইতে ভুষা ঘোষের হোগায় বাশ দিল৷ হা হা হা হা৷ তখন আপনেরা হয় পাকিস্তানে, নয় গনা জমাদারে বা জগু ট্যান্ডালে থাকেন৷ কোন সালে য্যান আইলেন৷ হ, চৌষট্টিতে৷ কী রায়টটাই না হইছিল সেইবার৷ কাইটা কুচিকুচি করছে আমাগো৷ কর্মকারবাবু কন, ওই রায়টেই আমরা বুঝতে পারি, এই দেশ আর আমাগো না৷

দরজার একটা পাল্লা খুলে যায়৷ হাওয়ায়৷ উঠোনে বৃষ্টির শব্দ৷ কোনো ঘরে ঘণ্টা বাজে৷ পুজো হচ্ছে বোধহয়৷ গৃহদেবতার৷

কর্মকারেই আপনেগো খবর দিছে৷ জায়গাটা ভালো না৷ এমনিতে নুংরা৷ চাইরদিকে জঞ্জাল৷ তার উপরিতে গুণ্ডা-বদমাইশের পাড়া৷ ঘরে মাইয়া থাকলে খুব উৎপাত৷ সাতচল্লিশের পর পাকিস্তানেও এইরকম হইছিল৷ আমাগো স্বাধীনতাটা গুণ্ডা-বদমাইশগো রাজত্ব বসাইল৷ আমি আপনেগো ডাকলাম৷ ডাকছি না কি বলেন? জমি দিলাম৷ দিছি না কি বলেন? রিফুজি সিলিপও ছিল না৷ তবু জমি পাইছেন৷ ঘরের সামনে কল পাইছেন৷ ঘর বানানোর টাকা অল্প হইলেও পাইছেন৷ আর, সেই আপনেরা আমার লগে একটা কথা না কইয়া বাড়ি বেইচা চইলা গেলেন৷ কইবেন, বেচি নাই, ভাড়া বসাইছি৷ নগদে দশ লাখ টাকা নিয়া ভাড়া বসাইছেন? চালাকি কইরেন না৷ আমারে চদু ভাইবেন না৷ আপনেরা নিজেগো শিক্ষিত কন! কলোনির ক্ষীর খাইলেন৷ পোলামাইয়াগো পোতিষ্ঠিত করলেন৷ জমির দাম চড়তেই বেইচা পলাইলেন৷ হা হা হা হা৷

শেষের কথাগুলো ক্রমে চিৎকার হয়ে ওঠে৷ চিৎকার উঠোনে বৃষ্টির মধ্যে আছড়ে পড়ে৷ নীলসাধু কাশিতে আক্রান্ত হয়৷ হাড্ডিসার বুকে হাত চাপা দিয়ে কাশির দমক সামলায়৷ কফের ডেলা কণ্ঠনালীতে ঘরঘর করে৷ ছুটে আসে নিশা৷ বুকে হাত ঘষে দিতে দিতে বলে, ক্যান যে এমুন করেন? ক্যান যে এত জোরে কথা বলেন? কত কইরা কই, সাবধানে চলেন৷ শরীর সারুক, তারপর আগের মতো তেজে চলবেন৷ যোগীঠাকুর কী বইলা গেছে আপনারে৷ শরীর হইল মাটির পাত্র৷ মাটির পাত্র জোড়হাতে রাখতে হয়৷ পইড়া গেলে খানখান৷ ক্যান যে শোনেন না৷ চিন্তা কী? আমি তো আছি৷ একটু ঘুইরা বসেন৷ পিঠে ঘি মাখাই৷

নিশা ঘিয়ের হাঁড়ির ঢাকনা সরায়৷ এক খাবলা ঘি বের করে৷ নীলসাধুর পিঠে মাখায়৷ ঘরের ভেতর একটা পচা আমিষ গন্ধ আগেই ছিল৷ সেটা উৎকট হয়৷ ঘি মাখাতে মাখাতে নিশা বলে, যোগীঠাকুররে মনে কইরা কইবেন৷ এইবার তিন হাড়ি য্যান আনে৷ সামনে শীত৷ কবে যেন আসবেন বলছেন?

