পড়শি যদি আমায় ছুঁতো যম যাতনা সকল যেত দূরে: লালন সাঁই

পড়শি যদি আমায় ছুঁতো যম যাতনা সকল যেত দূরে: লালন সাঁই

hhhhhhhhhhhhhh

সম্প্রীতি এবং সৌহার্দ্যের স্মৃতিতে খুশির উৎসব

  • 15 May, 2021
  • 0 Comment(s)
  • 560 view(s)
  • লিখেছেন : সেখ সাহেবুল হক
বাগদী পাড়ার রাধামাসী, অশোক কাকুদের কাছে ঈদ অন্যরকম খুশি বয়ে আনত। ঈদের নামাজের পর নাতি-নাতনীদের সঙ্গে করে বাড়িবাড়ি ঘুরে খুচরো পয়সা, লাচ্ছা-সিমুই প্লাস্টিকের প্যাকেটে ভরে বাড়ি নিয়ে যেতেন বাগদি বুড়ি। কমদামী শাড়িও জুটে যেত। বাবা-কাকাদের মাথায় হাত বুলিয়ে বলে যেতেন – 'পরের পাব্বোনে একটু দামী শাড়ি দিস বাপ। তুরাই মোর ব্যাটা। মোর ছেলেরা গোরিব, ঠাকুর তোদ্যার পয়সা দিইছে...।' অশোক কাকু, শশাঙ্ক কাকুরা আমাদের চাষবাস দেখাশোনা করতেন। ঈদ তাঁদের কাছে ‘বাবুদের উৎসব।’ প্রতিবার আবদার খুব সামান্য। একটা লুঙ্গি জুটে গেলেই বেজায় খুশি। জামা পেলে তো কথাই নেই। বেশ আয়েস করে লাচ্ছা-সিমুই খাওয়ার মধ্যেও তাঁদের মধ্যে গো মাংসের ছোঁয়াছুয়ির আশঙ্কা লক্ষ্য করতাম। অভয় দিয়ে বাবা-কাকারা বলতেন – “নির্ভয়ে খা ভাই। তোরা আসবি বলে এবেলা মুরগীর মাংস হয়েছে...।’


রমজানের দীর্ঘ অপেক্ষার পর ঈদ উল ফিতরের আগমন ঘটে। ইসলাম অনুসারীদের বিশ্বাস অনুযায়ী ঈদ সৃষ্টিকর্তার তরফে অমূল্য সওগাত। ছেলেবেলায় সব থেকে আনন্দের দিন ছিল বছর ঘুরে আসা দুই ঈদ। তবে কুরবানির ঈদ বা ঈদ উল আযহার তুলনায় রোজার ঈদ ছিল তুলনামূলক বেশি আনন্দের। দীর্ঘ প্রতীক্ষা, চাঁদ দেখা না দেখার অনিশ্চয়তা, দুশ্চিন্তা ও আনন্দ মিশে থাকত তাতে। উনত্রিশতম রোজার ইফতারটি ছিল ভিন্ন। সেদিন আর ইফতারে মন বসত না। কোনওমতে ইফতার সেরে দৌড় দিতাম ফাঁকা মাঠে, কিংবা বাড়ির ছাদে। তুতো ভাইবোন এবং পাড়ার বন্ধুদের নিয়ে একদৃষ্টিতে পশ্চিমে চেয়ে থাকতাম। পাতলা একফালি সরু চাঁদের অপেক্ষায়! কে আগে দেখতে পায় তা নিয়ে সে কী মজার প্রতিযোগিতা! সবার মধ্যে চাপা উত্তেজনা। অন্ধকার ঘনিয়ে আসছে। আকাশে চাঁদ খুঁজে পাচ্ছি না। চাঁদ দেখতে পেলে আর রোজা রাখতে হবে না। ঘোষণা হবে ঈদের।


