পড়শি যদি আমায় ছুঁতো যম যাতনা সকল যেত দূরে: লালন সাঁই

পড়শি যদি আমায় ছুঁতো যম যাতনা সকল যেত দূরে: লালন সাঁই

hhhhhhhhhhhhhh

পদ্মপাতার জল

  • 07 February, 2021
  • 0 Comment(s)
  • 669 view(s)
  • লিখেছেন : নিয়তি রায়চৌধুরী
এসব নিয়ে বলার সময় আর আসুক, আমি চাইনা। আসলে অজস্র নেই নিয়ে আমার যে চারপাশ, ভালবাসা সেখানে আছে কিনা বা থাকলেও আমার বোধ্য নয়। যেজন্যে মনে হয়, আমিও কাউকে ভালবাসতে পারিনি । যদি কখনও পারি বা সেই বোধ খুঁজে পাই, তোকেই জানাব।

সকল বদভ্যাস মেনে নিয়েই তানকে বিয়ে করতে রাজি রাজর্ষি।বদভ্যাস কি?তান কদাচিৎ হলেও সিগারেট খায়।অসময়ে ঘুমোতে ভালবাসে।যে কোনও ফেস্ট থেকে ডিস্কো ঠেক পর্যন্ত কিছুই অপছন্দের নয়।হট-প্যান্ট শর্ট টপ বেশ পছন্দের মনে হয়।চেহারাটা কাঠখোট্টা নয় বলে মা তাকে ডলপুতুল বানাতে চাইলেও সম্ভব হয় না।মা বেশি উত্যক্ত হলে,বিতর্ক বাড়লে শেষতক তার হেঁচকি তুলে কান্না --- না হয় না বলে দিক্‌সার বাড়ি কেটে পড়া।দীক্ষা, ওর বাবার হোসিয়ারি ব্যাবসার এ্যাকাউন্ট-টা দেখা-শোনা করে।বেশিটা বাড়ীতেই কাটে তাই তানেরও সেখানে ঘাপটি মারতে অসুবিধা হয় না।এইসব বদভ্যাসের আর যেটা,বাস্তবত ক্ষণভঙ্গুর জেনেও তান ভালবাসতে – ভালবাসে।ভালবাসায় সে বাঁশের ঘূনপোকা হয়ে যায়।কাশ্যপ বরুণ স্বস্তিক অত্রি এরা সব এই দলেই পরে।

রাজর্ষির সঙ্গে সাড়েতিন বছরের অ্যাফেয়ার।স্বভাবদোষের সবতথ্যই জানা ওর।বিয়ের জেদটাও ওর দিক থেকেই এল,বলল, দ্যাখ তান সময়ের সঙ্গে পরিস্থিতি একসময় খাপ খেয়ে যায়।সেটা পরের কথা। বিয়ে তো আমাদের করতে হবে নাকি!আল্টিমেট ভাল যখন বাসি।

---আল্টিমেট ভাল যখন বাসি!ভেংচি কেটেছিল তান।

তানিয়া সেনগুপ্ত।যত সহজে বলতে পারলি,প্রবলেম অ্যারাইজ করলে কথাটা মনে থাকবে তো!

রাজর্ষি জোর দিয়ে বলেছিল,রাখতেই হবে। পরক্ষনেই উদাসস্বর,

---তবে উভয়ত তো অবশ্যই ।মিটি মিটি হাসছিল সে।

তান পান চিবোচ্ছিল।পার্কস্ট্রিট এলে,রেস্তরাঁ ফেরৎ এই দোকানটির পান সে নেবেই।আজ সামান্যতম পানাহার হয়নি সেখানে ।রাজর্ষি একটা অকেশন অ্যাটেণ্ড করতে যাবে।বাড়ি পৌঁছে ফোন করে ক্যাব ডেকে নেবে,বাবা মা অপেক্ষায় আছেন।কখন সে ফিরছে ফোন এসেছে বাবার।রাজর্ষি একবার সময় দেখে,একবার তানের মুখ,-হ্যারে,কখন বলব?

