পড়শি যদি আমায় ছুঁতো যম যাতনা সকল যেত দূরে: লালন সাঁই

পড়শি যদি আমায় ছুঁতো যম যাতনা সকল যেত দূরে: লালন সাঁই

hhhhhhhhhhhhhh

ফস্কা গেঁড়োর কথা

  • 01 January, 1970
  • 0 Comment(s)
  • 204 view(s)
  • লিখেছেন : মালবিকা মিত্র
নির্বাচন কমিশনের প্রবণতা দেখে বোঝা যাচ্ছে অঘোষিত রাষ্ট্রপতি শাসন কায়েম করে তারা এরাজ্যে নির্বাচন সম্পন্ন করতে চায়। মুখ্যমন্ত্রীকে রাষ্ট্রপতি শাসনের মাধ্যমে অপসারণ করার ঝুঁকি না নিয়ে, মুখ্যমন্ত্রীর সমগ্র প্রশাসনযন্ত্র কে আপাদমস্তক ডানা ছেঁটে দিয়ে, নির্বাচন কমিশন নিজের ইচ্ছা ও পছন্দমত ভোট করতে চায়।

ডি এফ ফ্লেমিং তার কোল্ড ওয়ারের পটভূমি প্রসঙ্গে, ১৯৪৫ সালের সেপ্টেম্বর-অক্টোবর মাসে নটি দেশের বিদেশ মন্ত্রীদের সম্মেলনের আলোচনা বর্ণনা করেছেন। যা লন্ডন কনফারেন্স নামে পরিচিত। সেখানে তিনি বলেছেন, মাত্র এক মাস আগে, আগস্ট মাসে, হিরোশিমা ও নাগাসাকিতে ভয়াবহ পরমাণু বোমা নিক্ষেপের পরবর্তী, একটা ভীতিপূর্ণ গা ছমছমে "creeping" পরিবেশে বিদেশ মন্ত্রীদের এই সম্মেলন শুরু হয়েছিল। পারমাণবিক মারণাস্ত্রের আমেরিকান হুমকির পটভূমিতে, গোটা বিশ্ব স্তম্ভিত হয়ে গিয়েছিল। এই পরিবেশে বিদেশ মন্ত্রীদের মধ্যে ভবিষ্যৎ ইউরোপের ও পৃথিবীর শান্তি নিয়ে আলোচনা কার্যত অসম্ভব হয়ে পড়ে। শান্তির আলোচনার জন্য যে নূন্যতম শান্তির পরিবেশের প্রয়োজন, তা এ সময় ছিল না। বরং একটা পরমাণু অস্ত্রের হুমকির সামনে, গা ছমছমে পরিবেশ, পারস্পরিক সন্দেহ ও আশংকার বাতাবরণে আলোচনা শুরু হয় এবং অনিবার্য ভাবে এই আলোচনা ফলপ্রসু হতে পারে না। এটাই ছিল পরবর্তী পাঁচ দশকের ঠান্ডা যুদ্ধের পটভূমি।

প্রায় ৮০ বছর বাদে এই ঠান্ডা যুদ্ধের প্রেক্ষাপটকে আলোচনা করা আমার উদ্দেশ্য নয়। শান্তির আলোচনার জন্য যেমন শান্তিপূর্ণ উদার পরিবেশ প্রয়োজন, ঠিক তেমনি গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় একটি সর্বোচ্চ সক্রিয়তা সার্বজনীন ভোটাধিকার। তার প্রয়োগের ক্ষেত্রেও একটি গণতান্ত্রিক ও উদার বাতাবরণ প্রয়োজন। তা না হলে গণতন্ত্র কথাটি অসার হয়ে পড়ে। যে কারণে আমার অত্যন্ত প্রিয় পছন্দের বামপন্থী সাংবাদিক, স্নিগ্ধেন্দু ভট্টাচার্য। সেদিন ইউটিউবে একটা আলোচনায় নির্বাচন নিয়ে কোন পূর্বানুমান করতে পারল না। কারণ নির্বাচন শেষ পর্যন্ত কেমন হবে সে বিষয়ে স্নিগ্ধেন্দু শঙ্কিত। আসুন আমরা দেখে নেই আজকের এই বাতাবরণ ১৯৪৫ এ সাথে কতটা সাদৃশ্যপূর্ণ। শঙ্খ ঘোষের সেই ছড়াটি মনে পড়ছে -- 
বুকের উপর উঁচিয়ে আছে ছুরি, 
কাজেই এখন স্বাধীনভাবে ঘুরি।

গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা মানে একটি সুস্থির শাসনতন্ত্র থাকা প্রয়োজন। তা লিখিতই হোক বা অলিখিত যাই হোক। সেই শাসনতন্ত্র জনগণের পক্ষ থেকে গৃহীত হতে হবে। সমস্ত জনগণ তো এই সংবিধান রচনায় অংশ নেয় না, কিন্তু জনগণের প্রতিনিধিরা এই শাসনতন্ত্র লিপিবদ্ধ করে, যা জনগণের প্রতিনিধি দের দ্বারা অনুমোদিত হয়। "We the people of India having solemnly...... " জনগণ প্রত্যক্ষভাবে নয়, পরোক্ষভাবে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের মাধ্যমে এই সংবিধান ও তার বর্ণিত নীতি গুলিকে প্রয়োগ করে। প্রতিনিধিত্বমূলক গণতন্ত্রে নির্বাচন একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। স্বভাবতই একবার যদি নির্বাচন প্রক্রিয়াটি ক্ষতিগ্রস্ত করা যায়, তাহলে "We the people" ঘোষণার অন্তর্জলি যাত্রা সাঙ্গ হয়। এই কারণে সংবিধান প্রণেতারা ৩২৪ থেকে ৩২৬ ধারায় নির্বাচন কমিশনের গঠন প্রক্রিয়া, তার সীমাহীন ক্ষমতা, তার হাতে পূর্ণ স্বাধীন স্বায়ত্তশাসন ইত্যাদি প্রদান করেছে। 

মনে রাখতে হবে, সংবিধান যতই দুষ্পরিবর্তনীয় হোক না কেন, সংবিধানের মৌলিক অধিকার যতই সুরক্ষিত হোক না কেন, একবার যদি নির্বাচন প্রক্রিয়াটি ঘেঁটে দেওয়া যায়, অর্থাৎ গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার বটবৃক্ষের গোড়ায় কুড়োল না মাড়লেও চলে -- যদি গোড়ায় অ্যাসিড ঢেলে দেওয়া হয়, তাহলে সমগ্র মহীরুহ উপড়ে ফেলা তখন সময়ের অপেক্ষা মাত্র। 
মহাঘাতে মড়মড়ি
রসাল ভূতলে পড়ি
হায়, বায়ু বলে
হারাইল আয়ু..... । 

নির্বাচন পরিচালনার মূল কারিগর নির্বাচন কমিশনকে গঠন করার ক্ষেত্রে সতর্কতা রক্ষা করা ছিল জরুরি। সংবিধানের রচয়িতারা সরকারের কোন একটি বিভাগকে কমিশনের সদস্য নির্বাচনের অধিকার দেননি। বিচার বিভাগের শীর্ষে আসীন সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি, কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভার শীর্ষে আসীন প্রধানমন্ত্রী এবং সংসদে বিরোধী দলের শীর্ষ নেতা, এই তিনজনের দ্বারা নির্বাচিত হতে হবে নির্বাচন কমিশনের সদস্যদের। লক্ষ্য করুন, ২০২৪ এর লোকসভা নির্বাচনের পূর্বে, সংসদ থেকে ভুরি ভুরি বিরোধী সদস্যদের সাসপেন্ড করে, সংসদ কে বিরোধীহীন করে, ২০২৩ সালে, সংসদের উভয় কক্ষের অনুমোদনের সাহায্যে নির্বাচন কমিশন নিয়োগের প্রক্রিয়া টি সংশোধন করা হলো। কি হলো? The selection committee comprises the Prime Minister (Chairperson), the Leader of the Opposition (or largest opposition party) in the Lok Sabha, and a Union Cabinet Minister, nominated by the Prime Minister. Replaced the Supreme Court's earlier directive (which included the Chief Justice of India) with a Union Cabinet Minister, giving the government a majority on the panel. সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি নয়, প্রধানমন্ত্রী নিজে, প্রধানমন্ত্রী মনোনীত তার মন্ত্রিসভার একজন সদস্য এবং বিরোধী দলের নেতা, এই কাজ করবে। অর্থাৎ নিয়োগ প্রক্রিয়াকে ২ : ১ ভোটের সাহায্যে সরকারপক্ষ নিয়ন্ত্রণ করবে। 

এভাবে খেলার মূল নিয়ন্ত্রক রেফারি লাইন্সম্যানদ্বয় ও চতুর্থ রেফারি সকলে সরকারপক্ষের প্রসাদপুষ্ট হয়ে গেলো। গণতন্ত্রের গোড়ায় অ্যাসিড ঢালা সাঙ্গ হল। উল্লেখযোগ্য যে ২০২৪ এর লোকসভার নির্বাচনের আগেই এই পরিবর্তনটি সাধিত হয়েছিল। রাহুল গান্ধীর দেওয়া হিসেব অনুযায়ী অন্তত ৭৯ টি লোকসভা কেন্দ্রে নির্বাচন কমিশন অস্বচ্ছতা দেখিয়েছে। নির্বাচন শেষে মোট প্রদত্ত ভোটের যে হিসেব কমিশন থেকে প্রেস রিলিজ করা হয়, তার কয়েক ঘণ্টা পর রাত্রে প্রদত্ত ভোটের হার পাঁচ ছয় শতাংশ বৃদ্ধি পায় এবং সেই কেন্দ্রগুলি সবই বিজেপির দখলে গিয়েছে। তা না হলে লোকসভায় বিজেপির নির্বাচনী ফলাফল আরো শোচনীয় হতো। 

