পড়শি যদি আমায় ছুঁতো যম যাতনা সকল যেত দূরে: লালন সাঁই

পড়শি যদি আমায় ছুঁতো যম যাতনা সকল যেত দূরে: লালন সাঁই

hhhhhhhhhhhhhh

২০২৪ এর সাধারণ নির্বাচনে সিপিআইএমের মূল লক্ষ্য মোদী না মমতা?

  • 27 December, 2022
  • 0 Comment(s)
  • 580 view(s)
  • লিখেছেন : কল্যাণ সেনগুপ্ত
সিপিআইএম রাজ্য নেতারা বলেন, মোদী ও মমতা উভয়ই খুব খারাপ, ফলে দুজনের বিরুদ্ধেই লড়াই চালাতে হবে একসাথে। ইদানিং বিজেমূলের গল্প বিশেষ শোনা যাচ্ছে না বটে, কিন্তু মানসিকতার কোন বদল হয়নি আদৌ। ধরে নেওয়া যাক, মমতা ও মোদী সমান খারাপ, সমান ভয়ংকর। কিন্তু যুক্তি কি বলে, মোদী ও মমতার ক্ষতি করার সুযোগ বা ক্ষমতা কি এক?

নিকট অতীতে রাজ্যের গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রী ও নেতা পার্থ চ্যাটার্জি ও তাঁর বান্ধবীর বাড়ি থেকে উদ্ধার হওয়া টাকার পাহাড় দেখে সবাই যুগপৎ বিস্মিত ও ক্ষুব্ধ। সেই থেকেই মমতা সরকার ও তৃণমূল দল ব্যাকফুটে এবং দিশেহারা। যদিও ড্যামেজ কন্ট্রোলে কিছু ব্যবস্থা গ্রহণ করছে, কিন্তু এ ক্ষত সারতে সময় লাগবে। আর সেই সুযোগের সদব্যবহার সবচেয়ে বেশি করছে সিপিআইএম। কেন্দ্রীয় এজেন্সি ও আদালতকে সুচতুর ভাবে চূড়ান্ত ব্যবহার তো বটেই, এমনকি ভোট রাজনীতির ময়দানেও আসন্ন পঞ্চায়েত নির্বাচনের পরিপ্রেক্ষিতে ড্রেস রিহার্সাল রুপী সমবায় ভোটকে কাজে লাগিয়ে গ্রাউন্ড সার্ভে করে নিচ্ছে বিজেপির সাথে জোট বেঁধে দুর্নীতি রোখা যায় কি না।  দলীয় শৃঙ্খলা রক্ষার নামে কিছু ব্যবস্থা গ্রহণের কথা বলা হচ্ছে বটে, তবে তা নিছকই লোকদেখানো। তবে অনেকে একথাও বলে থাকেন যে, সিপিআইএম মমতা সরকারের দুর্নীতি নিয়ে যতখানি সোচ্চার বা সক্রিয় তার কিয়দংশও যদি মোদী সরকারের বিরুদ্ধে দেখা যেত তাহলে আজ তাঁদের বিধানসভার বিধায়ক সংখ্যা হয়তো শূন্য হতো না। দুর্নীতির এই রাজনৈতিক তারতম্য বিচারে সিপিআইএম অবশ্য বরাবরই দক্ষ।

এবার ধরা যাক, ২০২৪ সালে যে সাধারণ নির্বাচন হবে, তাতে তৃণমূল ও কংগ্রেসের সমঝোতা হোল হাই কমান্ডের নির্দেশে, তখন কি সিপিআইএম তৃণমূলের সঙ্গে সমঝোতায় যাবে,  নাকি বিজেপির সঙ্গে গোপনে সমঝোতা করবে, নাকি একলা লড়ে দেখবে? এটা নিশ্চিত, অবশ্যই তাঁরা একা লড়তে চাইবে না।  তাহলে মাত্র দুটি পথই খোলা, এক - কংগ্রেসের হাত ধরে তৃণমূলের সঙ্গে সমঝোতায় যাওয়া অথবা দুই - বিজেপির সঙ্গে গোপন বোঝাপড়ায় যাওয়া। দুটোই বেশ কঠিন। কারণ  এযাবৎ দলীয় অবস্থানে তৃণমূলকে উৎখাত করা বা নিদেনপক্ষে প্রচণ্ড চাপে রাখাই ছিল একমাত্র লক্ষ্য। সেখান থেকে হঠাৎই সমঝোতায় যাওয়া প্রায় অসম্ভব। দলের সর্বস্তরেই প্রবল আপত্তি হবে, যা কার্যকরী করা হবে খুবই কঠিন ও প্রায় অসম্ভব। দেখা যাবে, তেমন হলে সিপিআইএমের ভোট যাবে হয় বিজেপি নয়তো নোটায়। আর আজকের বাংলার  বিজেপির মতো  গোষ্ঠীদ্বন্দ্বে জর্জরিত  দলের সঙ্গে গোপন সমঝোতা সম্ভব কি? নাক কাটা যাবার সম্ভাবনা প্রবল। ফলে বঙ্গে কংগ্রেস - তৃণমূল সমঝোতা না হলে ভাল, কিন্তু হলে সিপিআইএম খুবই বিপদগ্রস্থ হতে বাধ্য। এমতাবস্থায় একমাত্র ভরসা তীব্র মমতা বিদ্বেষী কংগ্রেসের রাজ্য নেতৃত্ব।

