পড়শি যদি আমায় ছুঁতো যম যাতনা সকল যেত দূরে: লালন সাঁই

পড়শি যদি আমায় ছুঁতো যম যাতনা সকল যেত দূরে: লালন সাঁই

hhhhhhhhhhhhhh

একটি কাঁঠাল ও পাকিস্তানের গল্প

  • 13 November, 2022
  • 0 Comment(s)
  • 667 view(s)
  • লিখেছেন : দেবতোষ দাশ
সুর করে লক্ষ্মীর পাঁচালি পড়তে পড়তেই অযাচিত শব্দ কানে আসে ঊষারানির, যে-শব্দের উৎস নিয়ে তিনি নিশ্চিত নন, যেন দূরের কোনও মন্দির থেকে ভেসে আসছে ঘণ্টাধ্বনি। হয়ত-বা পূজায় বা পাঁচালির সুরে তিনি এমনই বিভোর যে ঘন্টাধ্বনি ছাড়া অন্য কোনও শব্দের কথা মাথাতেই আসে না। সেই শব্দ বা শব্দের অনুরণন পাঁচালির সুরকে অতিক্রম করবেই এত নাছোড়, যদিও সেই শব্দ আপাতত তাঁর বিচলনের কারণ হতে পারে না, ফলত ঊষারানি পাঁচালি থামান না, অবিকৃত রাখেন সুরও, কেবল সেই সুরের মধ্যে, পাঁচালির মধ্যে ঢুকে পড়ে সেই ধ্বনি।

অকস্মাৎ দেবর্ষি নারায়ণ স্বরে।

আসিলেন ভক্তি চিত্তে বৈকুন্ঠ নগরে।।

প্রণাম করি দেবর্ষি বলেন বচন।

মর্ত্যে দুর্ভিক্ষ মাগো কী ভীষণ।।

ঋষি বলে মা তুমি চঞ্চলা মন।

সর্বদা ঘোরো ভবন হতে ভবন।।

 

ঊষারানি ডুবে যান তাঁর পূজায়, কিন্তু অকস্মাৎ বন্ধ হয়ে যায় সেই শব্দ যা তিনি দূরাগত কোনও মন্দির-ধ্বনি ভেবে বসেছিলেন। হঠাৎই যেমন ঢুকে পড়েছিল পাঁচালিতে, তেমনই ঝপ করে পাঁচালির সুর থেকে খসে পড়ে অবাঞ্ছিত অনুনাদ। বন্ধ হওয়া সেই ধ্বনি ও তার অনুরণন তবুও মিশে থাকে পাঁচালির সুরে যেভাবে মৃতের স্মৃতি মিশে থাকে জীবিতের অস্তিত্বে।

 

তাই মর্ত্যবাসী কষ্ট কত পায়।

দেখি তাহা কেমনে মম প্রাণে সয়।।

অন্নাভাবে লোকে কত কষ্ট ভোগে।

মরিতেছে অনাহারে কৃশকায় রোগে।।

ধর্মাধর্ম লোকে সবে ত্যাগ করি দেয়।

স্ত্রী কন্যা বিক্রি করে ক্ষুধার জ্বালায়।।

দুর্ভিক্ষে হইল শেষ মরে জীবগণ।

দয়া করে মাগো তুমি করো নিবারণ।।

 

ফের শব্দ। পাঁচালি থামিয়ে চোখ মুদে ঠাহর করতে সময় নেন ঊষারানি। দরজাঘন্টি বাজছে। পরপর বারকতক বেজে থেমে যায়। খানিক বিরতি নিয়ে আবার বাজে। এত সকাল সকাল ঘণ্টি বাজায় কে? রাঁধুনি মেয়েটা বোধহয় নীচে মাছ ধুতে গিয়েছে, ছাদ-বাগানে জল দিচ্ছে বৌমা, বাজার থেকে ফিরে ছেলে নির্ঘাৎ ল্যাপটপ নিয়ে মগ্ন, নাতনি পড়ছে, পুজো বন্ধ করে দোতলা থেকেই, তৃতীয়বার বিরতি নিয়ে যখন ঘন্টি ফের বাজতে শুরু করেছে তারস্বরে, গলা তোলেন ঊষারানি,

‘ওরে দ্যাখ তো কে এলো এই সকালে? র-মা-আ-আ-আ!’

