যন্তর মন্তরে ঐতিহাসিক যুব বিদ্রোহ এবং তৎপরবর্তী ককরোচ জনতা পার্টির 'স্কুল ঠিক করো' অভিযান আরেকবার শিক্ষা ব্যবস্থা ও সরকারি স্কুলগুলোর হাল-হকিকত নিয়ে আলোচনাকে প্রাসঙ্গিক করে তুলেছে।এক্ষেত্রে আপাতত দুটো তথ্য মাথায় রাখলেই চলবে। গত দশ বছরে দেখা গেছে প্রতিদিন গড়ে ২৫ টি সরকারি স্কুল বন্ধ হয়ে গেছে। দ্বিতীয়টি হল উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষা দেবার আগেই ৭৩% শিক্ষার্থী শিক্ষা ব্যবস্থার বাইরে চলে যায়। শিক্ষার সংকট,সরকারি স্কুলের অধোগতির স্বরূপ নিয়ে আলোচনা যথেষ্ট কিন্তু সময় এসেছে পরিবর্তনের কথা আলোচনা করা। আমরা কেমন ধরণের স্কুল চাই তা নিয়ে প্রাথমিক সংলাপের ক্ষেত্র প্রস্তুত করা। শিক্ষা নিয়ে আলোচনার প্রশ্নে একটা মানদণ্ড জরুরি।সেটা হল যে শিক্ষা কাঠামো তৈরি হয়েছে তাকে চ্যালেঞ্জ করার মানসিকতা, যে ভাবে শিক্ষা পদ্ধতি চলছে তাকে প্রশ্ন করা এবং অবশ্যই সরকারের উপর ন্যস্ত দায়িত্ব ঠিক মত পালন করা হচ্ছে কি না তাকে দায়বদ্ধ করা।
সরকারি স্কুলে শিক্ষার্থী ভর্তি করার ক্ষেত্রে অভিভাবকদের মধ্যে যে বিশ্বাসের অভাব ( trust deficit) তৈরি হয়েছে, তার প্রধান কারণ আজকের পৃথিবীতে প্রতিযোগিতার বাতাবরণে সরকারি স্কুলগুলো শিক্ষাদানের ক্ষেত্রে যথেষ্ট যোগ্য নয়।অথচ আমরা যদি " The Right of children to free and compulsory education Act-2009" এবং " Right to education Rule -2010" এর দিকে নজর ফেরাই তাহলে দেখতে পাব যে নিয়মগুলো শিক্ষার্থী সহায়ক।এক্ষেত্রে প্রথম কথা বলা দরকার যে প্রাইমারি ( প্রথম - পঞ্চম শ্রেণি) সেকশনে শিশুর এক কিলোমিটারের মধ্যে স্কুল থাকতে হবে( নেইবারহুড স্কুল) এবং আপার প্রাইমারি সেকশনে ( ষষ্ঠ - অষ্টম শ্রেণি) তিন কিলোমিটারের মধ্যে স্কুল থাকবে। এখন আমাদের বুঝতে হবে যে গুগুল ম্যাপে এক বা তিন কিলোমিটারের মধ্যে স্কুল থাকা যথেষ্ট নয়। লক্ষ্য রাখতে হবে আলোচ্য স্কুলটিতে যাওয়া শিক্ষার্থীর পক্ষে সম্ভব কি না। পথে যদি ঘন জঙ্গল, নদী বা জলাভূমি থাকে তাহলে সেখানে নিয়মিত যাওয়া শিক্ষার্থীর পক্ষে সম্ভব নয়।শিক্ষার অধিকার নিয়ে কাজ করতে আগ্রহী মানুষদের কাছে তাই স্কুল ও শিক্ষার্থীর বাসস্থানের অবস্থান গুরুত্বপূর্ণ।