 

আসলে সিপিআইএম জন্মলগ্ন থেকেই নীতি আদর্শের ধার না ধেরে সাংগঠনিক সাফল্যের দিকেই বেশি নজর দিয়েছে। গোড়ায় দীর্ঘদিন অন্ধ কংগ্রেস বিরোধিতা চালিয়ে গেছে এবং সেটা করতে গিয়ে বিভিন্ন সময়ে বিজেপির সাথেও একযোগে আন্দোলন করেছে। ইন্দিরা গান্ধীকে ডাইনি, রাজিবকে বোফর্স চোর বলে লাগাতার প্রচার চালিয়েছে। ফলে ধীরে ধীরে কংগ্রেস দুর্বল হয়েছে এবং বিজেপি শক্তিশালী হয়েছে। পরে আবার দুর্বল কংগ্রেসের সাথেই হাত মিলিয়ে দলীয় স্বার্থসিদ্ধি করেছে। কিন্তু অতীতের সেই অন্ধ কংগ্রেস বিরোধিতা এখন অন্ধ তৃণমূল বিরোধিতায় বদলে গেছে এবং প্রবল পরাক্রমশালী  মোদীকে পরোক্ষে মদত দিচ্ছে মমতাকে ক্ষমতা থেকে সরাতে। কিন্তু শুধুমাত্র চালাকির দ্বারা যে মহৎ কার্য হয় না, সেটা বুঝতে সিপিআইএম অপারগ। ফলে ভোটের হার নামতে নামতে এখন ৫%এর নিচে এসে ঠেকেছে আর আসন সংখ্যা শূন্যে। ফলে এখন মোদীর ভরসায় হাত পা ছুড়ছে ভেসে উঠতে।

 

একথা অনস্বীকার্য যে ২০১১ ও '১৬র নির্বাচনে পর পর হেরে সিপিএমের সাংগঠনিক অবস্থা অতীব দুর্বল হয়ে পড়ে। সর্বত্র বেশির ভাগ পার্টি অফিসগুলো লোকের অভাবে বন্ধ হয়ে যায়। বেশিরভাগ কর্মী, সমর্থক হতাশ হয়ে রাজনীতিতে আগ্রহ হারিয়ে ফেলে এবং দলের ডাকাবুকোরা কেউ কেউ তৃণমূলে আর বাকিরা বিজেপিতে ঢুকে পড়ে। সেই সময় দলের অন্দরে অস্তিত্ব রক্ষার্থে আওয়াজ ওঠে, 'আগে রাম পরে বাম'। অর্থাৎ আগে বিজেপিকে জেতাও পরে বামকে। এরই সাথে বিজেপি কেন্দ্রের ক্ষমতার জোরের সাথে  মানি, মাসল ও মিডিয়া পাওয়ারের প্রভাবকে কাজে লাগিয়ে ২০১৯র নির্বাচনে প্রভূত সাফল্য লাভ করে। রাজ্যের মোট ৪২টি লোকসভা আসনের মধ্যে উত্তর বঙ্গ ও দক্ষিণ বঙ্গ মিলিয়ে ১৮টি আসন লাভ করে। ফলে এলাকায় এলাকায় বিজেপির দাপট প্রচণ্ড বেড়ে যায়। এরই ফলশ্রুতিতে তৃণমূল বেশ খানিকটা চাপে পড়ে যায় এবং সিপিআইএমের সাংগঠনিক রাহুগ্রস্থ অবস্থার বদল ঘটে। পার্টি অফিসগুলো আবার কিছুটা প্রাণ ফিরে পায়। কর্মীদের আনাগোনা শুরু হয়। দলের ছাত্র যুব সংগঠন সক্রিয় হয়, বিভিন্ন  আন্দোলনের কর্মসূচি সংগঠিত ও পালিত হয়।

 