রমা মাছের পাত্র সিঁড়িতে রেখে, দৌড়ে সদর দরজা পেরিয়ে, গ্রিল ঘেরা বারান্দায় সরেজমিনে যায় সাতসকালের আগন্তুককে দেখতে। গ্রিলের দরজায় তালা। বাইরে দাঁড়িয়ে আছে অচেনা এক লোক যার হাতে একটা আস্ত কাঁঠাল আর মুখে খানিক হাসি লেগে আছে কাঁঠালের আঠার মতো। রমার চোখে প্রশ্ন দেখে লোকটি বলল, ‘জ্যাঠামশাই পাঠাল।’

‘কোন জ্যাঠামশাই?’

‘সরকার বাড়ির – মেলা হয়েছে – আজ পাড়া হল – কাল-পরশুই খেতে পারবে – খাজা - জ্যাঠা বলল দিয়ে আয় – গলির শেষ বাড়ি – জিগাইলে কইস সরকারবাবু পাঠাইসে -’ বলতে বলতে হাসির মাত্রা আরও কিছুটা বাড়ায় লোকটা।

চাবি এনে গ্রিলের দরজা খোলে রমা। লোকটার হাত থেকে মস্ত কাঁঠালটা নিয়ে বারান্দার দেওয়ালে ঠেস দিয়ে রাখে আর ততক্ষণ হাসিমুখে চেয়ে থাকে কাঁঠাল-বাহক। রমার কাঁঠাল-রাখা সম্পন্ন হতেই দাঁড়ায় না সে। একটা সাইকেল ভ্যান নিয়ে ঘুরছে পাড়ার এমাথা-ওমাথা। গ্রীষ্মে প্রতিবেশীদের কাঁঠাল বিলি করছেন সরকারবাবু।

‘কে রে রমা?’ পুজো সেরে সিঁড়ি দিয়ে নীচে নামতে নামতে বলেন ঊষারানি।

‘কাঁঠাল দিয়ে গেল।’

‘কে?’

‘একটা লোক, চিনি না, বলল সরকারবাবু পাঠিয়েছে।’

নধর কাঁঠালটার দিকে তাকিয়ে ঊষারানির মনে পড়ে যায় সরকারবাবুর প্রাচীন চেহারা ও মুখমণ্ডল যে-প্রাচীনতায় কেবলই জন্মভিটের প্রতি উচাটন, পুনরুক্তি আর খেদ, ফলত ঊষারানির সময় মুহূর্তে স্থিতিবান ও স্মৃতি-উদ্রেককারী। প্রতি আষাঢ় মাসেই সরকারদা গাছের কাঁঠাল দিয়ে যান মানে দিয়ে যেতেন আরকী যদিও গত বছর দুয়েক বোধহয় দিতে পারেননি। দিয়েছেন কী দেননি, এই স্মৃতিও ঊষারানির নেই। বেমালুম একটা মানুষকে ভুলে যাওয়ার বেদনা মালুম হয় ঊষারানির, কাঁঠালটা সেই বেদনা মনে করিয়ে দিয়ে ক্রমশ অস্তিত্বমুখর। তার রসসিক্ত বোঁটা খবরের কাগজের টুকরো দিয়ে মোড়া। পুষ্ট সেই তাজা ফলের গা দিয়ে বেরোচ্ছে হলদে-সবুজ আভা। সেই আভায় মিশে যাচ্ছে হাসিমুখী এক মুখ। সরকারদার মুখ।  