---ফিরছি তো।বলেই দেনা।বলেই সে ট্যাক্সি ট্যাক্সি করে হাত তুলল।

ট্যাক্সি দাঁড়ালনা।রাজর্ষি বলল,দরকার নেই,বাসেই চলে যাই চল।

--কোথায় যাব?

--তুই যে বললি দিক্‌সার বাড়ি যাবি। তোকে স্ট্র্যান্ডরোডের অটোয় তুলে দিয়ে আমি লোকাল ধরবো।

তান,উন্মনা,-মা অফিস থেকে একাই বাড়ি এসেছে।শ্রাবনী আন্টি আসেনি।

-তার মানে-।

-হ্যা,শ্রাবনীআন্টিকে অ্যাভয়েড করতেই আমি দিক্‌সার কাছে পালাচ্ছিলাম।ওই ওবেসিটি মহিলার বডি ল্যাঙ্গুয়েজ আমার অসহ্য লাগে।নিজের চাকরি ,সিঙ্গল থাকার জ্বালা সব বিরক্তি খেদ ফেলে লেগে পড়বে আমাকে নিয়ে।

-যেমন!টেরিয়ে থাকল রাজর্ষি।

-যেমন ঘরের খেয়ে বনের মোষ তাড়ানোর নাম হল পত্রিকা ছাপা।চাকরি নিয়ে মার পাশে দাঁড়ানো কিংবা অ্যানাদার এডুকেশন

-সরাসরি বলে?

তান বলল,ওই আর কি!এগজাম্‌পল দিয়ে,মেডিক্যাল স্টুডেন্ট বোনঝির নজির তুলে-

-এরকম বন্ধু রাণু আন্টির হয় কী করে?

-বন্ধু না হাতি।বাবা মার যখন অ্যাফেয়ার চলছিল,উড়ে এসে জুড়ে বসল দু’জনের মধ্যিখানে।বাবা তো বিয়ে করল রাণুকেই।জ্বলেপুড়ে খাক হয়ে সরে গেল তখন।কিন্তু মাকে হ্যাটা দিয়ে বাবা তার কলিগ-গার্ল নিয়ে বম্বে পালাল যেই,সেকি মহানন্দে শ্রাবনীর ফিরে আসা মার পাশে।ততদিনে নিজের পাশটি তো এম্পটি হয়েছে।অনেকপরে জানা গেল,বাবা আর জয়েসের মিডিয়া হয়ে উঠেছিল একসময় শ্রাবনী।জয়েসের মা ছিল শ্রাবনীর ল্যান্ডলেডি।

-রাণুআন্টি এত জেনেও এন্ট্রান্স দিল?

তান বলল, নরেন মিত্র বলেছেন না-সবচেয়ে দুর্গম আর দুর্জ্ঞেয় হল বন্ধুজনের অন্তরদেশ।না জেনে কত না কেঁদেছিল মা ওকে ধরেই।

-আর জানল যখন?

-এই তো দেখছিস।হাজার অপমানেও সরাতে পারেনি।

রাজর্ষির হতবাক মুখের দিকে তাকিয়ে,-ওইদ্যাখ বাস আসছে,উঠে পড় -- তান ছটফট করে বলল, আমি ট্যাক্সি নিয়ে টালিগঞ্জ চলে যাব – তুই চলে যা –

শহরের ব্যস্ত চলাচলের রোডের ওপর ছোট্ট দোতলার ঘুপচি আধখানা ওদের আস্তানা।বাকিটা প্রেস।বহিরঙ্গে ত্রৈমাসিক সখ্য পত্রিকা অফিস,অন্তরঙ্গে যে যার মতো সময় কাটানোর,তর্কবিতর্কের ঠেক।কাছেই চারুমার্কেট। বিজ্ঞাপন জোগাড়ের দু’একজন বাউন্ডুলে থাকলেও চাকরিও আছে অনেকের।তান অল্পদিনের কলসেন্টারের কাজটা ছেড়ে দিয়ে বসে এখন।সব জায়গাতেই এক্সপিরিএন্স-এর চাহিদা। কোথাও ইতিবাচক ইঙ্গিত না মেলা অবধি কিছুটা সময় এখানেই কাটবে। রাজর্ষিকে তার সদ্য পাওয়া চাকরি থেকে আশা করা ভুল।সেক্টর ফাইভের অফিস ঘরে নিত্য চলছে তার মনোযোগের পালিশ।দিনভর এস এম এসের খেলাটুকু পুঁজি। ছুটির দিন তোয়াক্কাহীন দেখাপর্ব কোথাও না কোথাও হতেই পারে।পত্রিকা অফিসও অছ্যুৎ নয়।

