ককরোচদের “স্কুল ঠিক করো” আন্দোলন একটা প্রশ্ন উস্কে দিয়েছে – সরকারি স্কুলগুলিতে তালা পড়ছে আর পাশাপাশি ‘বিদ্যাভারতী’ বা ‘সরস্বতী শিশুমন্দির’এর নতুন বিল্ডিং তৈরি হচ্ছে, সেখানে বাড়ছে নতুন ছাত্রও, এর কারন কি ? তথ্য বলছে গত ২ বছরে দেশে সরকারী স্কুলে প্রায় দেড় কোটির উপর ছাত্র কমে গেছে , বন্ধ হয়েছে কুড়ি হাজার স্কুল। শুধু মাত্র উত্তরপ্রদেশে গত এক বছরে প্রায় ২২ লাখ বাচ্চা সরকারি স্কুল ছেড়েছে, কিন্তু পাশের সরস্বতী শিশুমন্দিরে ভর্তির জন্য লম্বা লাইন, সেটা ইংলিশ মিডিয়ম সিবিএসই স্কুল আর মাইনে মাত্র ৫০০ টাকা। ছাত্র কমে যাবার কারণ হিসেবে সরকার জন্মহার কমে যাওয়াকে উল্লেখ করলেও ‘বিদ্যাভারতী’ র মত স্কুলে প্রায় একই সময়ে ১০ লাখের উপর বাচ্চার ভর্তি হওয়াটা সেই কারনের স্বপক্ষে কথা বলেনা । জন্মহার কমে গেলে প্রাইভেট স্কুলগুলিতেও তো একই চিত্র দেখা যেত, কিন্তু সেখানে ছাত্র বাড়ছে রমরমিয়ে। তার মানে বাচ্চা জন্মাচ্ছে কিন্তু সরকারী স্কুলে যাচ্ছেনা, যাছে বিদ্যাভারতী’বা ‘সরস্বতী শিশুমন্দিরে- এক কথায় ভরতি হছে আর এস এস এর স্কুলে।
এবার এই স্কুলগুলির ইতিহাস একটু জেনে নেওয়া যাক ! ১৯৫২ সালে গোরখপুরে সরকারী নিষেধাজ্ঞা উঠে যাবার পর সরস্বতী শিশু মন্দির এর প্রথম স্কুল প্রতিষ্ঠা করেন আর এস এস নেতা নানাজি দেশমুখ। তারপর ১৯৭৭ সালে কেন্দ্রীয় কমিটির নির্দেশে লখনওতে প্রতিষ্ঠা হয় বিদ্যাভারতী অখিল ভারতীয় শিক্ষা সংস্থান। বর্তমানে ভারতে সরকারী হিসেবেই প্রায় ১২০০০ স্কুল এবং দেড় লাখ শিক্ষক আছে, ছাত্র সংখ্যা ৩০ লাখেরও বেশি। পশ্চিমবঙ্গেও এই মুহুর্তে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরে এই স্কুলের সংখ্যা ৫০০ ছাড়িয়েছে। সুতরাং বোঝাই যাচ্ছে যে সরকারি স্কুল গুলি ঠিক না হওয়াতে এই স্কুলগুলিতে ছাত্র বাড়ছে, বা অন্য ভাবে বলা যায়, সরকারি স্কুলগুলি ঠিক না হওয়ার পিছনে এই স্কুলগুলি গড়ে ওঠার অবদান আছে ।এটা কাকতালীয় নয়, এটা একটা ডিজাইন; আগে ছিল শিক্ষার বেসরকারিকরণ এখন বিজেপির সরকারের আমলে শিক্ষার গৈরিকিকরণের ডিজাইন। এই স্কুলগুলিতে ভারতীয় সংস্কৃতি, নৈতিক শিক্ষা এগুলিই বেশি করে শেখানো হয়, শেখান হয় বন্দে মাতরম, করানো হয় যোগ, ব্যায়াম, প্রার্থনা। এমনকি এদের নিজেদের প্রকাশনী থেকে ছাপা বইই পড়ানো হয়। তাই ইতিহাস বা বিজ্ঞান এর মত বিষয়গুলিতে যা পড়ানো হয় সেটা বর্তমানের বা যুগের সাথে তাল মিলিয়ে হছে কিনা সেটা বোঝবার যো নেই। সেক্ষেত্রে ইতিহাস বিকৃতির সম্ভাবনা ও উড়িয়ে দেওয়া যায়না । যেমন মোগল যুগের ইতিহাসের চেয়ে এদের বইতে শিবাজি বা রানা প্রতাপের বীরত্বের বর্ণনা অনেক বেশি। জোর দেওয়া হয় হিন্দু পুরাণকে। জোর দেওয়া হয় তথাকথিত ভারতীয় সংস্কৃতিতে। যাতে আগামী প্রজন্ম এই ভাবে আস্তে আস্তে আর এস এস ভাবধারায় শিক্ষিত হয়ে উঠতে পারে।