দ্বিতীয় বিষয়টি অবশ্যই পরিকাঠামো সংক্রান্ত। শিক্ষার অধিকার আইনে স্কুলের ক্ষেত্রে যে সমস্ত পরিকাঠামোকে আবশ্যক করা হয়েছে তার মধ্যে রয়েছে শক্তপোক্ত বিল্ডিং, প্রাথমিকে হেড টিচারের অন্তত একটা আলাদা কক্ষ যা একই সঙ্গে অফিস হিসাবে ব্যবহার করা যাবে। ছাত্র ও ছাত্রীদের জন্য আলাদা শৌচাগার, বিশুদ্ধ পানীয় জল, মিড ডে মিলের রান্নাঘর, খেলার মাঠ, স্কুলের সীমানা প্রাচীর এবং বিদ্যুৎের ব্যবস্থা। স্বাধীনতার ৭৫ বছর পরেও বলা যায় শহরাঞ্চলে পরিকাঠামোর কিছু উন্নতি পরিলক্ষিত হলেও গ্রাম ভারত এখনো নেই রাজ্যের দেশ। ককরোচ জনতা পার্টির স্বেচ্ছাসেবকরা যাতে স্কুলগুলো পরিদর্শন করতে না পারে তার জন্য রাজস্থান, উত্তরপ্রদেশ, মধ্যপ্রদেশ সরকারের একের পর এক নিষেধাজ্ঞার কারণ পরিকাঠামোর শোচনীয় অবস্থা। কিছুদিন আগে রাজস্থান সরকারের প্রেস বিবৃতি অনুসারে সে রাজ্যে ৬১১ টি স্কুলের নিজস্ব কোন ভবন নেই। ২০৪৭ টি বিদ্যালয়ে শৌচাগার নেই। ১০৪৯ টি স্কুলে পানীয় জলের ব্যবস্থা নেই। আজকে স্কুলের হাল ফেরাতে হলে মিড ডে মিলের উন্নতি দরকার।রান্নার জায়গা, জল, বাসন- কোসন, ইন্ধন ( বহু জায়গায় রান্নার গ্যাসের সমস্যা) এবং মিড ডে মিল কর্মীদের সামান্য বেতন পরিস্থিতিকে আরো জটিল করে তুলেছে। বিহারে শতাধিক স্কুলে সম্প্রতি কৃমি পাওয়া সেই দুরবস্থার প্রতিফলন মাত্র।
শিক্ষাবিজ্ঞান যতই শিক্ষার্থী কেন্দ্রিক শিক্ষা ব্যবস্থার কথা বলুক, এখনো শিক্ষার ভালোমন্দ চক-খড়ি হাতে ব্ল্যাকবোর্ডের সামনে দাঁড়ানো লোকগুলোর উপরই নির্ভরশীল। আজকের দিনে শিক্ষকরা সহজ চাঁদমারি কিন্তু শিক্ষকের অভাব শিক্ষাকে দুর্বল করেছে। শিক্ষার অধিকার আইন অনুসারে প্রাইমারিতে ৩০ জন শিক্ষার্থী পিছু একজন এবং স্কুলে যদি ১৫০ শিক্ষার্থী থাকে তবে একজন হেড টিচার থাকার কথা বলা হয়েছে।আপার প্রাইমারিতে সেই অনুপাত ১:৩৫।সংখ্যার বিচারে ভারতে শিক্ষক সংখ্যা সামান্য বৃদ্ধি পেলেও সমস্যা যোগ্য শিক্ষকের।বিশেষ করে আপার প্রাইমারি, সেকেন্ডারি ও হায়ার সেকেন্ডারি স্তরে বিষয় ভিত্তিক শিক্ষকের ক্ষেত্রে। ভৌত বিজ্ঞান, জীবন বিজ্ঞান, সমাজবিদ্যা এবং ভাষা শিক্ষার ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট বিষয় শিক্ষক ছাড়া চলতে পারে না।