এঘরের চতুর্দিকে কাগজপত্র ছড়ান।তাকভর্তি পুরনো সংখ্যার স্তুপ।চারটে ফাইবারের চেয়ারের একটাতে লুব্ধক বলে ছেলেটা পত্রিকার ফর্মা হিসেব করছে। অন্যটায় সহসম্পাদক বর্ণিল দে। প্রধান সম্পাদক ঈশান দাশ উঠতি গল্পকার তাই নামটা রাখলেই চলে যায়।তান এসেছে অনেক্ষন।চাবি একটা তার কাছেও থাকে।মার্কেজ্‌-এর একটা লেখা বেশ টেনে রেখেছে ওকে।কাশির শব্দে মুখ তুলে হাঁ।

-তুই?আজ তো ছুটির দিন নয়।এত আর্লি উত্তরপাড়া থেকে?

-এই এলাম।অস্ফুটে জানাল রাজর্ষি।বাঁহাতে ধোঁয়া তাড়াল। সরি! বলে বেরিয়ে গেল বর্ণিল।লুব্ধক গেছে চা আনতে।

-যা একখান পাঠালি মাঝরাতে,আজ আর অফিস যাওয়াই হল না।

তরতাজা মুখে তাকাল তান,তাই!এত সিরিয়াসলি নিলি? আসল উত্তরটা সরিয়ে রাজর্ষি বলল।ছেলেগুলো কী আমাদের একা হতে দিতেই সরে গেল?

তান সেটা প্রত্যক্ষ করে নিল দেখে, রাজর্ষি বলল, যাক,সিরিয়াসলি লিখিসনি বলছিস!

তান ক্ষুন্নস্বরে বলল,একটা কিছু না পেলে বিয়ে করার জোর পাচ্ছিনা।

-তুই আমাকে খাওয়াবি নাকি?

-বোর লাগছে

-বিয়ে তো সেটাই কাটিয়ে দেবে।

লুব্ধক ঘরে ঢুকল। বর্ণিলের সঙ্গে আরও দুজন।তান উঠে পড়ে বলল, বাইরে চল-

লুব্ধক বলল, চা খাবিনা?

রাজর্ষি হেসে ঘাড় নাড়া দিল।

বাইরে বেরিয়ে রাজর্ষি জানাল,-আমার কিন্তু টিফিন হয়নি । প্রায় না’বলেই বেরিয়ে এসেছি।তোর?

-ওই আর কি।খিটমিট চলছে।মা জেদ ধরেছে অফিসিয়াল ট্রাভেলিং-এ আমাকেও যেতে হবে।

-কোথায় রে?

-গ্যাংটক।তো আমি গিয়ে কি করব।

-হইচই তো ভালইবাসিস।যা না।

-ওইভাবে!মার অফিস কলিগ,ফ্রেন্ড রিলেটিভদের সঙ্গে! কতরকম প্রশ্ন ওঠে তা জানিস।

সামনে বাঁধানো গাছতলাটার পাশেই একটা রেস্তুরেন্ত।খাওয়ার কথা মাথায় রেখেও ওটাই বেছে নিল রাজর্ষি বসবার জন্য।

কতদিনের যেন চেনাজানা!কলেজের শেষবছরে জয়েন্ট-এর ধাক্কাটা দুজনকে ছিট্‌কে না দিয়ে বড়বেশি জুড়ে ফেলল। তান-এর মনখারাপের ফাঁকটায় নিজের সাকসেসটা উৎসর্গ করে দিল রাজর্ষি নিরুচ্চার অনবধানে।আর এই যে,ওর একটু মনখারাপ দেখলেই বুকটা মুচড়ে ওথে,একে কী বলে ভালবাসা।

