পড়শি যদি আমায় ছুঁতো যম যাতনা সকল যেত দূরে: লালন সাঁই

পড়শি যদি আমায় ছুঁতো যম যাতনা সকল যেত দূরে: লালন সাঁই

hhhhhhhhhhhhhh

মায়া পথ

  • 10 October, 2020
  • 0 Comment(s)
  • 152 view(s)
  • লিখেছেন : বিষ্ণু সরকার
সেই নিবিড় সময়ে লোকটা এসে দাঁড়ায়। ফাঁকা বেঞ্চটায় এসে বসে। গোবিন্দকে দেখে। গোবিন্দও সেদিকে তাকায়। লোকটার গায়ের চামড়া পুড়ে যাওয়া, রোদে গোটানো। মাথায় উসকোখুসকো চুল। চোখ মুখে ক্লান্তির ছাপ। আবার সেই চেহারায় কোথায় যেন লুকানো ভরা অতীতের ছাপ। এমন লোক তো আশপাশের মানুষ নয়!

ভোর রাত শেষ হতে না হতেই শিমুলপুর বাজারের ঘুম ভেঙে যায়। বাইরে তখনও দিনের আলো স্পষ্ট হয় না। আকাশ আবছা আলোয় ঢাকা থাকে। বাতাসে জড়ানো হিমহিম ভাব। গাছের পাতা চুইয়ে টুপটাপ জল পড়ার শব্দ। জনশূন্য বাজারটা তখন থেকেই সারাদিনের ব্যস্ততা নিতে শুরু করে দেয়।

বাজার বলতে বড় রাস্তা ঘিরে দুপাশে গড়ে ওঠা দোকানপাট। এক দিকে ছড়িয়ে থাকা মাঠ। সবজি বিক্রির হাট। ওপাশে মাছ বিক্রির চাতাল। সাব পোষ্ট অফিস। বুধ আর শুক্রবার পাইকারদের বাড়তি ভিড়ে হাটবার বেশ জমজমাট হয়ে ওঠে। সেদিন আশপাশের গ্রামের মানুষেরাও ভিড় জমায়।

এসবেরও আগে, এলাকাটা যখন এত জমজমাট হয়ে ওঠেনি, যে রাস্তাটা ঘিরে এই বাজার, সেই রাস্তাতেও ব্যস্ততা কম। যারা চলাফেরা করত, তাদেরই কেউ কেউ এসে দাঁড়িয়ে যেত গাছতলাটায়। বড় শিমুল গাছ। চারদিকে ছড়ানো তার ডালপালা, ছায়া। সেই শীতল ছায়ায় খানিক জিরিয়ে নিয়ে ফের চলতে শুরু করত কাশীপুর কিংবা মগরার দিকে। তার পর যেদিন বাস চালু হল এই রাস্তায়। সেই দশ মাইল দূরের স্টেশন থেকে এই বাজার ছুঁয়ে সোজা মগরা পর্যন্ত। হঠাৎ করেই রাস্তাটা ঘিরে ব্যস্ততা বেড়ে যায়। ভ্যান-রিক্সা, সাইকেল, মোটর গাড়ি ছাড়াও প্রাইভেট গাড়িতে চেপে তখন কত লোকের চলাফেরা। বাজার ঘিরেও অচেনা লোকের আনাগোনা। এর মধ্যেই এক সকালে বড় বড় পাথর, পিচ নিয়ে রাস্তার কাজে লেগে গিয়েছিল একদল লোক। সেদিনের পর রাস্তাটার চেহারাই রাতারাতি বদলে গেল কেমন। সেই সঙ্গে ছুটে চলা গাড়ির গতিও।

আশপাশের চেহারারও বদল হল। ফাঁকা জমি, পুকুর ডোবা বুজে রাতারাতি উঠল ঘরবাড়ি। উত্তরের বিলটা, যেখানে এক বুক জল ভেসে বেড়াত সবসময়, নাম না জানা পাখিদের আনাগোনা হত, হঠাৎ কেমন শুকিয়ে গেল। চারপাশে ঘিরে ধরল দালান। বাদ গেল না ফাঁকা খেলার মাঠটাও। সেই মাঠ জুড়ে এখন কত ঘরবাড়ি। অর্ধেক আকাশটাই ঢেকে ফেলল।

এই আকাশটুকু না দেখলে মন ভরে না গোবিন্দর। বাজারের বড় শিমুল গাছটা ঘিরে ওর চায়ের দোকান। দোকানে বসেই আকাশটার কত রকম যে চেহারা দেখে। সকালের সেই নরম আলো থেকে বিকেলের সিঁদুরে মেঘ। মনের ভেতরে কেমন এক উথালপাথাল খেলে বেড়ায়। তখন দোকানে খদ্দের না থাকলে হাতে তুলে নেয় সারেঙ্গিটা। তার পর নিজের মত ভেসে বেড়ায়।