নিশা, যোগীঠাকুররে তোমার ভালো লাগে? পছন্দ হয়?

কী যে কন৷ যোগীমানুষ৷ ভক্তির মানুষ৷

ছিপছিপা শরীর৷ শরীর না তো পাথরের দেহ৷ টানটান খাড়ায় যখন বুঝা যায় কী মজবুত৷ এমুন দেহের কাছেই তো মাইয়ামানুষ শরীর পাইতা দেয়৷ তারে ভালোবাসো?

কী যে কন? তেনারে ঠাকুর মানি৷

আমারে কইতে পারো৷ রাগ করুম না৷ তোমারে তো কিছুই দিতে পারি নাই৷ আমার লোভ তোমারে রোজ ঠকায়৷

চুপ কইরা বইসা থাকেন৷ আমি যাই৷

নিশা, আমার কষ্ট পাওয়াই উচিত৷ তোমারে কষ্ট দিছি অনেক৷ যদি যোগীঠাকুরে চায়. তারে দিতে পারো৷ দরজা জানালা খুইলা দাও৷ ঘিয়ের গন্ধে এনাগো বমি-বমি ভাব হইতে পারে৷

জানালা দরজা খুলে চলে যায় নিশা৷ বৃষ্টি ধরেছে৷ ঝোড়া হাওয়াটা নেই৷

নীলসাধু বলে, আমারে খুব ভালোবাসে৷ বুঝদার৷ কোনো সময় রাগ করে না৷ টানের এই ওষুধ সে-ই জোগাড় করছে৷ লতার মার হাতে থাকলে কবে মইরা যাইতাম৷ নিশা, চায়ের লগে এনাদের ভাজাভুজি কিছু দিয়ো৷ পূজা-কাটাইল্যা দিনে আইছেন৷ যজ্ঞেশ্বরবাবু, বাড়ি বেচবেন বইলা যে মনস্থ করছেন, সেইটা আমারে আগে কইতে পারতেন৷ যা দাম পাইছেন, তার চেয়ে বেশি পাইতেন৷ একলাখ বেশি তো হইতই৷ লতার মায়েরেও কইতে পারতেন৷ তারে তো আপনে মন দিয়া দেখতেন৷ মোটাপুষ্ট গোলপানা মাইয়ামানুষ আপনের পছন্দ, আমি জানি৷ বাণীভূষণবাবু যে আঠাইশ ঘরে থাকবেন না সেইটা চাইর-পাচ বছর আগেই আন্দাজ করছি৷ পোলা ডাক্তার হইতাছে৷ মাইয়া উচ্চশিক্ষা৷ কলোনির মাইনষের লগে আগের মতো মিলমিশ নাই৷ আঠাইশঘরে আপনেরে আর যে মানায় না, সেইটা নিজেই বুঝাইয়া দিতাছিলেন৷ কিন্তু এইটা বুঝি নাই যে একটা মাউড়ার কাছে বাড়ি বেচবেন৷ আপনে উচ্চশিক্ষিত৷ বলেন তো, খেদা খাইয়া যখন গুষ্টিসুদ্ধা এই বালোয় আইলেন, কোনো মাউড়ায় আপনেগো থাকতে দিছিল? গজু ট্যান্ডাল লেনে যে বস্তিতে ছিলেন, লেইটা এক বাঙালির৷ এই জমিও এক বাঙালির বাগান৷ আপনে কোন বুদ্ধিতে মাউড়ারে বাড়ি বেইচা কলোনির সর্বনাশ করলেন? আমাদের কষ্টের বাড়িঘর সে বুঝবে কী? আমাগো মাছ-মাংস খাওয়া নিয়া অরা মস্করা মাড়ায়৷ অগো রুচির লগে আমাগো মিলে না৷ তারা নিজেগো বেরাদরির লোক ছাড়া অন্য কারেও বাড়ি বেচে না৷ নিজেগো থাকনের ঘরবাড়ি বেচে না৷ কয়টা টাকা বেশি পাইবেন বইলা অগো হাতে তুইলা দিলেন? নিশারে জিগান, সে বইলা দিব তারা কেমন নিজেগো দল পাকাইতাছে৷ সে খবরাখবর রাখে৷ তারে বাইরনের পারমিশন দিছি৷