রাজর্ষি বলল , বাদ দে।বাবা মার সম্পর্কের গলতি অনেকেরই আছে।তাতে তোর কী করার আছে। আদরের হাতটা পিঠে রেখে চাপড়াল রাজর্ষি, বলল, চল টিফিনটা সেরে নিই।তান হঠাৎই ঘাড় ঘুরিয়ে চোখের জল লুকল। জীবনের দশটাবছর পর্যন্ত যা মনে পড়ে, ওইভাবে পিঠে হাত বাবাও রাখত।ঝুপ করে কোলে নুয়ে পড়লে-ওহ্‌ সেকী আদর। এতবড় জ্বলজ্বল সত্যিটা কোথা হারাল।

রেস্টুরেন্টে ঢুকে জানলার দিকে চেয়ার খুঁজছে রাজর্ষি। হয়ত অনেকেরই চাহিদা সেটা। কিন্তু খপ করে চেয়ারদুটো দখলকরেই হাঁ।তান নেই।গেল কথা।ইতি উতি তাকায়। রিংটোন,ইনবক্সে তান।

-তুই খেয়ে নে রাজর্ষি।আমি একটা বিশেষ কারণে অত্রির পিছু নিয়েছি। ওকে হঠাৎ দেখতে পেলাম। পরে সব বলব।

অত্রি,মানে সে তো আর এক অতীতের রাজর্ষি। সম্পর্কটা দু’জনের কেউ-একজন ভেঙ্গেছিল।অত্রির স্বরচিত কবিতায় মুগ্ধ তান বলেছিল, দুর্দান্ত। কিন্তু আমার তো ভূবনডাঙ্গার মাঠও নেই-বোতাম খোলা সার্টও নেই- থাকলে, তরুণকিশোর তোকে-অত্রি তার কানের কাছে-বোতাম খোলা সার্ট নাই বা থাকল - বলে এমন কিছু বলেছিল। সেটা তার অতিরিক্ত দখলদারির ভাষা ভেবে,রেগে উঠেছিল তান।নামমাত্র বন্ধুত্ত্বের বাক্যালাপটুকুই আছে শুনেছে।সেখানেই পিছু নেয়া? রাজর্ষি চেয়ারদুটো ছেড়েই দিল।

-পরপর দু’দুপুর ঘুমিয়ে কাটালো তান।মা বিরক্ত হয়ে গজগজ করলেও গা করেনি।অফিস বেরলে,দুপুরের ঢাকা খাবার খেয়ে ফের গড়ানো। চান করেছে। কপাল কুঁচকোয়। অত্রি ফোন করেছিল, ধরেনি।ওর চালবাজিতে ইন্টার্ভিউ দিতে যাওয়াই ভুল হয়েছিল। অত্রির বসের এমন সব প্রশ্ন ছিল, ওয়ার্ল্ড মার্কেটে স্লোডাউন নিয়ে নিশ্চয় ধারনা আছে –

-আছে-

-ডিমনিটাইজেশন?

-হ্যাঁ।

-শেয়ার মার্কেট এখন কত সেন্সেক্সে ডাউন চলছে বলুন তো !

কাগজ পড়ে কর্মখালি দেখা, জব সিলেক্সন, স্যালারির আন্দাজ, তার সঙ্গে স্লোডাউন, শেয়ার মার্কেটের উত্থান-পতন নিয়ে জানা বলতে, সর্বত্র একটা নাই নাই শব্দ। টার্গেট নেই, স্যালারি নেই, প্রমোশন নেই। কেন? না, মন্দা। এটুকুই কেবল জ্ঞাতব্যের প্রধান তার। কিন্তু সেন্সেক্স।শেয়ার মার্কেট। শব্দগুলো ভূতুড়ে লাগে। সাইলেন্ট থাকতে হয়। বস্তুত এই অদক্ষতাই যেন কাম্য ছিল সংস্থা পক্ষের।