অভ্যেসটা ধরিয়ে ছিল নিবারণ দাস। সেই কোন ছেলেবেলায়। হাটে হাটে বাজনা করত দেহাতি মানুষটা। গোল হয়ে ঘিরে ধরত জনতা। সেই ভিড় ঠেলে একদিন উঁকি দেওয়া। কেমন যে এক যন্ত্র। কী বিচিত্র তার সুর! সেই অল্প বয়সেই গোবিন্দর মনে গেঁথে গিয়েছিল। ভিড় হালকা হওয়ার পর বাচ্চা ছেলেটার কৌতূহল দেখে কাছে ডেকে নিয়েছিল নিবারণ দাস। তার পর যে কিভাবে ভাব হয়ে গেল দুজনের। বাপ-মা নেই জেনে গোবিন্দকে কাছে টেনে নিয়েছিল। বলেছিল, মনে করবি আজ থেকে আমিই তোর বাপ। দুঃখ কি, আমার মত সুর ধরবি, দেখবি সবকিছু ভুলে গিয়ে তুই তখন অন্য কোথাও!

সত্যি সত্যি কদিনে সুর ধরতে শিখে ফেলেছিল গোবিন্দ। নিজের হাতে যন্ত্র ধরা শিখিয়েছিল নিবারণ দাস। একদিন ভরা হাটে সেই সারেঙ্গি তখন গোবিন্দর হাতে। ঘিরে ধরা ভিড়ের মাঝে সেই তখন উজ্জ্বল মুখ। সবার অপলক দৃষ্টি ওর দিকে। পাশে বসা বুড়োর চোখ-মুখে তখন অপার বিম্ময়। অদ্ভুত আনন্দ। এত সহজে ছেলেটা সুর তোলা শিখে ফেলল!

নিবারণ দাস যে কদিন বেঁচে ছিল নিজের ছেলের মত আগলে রেখেছিল গোবিন্দকে। একসঙ্গে হাটে হাটে ঘোরাফেরা। আজ বাগজোলার হাট তো কাল চাতরা হাট। সবাই জেনেছিল সঙ্গের ছেলেটা ওর নিজের সন্তান। নিবারণও সেই পরিচয় দিত সবাইকে।

যেদিন সন্ধ্যায় বুকে ব্যথা উঠল নিবারণ দাসের, সঙ্গে বড় বড় শ্বাস, পাশে বসে থাকা গোবিন্দর হাতটা জাপটে ধরেছিল খড়কুটোর মত। হয়তো ভেতর থেকে টের পেয়েছিল কিছু, বুঝেছিল আয়ু ফুরিয়ে আসছে। সেদিন শিমুল গাছটার গোড়ায় মাথা রেখে নিজের শেষ ইচ্ছের কথা শুনিয়েছিল নিবারণ। মাথার ওপরে তখন মস্ত চাঁদ। চারদিকে ভেসে বেড়ানো আলো। লম্বা লম্বা দম নিয়ে নিবারণ বলেছিল, সারেঙ্গিটা দিয়ে গেলাম বাপ। ওরে বুকে আগলে রাখিস। সুর তুলিস। শত কষ্টেও অবহেলা করিসনে যেন।

নিবারণ দাসের সেই শেষ কথাগুলি আজও মনে আছে গোবিন্দর। এখনও তো মন খারাপের সঙ্গী ওই সারেঙ্গিটা। যাকে নিজের সন্তানের মত আগলে রেখেছে। সময় সুযোগ মিললে তাতে সুর তোলে কখনও সখনও৷ তখন ভেতরটা হালকা হয়ে যায়। সবকিছু গলে যায়। এই এতদিন পরেও । পেশাটা বদলে গেলেও সুর সেই একরকম রয়ে গেছে। গোবিন্দর ভেতরে জড়িয়ে আছে যেন। সেই সুরকে আলগা করা যায় না কোনভাবে।

 

দুই

সকাল থেকেই গোবিন্দর দোকান ঘিরে খদ্দেরদের ভিড় বাড়তে থাকে। এমনকী হাটবারের দিনগুলি বাদ দিলেও বাজারে ক্রেতা-বিক্রেতার ভিড় লেগে থাকে। একে একে ভরে ওঠে দোকানের ফাঁকা বেঞ্চগুলি। তখন খদ্দেরদের হাঁক-ডাকে সরগরম হয়ে ওঠে দোকান। গোবিন্দর ব্যস্ততাও বাড়তে থাকে বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে।