‘ওপরে নিয়ে যা।’ রমাকে সংক্ষিপ্ত নির্দেশ দিয়ে ফের ওপরে উঠে যান ঊষারানি।           

নিজের ঘরে গিয়ে বিছানায় বসেন। কোনও অদৃশ্য প্রোজেক্টর থেকে পর্দায় ফুটে ওঠে ছবির পর ছবি। বিবর্ণ পর্দায় ফের ফিরে আসে অপগত স্মৃতির দল। তারা ডানা মেলে প্রজাপতির মতো উড়ে বেড়ায়। ছবির সেই কোলাজের ভিতর ঢুকে পড়েন ঊষারানি। কেমন আছেন সরকারদা? প্রতি জৈষ্ঠ মাসে কাঁঠাল নিজেই দিয়ে যেতেন কিছুদিন আগেও। ভাদ্র মাসে তাল। শীতকালে লাউ। মাঝে মাঝে গাছের নারকেলও। এসে দু’দণ্ড বসতেন। চা করে দিতেন ঊষারানি।  চা খেতে খেতে তাঁর স্বামীর সঙ্গে গল্প। যোগ দিতেন ঊষারানিও। হেসে হেসে বলতেন ‘আমগো নাই-রাজ্যের গল্প’। ঊষারানির স্বামী মারা যাওয়ার পরও আসতেন সরকারদা। মরশুমি ফল-পাকড়া বা সব্জি নিয়ে নিয়মিত হয়ত আসতেন না বা আসতে পারতেন না। কিন্তু প্রতি জৈষ্ঠে কাঁঠাল একটা দিয়ে যাবেনই। সে-ও বন্ধ হয়ে গিয়েছিল গত দু’বছর। বয়সের ভার ও অতিমারি-আবহে গত দুই সন বাড়ির বাইরে পা দেননি অতীন্দ্র সরকার। অসুখে-বিসুখে, ত্রাসে-হতাশে, ক্রমাগত ব্যক্তিগত কোটরে ঢুকে গিয়ে ঊষারানি ভুলেই গিয়েছিলেন সরকারদার কথা। গত দু’বছর যে সরকারদার গাছ থেকে জৈষ্ঠের কাঁঠাল আসেনি, সম্পূর্ণ বিস্মৃত হয়েছিলেন। কী করে ভুলে গেলেন সরকারদার কথা! ঊষারানি লজ্জিত হন। বেদনা টপকে নিজের মাথার ভিতরে ঘুরপাক খায় লজ্জা। সরকারদাকে নিয়ে দুটো কথা বলবেন, এর-তার কাছে কুশল জেনে নিয়ে স্বস্তির শ্বাস ছাড়বেন, সেই উপায়ও নেই। যাঁর সঙ্গে বলবেন তিনিও তো আজ আর নেই। বস্তুত, বছর চারেক আগে স্বামী মারা যাওয়ার পর তিনি নিজস্ব বলয় ছেড়ে বড় একটা বেরোননি। কিন্তু একটা সবজে-হলুদ কাঁঠাল আজ এক লহমায় ঢুকে পড়ে ঊষারানির ব্যক্তিগত ব্যূহে। কেবল ঢুকেই পড়ে না, মুহূর্তে ফাটল ধরিয়ে দেয় তাঁর গোপন বিন্যাসে। কেন এত গ্লানি ঘিরে ফেলতে পারল তাঁকে, কেন অবসাদ, কেন অপরাধবোধ ছেয়ে যাচ্ছে শ্রাবণের মেঘের মতো। নিজের প্রতিবেশ থেকে একদা-সুহৃদকে কীভাবে সরিয়ে ফেলতে পারলেন তিনি, অপরাধবোধ কি এইজন্যই? আর পাঠালেন তো পাঠালেন, মানুষটার মৃত্যু-দিনেই কাঁঠাল পাঠালেন সরকারদা, যেন তাঁর বন্ধু এখনও অস্তিত্ব রক্ষা করছেন, বেঁচে আছেন, তার বার্তা।        

 

