পড়শি যদি আমায় ছুঁতো যম যাতনা সকল যেত দূরে: লালন সাঁই

পড়শি যদি আমায় ছুঁতো যম যাতনা সকল যেত দূরে: লালন সাঁই

hhhhhhhhhhhhhh

পথিক

  • 06 March, 2021
  • 0 Comment(s)
  • 347 view(s)
  • লিখেছেন : সুলতানা ওয়াজেদা
তিনি আজন্মের পথিক এই রসের ভিয়ানে । চলাই জীবন। প্রতিপক্ষের কাদা-পাঁক যত ছিটকে এসে পড়বে ধোপদুরস্ত কাপড়ে ততই জীবনের কামড় অনুভূত হবে, চলার অর্থ খুঁজে পাওয়া যাবে । জীবন চলুক এভাবেই । শেষ কোথায়, কতদূরে……কিভাবে ? তাই জানতেই তিনি আজও পথিক…….জীবন পথের পথিক……

তাঁর চলাফেরা, হাব-ভাব, হাঁটার ধরণ, ঢেউ খেলানো চুলের থাকে থাকে ভাঁজ, ফর্সা গাত্রবর্ণ সকলের নজর কাড়ে । রাস্তায় নামলেই সকলের দৃষ্টি একবার না একবার তাঁর দিকে পড়বেই । পরনে সর্বদা ধোপদুরস্ত পাজামা-পাঞ্জাবী । শীতকালে একটি জ্যাকেট, অতি শীতে মাথায় সাহেবী টুপি । বাইরের চাকচিক্য ও চলন-বলনের জন্য কেউ মুখের উপর তাঁকে কটূ কথা বলতে পারে না ।কিন্তু চেনা মহলে আড়ালে-আবডালে তাঁকে ‘বউমারি’ বলে অনেকেই । ‘বউমারি’ বিশেষণটি পল্লবিত হতে হতে তাঁর সাবেকি সাহিত্যিক-কবি-লেখক মহলেও ছড়িয়ে পড়েছে । পশ্চাতে তাঁকে ‘বউমারি’ বললেও সামনাসামনি তাঁর আদর- আপ্যায়ন তুঙ্গে ।চাঁদের কলঙ্কের মত ‘বউমারি’ বিশেষণটি তাঁর চরিত্রে লেপ্টে রইলো । আজও বুঝতে পারিনি তিনি তাঁর বিশেষণটি সম্বন্ধে সম্যকভাবে অবগত কিনা ।মুখ দেখে তাঁর মনের ভাব আজও কেউ টের পায়নি । এ হেন ব্যক্তিটি হলেন চন্দননগর বাগবাজারের স্বনামধন্য খ্যাতনামা সাহিত্যক কুনালচন্দ্র সাউ ।

কবি, গল্পকার, সাহিত্যিকদের বেষ্টনে আবৃত কুনালবাবুর দিন-রাত । কিভাবে দিনগুলি ঝড়ের গতিতে পেরিয়ে যায় তা নিজেও তিনি টের পান না ।তিনি নিজে কবি । গল্প লেখার হাতটিও চমৎকার । গল্পের বিষয়বস্তু যাই হোক নামকরণে একটি চটকদারি ব্যাপার থাকে । পাঠক বিশেষভাবে গল্পের নাম দেখেই পড়ে ফেলে গল্পটি । সবসময় যে প্রশংসনীয় লেখা হয় তা নয়, তবে অনেকক্ষেত্রেই গল্পটি একটি বিশেষ মাত্রা পায় ।বিশেষতঃ বতমান শাসনব্যবস্থার কষাঘাতে রচিত গল্পে তাঁর হাত সুনিপুণ । কয়েকটি কমিক গল্প রচনায় তিনি বিশেষ পারদর্শিতা দেখিয়েছেন । তবে ঐ এক গোঁ । খ্যাতনামা পত্র পত্রিকায় কখনো গল্প কবিতা পাঠান না ।তবে আঞ্চলিক পত্র পত্রিকায় তাঁর বাজার রমরমা ।চন্দননগরের এক নম্বর গল্পকার বলতে সকলে একডাকে কুনালচন্দ্র সাউকে চেনে ।