দিল্লির জামা মসজিদের ঈমামের তরফে কী বার্তা এসেছে জানার জন্য রেডিওর সাড়ে সাতটার খবরে কান পেতে থাকত গোটা গ্রাম। স্থানীয় সংবাদে বিশেষভাবে উল্লেখ করা হত নাখোদা মসজিদ এবং টিপু সুলতান মসজিদের ইমামদের বক্তব্য। তারপর মসজিদের মাইকে জালাল চাচা হেঁকে উঠতেন, ‘মেহেরবানি করে শুনবেন, ঈদের চাঁদ দেখা যাওয়ায় আগামীকাল সকাল আটটায় ঈদ উল ফিতরের নামাজের জামাত অনুষ্টিত হবে। ইনশাল্লাহ!’
এই ঘোষণার পরই শুরু হত ঈদের তোড়জোড়। দিনভর নানা পেশার মানুষ একে একে গ্রামে ফিরছেন। ব্যাগভর্তি লাচ্ছা-সিমুই ও অন্যান্য উপকরণ, নতুন জামাকাপড়। ঈদ উপলক্ষে মেহেন্দি পরছেন যুবতীরা, দিদিদের ঘিরে কচিকাঁচাদের ভিড়। মোড়ে মোড়ে আড্ডার আবহ।


তখন পছন্দ অপছন্দের ব্যাপার ছিল না। বড়জোর মায়ের চিঠিতে পিতৃদেবের কাছে খবর পাঠানো যেত, ‘আব্বা জিন্সের প্যান্ট আনবে।’ চাকুরীজীবী কিংবা অবস্থাপন্ন ব্যক্তি বাদ দিলে গ্রামের গরীব বাবার কাছে বড় চ্যালেঞ্জ ছিল পরিবারের সবার জন্য জামাকাপড়ের ব্যবস্থা করে ওঠা। ওভারটাইম কিংবা ধারদেনা করে সবার জামাকাপড় নিয়ে বাড়ি ঢুকবেন গৃহকর্তা। অভাবের সংসারে তিনি পুরানো জামাকাপড় পরেই নামাজ পড়ে নেবেন প্রতিবারের মতো।

সকালে স্নান করে নতুন জামাকাপড় পরে মসজিদ কিংবা ঈদগাহের দিকে যাওয়ার প্রস্তুতি। নতুন জামাকাপড়ের সঙ্গে টুপি এবং বাহারি আতর। তুলোর ছোট টুকরোয় আতর দিয়ে কানে গুঁজে দিতেন আব্বা। সেইসঙ্গে হাতে কিছু টাকা দিতেন ঈমাম সাহেবকে সাম্মানিক হিসেবে দেওয়ার জন্য। এক প্রজন্ম অন্য প্রজন্মের হাত ধরে ঈদগাহে যাচ্ছে। অসুস্থ বৃদ্ধকে নতুন পোশাক পরিয়ে মসজিদে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা চলছে। গতিময় পা৷ ওজু করার পর গন্তব্য ঈদের ময়দান৷ লোকে লোকারণ্য চারপাশ৷ আতরের গন্ধে মাখামাখি৷ ইমাম সাহেব ঈদের গুরুত্ব এবং তাৎপর্য নিয়ে বয়ান দিলেন৷ দু'রাকাত নামাজের পর ঈদের বিশেষ খুৎবা পাঠ হবে।


নামাজের অঙ্গভঙ্গিগুলো বড়দের থেকে নকল করত বাচ্চারা৷ শেষকাতারে বাচ্চাদের গোলযোগ নামাজে ব্যাঘাত ঘটাতো ঠিকই, কিন্তু বাচ্চাদের উপস্থিতি ঈদের জামাতকে প্রাণবন্ত করে তুলত। নামাজের পর লম্বা মোনাজাত, সবশেষে কোলাকুলি৷ মিষ্টিমুখ হিসেবে প্লেটে সিন্নির ক্ষীর ভাগ করে খাওয়া চলছে। এক প্লেটে ভাগ করে খাচ্ছেন নানা অর্থনৈতিক শ্রেণির মানুষ। বড় মনোরম সাম্যবস্থা।
সবার মধ্যে পরিচ্ছন্নতা ও পবিত্রতার পরশ৷ ঈদগাহের একপ্রান্তে ভিক্ষুকদের জমায়েত৷ খুব মায়া লাগত তাঁদের কষ্টের জীবনের কথা ভেবে। পাঞ্জাবির পকেট থেকে খুচরো বের করে কোনও শিশু রেখে দিয়েছে বৃদ্ধার হাতে। এই ছোট্ট ছোট্ট উদ্যোগের মাধ্যমে তৈরি হত অভাবী মানুষের পাশে দাঁড়ানোর অভ্যাস।

