পড়শি যদি আমায় ছুঁতো যম যাতনা সকল যেত দূরে: লালন সাঁই

পড়শি যদি আমায় ছুঁতো যম যাতনা সকল যেত দূরে: লালন সাঁই

hhhhhhhhhhhhhh

হীরক রাজার দরবার ও আজকের উদয়ন পণ্ডিতেরা

  • 01 January, 1970
  • 0 Comment(s)
  • 202 view(s)
  • লিখেছেন : কিংশুক বিশ্বাস
সত্যজিৎ রায় তাঁর ছবিতে কোনো হতাশার সমাপ্তি টানেননি। সেই অন্ধকারের মধ্যেও আগুন জ্বালিয়ে রেখেছিলেন পাহাড়ে আত্মগোপন করে থাকা উদয়ন পণ্ডিত। পেয়াদারা তাঁকে ধরতে পারেনি, কারণ সত্যকে শিকলে বাঁধা যায় না। শেষ পর্যন্ত সেই শিক্ষকই প্রজাদের চোখ খুলে দিয়েছিলেন, একত্রিত করেছিলেন জনতার সুপ্ত প্রতিরোধকে। আজকেও কি তেমনটাই হবে? বিশ্ববিদ্যালয়ের বদলি আইনের পরে এমনটা মনে হওয়া কি খুব অস্বাভাবিক?

উচ্চশিক্ষায় যন্তর-মন্তর এবং ‘জম্বি’ তৈরির রূপকথা

 

সত্যজিৎ রায়ের ছবি কেবল সেলুলয়েডের বিনোদন ছিল না; তা ছিল সময়ের এক ভয়ানক রাজনৈতিক ভবিষ্যৎবাণী। ১৯৮০ সালে ‘হীরক রাজার দেশে’ চলচ্চিত্রে যে স্বৈরাচারী শাসনের অ্যানাটমি ফুটিয়ে তোলা হয়েছিল, আজকের বাংলার উচ্চশিক্ষা এবং বিধানসভায় পাশ হওয়া The West Bengal Universities and Colleges (Administration and Regulation) Amendment Bill-এর দিকে তাকালে যেন মনে হয়—হীরক রাজার সেই অদ্ভুত রাজ্যটাই রূপকথার পর্দা ফুঁড়ে বাস্তবে নেমে এসেছে।

পর্দার হীরক রাজা যেমন শিক্ষাকে সবচেয়ে বেশি ভয় পেতেন এবং সোজাসাপটা বলতেন—“এরা যত বেশি পড়ে, তত বেশি জানে, তত কম মানে!”—ঠিক একইভাবে আজকের শাসকেরাও বুঝতে পেরেছেন, ক্ষমতার মসনদ চিরস্থায়ী করতে হলে সবার আগে আঘাত হানতে হবে মুক্ত চিন্তার বিদ্যায়তনগুলিতে। আর সেই লক্ষ্যেই তৈরি হয়েছে শিক্ষক ও শিক্ষাকর্মীদের এক প্রতিষ্ঠান থেকে অন্য প্রতিষ্ঠানে তুলে আছাড় মারার এই নয়া ‘বদলি আইন’।

হীরক রাজার প্রথম কাজই ছিল উদয়ন পণ্ডিতের পাঠশালায় তালা ঝুলিয়ে দেওয়া এবং বই পুড়িয়ে ছাই করে দেওয়া। কারণ, উদয়ন পণ্ডিত শিশুদের প্রশ্ন করতে শেখাতেন, চোখ তুলে তাকাতে শেখাতেন। আজকের দিনে হয়তো প্রকাশ্যে বই পোড়ানো হচ্ছে না, কিন্তু তার চেয়েও সূক্ষ্ম ও বিষাক্ত এক কুঠার নামিয়ে আনা হয়েছে। বিধানসভার নতুন সংযোজিত ধারা ১৪এ (Section 14A)-র মাধ্যমে অধ্যাপকদের মাথার ওপর ঝুলিয়ে দেওয়া হয়েছে প্রশাসনিক নির্বাসনের খাঁড়া। বিধানসভার রাজমঞ্চ থেকে যখন শাসক হুঙ্কার ছেড়ে বলে—“বদলের চাকরি, বদলি হয়ে যান। অসুবিধা থাকলে চাকরি ছেড়ে দিন। ঝোলা নিয়ে হোলটাইমার হয়ে যান”—তখন কি সেই রূপকথার হীরক রাজারই স্বৈরাচারী দম্ভ শোনা যায় না? যে শিক্ষক কোনো আপস করবেন না, যিনি সরকারের জনবিরোধী নীতি, দুর্নীতি বা উগ্র ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াবেন, তাঁকে তৎক্ষণাৎ শত শত মাইল দূরের কোনো প্রান্তে পাঠিয়ে দেওয়ার এই যে আইনি বন্দোবস্ত—এ তো আধুনিক যুগের উদয়ন পণ্ডিতদের পাঠশালা ছাড়া করে পাহাড়ের গুহায় নির্বাসনে পাঠানোরই প্রাতিষ্ঠানিক নামান্তর।