এরই মধ্যে আসে পরিমল মিস্ত্রি, গৌরাঙ্গ গোসাইরা। গোবিন্দর ভালো-মন্দের খোঁজখবর নেয়। গরম চায়ে চুমুক দিয়ে গান-বাজনার খবর শোনায়। শেষ শুক্রবার ঘোষবাড়ির আসরটা কেমন জমে উঠেছিল। বাসুদেবের গলাটা কি একটু বেশি চড়া স্বর তুলেছিল? বলরামের বাজনার হাতটা কেমন আসর জমাতে পেরেছিল, আরও কত কথা। ওদের দলের প্রায় সবার কথা উঠে আসে একে একে। গোবিন্দর কথাও ওঠে শেষে। পরিমল বলে, তুই থাকলে আসরটা আরও জমিয়ে দিতে পারতিস গোবিন্দ। ঘোষপাড়ার মানুষগুলি গানবাজনা যে এত ভালোবাসে, আগে কখনও দেখিনি।

গৌরাঙ্গ বলে ওঠে, এমন লোকজন আছে বলে গানবাজনা এখনও বেঁচে আছে। আর আমাদের মতন কেন্তন দলগুলোও।

গোবিন্দর ভেতরটা মোচড় দিয়ে ওঠে। গানবাজনার প্রতি বরাবরই সে দুর্বল। তবু সেই দুর্বলতা উপেক্ষা করে হাটের দিনে দোকান সামলাতে হয়। দমিয়ে রাখা শখটাকে চাপা দিতে হয় ফুটন্ত জল, দুধ, চা-পাতা আর চিনির পরিমাপে। এছাড়া যে উপায় থাকে না। মনটাকে সান্ত্বনা দিতে বলে ওঠে, গানবাজনায় মন ভরলেও এখন আর পেট ভরে না রে পরি। তাছাড়া ঘরের লোকগুলির কথাও তো ভাবতে হয়।

কি‌‌ন্তু দোকান করার পরেও সে কত বার দলের হয়ে কত জায়গায় ঘুরেছে। এই পরিমল আর গৌরাঙ্গ ওর বাজনা শুনে দলে টেনে নিয়েছে একদিন। সেই থেকে কত আসরে সারেঙ্গি বাজিয়ে লোকজনকে মুগ্ধ করেছে। তখন তো কেউ কেউ দর্শক আসন থেকে উঠে এসে ওর গলায় মালা পর্যন্ত পড়িয়ে দিয়েছে। সেই মালার মূল্য কি টাকাপয়সা দিয়ে মাপার!

তাই বলে যে সবসময় ভালো ভালো কথা শুনতে হয়েছে তাও নয়। কীর্তন দল করে বলে অন্য রকম ঈঙ্গিতও করেছে কেউ কেউ। সেই অল্প বয়সে মা-বাবাকে হারিয়ে দেশ ছেড়ে এসে। সেই সব অস্পষ্ট দিনের ছবি। একমাত্র উজ্জ্বল শুধু নিবারণ দাসের মুখটা। ওই তো একমাত্র খুঁটি ছিল ওর জীবনের । যাকে জড়িয়ে ধরে এই একটু একটু করে উঠে দৌড়াতে শেখা। মাথা গোজার একচিলতে ঠাই খুঁজে পাওয়া। তার পর নতুন দোকান, নতুন সংসার গড়া। জীবনের আরেক লড়াইয়ে নেমে পড়া সবকিছু নিয়ে।

 

তিন

দুপুরের পর বাজারটা কেমন ঝিমিয়ে যায়। এই সময় গোবিন্দও খানিকটা অবসর পায়। দুটো সেদ্ধ ভাত মুখে তুলে নেয়। পেট ঠাণ্ডা হলে মনটাকেও আরাম দিতে চায়। কি ভেবে যন্ত্রটাকে হাতে তুলে নেয়। নিজের মত করে সুর বেঁধে যায়।

সেই নিবিড় সময়ে লোকটা এসে দাঁড়ায়। ফাঁকা বেঞ্চটায় এসে বসে। গোবিন্দকে দেখে। গোবিন্দও সেদিকে তাকায়। লোকটার গায়ের চামড়া পুড়ে যাওয়া, রোদে গোটানো। মাথায় উসকোখুসকো চুল। চোখ মুখে ক্লান্তির ছাপ। আবার সেই চেহারায় কোথায় যেন লুকানো ভরা অতীতের ছাপ। এমন লোক তো আশপাশের মানুষ নয়!

চায়ের জন্য নয়। এক গ্লাস জল খেতে এসেছে লোকটা। সেই জল বাড়িয়ে দিয়ে জিজ্ঞেস করে গোবিন্দ, তা গোঁসাইয়ের কোথায় থাকা হয়?