নামাজ শেষে দেখতাম দুই ভাই আলমগির-বাসুন ঘুগনির পসরা নিয়ে বসে থাকত মসজিদের গেটের সামনে। কলাপাতায় পরবেশন করা একটাকার ঘুগনি। তালপাতা কেটে বানানো চামচে খেতে হত। ক্ষীর, লাচ্ছা-সিমুইয়ের জয়জয়কারের মাঝে হাতে হাতে ঘুরতো আলমগির-বাসুনের ঘুগনি। আলুকুচির মধ্যে গলে যাওয়া মটরে সেলিম-জাভেদের চিত্রনাট্য। অজ পাড়াগাঁয়ে ঘুগনিটুকুই ঈদের উপরি পাওনা। আধঘণ্টায় ফুরিয়ে যেতো সব।
বাসুন ছোট হলেও হিসেবে পাকা, আলমগির আগাগোড়া আনাড়ি। তাই বাসুন হিসেব রাখে আর আলমগির ঘুগনি দেয়। মাঝারি মাপের অ্যালুমিনিয়ামের হাঁড়ি ফুরিয়ে এলে একশো-দেড়শো টাকার সুপারহিট ব্যবসায় আলমগির-বাসুনদের ঈদের রোজগার। তারপর মাঠে গিয়ে বাসুনদের ভেতোপাড়ার সঙ্গে আমাদের ক্রিকেট ম্যাচ...। সবমিলিয়ে একটাকা-দুটাকার ঘুগনিতে হারিয়ে যাওয়া ছোটবেলার ঈদ।


বাগদী পাড়ার রাধামাসী, অশোক কাকুদের কাছে ঈদ অন্যরকম খুশি বয়ে আনত। ঈদের নামাজের পর নাতি-নাতনীদের সঙ্গে করে বাড়িবাড়ি ঘুরে খুচরো পয়সা, লাচ্ছা-সিমুই প্লাস্টিকের প্যাকেটে ভরে বাড়ি নিয়ে যেতেন বাগদি বুড়ি। কমদামী শাড়িও জুটে যেত। বাবা-কাকাদের মাথায় হাত বুলিয়ে বলে যেতেন – 'পরের পাব্বোনে একটু দামী শাড়ি দিস বাপ। তুরাই মোর ব্যাটা। মোর ছেলেরা গোরিব, ঠাকুর তোদ্যার পয়সা দিইছে...।' অশোক কাকু, শশাঙ্ক কাকুরা আমাদের চাষবাস দেখাশোনা করতেন। ঈদ তাঁদের কাছে ‘বাবুদের উৎসব।’ প্রতিবার আবদার খুব সামান্য। একটা লুঙ্গি জুটে গেলেই বেজায় খুশি। জামা পেলে তো কথাই নেই। বেশ আয়েস করে লাচ্ছা-সিমুই খাওয়ার মধ্যেও তাঁদের মধ্যে গো মাংসের ছোঁয়াছুয়ির আশঙ্কা লক্ষ্য করতাম। অভয় দিয়ে বাবা-কাকারা বলতেন – “নির্ভয়ে খা ভাই। তোরা আসবি বলে এবেলা মুরগীর মাংস হয়েছে...।’
মুসলিম বাড়ির লাচ্ছা-সিমুয়ের যে আবেদন, তা একমাত্র খাদ্যরসিকরাই জানেন। এটিকেই ঈদের অফিশিয়াল খাবার বলা চলে। ঈদের দাওয়াতে গিয়ে মুসলিম পরিবারের বউয়ের ঘোমটা সামলে - 'দাদা, আরেকটু সিমুই দিই। বাড়ির জন্য টিফিন ক্যারিয়ারে দিয়ে দিচ্ছি…।' এসব শুনবার পর কোথাও একটা পারস্পরিক আত্মীয়তার যোগসূত্র তৈরি হয়।

ধর্মীয় বিধান অনুযায়ী বিশেষ দান, যা ফিতরা নামে পরিচিত। ফিতরা নিতে আশেপাশের গ্রাম থেকে আসতেন মুসলিম মহিলারা। শোলবাগা, কাশমলির বাগদী পাড়ার প্রান্তিক মানুষেরা চিরকালই আমাদের আত্মীয় ছিলেন। ঈদের অপেক্ষা করতেন তাঁরা, আজও করেন। অশোক কাকুদের বয়স হয়েছে, রাধা মাসিরা আর আসতে পারেন না। ভক্তির মা প্রায় খুঁড়িয়ে হাঁটেন। অলিখিত অধিকারবোধে শাড়ি আদায় করেন পাতানো ছেলেদের কাছে। শাড়ি না পেলে পঞ্চাশ-একশো টাকাতেও খুশি হয়ে আশীর্বাদ করে যান।