তরে বারবার কইছি, আমারে জিগাইয়া তারে খাইতে দিবি, তুই কি তারে মারতে চাস, সেইদিনের মাইয়া এত জিদ কীসের, একজনের লগে থাকতে আইলি, আরেকজনের লগে থাকস, ছি ছি, ঠাকুরে তরে নেয় না কেন, বাজামাগির রসে সংসার ভাসে৷ খেলনা বন্দুকের মতো ক্যারক্যার আওয়াজে এক নিশ্বাসে বলে যায় এক মহিলাকণ্ঠ৷

আস্তে কন৷ তারে কষ্ট দ্যান কেন? নিশার গলা৷

দরজার দিকে মুখ করে গর্জন করে ওঠে নীলসাধু, লতার মা! অরে গাইল দিলে তোমারে পিষা ফেলুম৷

নীলসাধুর গলায় পাঁজরে ঝুলে থাকা তাগা তাবিজ মাদুলি রুদ্রাক্ষ হাড়ে লেগে বেজে ওঠে৷

প্রদীপের দিকে তাকিয়ে বলে, হিন্সা৷ হিন্সার শরীর বড়ো বউটার৷ মায়ে-পুতে চায় আমি য্যান এখনই মইরা যাই৷ বাদ দ্যান৷ আইজের দিনটা ঐতিহাসিক৷ চল্লিশ বছর আগে এই দিনে আঠাইশঘর বসল৷ মানে পোরতিষ্ঠা হইল৷ আমি তখনও জুয়ান৷ কোনো কামে পিছ নাই৷ তিন কোপে বাশ কাটি৷ সরসরাইয়া নাইকেল গাছে উঠি৷ এক ডুবে পুখর পার৷ তো রামবাশে আমারে কইল, শোন সাধু, একটা সভা করন লাগে৷ সামনের বিস্যুতবার শুভদিন৷ ঠিক করছি বামুন দিয়া পূজা করামু৷ বিকালে একটা কংগ্রেস ন্যাতা আইনা সভা করুম৷ দশ-বিশটা লোক জুটাইলেই হইব৷ তখন তো কংগ্রেসের সরকার৷ কমনিস্টি আছে দুই-চাইরখান৷ কোনো কামে লাগে না৷ খালি কয়, দিতে হবে, দিতে হবে৷ বিকালে একটা মন্ত্রী আইল গাড়ি কইরা৷ লগে দুইটা গুণ্ডামতন৷ মন্ত্রীটার প্যাট কী বড়ো কী বড়ো, ভরা পোয়াতির প্যাটের মতো ঝুইলা আছে৷ হাটলেই দোলে৷ গাড্ডাগুড্ডা বাচাইয়া মন্ত্রীটা মঞ্চের সামনে খাড়াইয়া ভাষণ দিল৷ মঞ্চে উঠে নাই, ভাইঙা পড়ে যদি৷ সে কয় কিনা, আমরা ইংরাজের সঙ্গে যুদ্ধ করছি, রক্ত দিছি, প্রাণ দিছি৷ দেশ স্বাধীন হইছে৷ আমার হাসি পায়৷ হাসি নাই৷ উজবুকে কয় কী? আরে দ্যাশটা টুকরা হইল, মানুষে খ্যাদা খাইল, মারদাঙ্গা হইল, পলাইয়া বাচল লাখে লাখে, তবে দ্যাশ স্বাধীন হইল৷ কত কোটি লোকের দ্যাশ গেল৷ রামবাশে আমার কান্ধে চাপ দেয়৷ ভরাপোয়াতি মন্ত্রীটা গাড়িতে উঠনের আগে দুই প্যাকেট মিষ্টি চাইয়া নিল৷