আবার অঙ্কন,হাতের কাজ এবং শারীর শিক্ষার ক্ষেত্রে দক্ষ শিক্ষক না থাকলে সমস্যা। এক্ষেত্রে আংশিক সময়ের শিক্ষক দিয়েও কাজ চালানোর চেষ্টা হচ্ছে। অভিজ্ঞতা বলছে বহু ক্ষেত্রে শিক্ষার্থী ও শিক্ষকের অনুপাত গাণিতিক নিয়মে ঠিক থাকলেও নির্দিষ্ট বিষয় ভিত্তিক শিক্ষক নেই। ফলে শিক্ষার্থীকে প্রাইভেট টিউটরকে ভরসা করতে হচ্ছে। যন্তরমন্তর আন্দোলনের প্রতিক্রিয়ায় উত্তর ভারতের বিভিন্ন স্কুলের শিক্ষার্থীরা রাস্তায় নেমে এসেছিল। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই তাদের দাবি ছিল শিক্ষক নিয়োগের। আজ আরেকটা বড় সমস্যা হল শিক্ষকদের বহু কাজ করতে হচ্ছে যার সঙ্গে স্কুল শিক্ষার কোন সম্পর্ক নেই।ভোট করানো, এসআইআর, জনগণনা প্রভৃতি কাজে শিক্ষকদের যুক্ত করানোর কারণে স্কুল খোলা থাকলেও নির্দিষ্ট ক্লাস হচ্ছে না। সরকারি স্কুল আজ পরিষেবা দেওয়ার কেন্দ্র ফলে বহু জায়গায় পড়াশোনা লাটে উঠছে।
সরকারি স্কুলে আজ সারা দেশ জুড়েই শিক্ষকের সংকট। দেশে এক লক্ষ চার হাজার একশ পঁচিশটি স্কুল এক শিক্ষক চালিত যার বেশিটাই গ্রাম ভারতের।মাধ্যমিক স্তরে প্রতি সাতচল্লিশ জন পিছু একজন শিক্ষক যা শ্রেণিকক্ষে পঠন-পাঠনের প্রকৃত অবস্থাটা আমাদের চোখের সামনে তুলে ধরে।আর কম শিক্ষকের সমস্যায় সবচেয়ে জেরবার যে রাজ্য তার নাম বিহার,এখানে দুই লক্ষ আট হাজার সাতশ চুরাশিটি শিক্ষকের পদ ফাঁকা পড়ে আছে।এছাড়া আছে ভুতুড়ে স্কুল যেখানে স্কুল বাড়ি আছে,চেয়ার বেঞ্চ আছে, শিক্ষক আছে কিন্তু শিক্ষার্থী নেই। এই মাপকাঠিতে প্রথম পশ্চিমবঙ্গ (৩৮১২) এবং দ্বিতীয় তেলেঙ্গানা (২২৪৫)। এমনকি শিক্ষকদের দক্ষতা নিয়ে ঘুরিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছে নীতি আয়োগের প্রতিবেদনে। গণিত শিক্ষকদের দক্ষতা যাচাইয়ের পরীক্ষায় মাত্র ২% একশর মধ্যে ৭০ বা তার বেশি নম্বর পেয়েছে, গড় নাম্বার ৪৬। সরকারি স্কুলে পড়াশোনা নিয়মিত হয় না, এমন অভিযোগও মান্যতা পেয়েছে। পাঠ দিবসের ১৪% নষ্ট হয় সার্ভে,নির্বাচন,প্রশাসনিক কাজের মত নন- অ্যাকাডেমিক কাজকর্মের জন্য।
ভারতে বেশিরভাগ স্কুলের পরিচালন ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত মানুষদের রাজনৈতিক ক্ষমতা বিস্তারের চেষ্টা, শিক্ষা অনুরাগীর ছদ্মবেশে দলতন্ত্রের কুৎসিত আস্ফালন এবং ম্যানেজিং কমিটিতে অযোগ্য মানুষদের উপস্থিতি স্কুল পরিচালন ব্যবস্থায় প্রতিবন্ধকতা তৈরি করছে। ম্যানেজিং কমিটি যদি গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে স্কুল উন্নয়নের রূপরেখা তৈরি করতে পারে তাহলে স্কুল সবচেয়ে ভালো ভাবে চলতে পারে।