জীবন যুদ্ধে বেকারত্বের জালা অনুভব করতে হয় নি তাঁকে । মাত্র সাতাশ বছর বয়সে তিনি ব্যাংকের পরীক্ষায় চরমভাবে সফল হন ।এস বি আই ব্যাংকের অ্যাকাউন্ট- ম্যানেজার পদে যোগ দেন সগৌরবে । নতুন চাকরী, নতুন মেজাজ । অতীব সুপুরুষ, স্মার্ট কুনাল নিজ স্বভাবগুনেই কর্মক্ষেত্রে সকলের প্রিয় পাত্র হয়ে উঠলেন ।কমী সংগঠনের ছোটখাটো নেতা হয়ে উঠতেও বেশি সময় নেন নি তিনি ।নতুন চাকরী, ফুরফুরে এক হাওয়ায় ভাসেন সারাক্ষণ যুবক কুনাল । বড়দির তত্তবাবধানে কড়া শাসনে বেড়ে ওঠা কুনাল অন্য কুনাল হয়ে উঠলো। মাস গেলে হাতে মাইনের টাকা, ইয়ার বন্ধু, ফূর্তি, হুল্লোড় সব পেয়েও শান্তি নেই কুনালের মনে ।বড়দির শাসনের বাঁধন আলগা হয়ে এসেছে ।এখন তিনি নিজেই নিজের জীবনের নিয়ন্তা। স্কুল-কলেজ জীবনে যে ছুটছাট কবিতা লিখতেন লুকিয়ে চুরিয়ে সেগুলি পরিপূর্ণতা দিতে পুরো উদ্যমে নেমে পড়লেন কুনালবাবু । বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় তাঁর কবিতা প্রকাশিত হতে লাগলো । গল্প রচনাতেও তাঁর দক্ষতা পাঠক মহলে খ্যাতি পেল ।তাতেও মন ভরে না কুনালের । তাঁর কেবলই মনে হয় আরও কিছু করার আছে, করতে হবে ।হয়ে উঠলেন লিটল ম্যাগাজিনের সম্পাদক । ছিমছাম এক পত্রিকা ‘সঙ্কল্প’ নামে বেরোতে শুরু করলো চন্দননগরের বুকে । মাত্র কয়েকটি সংখ্যায় এই পত্রিকা সকলের কাছে বিশেষভাবে সমাদৃত হল । কাছের দূরের বন্ধু সংখ্যা বেড়ে গেল অনেক । কুনালবাবু মনে করেন একজন সমাজ সচেতন মানুষ কখনই সময়ের রাজনীতিকে উপেক্ষা করে সাহিত্য চর্চা চালিয়ে যেতে পারেন না । তাঁর পত্রিকায় ত কালীন আশির দশকের বাম রাজনীতির ভাল-মন্দের দিক প্রতিফলিত হতে থাকলো ।‘সঙ্কল্প’ হয়ে উঠলো তাঁর বাম আদশের বাতাবহ মুখপাত্র । নিজের অজান্তেই জড়িয়ে পড়লো রাজনীতির চক্রবূহে । সিপিআইএম পাটি অফিস হয়ে উঠলো তাঁর আর এক আড্ডার ঠেক । বন্ধু সংখ্যা আরও বেড়ে গেল । ব্যস্ততার চরম শিখরে কুনালবাবু ।

‘সঙ্কল্প’ পত্রিকার সূত্র ধরেই কুনালবাবুর সঙ্গে পাপিয়া মিত্রের যোগাযোগ ।কবিতা লেখেন পাপিয়াদেবী চমৎকার ।‘সঙ্কল্পে’র প্রতিটি সংখ্যায় পাপিয়াদেবীর কবিতা থাকেই । সম্পাদক মহাশয়ের সঙ্গে পত্রালাপ চলে কিছুকাল । ক্রমে পরস্পরের সাক্ষাৎ হয় । মেলামেশা বাড়ে । কুনালবাবু-পাপিয়াদেবী একই মঞ্চে কবিতা পড়েন । রাজজ়োটক যেন । অপূর্ব রূপের ডালি সাজিয়ে মঞ্চ আলো করেন পাপিয়াদেবী আর কুনালবাবুর উদাত্ত কন্ঠের কবিতা পাঠক-শ্রোতাদের মধ্যে যে কি মোহজাল বিস্তার করে তা কেউ বলতে পারে না । কবিতার আসর কিভাবে এই জুটির জীবনে চিরকালীন বিবাহের আসরে পরিণত হল তা কেউ বুঝতেই পারলো না । এ যেন হতোই, এমনটা তো হওয়ার ছিল ।চন্দননগরে কুনালবাবুর শুভানুধ্যায়ীরা এতে আনন্দে আত্মহারা । বড়দিও সাদরে ভ্রাতৃবধূকে বরণ করেন ।