হীরক রাজার রাজত্বে এক অদ্ভুত বিজ্ঞানী ছিলেন, আর ছিল তাঁর তৈরি কুখ্যাত ‘যন্তর-মন্তর ঘর’। যে প্রজা প্রতিবাদ করত, সত্য বলত, তাকে সেই যন্তর-মন্তরে ঢুকিয়ে মন্ত্র আওড়ে দেওয়া হতো: “জানার কোনো শেষ নাই, জানার চেষ্টা বৃথা তাই!” আজকের উচ্চশিক্ষায় সেই ‘যন্তর-মন্তর ঘর’-এর দায়িত্ব নিয়েছে রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘ (RSS) এবং তাদের সহযোগী রাজনৈতিক চক্র। তাদের কাজ হলো ইতিহাস বিকৃত করা, পাঠ্যক্রম থেকে বিজ্ঞান ও যুক্তিকে মুছে ফেলা এবং গোটা জাতিকে এক অন্ধ উগ্রতায় বন্দি করা। মুক্তমনা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলি যখন এই মতাদর্শিক আগ্রাসনের মুখে সবচেয়ে বড় প্রাচীর হয়ে দাঁড়ায়, তখনই শুরু হয় তাদের ‘দেশবিরোধী’ দাগিয়ে দেওয়ার চক্রান্ত। যখন ক্ষমতার অলিন্দ থেকে চিৎকার ওঠে—“ভারত টুকরে হোঙ্গে লিখলেই টুকরো করে দেব”, তখন বুঝতে বাকি থাকে না যে এটি কোনো শৃঙ্খলা রক্ষার কথা নয়; এটি ভিন্ন মতের মগজ থেঁতলে দেওয়ার হুমকি। শিক্ষাঙ্গনে ভয়ের বাতাবরণ তৈরি করে এমন এক অবস্থা তৈরি করা হচ্ছে, যাতে কোনো ছাত্র প্রশ্ন না তোলে, কোনো অধ্যাপক শাসকের মুখের ওপর অপ্রিয় সত্য উচ্চারণ করতে সাহস না পান। মগজধোলাইয়ের আধুনিক যন্তর-মন্তরে ঢুকিয়ে তরুণ প্রজন্মের বিবেককে নিস্তেজ করে দেওয়ার এ এক নারকীয় প্রয়াস।

হীরক রাজার রাজসভায় সবাই কথা বলত ছন্দ মিলিয়ে, রাজার তালে তাল মিলিয়ে। কেবল একজনই ছন্দে কথা বলতেন না—তিনি হলেন শিক্ষক উদয়ন পণ্ডিত। কারণ সত্যের কোনো ছন্দ হয় না, মুক্ত চিন্তা কোনো ফরমানে বাঁধানো যায় না। আজকের শাসকও চায় গোটা সমাজ পরিণত হোক অনুগত স্তাবকে। শ্রেণিকক্ষ থেকে উদয়ন পণ্ডিতদের উপড়ে ফেলতে পারলে ছাত্রছাত্রীদের খুব সহজেই পরিণত করা যায় অনুভূতিহীন, বিবেকহীন একদল ‘জম্বি’ (Zombie)-তে। এই রোবটসম জম্বি প্রজন্ম চাকরির অভাব বা শিক্ষা ক্ষেত্রে দুর্নীতি নিয়ে প্রশ্ন তুলবে না, ধর্মের নামে রক্তপাত হলে চোখ ফিরিয়ে নেবে, আর রাজদণ্ডের অন্যায় অত্যাচারের সামনেও হাততালি দিয়ে বলবে—“যায় যদি যাক প্রাণ, হীরকের রাজা ভগবান!” একটি জাতির মেরুদণ্ড ভাঙার এর চেয়ে রোমহর্ষক ও নিখুঁত বৈজ্ঞানিক ষড়যন্ত্র আর কী হতে পারে? শিক্ষাকে যদি প্রশ্নহীন স্তাবকতায় বদলে দেওয়া যায়, তবে স্বৈরশাসনের মসনদ কখনো টলে না।

কিন্তু সত্যজিৎ রায় তাঁর ছবিতে কোনো হতাশার সমাপ্তি টানেননি। সেই অন্ধকারের মধ্যেও আগুন জ্বালিয়ে রেখেছিলেন পাহাড়ে আত্মগোপন করে থাকা উদয়ন পণ্ডিত। পেয়াদারা তাঁকে ধরতে পারেনি, কারণ সত্যকে শিকলে বাঁধা যায় না। শেষ পর্যন্ত সেই শিক্ষকই প্রজাদের চোখ খুলে দিয়েছিলেন, একত্রিত করেছিলেন জনতার সুপ্ত প্রতিরোধকে। আজকের শাসকেরা হয়তো ভাবছেন, দমন মূলক আইন, শিক্ষকদের বদলির ভয় দেখিয়ে এবং ক্যাম্পাসগুলিতে সংঘীয় ফ্যাসিবাদের বিষাক্ত জাল বিস্তার করে চিরকালের মতো মুক্ত চিন্তা স্তব্ধ করে দেবেন। কিন্তু ইতিহাস সাক্ষী—সিংহাসন যতই হীরে-মাণিক্যে মোড়া হোক, তা চিরস্থায়ী নয়। শিক্ষাঙ্গনের উদয়ন পণ্ডিতেরা যদি মাথা উঁচু করে দাঁড়ান, ছাত্ররা যদি জম্বি হতে অস্বীকার করে প্রশ্ন করতে শুরু করে, তবে আধুনিক এই হীরক রাজাদের প্রাসাদের ভিত্তিপ্রস্তরও কেঁপে উঠতে বাধ্য। পর্দার সেই অমর দৃশ্য আজও শাসকের শিরদাঁড়ায় কাঁপন ধরায়—যেখানে প্রজারা সমস্বরে রশি টেনে ধরে গর্জে ওঠে: “দড়ি ধরে মারো টান, রাজা হবে খানখান!” শিক্ষার এই লড়াইয়ে শেষ কথাটি কোনো স্বৈরাচারী শাসক বলবে না; বলবে শ্রেণিকক্ষের সেই অপরাজেয় শিক্ষক রা যারা আগামী প্রজন্মের নির্ভীক বিবেককে জাগ্রত করে চলেছে

 

0 Comments

Post Comment