কাঁঠাল দিতে যে এসেছিল, সে চলে গিয়েছে। রমা তাকে জিজ্ঞেস করেনি সরকারদার কথা। কোলে করে রমা ওপরে নিয়ে আসে মস্ত ভারি কাঁঠাল। একটা কাঁঠাল কেমন লজ্জা ও অস্বস্তির চিহ্ন হয়ে গেল নিমেষে। রমাকে বললেন, কাঁঠালটাকে তিনতলার সিঁড়ির ল্যান্ডিং-এ কাপড়ের টুকরোর ওপর যত্ন করে দাঁড় করিয়ে রাখতে। যেন কাঁঠালটার যত্ন মানে সরকারদার যত্ন। সরকারদার কুশল জিজ্ঞাসা। পূর্ববঙ্গে তাঁর স্বামীর দেশেই বাড়ি ওঁরও। তখন এক জেলাই ছিল। নোয়াখালি। তাঁর শ্বশুরকুলের ঘর ফেনী সাব-ডিভিশন। সরকারদার সদর সাব-ডিভিশনের লক্ষ্মীপুর। ফেনী তো হয়েছেই, এখন না কি স্বাধীন বাংলাদেশে লক্ষ্মীপুরও আলাদা জেলা। গল্পে গল্পে একদিন সরকারদাই বলেছিলেন। গিয়েও ছিলেন তিনি বাংলাদেশ। ফেলে আসা স্মৃতি ছুঁতে। মন ভরেনি।

 

‘বুঝলা অনিল, ব্যাক পরিবর্তন হই গেসে!’ তাঁর স্বামীর উদ্দেশে সরকারদার খেদোক্তি। উনি হেসেছিলেন শুনে। মৃদু। ‘ভালাই কইরস না-যাই, আঁরও অহন মন কয় ক্যান গেলাম, কী দেইখতে গেলাম! যাইতে না-যাইতে কাতার দি ঘিরি হালাইল হেতারা! য্যান দাবি লই ফিরি আইসি! ঢাকার থুনই কইসিল, যাইয়েন না, ভালা লাইগব না! তবু, একবার চোখের দেখা আরকী, নিজের বসত – ফিরি আই ভাবি কিয়ের লাই যাওনের এত তাড়না আইলো, জানি না অনিল!’

 

অনিল জবাবে অতীন্দ্র সরকারকে কিছুই বলেন না, ঊষারানিকে বলেন, ‘চা খাওয়াইবা না সরকারদারে?’

‘শুধু চা ক্যান, টা-ও খাওয়াইমু।’

 

হাসতে হাসতে চলে যান ঊষারানি, পরক্ষণেই কাজের মেয়েটিকে নিয়ে ফিরেও আসেন, হাসিমুখেই। ‘পাটপাতার বড়া করেছি আজ, কাসুন্দ দিয়ে খান।’

 

অবাক অতীন্দ্র সরকারের দৃষ্টি নিক্ষিপ্ত হয় একবার ঊষারানি, তারপর অনিলের দিকে।

 

‘আইজ পাইলাম বাজারে, বহুদিন পর।’ জবাবের ভার নেন অনিল ঈষৎ তৃপ্তিসহ, কারণ পাটপাতা তো আর কেবল পাতা নয়, অতীত ছুঁয়ে আছে সেই হরিৎ পত্রগুচ্ছ।

 

‘হেইদিন গরমাতুরি বাটা দিল আমগো অঞ্জনা, সাধনের পোলার বউ, এক থালা ভাত ওই দি-ই খাই হালাইলাম!’ কাসুন্দি মেখে পাটপাতার বড়া মুখে দিয়ে ঊষারানির দিকে চেয়ে বলেন, ‘কতদিন পরে খাইলাম বৌমা, হেই মাইয়াই কি কইরল, তুমি তো রান্ধ না?’

হাসেন ঊষারানি। ‘দেখিয়ে দিতে হয়, মেয়েটা ভালো, চট করে ধরে নিতে পারে।’

 

আর টুকরো নয়, পুরো বড়াটাই মুখে পুরে দেন অতীন্দ্র। ঊষারানি দেখেন, মুখগহ্বরে দাঁত আর জিভের আন্দোলন, চোখ-মুখ ক্রমাগত উজ্জ্বল করে তোলে সরকারদার। তৃপ্তি পান ঊষারানি। চায়ের কাপে চুমুক দেন অনিল।

 

‘সাধনদার লগে বাজারে দেখা হয়। বিভিন্ন শাক আর চুনা মাছ টোকায়। গোটা বাজার ঘুরি ফালায়।’ হেসে বলেন অনিল।

‘যত বয়স বাড়ে পাকিস্তানের কথা ক্যান মনে আসে অনিল?

