পড়শি যদি আমায় ছুঁতো যম যাতনা সকল যেত দূরে: লালন সাঁই

পড়শি যদি আমায় ছুঁতো যম যাতনা সকল যেত দূরে: লালন সাঁই

hhhhhhhhhhhhhh

কেন্দ্রে- রাজ্যে এক সরকার হলে কি সরকারী চাকুরেদের লাভ হবে ?

  • 12 February, 2021
  • 0 Comment(s)
  • 406 view(s)
  • লিখেছেন : অমিত দাশগুপ্ত
ভারতীয় জনতা পার্টির সরকারি কর্মচারীদের পেনশনের দায় থেকে অব্যাহতি নেওয়ার দরুণ নবনিযুক্ত কর্মচারিদের যে বিপুল পরিমাণ আর্থিক ক্ষতি হবে তা অভাবনীয়। একটু খতিয়ে দেখা যাক। ধরা যাক কোন কর্মী কেন্দ্রিয় সরকারে ২০১৬ সালের ১ জানুয়ারি যোগদান করেছেন গ্রুপ ডি চাকুরিতে। যোগদানের সময় তার মূল বেতন ১৮০০০ টাকা। ডিএ বা মহার্ঘ ভাতা নেই। অনেকে ভাবছেন কেন্দ্র এবং রাজ্যে একই দলের সরকার হলে ভালো হয়, কিন্তু সত্যিই কি তাই, কেন্দ্রের ডিএ বা পেনশন আইন কি তাই বলে ?

ইদানিংকালে বেশ কিছু স্কুল- কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক প্রবল ‘দ্বেষপ্রেমী’ হয়ে উঠেছেন। তাঁরা বেশ ‘দুর্নীতিবিরোধী’ও বটে। অনেকে রাজ্য সরকারের ডোল বিতরণের বিরুদ্ধে সরব। ট্যাবের বদলে ১০ হাজার করে টাকা দেওয়াটা আসলে অকাজে বা অনুৎপাদক টাকা দেওয়া তাও তাঁরা মনে করেন। অবশ্য গত ১ বছর ধরে প্রায় কিছু না করে কয়েক লক্ষ টাকা বেতন পাওয়াটা ন্যায্য ও উৎপাদনশীল বলেই তাঁদের ধারণা।

সরকারী কর্মচারীদের এক অংশও অনুরূপ ‘দ্বেষপ্রেম’-এ মুগ্ধ হয়ে নরেনবন্দনায় ব্যস্ত। তাঁরা কেউ কেউ আবার বিজেপি ক্ষমতায় এলে রাজ্যে কেন্দ্রীয় হারে ডিএ পাবেন ভেবে আহ্লাদিত। তবে ত্রিপুরায় প্রতিশ্রুতি দিয়েও ক্ষমতায় এসে বিজেপি সপ্তম বেতন কমিশন বা কেন্দ্রীয় হারে ডিএ দেয় নি। উপরন্তু জুলাই, ২০১৮র পরে নিযুক্ত সরকারি কর্মে বা স্কুল- কলেজ-বিশ্বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের অবসরকালিন পেনশনের দায় ঝেড়ে ফেলে নতুন পেনশন তহবিলে মূল বেতন ও ডিএর সামগ্রিক যোগফলের ১০% কন্ট্রিবিউট করে দায় সারছে। কেন্দ্রিয় সরকার ২০০৪ সালের ১ এপ্রিলের পরে যোগদানকারি কর্মচারীদের জন্যও অনুরূপ কাজ শুরু করেছে বহু আগেই।

মনে রাখা দরকার রাজ্য সরকারী কর্মচারীরা যে পেনশন পান তা বর্তমানে তাদের অবসরকালিন মূল বেতনের অর্ধেক, সাথে ডিএ ও চিকিৎসা ভাতা পান। ফলে মূল্যবৃদ্ধির সঙ্গে পেনশন বাড়তে থাকে। নতুন পেনশন প্রকল্পে পেনশন তহবিলে জমা টাকার মাধ্যমে কর্মচারীকে এ্যানুয়িটি প্রদান করবে কোন লগ্নি তহবিল, যেখানে মূল্যবৃদ্ধির সঙ্গে এ্যানুয়িটির কোন সম্পর্ক থাকবে না। সে অর্থে এ্যানুয়িটির পরিমাণ স্থির থাকবে।