কুনালবাবু তাঁর চাকরী, পার্টি অফিস, ‘সঙ্কল্প’, কবি সম্মেলন, গল্প পাঠের আসর, চা-বিড়ি-সিগারেট-বন্ধু-বান্ধব নিয়ে জমপেশ জীবন যাপন চর্যা চালাতে লাগলেন । কোথাও কোন অসঙ্গতি নেই । পাপিয়াদেবী এখন ঘোর সংসারী, গৃহী মানবী । ঋতমা, নন্দিতা-এই দুই কন্যাকে নিয়ে তাঁর কাটে সকাল-দুপুর-সন্ধ্যা-রাত্রি ।কবিতা বিদায় নিয়েছে তাঁর জীবন থেকে ।কবিতার আর কি দোষ! কবিতা অতি নাজুক এক শৈল্পিক চর্চা। তাকে সযত্নে হৃদয় দিয়ে মানাতে হয়, নইলে সে ফুড়ুৎ হবেই ।বদলে গেল পাপিয়া । কবিতাহীন পাপিয়ার জ়ীবন সাধারণ গদ্যময়ের জীবন এখন ।

সংসারের গতানুগতিকতা কুনালের রোম্যান্টিক মনটিকে আর পাঁচজন সংসারী মানুষের মত গৃহীর জীবনে বাঁধতে পারে নি । সে যেন বল্গাহীন, ছন্নছাড়া পাগলপারা । আপনা মর্জি কা মালিক ।কুনালের ভদ্রেশ্বর গমন বাড়তে লাগলো ।সেখানে সাহিত্যিক আড্ডার ছুতো করে চিত্রাদের বাড়ি যাতায়াত একটা জলভাতের মত ব্যাপার দাঁড়ালো । ঢাক-ঢাক, গুড়-গুড় ব্যাপারটা আর রইল না ।কুনাল-চিত্রার গোপন গূঢ় সম্পর্কটি আর গোপন রইল না ।কান পাতলেই শোনা যায় পাড়া-পড়শিদের কানাকানি, বন্ধু-বান্ধবদের ফিসফাস ।এ সম্পর্ক গঙ্গার প্রবাহমান স্রোতের মতই বয়ে চলে অতি সাভাবিক গতিতে । কেবল ধিকি ধিকি তুষের মত আগুন জলে পাপিয়ার মনে ।সে জানে কুনাল তার কথা শুনবে না, তার আবেদনের কোন মূল্য নেই তার কাছে । সে যে আপনা খেয়ালের মানুষ, যখন যা ঝোঁক উঠবে সেই গতিতেই হাঁটবে । ন্যায়-অন্যায়, ভালো-মন্দ বিচারবোধের চেয়ে হৃদয় বোধের তাগিদকেই সে বেশি প্রাধান্য দেয়। পাপিয়া তাকে ফেরাতে পারে না। অসার মনে হয় তার সংসার ।ঠাকুরের থানে মাথা কুটে সে বলে, “ঠাকুর, আমায় উঠিয়ে নাও, এ পাপ আর সহ্য হয় না । মেয়েরাও বড় হচ্ছে”। কিন্তু মরণ এত সোজা নয় ।সুস্থ সবল দেহে মরণ আসবেই বা কোন দুয়ার ভেদ করে ?তাই পাপিয়াদেবী মনে মনে কঠোর সঙ্কল্প নেয়—দৃঢ় সে সঙ্কল্প ।ধীরে ধীরে সে প্রস্তুত করে সে নিজেকে ।এ প্রস্তুতি গভীরে, সংগোপনে ।বাইরের কেউ তা টেরই পায় না ।