কথা আস্তে কন৷ আবার কাশ উঠব৷ টান উঠব৷ নিশার গলা৷

নীলসাধু বলে যায়, মন্ত্রীরে আমি কই, দ্যাশ তো আমাগো গ্যাছেই, এইখানে ঘর বানাতে হবে৷ টাকাপয়সা লাগে৷ হোগলাপাতার দরমা কিনতেও টাকা লাগে৷ মন্ত্রী হাসে৷ য্যান দাতের মাজনের ছবি৷ আপনেরা তখন হয় পাকিস্তানে, নয় ক্যাম্পে বা বস্তিতে৷ আপনেরা যখন আসলেন, তখন আঠাইশঘর খুলনা বরিশাল কুমিল্লা চানপুর নোয়াখালি ফরিদপুরে ভইরা গ্যাছে৷ সেইসব দিনের কথা মনে পড়ে, কত খাটনি দিয়া, ঘাম দিয়া, রক্ত দিয়া এই দ্যাশ বানানো হইল৷

নীলসাধু থামে৷ কিছুক্ষণ চুপ থাকে৷ কান পেতে কিছু শোনে৷ জানালার দিকে তাকায়৷ বলে, নিশা, শুনতে পাও৷ জগন্নাথ আসছে৷ বাণীভূষণবাবু, সেই জগন্নাথ৷ জ্ঞানের কথা কইত বইলা আমরা অরে ডাকতাম ‘পোপেচার জগন্নাথ”৷ আপনেও ডাকছেন৷ তখনও মোয়া বেচত৷ এখনও বেচে৷ আমরা অরে লইয়া হাসাহাসি করতাম৷ অর বউরে ধইরা লইয়া গেল আনসাররা৷ সে নাকি সোনা চুরি করছে৷ দেশের সম্পদ চুরি করছে৷ আরে, তার যে দ্যাশটাই চুরি হইয়া গেল৷ তার ঘরবাড়িসংসার সব গেল৷ আরে গুয়েরপোক, তার জীবনটাই যে লুটমার হইয়া গেল৷ পরনের একখান চুড়ি, গলার পাতলা হার কি কানের দুলে কত সোনা হয়? জগন্নাথ বউরে ফেরত পায় নাই৷ আমরা হাসাহাসি করছি৷ নিশা, চাইরখান মুড়ির মোয়া রাইখা দাও৷ চিড়ার মোয়া আর দাতে কাটতে পারি না৷ কেউ কেউ কয় জগন্নাথ মইরা গেছে৷ আমি বিশ্বাস যাই নাই৷

কথা আস্তে কন৷ কাশ উঠব৷ টান উঠব৷ জল খাইবেন৷ যোগীঠাকুরে কী কইছে? নিশার গলা৷

ছোটোবউ, যোগীঠাকুররে তোমার পছন্দ? আমারে বলতে পারো৷ কষ্ট পামু না৷ চা হইল? ভাজাভুজি কিছু করলা? পূজা-কাটাইল্যার দিনে এনারা আসছেন৷ তাছাড়াও, আইজ ঐতিহাসিক দিন৷ এইদিনে আঠাইশঘর কলোনি বসছিল৷ তুমি তখন হও নাই, ছোটোবউ৷ পোরথম ঘর হয় আমার৷ এই সেই ঘর৷ তবে সেই দরমার বেড়া আর টিনের চাল নাই৷ পাকা দালান হইছে৷ দোতলা হইছে৷ আগে কুয়ার পায়খানা ছিল৷ দরজায়, চালে, গাছের ডালে জোক৷ দুয়ারে শিয়াল৷ চালের ফাক দিয়া সাপ আসে ঘরে৷ এই সবের মধ্যে বসবাস করছি৷ আস্তে ধীরে সব ঘরই পাকা হইল৷ আঠাইশঘরে চাকরির লোক খুব কম ছিল৷ বেশিরভাগ সব্জিওলা, ফেরিওলা, দিনমজুর৷ রিক্সাওলাও ছিল৷ তাই ইট-সিমেন্টের গাথনি হইছে দেরিতে৷ আপনেরা যখন আসলেন, তখন চিটাগাং, নেত্রকোণা, রংপুর, বিক্রমপুরে ভইরা গেছে৷ আপনেরা চইলাও গেলেন৷ পোপেচার যায় নাই৷