তাছাড়া, সরকার কর্তৃক দেয় পেনশনের পরিমাণ তুলনায় সরকারের দেওয়া কন্ট্রিবিউশন থেকে প্রাপ্য এ্যানুয়িটির পরিমাণ বিপুল পরিমাণে কম। হিসেব করলে দেখা যাবে, সামগ্রিকে একজন গ্রুপ ডি কর্মচারী অন্তত ৫৫ লক্ষ টাকা ও গ্রুপ সি কর্মচারী ১ কোটি টাকা লোকসান করবে।

এব্যাপারে একটি ছোট্ট প্রতিবেদন যুক্ত করা হল। পুরো হিসেবটি একটু জটিল কিন্তু কেউ চাইলে দেখানো যেতে পারে। যে যে ধারণার ভিত্তিতে হিসেবটি করা হয়েছে তাও লিখে দেওয়া হয়েছে।

পুরোনো পেনশন প্রকল্পের (পশ্চিমবঙ্গ ও কেরলে বর্তমানে চালু প্রকল্পে) তুলনায় কেন্দ্রীয় ও রাজ্য সরকারগুলির ( কেরল ও পশ্চিমবঙ্গ ব্যতিরেকে) বর্তমান অবসরকালিন প্রকল্পে কর্মচারীদের সামগ্রিক ক্ষতির পরিমাণ, কম করে ধরলেও, আনুমানিক অন্তত ৫৫ লক্ষ (গ্রুপ ডি) ও১ কোটি (গ্রুপ সি) টাকা।

ভারতীয় জনতা পার্টির সরকারি কর্মচারীদের পেনশনের দায় থেকে অব্যাহতি নেওয়ার দরুণ নবনিযুক্ত কর্মচারিদের যে বিপুল পরিমাণ আর্থিক ক্ষতি হবে তা অভাবনীয়। একটু খতিয়ে দেখা যাক। ধরা যাক কোন কর্মী কেন্দ্রিয় সরকারে ২০১৬ সালের ১ জানুয়ারি যোগদান করেছেন গ্রুপ ডি চাকুরিতে। যোগদানের সময় তার মূল বেতন ১৮০০০ টাকা। ডিএ বা মহার্ঘ ভাতা নেই। মূল বেতনের বার্ষিক বৃদ্ধি ৩% ও মুদ্রাস্ফীতি জনিত ডিএর বৃদ্ধি বার্ষিক ৫% ধরে হিসেব করে সরকারি নিয়ম অনুযায়ী কর্মচারীর বেতনের (মূল বেতন ও মহার্ঘ ভাতা) ১০% সরকার পেনশন তহবিলে প্রদান করবে, কর্মচারীও অনুরূপ পরিমাণ বেতন থেকে দেবে। ধরা যাক কর্মচারী ৩০ বছর বয়সে চাকুরিতে যোগদান করেছেন ও ৩০ বছর চাকুরি করে ৬০ বছর বয়সে অবসর নিচ্ছেন। প্রথম বছরে প্রতি মাসে সরকার দেবে ১৮০০ টাকা। ফলে সরকারের তরফে মোট জমা পড়বে ২১৬০০ টাকা । অবসর নেওয়ার বছরে মোট বেতন হবে মাসিক ১০৪০০০ টাকা। ফলে পেনশন তহবিলে সরকারের তরফে জমা পড়বে ১২৫০০০ টাকা। যদি ধরে নেই পেনশন তহবিলের অর্থে বার্ষিক প্রতিদান বর্তমান প্রতিষ্ঠিত ব্যাঙ্কগুলির দেয় সুদের হারের (বার্ষিক ৫.৫-৬%) থেকে বেশ কিছুটা বেশী, ৭.৫% তাহলে । পেনশন তহবিল কর্মচারীর অবসরকালে সরকারের তরফে জমা অর্থ চক্রবৃদ্ধি হারে সুদ সমেত হবে ৫০ লক্ষ টাকার**মত। ওই জমা অর্থের উপরে যদি কর্মচারী পরবর্তীতেও বার্ষিক ৭.৫% হার সুদে এ্যানুইটি পেতে থাকে তাহলে তার পাওনা হবে মাসিক ৪০ হাজার টাকা**। মনে রাখা দরকার এই এ্যানুয়িটি স্থির ও তা ২০ বছরের জন্য হিসেব করা হয়েছে, তাও অত্যন্ত উচু সুদের হারে।