(দুই)

অমাবস্যার রাত্রি । নিঝুম অন্ধকার । নিশ্চিন্ত ঘুমে পাড়া নিথর । দ্বিতল বাড়ির নিচের তলায় এক কামরায় তমা ও নন্দিতা শান্তিতে ঘুমে মগ্ন ।পাশের ঘরে কুনাল-পাপিয়ার শয্যা । পাপিয়া ঘরে নেই ।কুনাল এক পেগ নিয়ে নেশাচ্ছন্ন ।নেশার ঘোরে আওড়াচ্ছে তাঁর নতুন লেখা কবিতাটি –“বিজনে কুহকে ডাক দিয়ে যায় কালের মন্দিরা ,/ এ ঘোর অমনিশা ছিন্ন করি দাও হে প্রিয়ে/ দু’বাহু বাড়িয়ে দাও দাও…….” এক সময় আবেশের ঘোরে ঢলে পড়ে ঘুমের কোলে ।কোন এক দূরদেশে হাত ধরে তাকে নিয়ে যায় কোন এক অচিনপুরের পৃথবিদেশে তাঁরই মানসী নারী চিত্রা ।

দাউ দাউ করে জলছে আগুন। আর্তনাদ, কাতরানোর গোঙানি ঘুমের মধ্যে টের পায় নন্দিতা । সে ধড়ফড়িয়ে বিছানায় উঠে বসে । দেখে উঠোনময় আলোর বিচ্ছুরণ । ভয়ার্ত স্বরে কেঁদে কঁকিয়ে ডাক দেয় তার দিদিকে ।ততক্ষণে আগুনের লেলিহান শিখার বিস্তার ভয়ানক রূপ ধারণ করেছে ।তাদের পরিত্রাহি চিৎকারে কুনালবাবু বাইরে বেরিয়ে দেখে সর্বনাশের ধবংসলীলা । পড়শীরা ছুটে আসে । তাদের চটজলদি তৎপরতায় ঠাকুর ঘরের আগুন নেভে । তবু শেষরক্ষা হয় না ।দেবী প্রতিমার মত রূপ আগুনে ঝলসে বিকৃত কদযতায় বীভৎস । পাপিয়াকে বাঁচানো যায় নি ।হাসপাতালে তিন দিন জমে- মানুষে টানাটানি চলেছিল । পুলিশের কাছে দেওয়া তার শেষ বয়ানের জন্য কুনালবাবুকে নিয়ে পুলিশ আর টানাটানি করেনি । পাপিয়াদেবী নিজের আত্মহত্যার জন্য নিজেকে দায়ী করে গেছেন ।

পাপিয়ার চলে যাওয়ার পর কুনালবাবু কয়েকদিন কয়েক দিন কেমন থম মেরে গেলেন । আত্মধিক্কার আর আত্মগ্লানিতে কেমন যেন কুঁকড়ে যান । পাপিয়ার আত্মহত্যার জন্য নিজেকে অপরাধী ভাবেন ।মেয়েদের চোখের দিকে তাকাতে পারেন না ।রাস্তাঘাটে চলতে ফিরতে টের পান তাকে ঘিরে মানুষজনের ফিসফিসানি ।একসময় তারা তাকে দেখলেই ‘বউমারি’ বলতে থাকে ।যদিও মুখের সামনে নয়, আড়ালে তবুও কুনালবাবুর সেটি বুঝতে অসুবিধা হয় না।