এর থেকে পরিষ্কার বোঝা যায়, কেন্দ্রের ক্ষমতায় থাকা মোদী বিভিন্ন কেন্দ্রীয় এজেন্সির মাধ্যমে মমতাকে যথেষ্ট চাপে রাখতে পারলেই পরিস্থিতি সিপিআইএমের পক্ষে সুবিধাজনক হয়ে ওঠে। সেকারণেই সিপিআইএম কি চাইবে মোদী হেরে যাক এবং তৃণমূল আবার কেশর ফুলিয়ে ঘোরাফেরা করুক, কখনোই নয়। কেন্দ্রের ক্ষমতায় মোদী আছে বলেই না সিপিআইএম এতটা নির্ভয়ে হম্বিতম্বি করতে পারছে। সুখে থাকতে ভূতে কিলোনোর ভুল কি কেউ  করে? নীতি আদর্শ নিয়ে চললে কি ভাত মিলবে? অর্থাৎ সাংগঠনিক শক্তি বা ক্ষমতা বজায় থাকবে? মো. সেলিম, বর্তমান সিপিআইএম রাজ্য সম্পাদক, যিনি মনে করেন হাসপাতালের একাংশকে রুগীদের বঞ্চিত করে বাসস্থানরূপে ব্যবহার করা কোন দুর্নীতি নয়। আরও মনে করেন, আব্বাস সিদ্দিকীর মতো এক ফতোয়াবাজ ধর্মগুরুকে জাদুমন্ত্র বলে রাতারাতি সেকুলার বানিয়ে ভোটের বাজারে নামিয়ে দিতে পারলেই মুসলিম ভোট কেটে মমতাকে কোণঠাসা করা সহজ। কিন্তু বিধি বাম, ভোটে ফল হোল শুন্য। তাও তিনি স্বপদে এখনও উজ্জ্বল!  দলে অন্দরের সমীকরণ বুঝে তা ম্যানেজ করায় তিনি যে পারদর্শী, সেটা এখন পরিষ্কার। কিন্তু তাঁর হাতে দলের ভবিষ্যত কতখানি উজ্জ্বল, সেটাই এখন লাখ টাকার প্রশ্ন।  আরও প্রশ্ন, জাতীয় নেতৃত্ব তথা সীতারাম ইয়েচুরি যদি বলেনও যে, মোদীকে পরাজিত করার লক্ষ্যে সব বিরোধী শক্তিকে বোঝাপড়ায় আসা জরুরি, কিন্তু মো. সেলিম কি সেই বার্তা আন্তরিকভাবে মানবেন? মনে হয়না। কারণ, মমতা বিনাশের আগে মোদীর বিনাশ  চাওয়া প্রায় অসম্ভব।

 

সিপিআইএম রাজ্য নেতারা বলেন, মোদী ও মমতা উভয়ই খুব খারাপ, ফলে দুজনের বিরুদ্ধেই লড়াই চালাতে হবে একসাথে। ইদানিং  বিজেমূল তত্বের গল্প বিশেষ শোনা যাচ্ছে না বটে, কিন্তু মানসিকতার কোন বদল হয়নি আদৌ। ধরে নেওয়া যাক, মমতা ও মোদী সমান খারাপ, সমান ভয়ংকর। কিন্তু যুক্তি কি বলে, মোদী ও মমতার ক্ষতি করার সুযোগ বা ক্ষমতা কি এক? আর নূন্যতম নিরপেক্ষতা যাদের আছে তারা কি মনে করেন, প্রধানমন্ত্রিত্বের বলে বলীয়ান মোদীর অসীম ক্ষমতার সঙ্গে কোনভাবেই কি তুলনীয় মমতার ক্ষমতা! আসলে ভয় বা হিসেবটা ভিন্ন। যথা - মোদী হারলে মমতার শক্তিবৃদ্ধি হবে এবং ২০২৬এ ভোটে হারানো আরও কঠিন হবে। ফলে মমতাকে হারাতে মোদীই এদের সেরা হাতিয়ার। কিন্তু আসন্ন ২০২৪এর ভোটে যদি গোটা দেশে মোদী দুর্বল হয়, তাহলে শুধু এই রাজ্যেই কি বিজেপি দুর্বল না হয়ে সবল হবে? এমনটা তো নয়।

 

সর্বভারতীয় ক্ষেত্রে কংগ্রেসের সঙ্গে যেতে সিপিআইএমের কোন অসুবিধে নেই। কিন্তু কেরলে কি হবে? সমঝোতা হবার কোন সম্ভাবনা আছে বলে মনে হয়না। দুদলের মুখোমুখি লড়াইই প্রায় নিশ্চিত। বাঁচোয়া যে, কেরলে বিজেপি এখনও যথেষ্ট শক্তিশালী নয়। কিন্তু গোটা দেশে মোদীর দল বিজেপি যে, এক দেশ, এক নেতা, এক নীতির সঙ্গে হিন্দী - হিন্দু - হিন্দুস্থানের স্লোগান তুলে সংবিধান ও গণতন্ত্রের শ্মশান যাত্রা প্রায় সম্পন্ন করে হিন্দু রাষ্ট্র স্থাপনের জোগাড় সেড়ে ফেলেছে এবং তাকে ঠেকানোই এখন দেশবাসীর প্রধান কর্তব্য। এমতাবস্থায় সীতারাম ইয়েচুরি বা মো. সেলিম মুখে কি বলে আর কাজে কি করে, সেদিকে সবারই নজর থাকবে।

 

                       

   

 

0 Comments

Post Comment