পুরো জলটা শেষ করে তৃপ্তি ছড়িয়ে যায় ওর মুখে। একটু থেমে বলে, সে মেলা পথ, চন্দর বিলের নাম শুনিচ। সেই চন্দর বিলের ওধারে।

গোবিন্দর নামটা বড্ড চেনা মনে হয়। সে তো ফেলে আসা দেশের পথ। সেই সীমান্ত পেরিয়ে আরও দূরের । এক শীতের রাতে সেই বিল ধরে ফিরেছিল গোবিন্দ। চন্দর বিল তো বিল নয়, যেন এক সাগর! অথচ কি মায়ায় জড়ানো সে জল। রাতটাকে ভরিয়ে দিয়েছিল স্বচ্ছ জল আর শীতল বাতাসে। সেই হাড় হিম রাতে চারদিকে কুয়াশা কেটে এগিয়ে গিয়েছিল ওরা। চারদিকে ছড়ানো মায়া। সেই জলই যেন আগলে রেখেছিল সারাটা পথ।

গোবিন্দ বলে ওঠে, এতটা পথ তুমি এলে কী ভাবে?

সেই শুকনো মুখেও একগাল হাসি ছড়িয়ে দেয় লোকটা। হাসতে হাসতেই বলে, চলি আলাম, এই ঘুরতি ঘুরতি।

সে কী কথা গো! তুমি কি ঘুরে-ফিরে বেড়াও নাকি? তোমার ঘর বাড়ি নাই? ছেলেমেয়েরা কিছু বলে না?’’

ওর ঠোট দুটো কেঁপে ওঠে। কপাল জুড়ে নামে একটা ছায়া। বলে, কওনের আর আছে কে কও। বেবাকে তো মেলা দিন নিরুদ্দেশ!

গোবিন্দ অবাক হয়। কি বলছে লোকটা। নিরুদ্দেশ মানে কি? ওর ছেলেমেয়েরা কি সব হারিয়ে গেছে? তাদের এখন খুঁজে বেড়াচ্ছে একা এভাবে!

লোকটা এবার গোবিন্দকে থামায়। বলে ওঠে, আমার কথা বাদ দাও, তোমার কথা কও দিখিনি। তোমার না একটা মাইয়া আছেই হ্যায় কত বড় হইল এখন?

অবাক হয় গোবিন্দ। ওর যে একটা মেয়ে আছে সেটা জানে লোকটা!

আর তোমার সেই পাখিটা? ময়নামতী না কি জানি নাম?

গোবিন্দর হাত থেকে বাজনাটা পড়ে যায়। কি যে‌ন সুর তুলছিল সে। সেই চন্দর বিল ধরে ফেরার পথে। কখন যে ভেতরটা কেঁদে ওঠে। সেই এক বুক জলের ভেতরেই ময়নামতীকে উড়িয়ে দিয়েছিল মুক্ত বাতাসে। যেন ময়নামতী পাখিকে নয়, নিজের ভেতরটাই উড়িয়ে দিয়েছিল সে। অথচ কী আশ্চর্য এত দিনের পোশা পাখিটা ছাড়তে চায়নি গোবিন্দকে। ঢেউ তুলেছিল বিলের জলে। আছড়ে পড়েছিল পাড়ে এসে। সমস্ত নিস্তব্ধতাকে ভেঙে দিয়েছিল।

গোবিন্দ বলে, এসব কথা তুমি জানলে কি করে গোঁসাই?

লোকটা ততক্ষণে উঠে দাঁড়ায়। চলে যাওয়ার আগে শুধু বলে যায়, আমারে চিনলি নে বাপ! আমারে চিনলি নে! এই এত বছরে ব্যাবাক ভুইল্যা গেলি?

 

চার

সন্ধ্যের পর আঁধার নামে শিমুলপুর বাজার জুড়ে। সেই আঁধার পেরিয়ে গাছপালার ফাঁক গলে উঁকি দেয় একফালি চাঁদ। গোবিন্দর স্মৃতিতে ভেসে ওঠে সেই কালো রাত পেরিয়ে নতুন দিনের আলো। অচেনা ভোর। ফেলে আসা শিকড়ের ছবি। সেই ঝাপসা ছবিটাকেই জাপটে ধরতে চায়। প্রবল ভাবে ছুঁয়ে দেখতে চায় সেই মাটিকে। সেই হারিয়ে যাওয়া মানুষগুলোকে। ময়নামতীকে। এত দিন ধামাচাপা পড়ে থাকা এই দোকানে, এই শিমুলপুরের বাজার পেরিয়ে চন্দর বিল ছাড়িয়ে দূরের অন্য কোনও জগতে।

এই ফিরে যাওয়ার সময়ও একমাত্র যন্ত্রটাই ওর সঙ্গী হয়ে থাকে। হয়ত বাকিটা পথ পেরিয়ে যাওয়ার জন্যও।

0 Comments

Post Comment