সময়ের বহমানতায় দুঃসময়ের পালাও একদিন শেষ হয় । ঋতমা, নন্দিতা এক ধাক্কায় অনেকখানি বড় হয়ে গেল । তারা যেন রাতারাতি স্বাবলম্বী হয়ে উঠল। কুনালবাবু ধীরে ধীরে তাঁর জীবনের সাভাবিক ছন্দে ফিরতে লাগলেন ।কবি-লেখক বন্ধু, পাটি অফিসের বন্ধু-বান্ধব তাঁকে আবার নিয়ে চলল্ বহমানতার স্রোতে । সর্বোপরি চিত্রা তাঁকে স্থির থাকতে দিল না । তার সম্মোহনী টানে বার বার ছুটে যান তিনি ভদ্রেশ্বরে । মাঝে মাঝে চিত্রার বাড়িতে থেকেও যান । চলে সেখানে মদ্যপানের জম্পেশ আড্ডা । অনাথ মেয়েদের চিন্তা বিবেকের কোন এক অদৃশ্য ধাক্কায় তাঁকে ফেরায় চন্দননগরের বাড়িতে । কয়েকদিন মেয়েদের প্রতি কর্তব্যকর্মে চুর থাকেন । কাটান গৃহীর জীবন—মেয়েদের সান্নিধ্যে । আবার ওঠে প্রেমের জোয়ার –চিত্রা তাঁকে টেনে নিয়ে যায় নরকের শেষ খাতে ।

একদিন চন্দননগরের বাড়িতে দুম করে এসে পড়েন কুনালবাবু, সঙ্গে চিত্রাদেবী । মেয়েদের জানান, চিত্রা এখন থেকে তাঁদের বাড়িতে থাকবে । ওকে বিয়ে করে কুনালবাবু স্বীকৃতি দিতে চান । রাগে দাউ দাউ আগুন জলে ওঠে নন্দিতার মাথায় । তখন সে সবে ক্লাশ এইটের ছাত্রী । হঠাৎ জোর ধাক্কা মেরে চিত্রাকে ঠেলতে ঠেলতে রাস্তায় এনে ফেলে তাকে । তারপর মেন গেটের দরজায় খিল দিয়ে এসে দাঁড়ায় বাবার সম্মুখে । হাঁপাতে হাঁপাতে বলে –“যার জন্যে আমার মা নিজেকে শেষ করে দিল, তার সঙ্গে এক ছাদের তলায় আমি থাকব না, বুঝলে বাবা ? তোমাকে ‘বাবা’ বলে ডাকতেও আমার ঘেন্না হয় । ছিঃ! মরণ হয় না তোমার ? অনাথের জীবন কাটানোও সম্মানের, তোমার মত চরিত্রহীন বাবার চেয়ে”।

ঘটনার আকস্মিকতায় হতবুদ্ধি কুনালবাবু থম মেরে যান। তাঁর পা দুটি দৃঢ়ভাবে মাটিতে কেউ যেন প্রোথিত করেছে ।তিনি একচুল নড়তেও পারলেন না । দরজা খুলে একটিবার বাইরে গিয়ে চিত্রার পাশে দাঁড়াতেও পারলেন না । কেবলই কানের মধ্যে প্রতিধ নিত হতে থাকলো নন্দিতার উচ্চারিত দুটি শব্দ ‘চরিত্রহীন বাবা’ ।

ঘটনার আকস্মিকতায় হতবুদ্ধি কুনালবাবু থম মেরে যান। তাঁর পা দুটি দৃঢ়ভাবে মাটিতে কেউ যেন প্রোথিত করেছে ।তিনি একচুল নড়তেও পারলেন না । দরজা খুলে একটিবার বাইরে গিয়ে চিত্রার পাশে দাঁড়াতেও পারলেন না । কেবলই কানের মধ্যে প্রতিধবনিত হতে থাকলো নন্দিতার উচ্চারিত দুটি শব্দ ‘চরিত্রহীন বাবা’ ।

কুনালের বাড়িতে সেই চরম অপমানের পর চিত্রাদেবী কোনদিন আর কুনালমুখী হয়নি ।কুনালবাবু ওর বাড়িতে গেলে সেও সপাট দুয়ার দিয়েছে কুনালের মুখের উপর ।অতঃকিম ? কুনালবাবু হয়ে উঠলেন অন্য মানুষ ।সংসারী-ঘোরতর সংসারী । কেমন যেন শুধরে গেলেন তিনি । মেয়েদের দেখভালে সদা নিয়োজিত, কর্তব্যনিষ্ঠ এক পিতা । মেয়েদের যথাসাধ্যমত শিক্ষা দিলেন, তাদের সৎ পাত্রস্থ করলেন । জীবনের একটি বড় পর্ব সমাপন হল । পাপিয়ার ফেলে যাওয়া দায়িত্ব তিনি সম্পন্ন করতে পেরেছেন । একটি সস্তির নিঃশাস আপনা আপনিই পড়ে ।

