পড়শি যদি আমায় ছুঁতো যম যাতনা সকল যেত দূরে: লালন সাঁই

পড়শি যদি আমায় ছুঁতো যম যাতনা সকল যেত দূরে: লালন সাঁই

hhhhhhhhhhhhhh

সংখ্যাগুরুর দায়িত্ব কি সংখ্যালঘুর অধিকার সুনিশ্চিত করা নয়?

  • 23 October, 2021
  • 1 Comment(s)
  • 646 view(s)
  • লিখেছেন : সেখ সাহেবুল হক
একটি দেশে সংখ্যাগুরুর দায়িত্ব সংখ্যালঘুর অধিকার সুনিশ্চিত করা, সুরক্ষার দায়িত্ব নেওয়া৷ বাংলাদেশিরা ব্যর্থ হয়েছে৷ কিন্তু অপরাধীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। কিন্তু এদেশে? এদেশের সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা দিতে হিন্দুত্ববাদের পূজারীরা কতখানি সোচ্চার? তাঁরা নিজ দেশে কতখানি দায়িত্ব পালন করেছেন? আখলাখের খুনিদের সাজা চেয়েছেন? সংখ্যালঘুর লিঞ্চিংয়ে অভিযুক্তদের সংবর্ধনা দিলে বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছেন? বেছে বেছে বিশেষ ধর্মের সংখ্যালঘুদের রাতারাতি ডিটেনশন ক্যাম্পে পাঠানোর উদ্যোগ হলে রুখে দাঁড়িয়ে বলেছেন, কারও বাপের ক্ষমতা নেই পাঁচপ্রজন্ম এদেশে থাকা সংখ্যালঘু পরিবারের কাগজ দেখার কথা বলার? না বলেননি৷ উল্টে 'এদেশে থাকতে হলে দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিক হয়ে থাকতে হবে' মানসিকতাই উঠে এসেছে।

বাংলাদেশে সংখ্যাগুরুদের আগ্রাসন, সংখ্যাগুরু কর্তৃক নিপীড়নের প্রতিবাদ সর্বস্তরে হয়েছে৷ কোনও রাখঢাক না করেই ইসলামপন্থীদের ধর্মীয় নিপীড়ন যে কী ভয়ঙ্কর রূপ নিয়েছে সেটা নিয়ে বার্তা দিয়েছেন সবাই। সেলিব্রিটিরা আক্রান্তদের পক্ষ নিয়েছেন, ধার্মিকরাও এই ঘটনার নিন্দা করে অভিযুক্তের শাস্তির দাবি করেছেন৷ সে'দেশের সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করতে মোটামুটিভাবে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে সরকারের তরফে৷ এবার একটু ভিন্ন দিক নিয়ে আলোচনা দরকার৷ তাৎক্ষণিকভাবে হোয়াটঅ্যাবাউটারি মনে হলেও এই কথাগুলোও ভাবার বিষয়।

বাংলাদেশের মণ্ডপে আক্রমণ, মন্দির ভাঙচুরের ঘটনায় একধরনের প্রতিবাদের প্রকৃতি এবং উদ্দেশ্য লক্ষ্য করুন। দেখবেন যে হিন্দুত্ববাদীরা আসামে সংখ্যালঘুদের বুকের উপর নাচলে, গোরক্ষার নামে পেহেলু খানদের পিটিয়ে মারলে, ডিটেনশন ক্যাম্পে পাঠানোর কথা উঠলে উল্লাস করে তারা ভীষণ আহত হয়েছে বাংলাদেশের ঘটনায়৷ কি অদ্ভুত না? অথচ এরাই বাঙালি শ্রমিক আফরাজুলের খুনি শম্ভুলাল রেগারের সমর্থক৷ মুসলিমশূন্য হিন্দুরাষ্ট্রের স্বপ্নসুখে বাঁচে৷ সংখ্যালঘুদের উপর আগ্রাসনের মনোভাব পোষণ করে।

