পড়শি যদি আমায় ছুঁতো যম যাতনা সকল যেত দূরে: লালন সাঁই

পড়শি যদি আমায় ছুঁতো যম যাতনা সকল যেত দূরে: লালন সাঁই

hhhhhhhhhhhhhh

মুম্বাই, কিয়ারোস্তোমি ও কিছু ‘দিমাগি’ ছেলেমেয়ে

  • 01 January, 1970
  • 0 Comment(s)
  • 209 view(s)
  • লিখেছেন : সোমনাথ গুহ
সাত-আট বছরের দুই বন্ধু, আহমদ এবং নেমাতজাদে, ক্লাসে পাশাপাশি বসে। দ্বিতীয়জনের হোমওয়ার্কের খাতা প্রথমজন ভুল করে বাড়ি নিয়ে য্যয়। স্কুলের শিক্ষক নেমাতজাদেকে জানিয়ে দিয়েছে পরের দিন খাতা জমা না দিতে পারলে তাকে বহিষ্কার করা হবে। বাড়ি গিয়ে আহমদ যখন আবিষ্কার করে যে বন্ধুর খাতা তার ব্যাগে ঢুকে গেছে তখন সে সিদ্ধান্ত নেয় যে ভাবেই হোক বন্ধুর গ্রামের বাড়িতে সেটা পৌঁছে দিতে হবে। আহমদ কি পারবে তার কাছে সে খাতা পৌঁছে দিতে?

বর্ষণসিক্ত এক অলস সকালে মুম্বাইয়ের সমুদ্রতটের পাশ্ববর্তি একটি ঘরে বসে যখন সারা দিনটা কী ভাবে কাটাব ভেবে উতলা হয়ে উঠেছি, তখন মোবাইলে আচমকা একটা পোস্ট ভেসে এল। ‘চিত্রনগরি সিনেফাইলস’ নামে একটি সংগঠন সান্তাক্রুজ অঞ্চলে একটি সিনেমা শো-য়ের আয়োজন করেছে, যাঁরা ইচ্ছুক তাঁদের একটি নম্বরে যোগাযোগ করতে বলা হয়েছে। স্বয়ং আব্বাস কিয়ারোস্তোমির ছবি, বিশ্ববন্দিত পরিচালক, ইরানিয়ান ছবির এক প্রবাদপ্রতিম পুরোধা। যে ছবিটি দেখান হচ্ছে সেটাও ততধিক বিখ্যাত, তাঁর ‘কোকের ত্রয়ী’র প্রথম ছবি, ‘হোয়ার ইজ দ্য ফ্রেন্ড’স হোম’। উৎসাহটা আরও বেড়ে গেল কারণ এই ত্রয়ীর পরের দুটি ছবি (এন্ড লাইফ গোজ অন এবং থ্রু দ্য অলিভ ট্রিজ) দেখা, কিন্তু প্রথমটি না দেখার কারণে বৃত্তটা সম্পূর্ণ হচ্ছিল না।

মুম্বাই শহরটি স্বল্পপরিচিত, ঘোরাঘুরি দুতিনটে জায়গার মধ্যে সীমাবদ্ধ। মহানগরের অন্যান্য জায়গা বা রেল স্টেশনের মতো সান্তক্রুজ অঞ্চলের পূর্ব এবং পশ্চিম আছে, যেটা কয়েকবার এখানে আসা সত্ত্বেও এখনো বুঝে উঠতে পারিনি। এই বিভ্রান্তির মধ্যে কিছুক্ষণ চক্কর কাটার পরে প্রায় দশ মিনিট দেরিতে গন্তব্যস্থলে পৌঁছালাম। আশেপাশে হল বা অডিটোরিয়াম জাতীয় কিছুই নেই, প্রায় সবই ছোট বাড়ি বা চওল, মুম্বাইয়ে নিম্নবিত্তদের ঘর যেভাবে বলা হয়ে থাকে। অতঃপর আরও ফোনাফুনি, অবশেষে একটি মেয়ে এসে পথ দেখালেন। পথ বলতে গত শতাব্দীর ভিন্টেজ মার্কা একটি বাঁকান লোহার সিঁড়ি, যার ভিজে এক-ফুটি পাদানিতে যখন তখন পা হড়কানোর ভয়। একটি ঘুপচি ঘর, দেয়ালে ঝোলান ৪ বাই ৫ একটি সাদা পর্দা যার আড়াই ফুট দূরত্বে মাটির ওপর রাখা একটি ছোট প্রোজেক্টার, ডান দিকের র‍্যাকে ঠাসা বই, পেছনে একটি টেবিলের ওপর কিছু বই ডিসপ্লে করা, তার পাশে দুটি চেয়ার। আমাকে হাঁপাতে দেখে সবাই প্রায় জোর করেই আমাকে চেয়ারে বসিয়ে দিলেন। জনা দশ বারো ছেলেমেয়ে, বয়স ২২-২৫। নিজের পরিচয় দিলাম, ডিসপ্লে করা বইগুলো নাড়াচাড়া করলাম --- বিজয় তেন্ডুলকার, গিরিশ কারনাড়, ব্রেখটের নাটক। কিন্তু সবই প্রায় হিন্দিতে। ইতিমধ্যে আরও কয়েকজন এসেছেন এবং ঘরের ভিড় জমে উঠেছে।