(তিন)

বড় ফাঁকা ফাঁকা লাগে বাড়ি এখন। বাগবাজারের এই দ্বিতল বাড়িটি সন্ধে নামলেই কেমন যেন নিঝুমপুরী হয়ে যায় । পাপিয়ার অভাব যেন আরও বেশি করে অনুভূত হয় । যদিও গভীর রাত পর্যন্ত তিনি ‘সঙ্কল্প’-এর এডিটিং করেন, নয়ত গল্প লেখেন তবুও কি একটি অভাব অনুভব করেন । কর্মজীবনে অবসর এক অবশ্যম্ভাবী ঘটনা। তিনি ক্রমে আরও একা হয়ে পড়েন। জীবন তাঁকে টেনে শামুকের খোলের মধ্যে ঢুকিয়ে ফেলতে চায় । নাহ ! তিনি এমনটি তাঁর জীবনে ঘটতে দেবেন না । আবার মাথা ঝাড়া দিয়ে উঠতে চান তিনি ।

সাতষট্টি বছর বয়সেও তারুণ্যের উদ্দীপনা আজও কুনালচন্দ্রের যাপন-যাত্রায় । স্মিত হাসিটি সর্বদা ঠোঁটে ঝুলছে । চেহারার আভিজাত্যেই হোক বা তাঁর বাচনভঙ্গীর বিশেষত্বেই হোক, শিল্পজগতে মহিলাবন্ধুর সংখ্যাই বেশি । মহিলা পরিবৃত থাকাটা তিনি রেলিশ করেন । তাদের উদ্দেশ্যে স্বভাবসিদ্ধ কবি কুনালবাবু বাঁধভাঙা উচ্ছাস নিয়ে বলতে থাকেন –“এস এস ললনা সকল/ বহু প্রতীক্ষার পর পেয়েছি দেখা/ মিলনের বেলা যে বয়ে যায়,/ উ কন্ঠায়, আবেগে ভেসে যায় তরীখানি/ পারে ভেড়ে কেবলি তোমাদের তরে / এস তরা করি, দেরী যে নাহি সহে….” । হাসির হিল্লোল ওঠে ললনা দলের কন্ঠে । তাদের উচ্ছাসের ঢেউ আছড়ে পড়ে কবির প্রাণে-মনে, দেহের রোমকূপে-রোমকূপে ।জীবন ধন্য মনে হয় তাঁর । জীবনে বেঁচে থাকার মানে খুঁজে পান তিনি ।

‘বউমারি’ তকমা মোছে না কুনালবাবুর জীবন থেকে । সখী-পরিবৃত কুনালবাবুকে অনেকেই বিদ্রূপ করে । বলে,‘কলির কেষ্ট’। তবুও তাঁর ঠোঁটে হাসি অম্লান। নব নব চিন্তাধারায় তিনি সদা সিক্ত, সদা আনন্দময় । তিনিই পারেন নব আনন্দে চুবিয়ে স্নান করতে । জীবন থাকবে্‌, ঘাত-প্রতিঘাত থাকবে না? পথ চলতি নর্দমার কাদা ছিটকে এসে গায়ে পড়বেই । সবকিছুকে এড়িয়ে চলা যায় না । কালো ছিটে ফোঁটার দাগে জীবনের চিত্ররূপটি আরও সুন্দর মধুময় হয় । এভাবে চলাতেই মজা । তিনি আজন্মের পথিক এই রসের ভিয়ানে । চলাই জীবন। প্রতিপক্ষের কাদা-পাঁক যত ছিটকে এসে পড়বে ধোপদুরস্ত কাপড়ে ততই জীবনের কামড় অনুভূত হবে, চলার অর্থ খুঁজে পাওয়া যাবে । জীবন চলুক এভাবেই । শেষ কোথায়, কতদূরে……কিভাবে ? তাই জানতেই তিনি আজও পথিক…….জীবন পথের পথিক……

0 Comments

Post Comment