একটি দেশে সংখ্যাগুরুর দায়িত্ব সংখ্যালঘুর অধিকার সুনিশ্চিত করা, সুরক্ষার দায়িত্ব নেওয়া৷ বাংলাদেশিরা ব্যর্থ হয়েছে৷ কিন্তু অপরাধীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। কিন্তু এদেশে? এদেশের সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা দিতে হিন্দুত্ববাদের পূজারীরা কতখানি সোচ্চার? তাঁরা নিজ দেশে কতখানি দায়িত্ব পালন করেছেন? আখলাখের খুনিদের সাজা চেয়েছেন? সংখ্যালঘুর লিঞ্চিংয়ে অভিযুক্তদের সংবর্ধনা দিলে বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছেন? বেছে বেছে বিশেষ ধর্মের সংখ্যালঘুদের রাতারাতি ডিটেনশন ক্যাম্পে পাঠানোর উদ্যোগ হলে রুখে দাঁড়িয়ে বলেছেন, কারও বাপের ক্ষমতা নেই পাঁচপ্রজন্ম এদেশে থাকা সংখ্যালঘু পরিবারের কাগজ দেখার কথা বলার? না বলেননি৷ উল্টে 'এদেশে থাকতে হলে দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিক হয়ে থাকতে হবে' মানসিকতাই উঠে এসেছে। সরকারের সমালোচনা করলে সর্বত্রই পাকিস্তানের দালালি দেখার প্রবণতা, তারপর 'কাটার বাচ্চা' ইত্যাদি বলে তেড়ে যাওয়া৷ সংখ্যাগুরুর একটা বড় অংশের ভাবখানা এমন, তুমি সংখ্যালঘু, দয়া করে থাকতে দিয়েছি, তারপরও সরকারের সমালোচনা কর কোন মুখে! না পোষালে মুসলিম দেশে চলে যাও৷ তোমাদের তো অনেকগুলো দেশ আছে।' হায়রে চায় অক্ষর! দেশের অব্যবস্থা নিয়ে প্রশ্ন তুললেও সংখ্যালঘুকে কেন তাড়ানোর হুমকি দেওয়া হবে, সেটা নিয়ে সরকারের অবস্থান কী? সংখ্যাগুরু কী দায়িত্ব নিয়েছেন এর প্রতিকারে? প্রশ্নগুলো সহজ, আর উত্তরও তো জানা।

একটি দেশের নেতা প্রকাশ্যে বলেন, সংখ্যালঘুদের ভোটাধিকার কেড়ে নেওয়া হবে। সেখানে সংখ্যাগুরুর সম্মিলিত প্রতিবাদ কই? উল্টে দর্শক আসন থেকে হাততালির ঝড় ওঠে। সংখ্যালঘু সহকর্মীকে পাকিস্তানি দেগে দিলে, ধর্ম তুলে অপমান করলে যে সহকর্মী রুখে দাঁড়ান না। সেই এতকালের 'অরাজনৈতিক' সহকর্মী হঠাৎ ভীষণভাবে রাজনৈতিক হয়ে পড়লেন কেন! কারণ বাংলাদেশের ঘটনায় তিনি ধর্মীয় যোগ পেয়েছেন৷ এই প্রতিবাদ আসলে ধর্মের টানে, মানবিকতার টানে নয়। এমনটা হওয়া কাম্য কি? বাংলাদেশের ইসলামিক মৌলবাদ দেখে ক্ষেপে যাওয়া সংখ্যাগুরুর একটা বড় অংশ নিজেরাও হিন্দুত্ববাদী মৌলবাদী হয়ে উঠেছেন৷ সে পরিচয় তাঁদের আচরণে, এবং কার্যকলাপে এবং দ্বিচারিতায় ধরা পড়ে।