"স্কুল ঠিক করো" আন্দোলনের তথ্য বলছে শুধু মাত্র তেলেঙ্গানার মত রাজ্যেই - ৫,৪৩২ স্কুলে কারেন্ট নেই, ২,৮১১টায় টয়লেট নেই, ৫,০৯০টা স্কুল ১ জন শিক্ষক দিয়ে চলছে — সুতারাং অন্য রাজ্যেরও একই হ্থ, UDISE রিপোর্ট বলছে শিক্ষক-ছাত্র অনুপাত ১:২৪। সব ঠিক আছে। অথচ দেশজুড়ে প্রায় ৮ লক্ষ শিক্ষকের পদ খালি। বাজেটে শিক্ষায় ২.৯% ব্যয় অথচ প্রতিরক্ষা খাতে প্রায় ৫%। প্রায় ৭৫% সরকারি স্কুলে মাঠ নেই, গরীব বাবা-মা ভাবছে, "ফ্রি স্কুলে দিলে বাচ্চা পড়বে না অতএব RSS এর স্কুলে ভরতি করে দাও , এই স্কুল গুলো প্রাইভেটের চেয়ে সস্তা, DPS- এর মত স্কুলে যেখানে প্রতি মাসে ৫,০০০ টাকা লাগে, শিশু মন্দিরে ৫০০ টাকায় অনায়াসে পড়া হয়, এই জন্যই এই স্কুলগুলি ধীরে ধীরে মধ্যবিত্তের জন্য বাজেটের নাগালে অথচ প্রাইভেট স্কুল হয়ে উঠছে, সংখ্যায় বাড়ছে লাফিয়ে লাফিয়ে"। ২০১৪ সালে বিজেপি ক্ষমতায় আসার পর বিদ্যা ভারতীর স্কুল ৭ হাজার থেকে ১২ হাজার হয়েছে। তাছাড়াও সরকারের পরোক্ষ মদতও আছে । বিজেপি শাসিত রাজ্য মধ্যপ্রদেশ, উত্তরপ্রদেশ, রাজস্থানে বিদ্যা ভারতী স্কুলগুলো জমি, স্বীকৃতি, CBSE স্বীকৃতি খুব সহজে পেয়েছে। ১৯৯২ সালে India Today-ই লিখেছিল — মধ্যপ্রদেশে বিজেপি আসার পর শিক্ষকের যোগ্যতার নিয়ম শিথিল করে দেওয়া হয়েছিল এই স্কুলগুলোর জন্যই।
সরকারি স্কুলে শিক্ষক আসে না, তাছাড়াও BLO ডিউটি, ভোটার লিস্ট, আবাস যোজনার ফর্ম দেবার জন্যই ব্যাস্ত থাকেন, ফলে শিক্ষকেরা পড়ানোর সুযোগ ও পাচ্ছেন না। শিশু মন্দিরে সকাল ৭টায় প্রার্থনা হয়। গরীব বাবা-মার কাছে শৃঙ্খলা মানে নিরাপত্তা। সুতরাং এটাই ভাল স্কুল, ৩০০-৫০০ টাকা মাইনে দিতেও রাজি। এবং এটাই বিজেপি সরকারের প্ল্যান, সরকারি স্কুলকে ভাঙা রাখলে — শিক্ষক না থাকলে, টাকা্ না দিলে ওগুলো উঠে যাবে। তাহলে বাবা-মা বাধ্য হয়ে প্রাইভেটে যাবে। কিন্তু এর সমস্যা কোথায় ? এটা শুধু শিক্ষার খেলা না, আদর্শের খেলা। প্রথমত গৈরিকিকরণ, দ্বিতীয় সর্বত্র ঐ স্কুল চালু করে লোকাল বোর্ডগুলোকে মেরে ফেলা হচ্ছে, কাশ্মীর থেকে কন্যাকুমারী সবাই পাচ্ছে বৈচিত্র্যহীন এক ধাঁচের শিক্ষা। দ্বিতীয়ত সরকারি স্কুলে না গেলে, প্রশ্ন করা নাগরিক তৈরি হবে না। "মিড-ডে মিলে ডিম কই? বা দেওয়াল ভাঙ্গা কেন, ফ্যান নেই কেন, এই প্রশ্ন কেউ করবেনা, " তাই দুই দিক থেকেই সরকারি স্কুল ভাঙা রাখা লাভজনক । বিজেপির রাজনীতির জন্য লাভ, কারণ প্রশ্ন কম। RSS-এর সাংগঠনিক জন্য লাভ, কারণ ছাত্র বাড়ে, একটা নির্দিষ্ট আদর্শের নাগরিক তৈরি হয় যার ভিত্তি — দেশপ্রেম, সংস্কৃতি, মাতৃভাষা।