কিন্তু এতদিনের পড়াশুনো- ফিজিক্স নিয়ে অনার্স করা।

আঁতিপাতি জার্নাল ঘাটা-খুঁটিয়ে কাগজ পড়া-বই পত্রিকা প্রকাশ – নিত্য তীক্ষ্ণ তর্জা তর্কে মগজ সম্প্রসারণ,এই তার হাল।

নিজের ওপরেই বিরক্ত হয়ে,বেরিয়ে এসে সবকেমন অন্ধকার দেখেছিল।

লিফট থেকে ফ্লোরে নেমেই একদৌড়ে বাস-

ব্যস আর কিছু মনে রাখতে চায়না তান। বাজুক অত্রির ফোন। কিন্তু যদি রাজর্ষির হ্য়।তুলে দেখল, না, তারপর থেকে রাজর্ষি আর ফোন করে না। দরকার নেই। উঠে বসে খাটের গায়ে দুটো চাপড় মারল ধাঁই ধাঁই। ফেট? শেষপর্যন্ত ফেট-ই মানতে হবে!তাই যদি তো, কাশ্যপ বরুণ অদিতি এরা কেন ফেট-এর কবলে পড়ে না। কাশ্যপ ওর সঙ্গে ডুবে ডুবে জল খেয়েও, অদিতিকে হাতে রেখেছিল। অদিতির বাবা নামি সংস্থার সিইও বলে। চাকরি হাতিয়ে, অদিতির হাত ধরে বম্বে যাবার ক’দিন আগেই বা জানাল তান-কে। তাদের স্ট্র্যাটেজি তো বিট্রে করল না! বালিশ আঁকড়ে আবার গড়িয়ে পড়ল বিছানায়।

-একটা রবিবার ফাঁকা কাটল রাজর্ষিহীন।পত্রিকা অফিসে চা, গল্প সেরে বাড়ি ফিরে ফোন ছুঁড়ল একটা ,-বাব্বা, এমন অবস্থা তোর?

-উত্তর নেই।

-সেদিন রেস্টুরেন্ট থেকে যে না বলে চলে এলাম – তো –

-এ আর নতুন কী। হ্যাম্‌লিনের বাঁশিওলাটি যে-

-আমার প্রবলেম নিয়ে চিন্তা হয়না তোর? অত্রি মানেই পুরনো প্রেম!

হাসছে রাজর্ষি - তা যদি বলিস তোর যাবতীয় প্রব্লেম,মানে, জবলেস টাইম শ্রাবনী মাসির টোন্ট রাণু আন্টির হেডেক সব উড়িয়ে দিতে একটাই দাওয়াই---

-বিয়ে!

-কারেক্ট।

-তোকে তো!

-না হয় অত্রিকেই কর-

-আমার জন্যে কেউ বসে নেই রে। অত্রি বহ্নিকে নিয়ে উড়ছে।

-তবে তো আমি এখন তোর ভাঙাকুলো –

জোড় হাসির ধাক্কায় ফোনটা কেটেছে তান।

সবকিছুর শূণ্যতা নিয়ে সামনেটা ধূ ধূ হয়ে যাবার আগে না হয় একটা দিশা থাক। রাজর্ষির দাওয়াই, বিয়ে।

তাহ’লে সাতপাকে পড়বার আগে দু’এক পাক ঘুরে নিতে অসুবিধা কী। ইচ্ছেটা উভয়ত এবং চাকরি যখন শুধু রাজর্ষিরই একা, তখন অফিস কি বাড়িতে লাগসই একটা কজ বানিয়ে বলা তেমন কিছুনা।

-সুতরাং শব্দমুখর সমুদ্রবেলার অভিনব একটি রাত্রি তারা কাটাতে পেরেছে। উজাড় লেনদেন-এর অব্যবহিত সময়গুলি যাকে বলে টইটম্বুর। সবপেয়েছির এই অবস্থার পরে আর কী কিছু পাওয়ার থাকে?