মানুষ আক্রান্ত হলেই প্রতিবাদ হওয়া দরকার। ধর্মীয় পরিচয় জরুরি নয়। সংখ্যালঘু হয়ে প্রতিনিয়ত বুঝতে পারি 'মালাউনের বাচ্চা' আর 'কাটার বাচ্চা' আসলে অভিন্ন৷ ভাড়াটে লোক দিয়ে মন্দিরে গোমাংস ফেলে সেই ছুতোয় এপারের সংখ্যালঘুদের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে যারা, আবার কোরানের অবমাননার চক্রান্ত করে ওপারের সংখ্যালঘুদের জীবন অতিষ্ট করে যারা, উভয় প্রজাতি আসলে একই। এজন্যই ধর্ম না দেখে সার্বিকভাবে প্রতিবাদ করা দরকার। কিন্তু সেটা হয় না। এই সুযোগে কুমিল্লা নিয়ে কান্নাকাটি করা বীর হিন্দুত্ববাদীর বোঝা উচিত জোর করে জয় শ্রীরাম বলে পিটিয়ে মারা তাবরেজ আনসারিদের সুরক্ষার দায়িত্বও কিন্তু তাঁদেরই৷ বাংলাদেশে সংখ্যালঘুদের উপর বর্বরোচিত হামলায় সোচ্চার হওয়ার পাশাপাশি, নিজ দেশের সংগঠিত সংখ্যালঘু নিপিড়ন নিয়ে সচেতন হতে হবে। নইলে মৌলবাদের বিরোধিতা করার কোনও অধিকার তাঁদের নেই। কিন্তু তাঁরা কি বুঝবেন? সেই তো আবার কোনও মুসলিমকে পিটিয়ে মারলে উল্লাস করবেন! দাঙ্গাবাজ কপিল মিশ্রদের পক্ষ নেবেন৷ ঠিক যেটা এখন বাংলাদেশি মৌলবাদীরা করছে সেই একই ঘটনা এপারেও ঘটবে।
বাংলাদেশের ঘটনার প্রতিবাদে ত্রিপুরাতে একাধিক মসজিদ ভাঙচুর এবং সংখ্যালঘু মুসলিমদের উপর নিপীড়নের ঘটনা ঘটেছে। মেইনস্ট্রিম মিডিয়ায় সেই খবর নেই৷ সোচ্চারে সংখ্যাগুরুর প্রতিবাদ কিংবা পাশে দাঁড়ানোর বালাই নেই। বাংলাদেশ নিয়ে প্রতিবাদের মাধ্যম এদেশের সংখ্যালঘুদের উপর নিপীড়ন? এখানেই ধর্মভিত্তিক প্রতিবাদের দিকে আঙুল উঠে যায়৷ এই ধরণের একপেশে প্রতিবাদীরা আসলে প্রতিবাদ চান না, চান প্রতিশোধ।

উপমহাদেশে প্রতিবাদের ক্ষেত্রে আশ্চর্য দ্বিচারিতা সর্বত্রই৷ বাংলাদেশের যে মানুষটি ভারতের সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা চেয়ে সোশ্যাল মিডিয়ার ক্ষোভ ব্যক্ত করছেন, তিনি নিজ দেশে সংখ্যালঘুদের উপর অত্যাচারের ঘটনায় প্রতিবাদ তো দূর, অস্বীকার করছেন৷ শাক দিয়ে মাছ ঢাকছেন৷
উল্টোদিকে রিহানা, গ্রেটা থুংবার্গ ভারতের সংখ্যালঘুদের সুরক্ষা এবং অধিকারের পক্ষে টুইট করলে যে ভারতীয় বলেন, 'আমাদের ব্যাপারে নাক গলাতে এসো না। এসব আমাদের দেশের আভ্যন্তরীণ ব্যাপার' ইত্যাদি, তিনি বাংলাদেশের সংখ্যালঘু নিপীড়নে সোচ্চার৷ তাঁর এই আচরণের পেছনেও রয়েছে শুধুমাত্র 'হিন্দু' ভাইচারা৷ নইলে যাঁরা নিজ দেশের সংখ্যালঘু নিধনে বিন্দুমাত্র বিচলিত নন৷ প্রতিবাদ দূরে থাক, ভেবেই নিয়েছেন অমন একটু হয়। ধর্ম দেখে আক্রান্ত সংখ্যালঘুর পক্ষ নেওয়ার প্রবণতায় কোনও নিরপেক্ষতা নেই, মানবিক দৃষ্টিভঙ্গিতেও রয়েছে বিস্তর ধর্মীয় ভেদাভেদ৷ নিজ ধর্মের লোক দেখে তবেই প্রতিবাদ করবো, এমনটা কেন হবে!

1 Comments

Goutam Das

23 October, 2021

আপনাদের লেখাগুলো পড়ে খুব ভালো লাগলো।

Post Comment