আরও বিপজ্জনক হল সৈনিক স্কুলের বেসরকারিকরণ, ফৌজের গৈরিকীকরণ। ১৯৬১ সালে শুরু হওয়া ৩৩টা সৈনিক স্কুল প্রতিরক্ষা মন্ত্রকের অধীনে ছিল, ফি কম, স্কলারশিপে গরীব বাচ্চারা পড়ত ।২০২১ সালে মোদী সরকার নতুন নিয়ম আনলো — ১০০টা নতুন সৈনিক স্কুল হবে PPP মডেলে, সরকার প্রতি বাচ্চার জন্য ৪০,০০০ টাকা দেবে। কিন্তু RTI-তে বেরিয়েছে প্রথম ৪০টা MoU-এর মধ্যে ৬২% স্কুল RSS, BJP নেতা, MLA, মুখ্যমন্ত্রীর পরিবারের। গরীবদের ওখানে পড়া হবেনা। তা ছাড়া ধর্মনিরপেক্ষতা থাকবেনা । The Print-এর বিশ্লেষণে বলা হয়েছে — বিদ্যা ভারতীর মতো সংস্থার মিশনই হলো "-হিন্দুত্ব বিশ্বাসী প্রজন্ম তৈরি করা"। যদি সেই সংস্থা সৈনিক স্কুল চালায়, তাহলে ভবিষ্যতের সেনা অফিসার কী শিখবে? সংবিধান, না হিন্দুত্ব, এটা সৈনিক স্কুলের মূল আদর্শের বিরোধী।
ককরোচ জনতা পার্টির অভিজিত দীপকে বলেছেন প্রথমে ভেবেছিলাম আমাদের লড়াই চাকরি নিয়ে। কিন্ত চাকরি না পাওয়ার শুরুটা ক্লাস ওয়ানে। তাই ‘স্কুল ঠিক করো অভিযান’ শুরু করতে হবে। কারন ককরোচ তৈরি হচ্ছে স্কুল থেকেই। যে ছেলেটা আজ গ্র্যাজুয়েট হয়ে ১১.২% শিক্ষিত বেকারের লিস্টে, সে ১২ বছর আগে একটা সরকারি স্কুলে পড়ত যেখানে ১ জন শিক্ষক ৫টা ক্লাস নিতেন, কারেন্ট ছিল না, - লাইব্রেরি ছিল, বই ছিল না, - টয়লেট ছিল, জল ছিল না, কিন্তু আগে বাচ্চারা চুপ থাকত, এখন তারা ভিডিও করে Instagram-এ দিচ্ছে। এটাই "স্কুল ঠিক করো" আন্দোলনের সবচেয়ে বড় ভয় — ককরোচরা যখন বলছে "সরকারি স্কুল ঠিক করো", তখন অনেকের মনেই ভয়ের উদ্রেক হচ্ছে। কিন্তু ককরোচরা বলছে না 'শিশু মন্দির ' বন্ধ করো। বলছে, সরকারি স্কুল ঠিক করো, সরকারি স্কুল ঠিক হলে RSS-এর স্কুলেরও ভালো হবে। কারণ কম্পিটিশন পড়াশোনায়, আদর্শে নয়। তারা বলছে ৫০০ টাকা দিয়ে আদর্শ কেনার বদলে পড়াশুনায় জোর দিক সরকার । আজ সরকারি স্কুলে পড়ে ১১.৮৯ কোটি বাচ্চা। এরা ৭০% গরিব, দলিত, আদিবাসী, সংখ্যালঘু পরিবারের। এদের যদি এখন না বাঁচাই, তাহলে ১০ বছর পর দেশে আরও ১০ কোটি ককরোচ বাড়বে। Gen Alpha-র বাচ্চারা এখন প্রশ্ন করছে — কেন প্রাইভেট স্কুলে AC আছে, আর আমাদের স্কুলে ফ্যান নেই? কেন নেতার ছেলে বিদেশে পড়ে, আর আমরা গোয়ালঘরে পড়ি? সরকার ভয় পাচ্ছে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের এই প্রশ্নকে।
আরশোলারা বলছে স্কুল ঠিক করতে চায় আর তাই তাদের তিন দফা দাবি সরকারের সামনে রেখেছে
১. স্কুল বাঁচাও ফান্ড: প্রতিটা বিধায়কের তহবিল থেকে ২৫% স্কুল মেরামতে বাধ্য করা হোক।
২. শিক্ষককে শিক্ষকের কাজ দিতে হবে , শিক্ষককে ভোট, জনগণনা, মিড ডে মিলের হিসাব থেকে মুক্তি দিতে হবে ।
৩. ছাত্র-নাগরিক অডিট: প্রতি ৩ মাসে ছাত্ররা স্কুলের ছবি তুলে পোর্টালে দেবে — টয়লেট পরিষ্কার কিনা, ফ্যান চলছে কিনা।
সরকার ভাবছে ককরোচরা নোংরা জায়গায় থাকে। এটা ভুল, ককরোচরা সেই জায়গায় থাকে যেখানে আলো পৌঁছায় না। সরকারি স্কুলগুলোই আজ আরশোলাদের আঁতুড়ঘর । সেখানে আলো না জ্বালালে অচিরেই সরকারি স্কুলগুলি সব ৫০০ টাকা দিয়ে ‘ভারত মাতা কি জয় ‘বলার আদর্শ বিদ্যা ভারতীতে পরিণত হবে।