হাত ধরাধরি হাঁটা থেকে তান বলল, ওল্ড দীঘা শুধু নয়, পুরো দীঘাটাই ওল্ড হয়ে গেছে। একটু অন্যরকম ভাবলে পারতিস। সপ্রশ্ন তাকাল রাজর্ষি ।

-উটি কিংবা ধর দুবাই-এর এপাড়-

-বম্বে? দুদিনের ছুটিতে? এখনও বিয়েই হল না।

-তো?

-না,মানে,বিয়ের পর এপাড় ওপাড় নয়। সোজা নায়াগ্রা সিটি – ফরেন হানিমুন ।

-বাব্বা,দেখিস--। ওঠ—হাত ধরে টান দিল তান।

-কোথায়?

-ঘুরবি না ?

মোবাইল টিপল রাজর্ষি,-এখন ? এইসময়ে ? তুই তো হটপ্যান্ট পরে আছিস – ওদিকটা ঝাউবনের অন্ধকার। তান ফুঁসে উঠল । আলোতে যাবনা – অন্ধকারে যাবনা । হটপ্যান্ট না, সিগ্রেট না, শুরু করে দিয়েছিস ! এত নেগেটিভ লিস্ট ধরাতেই এলিবুঝি !

লাফিয়ে উঠে পড়ল রাজর্ষি, ঠিক আছে, চল—চল—।

তত অন্ধকার নয়। সদ্য পূর্ণিমা গেছে, ঝাউবনে ঝিলমিল খেলছে প্রতিপদী চাঁদ – হুড় হুড় বইছে সমুদ্র বাতাস । নিবিড় মায়াময় এই নিসর্গের অথৈ মনটা কোনো দ্বন্দ্ব চাইছে না তানের । রাজর্ষির মুঠো ছাড়িয়ে হাতের আড়ে একটা সিগারেট ধরাল , উদাত্ত গলায় জুড়েছে শক্তি চাটুজ্জের তীরে কী প্রচণ্ড কলরব/ জলেভেসে যায় কার শব / কোথা ছিল বাড়ি ? – রাতের কল্লোল শুধু বলে যায় আমি স্বেচ্ছাচারী--।

রাজর্ষির এই এক নান্যপন্থা অবস্থা- যখন তানের ফোন বলে সুইচ্‌ড অফ—তাদের বেড়িয়ে ফেরা তক ধূ ধূ গড়িয়েছে না কথা, না এস এম এস পুরো সানডে। রানু আন্টির সদ্য নেয়া স্মার্ট ফোনের নম্বর তার জানা নেই। সখ্য পত্রিকা অফিসেও খবর মেলেনি। তানের বাড়ি যাওয়া তানের নিষেধাজ্ঞা আছে।

বেড়িয়ে কলকাতা ফেরার মুডে তো ভালোই ছিল তান । কাঁধে মাথা রেখে গান জুড়েছিল – আমায় যেসব দিতে হবে সে’তো আমি জানি ।

-এবার দিক্‌সার সঙ্গে এসব শেয়ার করবি তো গিয়ে ? রাজর্ষি তাল কাটল ।

-মানে।

-এই এলাম গেলাম কী করলাম – এইসব –।

হাঁটু বাজাচ্ছে তান,- না বাবা। আমি গিয়ে বিমোহনদার অফিসে একবার ঝাঁপ মারব। দেখিনা কী বলে !

-আবার! এই তো বললি অ্যাভয়েড করছে ।

-না না ফোন ধরেছিল । অতবড় কর্পোরেট লেবেল-এ পা যার, তার তো একটু---

- পারিস বটে। এরপরেই মুখ ফস্কে বেরিয়ে গেল রাজর্ষির, আসলে পুরনো পিছুটান বল্‌ --- কম তো যাসনি -- ।