একটি চলচ্চিত্রকে কেন্দ্র করে লেখা সুতরাং সেটা নিয়ে আলোচনা তো অপরিহার্য। গল্পটা সোজাসাপটা। সাত-আট বছরের দুই বন্ধু, আহমদ এবং নেমাতজাদে, ক্লাসে পাশাপাশি বসে। দ্বিতীয়জনের হোমওয়ার্কের খাতা প্রথমজন ভুল করে বাড়ি নিয়ে য্যয়। স্কুলের শিক্ষক নেমাতজাদেকে জানিয়ে দিয়েছে পরের দিন খাতা জমা না দিতে পারলে তাকে বহিষ্কার করা হবে। বাড়ি গিয়ে আহমদ যখন আবিষ্কার করে যে বন্ধুর খাতা তার ব্যাগে ঢুকে গেছে তখন সে সিদ্ধান্ত নেয় যে ভাবেই হোক বন্ধুর  গ্রামের বাড়িতে সেটা পৌঁছে দিতে হবে। আহমদ কি পারবে তার কাছে সে খাতা পৌঁছে দিতে? এটা নিয়েই গল্প। গল্প বলতে গিয়ে সমাজের নানা দিক, সীমাবদ্ধতা উন্মোচিত হয়ে পড়ে। নেমাতজাদের বাড়ি স্কুল থেকে দূরে পোশতেহ নামে গ্রামে। শিক্ষক সেই গ্রামের ছাত্রদের উপদেশ দেন রাতে আগে ঘুমাতে যাতে সকালে তারা দশ মিনিট আগে উঠতে পারে এবং সময় মতো হাজিরা দিতে পারে। আহমেদ যখন তার দাদুর সিগারেট এনে দিতে অস্বীকার করে, তিনি তাঁর নাতির অবাধ্যতার সঙ্গে তাঁর নিজের বাল্যকালের তুলনা করেন। বলেন কাজে বা পড়াশোনায় যাতে গাফিলতি না হয় তার জন্য তাঁদের নিয়মিত নিগৃহীত করা হতো, একই সঙ্গে পারিতোষিকও দেওয়া হতো। অতীত এবং বর্তমানের তুলনা ছবিতে বারবার ফুটে ওঠে। সুন্দর কাঠের কাজের পরিবর্তে মানুষ এখন লোহার দরজা জানালার দিকে ঝুঁকছে, ব্যবসায় আরও লাভ করার জন্য গ্রাম থেকে শহরে সরে যাচ্ছে। পিতৃতন্ত্রের পাহাড়প্রমাণ চাপ ইরানের অনেক ছবিতেই প্রকট ভাবে প্রতিফলিত হয়। এই ছবি কোনও ব্যতিক্রম নয়। আহমেদের মা ঘরকন্নার কাজে বিপর্যস্ত, অথচ সংসারে তার বাবার অবদান প্রান্তিক।

ছবিটি ইরানের গ্রামজীবনের একটি দলিল। আহমেদ ধূসর আঁকাবাঁকা পথ দিয়ে, অনেকটা আমাদের এখানের আলপথের মতো, পোশতেহ গ্রামে ছুটে যায়। বন্ধুর বাড়ি খুঁজে পেতে সবাই তাকে সাহায্য করে। কিন্তু একই পদবীর মানুষের মধ্যে নানা ভাগ থাকার কারণে, কিংবা গ্রামের নানা পাড়ার অবস্থানের কারণে তার খোঁজ বারবার ধাক্কা খায়। কোনও চলচ্চিত্র বা সাহিত্যে একটা মেসেজ থাকতেও পারে আবার নাও থাকতে পারে; সোশ্যালিস্ট রিয়ালিজম বলে একটা স্কুল সোভিয়েত রাশিয়ায় তিরিশের দশকে চালু হয়েছিল, সেটার কোনও উত্তরসূরি আজ আর আছে বলে মনে হয় না। কিন্তু এই ছবির একটা বার্তা আছে, সেটা হচ্ছে বন্ধুত্ব। বন্ধুর কাছে খাতা পৌঁছে দিতে আহমেদ দৃঢ়প্রতিজ্ঞ; স্কুলের কড়া শিক্ষক, বাড়ির কড়া শাসন, বন্ধুর গ্রামের দুর্গমতা, তাকে খুঁজে পাওয়ার প্রায় অসম্ভব প্রচেষ্টা, কোনও কিছুই আহমেদকে দমিয়ে রাখতে পারে না।