কর্মচারীটির মূল বেতন ৩০ বছর বাদে, অবসরের সময়ে ৩% চক্রবৃদ্ধি হারে বেড়ে হবে ৪২৫০০ টাকা, মহার্ঘ ভাতা সমেত ১ লক্ষ ৪ হাজার টাকা। । মূল পেনশন ওই বেতনের অর্ধেক হবে ও তা হবে ২১২৫০ টাকা মাসিক, মহার্ঘ ভাতা সমেত পেনশন হবে ৫৩১২৫ টাকা। এটি সরকারের দেয় পেনশন। যা পূর্বে সরকার কর্তৃক দেওয়া টাকার এ্যানুইটি, ৪০ হাজার টাকার তুলনায় ১৩১২৫ টাকা বেশী। কেবল তাই নয়, ওই পেনশন ডিএ বাড়ার সাথে সাথে বাড়বে। পূর্বের হারে তা বাড়লে ২০ বছর বাদে মোট পেনশন দাঁড়াবে ৭৩ হাজার ৩০০ টাকার বেশী। ফলে মাসিক ৩৩ হাজার ৩০০ টাকার ক্ষতি স্বীকার করতে হবে কর্মচারীকে। সামগ্রিকে ২০ বছরে সেই ক্ষতির যোগফল ৫৫ লক্ষ টাকার বেশী।

গ্রুপ সি কর্মীদের বেতন বেশী। ফলে ক্ষতিও বেশী। সেক্ষেত্রে সামগ্রিক ক্ষতির পরিমাণ হবে ১ কোটি টাকার বেশী। উপরের উদাহরণে কর্মীর কোন প্রোমোশনের কথা বা পে রিভিশনের বিষয় ধরা হয়নি। তা ধরলে ক্ষতির পরিমাণ অনেক বেশী হবে।

পেনশন তহবিল থেকে পেনশন হিসেব করার সময় ২০ বছরের এ্যানুইটি ধরেছিলাম। সেক্ষেত্রে ২০ বছর বাদে এ্যানুইটি বন্ধ হয়ে যাবে। যদি সময়কে বাড়ানো যায় তাহলে এ্যানুইটি কমবে। আজীবন এ্যানুইটির ক্ষেত্রে তাই পরিমাণ কমবে। কিন্তু পেনশন আজীবন পাওযা যাবে, তা মূল্যবৃদ্ধির সঙ্গে বাড়বে। সাধারণত বেতন পুনর্বিন্যাসের ফলেও তা বাড়ে। তাছাড়া, ৮০ বছর বয়সের পরে পেনশন মূল অংশটির ২০% বাড়ে।

পশ্চিমবঙ্গের সমস্ত সরকারি কর্মচারী ও চাকুরী প্রার্থীদের মনে রাখতে হবে যে, বিজেপি ত্রিপুরায় ক্ষমতায় এসে কেন্দ্রীয় বেতন কাঠামো বা সপ্তম বেতন কমিশন লাগু করেনি; উপরন্তু জুলাই ২০১৮ থেকে নবনিযুক্ত সরকারি কর্মচারীদের (স্কুল কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সমেত) জন্য পেনশন ও জিপিএফ (সরকারি ভবিষ্যনিধি তহবিল) তুলে দিয়েছে। পশ্চিমবঙ্গে ক্ষমতায় এলে সেটাই করবে।

** পেনশন তহবিল থেকে প্রাপ্য এ্যানুয়িটিকে হিসেব করার সময়ে কর্মচারীর প্রদত্ত জমার উপরে এ্যানুয়িটিকে ধরা হয় নি, কারণ তাতে সরকারের কোন কন্ট্রিবিউশন নেই।

0 Comments

Post Comment