ঈদে মনের কালিমা দূর করে ভেদাভেদ ভুলে, মান-অভিমান বিসর্জন দিয়ে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে নামাজে সামিল হন সবাই৷ রোজা রাখার মাধ্যমে মনের হিংসা, ঘৃণা, লোভ, অহংকার, অহমিকা, রাগ-ক্রোধ, বিদ্বেষসহ যাবতীয় কুপ্রবৃত্তি থেকে নিজেকে মুক্ত করার যে প্রয়াস তা পূর্ণতা পায় ঈদে। সাম্য, ভ্রাতৃত্ব, ঐক্য, সৌহার্দ্য-সম্প্রীতির প্রতিষ্ঠার বার্তা আসে।

মৌলিক ব্যাপারগুলো একই থাকলেও কালের নিয়মে ঈদের খুশিতে নানান সংযোজন হয়েছে। সোশ্যাল মিডিয়ায় ঈদের সেলফি, চিন্তাভাবনার আদানপ্রদান, খাদ্যতালিকায় সংযোজন, অর্থনৈতিক বিনিয়োগ বৃদ্ধি, ঈদসাহিত্য, ভাইজানের সিনেমা ইত্যাদি জায়গা করে নিয়েছে। ঈদের শুভেচ্ছা বিনিময় বা ঈদের সাজগোজে ভিন্ন ধর্মাবলম্বী মানুষের অংশগ্রহণ, মুসলিম বন্ধুর বাড়িতে জমিয়ে খাওয়াদাওয়ার চিত্র এখন নজরে পড়ার মতো। আজ থেকে পনেরো-কুড়ি বছর আগেও গ্রাম্য উৎসবে অশোক কাকুদের উপস্থিতি প্রশান্তি এনে দিত। সাদামাটা ঈদযাপনে সহাবস্থান ছিল। ‘প্রতিবেশীকে জানুন’ জাতীয় প্রচারের দরকার গ্রামেগঞ্জে কোনওদিনই সেভাবে পড়েনি। গ্রাম্য ক্যালেন্ডার সৌহার্দ্যের নিজস্ব পরিভাষা দিয়ে উৎসবে মিলিয়ে দিয়েছে বিভিন্ন ধর্ম এবং শ্রেণীর মানুষদের। ছোটবেলায় আলমগীর-বাসুনদের ঈদকেন্দ্রিক অর্থনৈতিক সংগ্রাম, ভক্তির মা বা শশাঙ্ককাকুদের ঈদে পরোক্ষভাবে সামিল হওয়া ঈদকে তখনও এক অন্যরকম নির্দেশতন্ত্রে দেখার সুযোগ করে দিত।

ঈদকে কেন্দ্র করে তৈরি হয় বিপুল ব্যবসায়িক ক্ষেত্র। কোভিডের কারণে তাতে অভূতপূর্ব প্রভাব পড়েছে। বাড়িতে কিংবা সামাজিক দূরত্ব মেনে ছোট জামাতের নামাজে চেনা খুশিটাই হারিয়ে গিয়েছিল গতবছর। এবার আরও ভয়ঙ্কর পরিস্থিতি, চারিদিকে মৃত্যুমিছিল। আবারও ঈদের নামাজ বাড়িতে পড়ার বার্তা, ছোট জমায়েতে কোভিডবিধি মেনে উৎসবে সামিল হওয়া।

লকডাউনে বন্দী জীবনে ঈদের স্মৃতিই সম্বল। পাড়ার হতদরিদ্র পরিবারের ছেলেটির নতুন জামাকাপড় না হওয়ার মনখারাপে আগলে রাখা শৈশব। সবার অলক্ষ্যে চুপিচুপি তার হাতে দিয়ে আসা দুটাকার কয়েন…। স্মৃতিমেদুরতায় ঈদের দিনের সন্ধে জেগে ওঠে। হ্যারিকেনের আলো জ্বালছেন দাদি। কিছুটা মনখারাপ তাঁর গলায়। আপন মনে বলছেন, ‘নামাজ হবে হবে করে হয়ে গেল। আসছে বচ্ছর আবার। যে বেচবে সে থেকবে।’ ‘যে বেচবে’ কথাটা মহামারীর মরশুমে বেশি করে ভাবাচ্ছে। সুস্থভাবে বেঁচে থাকাটাই আপাতত সবচেয়ে বড় উদযাপন।

কভারের ছবি আমাদের বন্ধু উপাসনা সরকারের কন্যা অংশিকার আঁকা।

0 Comments

Post Comment