নতুন আইনে বলা হয়েছে ম্যানেজিং কমিটির ৭৫% সদস্য অভিভাবকদের মধ্যে থেকে নেওয়া হবে এবং তার মধ্যে ৫০% হবে মহিলা।নিয়মটা উপযুক্ত হলেও কোন পদ্ধতিতে এই সদস্যরা মনোনীত হবেন তা নিয়ে স্বচ্ছ গাইডলাইনের অভাব রয়েছে। পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলগুলো স্কুল পরিচালন করার ক্ষেত্রে যথেচ্ছ হস্তক্ষেপ করতে পারছে।
স্কুল শিক্ষার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় সমস্যা হল ড্রপআউট।২০২৫ সালের কেন্দ্রীয় শিক্ষা মন্ত্রকের প্রতিবেদনে ড্রপ আউটের ভয়াবহতা ফুটে উঠেছে। প্রাইমারিতে দেশে শিক্ষার্থী সংখ্যা ১০৪,৩৮১,৩৪৭।কিন্তু এরাই যখন আপার প্রাইমারিতে যাচ্ছে তখন সংখ্যাটা হচ্ছে ৬৩,৬৯৫,১০০।মাধ্যমিক স্তরে সেটা হচ্ছে ৩৭,১৬৫,৪৩৬।উচ্চ মাধ্যমিক স্তরে যখন শিক্ষার্থীরা এসে পৌঁছাতে পারছে তখন সংখ্যা ২৭,৬৪৩,১১৭। চারটি স্তরে এনরোলমেন্টের শতকরা হার যথাক্রমে ৭৭%, ৬৭.৫%, ৪৭.৫%, ৩৬% যা ড্রপ আউটের ভয়াবহতা প্রকাশ করে। আর অসরকারি সংস্থা ' প্রথম ' এর গত দশ বছরের রিপোর্ট যদি পর্যালোচনা করি তাহলে দেখতে পাব যারা স্কুলে পড়ছে তাদের শেখার হাল হকিকত কাম্যমানের চেয়ে অনেক কম।
টাকা পয়সার গল্প ছাড়া সরকারি স্কুলের মানোন্নয়ন সংক্রান্ত কোন গল্পই শেষ হবে না।ভারতে রাজ্যস্তরে জিডিপির ৩% ও কেন্দ্রীয় স্তরে ১% অর্থাৎ মোট ৪% খরচ করা হয় যা প্রয়েজনের তুলনায় সামান্য। জনশিক্ষায় টাকার অভাব এতটাই দৃশ্য মান যে অভিভাবকেরা সরকারি স্কুলের বদলে বিভিন্ন খরচের প্রাইভেট স্কুল বেছে নিচ্ছেন। এই মুহূর্তে দেশে প্রাইভেট স্কুলের সংখ্যা ১২০,৬১৮,২৩৬ এবং সরকারি স্কুলের সংখ্যা ১২১,৫৮৯,৯১১। সংখ্যা প্রায় সমান সমান। শহরের দিকে ছবিটা আরো উদ্বেগজনক।এখানে ৫১% শিক্ষার্থী প্রাইভেট স্কুলে পড়ে।
আজ আমরা যদি আধুনিক পরিকাঠামো, প্রযুক্তির মানবিক প্রয়োগ, শিক্ষার্থীদের প্রতি সংবেদনশীল এবং ধর্মনিরপেক্ষ, যুক্তিবাদী সিলেবাস সমৃদ্ধ সরকারি স্কুল তথা শিক্ষাব্যবস্থা আমরা চাই তবে সরকারি স্কুলের খোলনলচে পাল্টাতে হবে। সেজন্য গণতান্ত্রিক মূল্যবোধে বিশ্বাসী মানুষদের যে কোন উদ্যোগ স্বাগত।সরকার দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হয়েছে, পাল্টানোর ডাক দেওয়া সময়ের দাবি।