 

সুড়ুৎ শব্দে চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে প্রশ্ন সরকারদার। যেন প্রশ্ন নয়, স্বগতোক্তি, উত্তরের তোয়াক্কা না-করা জিজ্ঞাসা। প্রস্তাবনা তৈরি হচ্ছিল, যেন এমন বাক্য আসবেই অবধারিত, ঊষারানি দুই ভাসমান বৃদ্ধের মাঝে দর্শক-শ্রোতা, পরবর্তী দৃশ্য বা সংলাপে যাঁর কোনও অতিরিক্ত কৌতূহল নেই, সামান্য দীর্ঘশ্বাস ছাড়া। সেই শ্বাস, মধ্যবর্তী শূন্যতায় আঁক টেনে দেয় যেভাবে আঁচড় পড়ে যায় বহুশ্রুত এলপি রেকর্ডে। ঊষারানি জানেন, শ্রাবণ মাসের হঠাৎ-বৃষ্টির মতো অকস্মাৎ  আবির্ভূত এই প্রশ্নের জবাব সঙ্গে সঙ্গে দেবেন না অনিল। বস্তুত কীই-বা প্রত্যুত্তর হয় এই প্রশ্নের? যতবারই এই প্রশ্ন আসে, সময় নিয়ে অনিল বলেন বিভিন্ন বাক্য, যেন সরকারদাকে কিছুটা সান্ত্বনা দিতেই মনে মনে শব্দ সাজিয়ে নিতে যেটুকু কালক্ষেপ। ‘মনে করে আর কী হবে দাদা, নাতি-নাতনিকে নিয়ে আনন্দে বাঁচেন! আমি ওইসব মনেও আনি না।’ এমনই কিছু বলবেন, জানেন ঊষারানি, কিন্তু সেদিন, চায়ে ফের চুমুক দিয়ে অনিল বললেন, স্মিত হেসে, ‘পাকিস্তান শুনি আমার নাতনি তো হাসে, কয় তোমরা পাকিস্তানে থাকতে!’ ঘর ফাটিয়ে হাসতে থাকেন সরকারদা, ‘কথা ভুল না অনিল, একোই দ্যাশের নাম কখনও পুব্ববঙ্গ, পুব্ব-পাকিস্তান আবার অহন বাংলাদেশ। আঁরা পুব্ববঙ্গের, পুব্ব-পাকিস্তানের অথচ বাংলাদেশের কেউ না! একোই মাটি!’       

 

স্থবিরতা থেকে মুক্ত হন ঊষারানি। আজ শনিবার। ছেলের অফিসের তাড়া নেই। নাতনিরও স্কুল ছুটি। জলখাবারের পাট চুকিয়ে, দশটা বাজতেই প্রস্তুতি শুরু করেন। রান্নাঘরে গিয়ে ফ্রিজ খুলে বার করেন ছোট্ট একটি পাত্র। গতকাল কাঁচকলার খোসাবাটা করেছিল রমা। আজ হয়েছে মুসুরির ডালের বড়া দিয়ে মোচা, পটল ভাজা, লেবু পাতা দিয়ে মুগ ডাল, পার্শে মাছের ঝালসহ আরও দু’একটি পদ। সব পদই তাঁর স্বামীর প্রিয়। আজকের দিনের জন্য স্পেশাল মেনু। যত্ন করে টিফিন বাক্সে ভরেন ঊষারানি। তাঁতের একটা শাড়ি ভাঙেন, নাতনির কৌতূহলী চোখের দিকে তাকিয়ে বলেন, ‘চল তো মুনাই, আমার সঙ্গে চল।’

‘কোথায় ঠাম্মি?’