নীলসাধু জলের পাত্র টেনে নেয়৷ পাশে রাখা গ্লাসে ঢালে৷ নিশা, আমি জল খাই৷ জল খাবার সময় তার কণ্ঠা ওঠে নামে৷ ঘি-মাখানো বুকের হাড়ে প্রদীপের আলো কাঁপে৷ জল খাওয়া শেষ করে পাশে রাখা গামছায় মুখ মোছে৷ বলে, আপনেরা গেলেন৷ আমারে “চোর’ বইলা গেলেন৷ আমি জমি চুরি করছি৷ ঠিক৷ একত্রিশঘররে আমি আঠাইশঘর বানাইছি৷ তিনটা প্লট আমার জমিতে৷ কলোনি কমিটিতে আমার লোক বেশি ছিল৷ সরকারি লোকেরে ঘুষ দিছি৷ স্বাধীনতা আমারে চুরি শিখাইছে৷ নেহরু-প্যাটেলরা আমারে চোর বানাইছে৷ বেরিস্টার জহর বিশ্বাসের কথা মনে পড়ে৷ উচা লম্বা৷ কথা কয় চ্যাটাং চ্যাটাং৷ সে নমশূদ্র বইলা ন্যাতা ধইরা জমি পাইল৷ পাওনের কথা না৷ সে রিফুজি না৷ পুখরে-খাওয়া জমি দেওয়া হইল তারা পালেরে৷ অর্ধেক জমি পুখরে৷ তারা পালের ভালো জমি পাইছে জহরে৷ দমকলের ড্রাইভার বেরিস্টার বিশ্বাস পোরথম জমি বেচল৷ মাগনায় পাওয়া জমি যারা লুকাইয়া বেচে, তারা চোর৷ জহর চোর৷ আপনেরাও চোর৷ কিছুমাত্র মনে কইরেন না৷ পূজা-কাটাইল্যার দিন৷ আজি ঐতিহাসিক দিন৷ নিশা, চা হইল? ভাজাভুজি হইল?

আঠাশঘরের কলোনিতে কয়েক বছর ভাড়া ছিলাম৷ সেইসময় নীলসাধু ওরফে সাধুচরণ ঘোষের সঙ্গে পরিচয় হয়৷ তাঁর ঘরে গিয়েছি বহুবার৷ কথা শুনেছি অনেক৷ কলোনির অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা তিনি৷ আমাকে একটা খাতা দেন৷ সেখানে কয়েক পৃষ্ঠা মুদির হিসাব ছিল৷ চালের সের যখন দেড়টাকা-দুটাকা, তেলের সের যখন পাঁচটাকা, সেই সময়ের খাতা৷ কয়েক পৃষ্ঠা নিজের আর কলোনির কথা৷ ছাড়া-ছাড়া দু-তিন লাইনে৷ যেমন, ষষ্ঠী সরকার ও যজ্ঞেশ্বর সাহা আমার চুরি ধরিতে দল পাকাইতেছে৷

রতনে কামটা ঠিক করে নাই৷

বাণীভূষণ দেমাকি৷ কলোনিতে সে যেন দয়া করিয়া আছে৷

তারা পালকে ঠকানো হইল৷

জহর জমি বেচিবে৷

নিশার সাখে আমার সম্পর্ক লইয়া টিটকারি মারে৷ নিজেরা পাইলে ছাড়িবে না, ভারও নিবে না৷

যাহারা আমাকে বলে, চোর, তাহারা নিজেরা কী?

নীলসাধুর ছোটোবউকে দেখেছি৷ বড়োবউয়ের কথা শুনেছি৷ নীলসাধুকে নিয়ে কিছু ঘটনা আছে, রটনা আছে৷ অনেকটাই শুনেছি৷ এসবের ভিত্তিতে লিখলাম৷ পরে জানলাম, ছোটোবউ নিশা নিতাইমুদির বাইকে চেপে পালিয়েছে৷ সে-বিষয়ে লিখিনি৷ পরে লেখবার ইচ্ছে আছে৷ আঠাশঘরের কলোনি এখন খাটাশঘরের কলোনি, স্থানীয় মানুষ বলে৷

ইতি অতুলকথা বাঙাল

0 Comments

Post Comment