রাগ নয়, দূরমনস্ক হয়ে পড়ল তান । পঁয়ত্রিশের বিমোহন মিত্র কি শুধু বয়সের কারনেই নাকি এডুকেটেড কেতায় ,কথাবার্তার সম্মোহনের সমীহ থেকে দাদা বা সেখান থেকে সূক্ষ ভাললাগায় পৌঁছেছিল । পরস্পর তারা ক্রমে তুমি বলতে অভ্যস্ত হয়েছিল ঠিকই তবে চূড়ান্ত লেন-দেন-এর আগে কী অত্রি পিছু টানল ? নাকি বিমোহনকেই টেনে নিল কর্পোরেট দুনিয়া ? বিমোহনের কথা ভাবতে এখনও ভালো লাগে তানের । আবার অত্রির সময়টাও ইন্টারেস্টিং কম ছিল না । আর রাজর্ষি ? প্রেম কি তাহলে ওম্বুবিম্ব ? হঠাৎ আনচান করে মুখ ফেরাল তান,- কি যেন বললি?

রাজর্ষি চুপ। তান খেই খুঁজে নিয়ে বলল, দ্যাখ রাজর্ষি, প্রেম ভালবাসা আমি তেমন বুঝিনা – শুধু তার অভাব বোধটা আমাকে তাড়িয়ে নিয়ে বেড়ায় । রাজর্ষির টেরিয়ে তাকান দেখে তানের সেকি হাসি – ব্যস্‌ ।

এই মুহূর্তে তার ফ্রেমে আর তান নেই । কক্ষপথ থেকে রাজর্ষি কি ছিটকে গেল । একটি ভালবাসার অসম্পূর্ণ বিস্তারের মাঝ মধ্যিখানে দাঁড়িয়ে রাজর্ষির তবে কি করনীয় ? সেটা ভাবতে ভাবতেই একদিন সাড়া এল,- ফোন করেছিলি ?

-সে তো অজস্রবার। তুই বিমোহিত জেনেও।

-না রে ফেরার পরেই শুনলাম বিমোহনদা আইওয়া যাচ্ছে। এ দফা আর কিছু হবে’না।

রাজর্ষি সামান্য থেমে থেকে বলল, তান, সত্যি কী চাকরি তোর এতই জরুরি! এখনই এবং আমার চেয়েও ?

-ওইভাবে তো তুলনা হয় না।

-তবে অন্যভাবেই দে—

ওপার হঠাৎ স্তব্ধ।

-দ্যাখ রাজর্ষি, এসব নিয়ে বলার সময় আর আসুক, আমি চাইনা। আসলে অজস্র নেই নিয়ে আমার যে চারপাশ, ভালবাসা সেখানে আছে কিনা বা থাকলেও আমার বোধ্য নয়। যেজন্যে মনে হয়, আমিও কাউকে ভালবাসতে পারিনি । যদি কখনও পারি বা সেই বোধ খুঁজে পাই, তোকেই জানাব---।

থামিয়ে দেয়া দূরভাষ আর জোড়া গেল না শত কলেও। রাজর্ষি তার অপেক্ষায় দু’চারদিন থেকে ব্যয় করে দিন ক’টা সপ্তাহও। শেষে কি ভেবে হঠাৎ একদিন সখ্য পত্রিকা অফিসে উঁকি । ভেতরে আজ অনেকেই আছে মনে হ’ল। বেশ সরগরম। ঢুকতেই এক কাপ চায়ের সঙ্গে নতুন সংখ্যাটা ধরিয়ে দিয়ে হাসল কান্তি। প্রশ্নের আগেই বলল, তানতো আর আসেনা এখাণে। শুনেছি একটা এন.জি.ও-তে ঢুকেছে । তবে হঠাৎ একদিন এসে...কথাটা বলতে বলতে একটা বই পেড়ে তার হাতে দিয়ে বলল, তোমাকে এটা দিতে বলেছে...।

জীবনানন্দ দাশ। রাজর্ষির জন্মদিনে, প্রথম পাতায় তান লিখেছে, এই জীবনে সত্য তবু পেয়েছি এক তিল...পদ্মপাতায় তোর আর আমার মিল...। কবির তোমার আমার-কে তান সরিয়েছে নিজের মতো তোর আর আমার করে। রাজর্ষি বাইরে এসে বই মুড়ে চোখ বুঁজে একবার সেই পদ্মপাতার অবস্থানটাই দেখতে চাইল...ব্যাকুল হয়ে...।

0 Comments

Post Comment