‘চল না!’

 

সাধনদাও আর নেই, মারা গিয়েছেন তাঁর স্বামীর মৃত্যুর পরপরই। একদা কী জমজমাট ছিল এই পাড়া। পূর্ববঙ্গ থেকে আগত উদ্বাস্তু পরিবারের ঠাঁই এই শহরতলী, যারা কেউই স্বাধীনতার অব্যবহিত আগে বা পরে দেশ ছাড়েনি, প্রত্যেক পরিবার এসেছে বা আসতে বাধ্য হয়েছে স্বাধীনতার বেশ কিছুকাল পরেই। তখন আর পূর্ববঙ্গ নয়, পূর্ব পাকিস্তান। পাকিস্তানের নাগরিক থেকে ইন্ডিয়ার নাগরিক বনে যাওয়া বাস্তুহারার দলের মাথার ভিতরেও আধাআধি কাঁটাতারের বেড়া, কিছুটা পাকিস্তান, কিছুটা হিন্দুস্থান।

 

নাতনির সঙ্গে হাঁটতে হাঁটতে ঊষারানি দু’দিকে তাকান। বউ হয়ে এপাড়ায় আসা ইস্তক তিনি দেখেছেন পরস্পর বেঁধেবেঁধে থাকাটাই ছিল দস্তুর। আজ বাঁধনহারা সেই পাড়া কৌম কোলাহল হারিয়ে মৃতবৎ। শ্রাবণের হঠাৎ-বৃষ্টিতে মাথা বাঁচাতে অকুণ্ঠ ঢুকে পড়া যেত যেকোনও বাড়িতে, আজ সেইসব বাড়ি ঘিরে সীমানা মেপে পাঁচিল তুলে দিয়ে চলে গিয়েছে কোনও স্বার্থপর দৈত্য। আস্ত একটা অখণ্ড ভদ্রাসন খণ্ড খণ্ড বাড়িতে বিভক্ত হয়ে গেল কীভাবে, কবে? দায় উষারানির উপরও বর্তায় বৈকি, তিনিও ভিন্ন হয়ে আশ্রয় নিয়েছিলেন নিজস্ব কোটরে। ঊষারানি নাতনির হাত ধরে পা চালান।

‘দাদুনের সেই পাকিস্তানের বন্ধুর বাড়ি?’

নাতনির কথায় হেসে সায় দেন ঊষারানি। রাস্তার দু’দিকে পাঁচিলের মাঝে নিস্তব্ধ বড় বড় ফটকগুলি দেখেই মনে হয়, এগুলো তৈরিই হয়েছে চেনা-অচেনাকে আহ্বান করতে নয়, প্রবেশ প্রতিহত করতে। পয়লা বৈশাখে এজমালি পুকুরে পড়ত বেড়, দু’তিন কেজির রুই-কাতলা আর মৌরলা মাছের ভাগ থরে থরে সাজিয়ে ভাগিদারদের হাতে তুলে দিতেন সাধনদা আর সরকারদা। এখনও বেড় দেয়, জালের মাঝে লাফায় রুই-কাতল-মৃগেল? দোলের সময় গণ্ডিহীন সব বাড়ির উঠোনে উঠোনে ছড়িয়ে পড়ত রঙ, আবিরের সঙ্গে মিশে যত ফুটকড়াই। এখনও খেলা হয় রঙ? আবির মিশে যায় বাতাসে? আর দুটো বাড়ি পরেই সরকারদার বাড়ি। ডানহাতে গায়ে আঁচল টানেন ঊষারানি।  

বেরঙ সেই প্রাচীন মানুষটির কাছে গিয়ে আজ দাঁড়াবেন বহুদিন পরে যিনি গল্পে গল্পে বলবেন, যেন অবধারিত, বয়স বাড়ার লগে লগে পাকিস্তানের কথা ক্যান এত মনে পড়ে কইতে পার বৌমা!  

 

শারদীয় কথাসাহিত্য ২০২২-এ প্রকাশিত

0 Comments

Post Comment