‘চিত্রনগরি সিনেফাইলস’ খালি সিনেমা দেখায় না, সেটা নিয়ে মত বিনিময়ও হয়। প্রথমে প্রত্যেকের পরিচয়জ্ঞাপন। তারপর মতামত। এই প্রতিবেদক ক্যাবে আসার সময় চালক অখিলেশজির থেকে শোনা একটা তথ্য জানালঃ নানা কথার মধ্যে উনি জানালেন ইউপিতে ৩৬০০০ স্কুল বন্ধ হয়ে গেছে। পোশতেহ গ্রামের সমস্যা, ভারতেরও অনেক গ্রামের সমস্যা। গ্রাম থেকে স্কুলের দূরত্ব, পড়াশোনার চেয়ে বাড়ির কাজ বেশি গুরুত্ব পাওয়া, এসবই বাল্যকাল থেকে পড়াশোনার প্রতি অনীহা তৈরি করে। আরেকজন বললেন আধুনিকতা কী ভাবে গ্রামকে গ্রাস করছে। পরম্পরাগত কাজ ছেড়ে মানুষ অধিক লাভের নেশায় নতুন কাজের দিকে আকৃষ্ট হচ্ছে, গ্রাম ছেড়ে শহরে বাসা বাঁধছে। আরেক বক্তা গুরুত্বপূর্ণ একটা পয়েন্ট শোনালেন। ছবিটিতে রাষ্ট্রবিরোধি কিছুই নেই, তবুও সহজ একটি গল্পের মধ্যে দিয়ে পরিচালক সমাজের সীমাবদ্ধতা তুলে ধরেছেন। বাস্তবিক এটাই হচ্ছে কিয়ারোস্তোমির শিল্পের মূল মন্ত্র, সুক্ষ ভাবে সমাজের নানা দিক তুলে ধরবেন কিন্তু সেটাকে সরাসরি সরকার-বিরোধি বলে আখ্যা দেওয়া যাবে না। কোকের ত্রয়ীর পরের দুটি গল্পও নীচু তারে বাঁধা। পরের ছবিটি একটি বিধ্বংসি ভূমিকম্প, যাতে কোকের গ্রাম ক্ষতিগ্রস্ত, সেটির পটভূমিতে তৈরি। পরিচালক তাঁর পুত্রকে নিয়ে প্রথম ছবিতে আহমেদের চরিত্রে যে অভিনয় করেছিলেন এবং যাঁর বাড়ি কোকের গ্রামে তাঁকে খুঁজতে বেরিয়েছেন। তৃতীয় ছবিতে প্রধান পুরুষ চরিত্র সেলুলয়েডের পর্দায় এবং বাস্তব জীবনে মূল মহিলা চরিত্রের প্রতি আকৃষ্ট। পরিচালকের প্রথম দিকের একটি ছবি নিষিদ্ধ হয়েছে, ‘টেস্ট অফ পাই’ এর মতো সাড়াজাগানো ছবি, আত্মহত্যার মতো একটি বিষয়কে ছবির মূল থিম করার কারণে সরকারের কোপে পড়েছে। বোঝাই যায় পরিচালকের সঙ্গে সরকারের সম্পর্ক অহি-নকুল না হলেও, একেবারে মোলায়েমও নয়।  

কথায় কথায় ইরান ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক যুদ্ধও আলোচনায় চলে এল। দেখা গেল ভিন রাজ্যের এই যুবক যুবতীরাও একমত যে ইরানে পরিবর্তন দরকার কিন্তু সেটা মার্কিনিদের দাদাগিরির মাধ্যমে হতে পারে না। জানা গেল যে এঁরা মাঝেমধ্যেই মিলিত হন, সিনেমা দেখান হয়, বিভিন্ন ইস্যু নিয়ে আলোচনা হয়, কোনও প্রতিবাদ বিক্ষোভের কর্মসূচী ঠিক হয়। ‘দিমাগি নক্সাল’ কথাটা দু দিন আগে বাজারে এসেছে, দেখলাম সেটা বেশ হট টপিক। সবাই মজাই করছেন সেটা নিয়ে। বললাম ঘটনা হচ্ছে রাষ্ট্র স্বীকার করল যে নক্সালদের মেধা আছে, সুতরাং এটা তো একটা কমপ্লিমেন্ট।

 

 

 

 

               

0 Comments

Post Comment