এই অবস্থায় নির্বাচন কমিশন আরো সতর্ক হল এবার নির্বাচনের আগেই একচেটিয়া ভাবে বিভিন্ন নির্বাচনী কেন্দ্রে নির্দিষ্ট বুথ গুলি, যেখানে বিজেপি বিরোধী শক্তি অতিশক্তিধর সেই সমস্ত বুথ থেকে বেপরোয়া নাম বাতিল করা হলো। মহারাষ্ট্রে দিল্লিতে বিহারে। ফল পাওয়া গেল হাতে নাতে। এবার সেই অভিজ্ঞতাকে প্রয়োগ করলো বাংলার নির্বাচনে। তাদের লক্ষ্য ছিল ন্যূনতম দেড় কোটি নাম বাদ দেওয়া। কিন্তু প্রাথমিক নিয়ম-কানুন, ২০০২ সাল কে ভিত্তি করে ম্যাপিং, এসবের মাধ্যমে মাত্র ৫৮ লক্ষ নাম বাদ গেল। বোঝা গেল তাদের লক্ষ্য সিদ্ধ হচ্ছে না। তাই এরপর তারা খেলার নিয়ম পরিবর্তন করে, নতুন নতুন যুক্তি আমদানি করলো, লজিক্যাল ডিসক্রিপেন্সির নামে। ক্লারিক্যাল এবং টেকনিক্যাল ডিসক্রিপেন্সি কে হাজির করলো। এক কোটি পঁয়ত্রিশ লক্ষ মানুষ অভিযুক্ত হল। 

সুপ্রিম কোর্টের হস্তক্ষেপের ফলে এই সংখ্যাটা কমে আসার সম্ভাবনা। তাই নতুন করে নাম তোলার ব্যবস্থা এবং সেই নাম নির্বাচনের আগের দিন পর্যন্ত অপ্রকাশ থাকার ব্যবস্থা হয়েছে। বিহার, উত্তর প্রদেশ, আসাম, থেকে রাতারাতি কয়েক লক্ষ ভোটারকে পাঠিয়ে, ভোটের দিন ভোট দিয়ে, সেই কাঙ্খিত দেড় কোটি সংখ্যাটাকে বজায় রাখার মরিয়া প্রচেষ্টা। এখানেই শেষ না, নির্বাচন ঘোষণার দিন ১৫ আগে থেকে লক্ষ লক্ষ কেন্দ্রীয় বাহিনী ঢুকতে শুরু করলো। তারা নিয়মিত সকাল সন্ধ্যা বিভিন্ন এলাকায় রুট মার্চ করে চলেছে। এই সমস্ত কেন্দ্রীয় বাহিনীর কীর্তিকলাপ ইতিপূর্বে মনিপুর বারে বারে দেখেছে। সাম্প্রতিক মেইতেই - কুকি দাঙ্গায় এরা সংখ্যাগুরুর পক্ষ অবলম্বন করেছে। এদের হাতেই মনোরমা ধর্ষিতা হয় এবং খুন হয়। এরাই শীতলকুচি ঘটিয়েছে। বলা যায় এদের নামানো হয়েছে মানুষকে আশ্বাস দেওয়া নয়, সন্ত্রস্ত করার উদ্দেশ্য।

এরপরেই এই নির্বাচন কমিশন নির্বাচনের দিন ঘোষণার অনতিবিলম্বে, রাজ্যের মুখ্য সচিব, স্বরাষ্ট্র সচিব, উচ্চপদস্থ, নিম্নপদস্থ, সমস্ত স্তরের পুলিশ অফিসার, জেলায় জেলায় জেলা শাসকদের, খুশি মত বদল করতে থাকলো। তার আগেই আমরা জেনেছি এই রাজ্যের রাজ্যপাল কে পরিবর্তন করা হয়েছে। এখন বলা হচ্ছে ২৯৪ টি বিধানসভা কেন্দ্রে প্রতিটিতেই একজন করে কেন্দ্রীয় পর্যবেক্ষক অর্থাৎ ২৯৪ জন মাইক্রো অবজার্ভার নিয়োগ করা হচ্ছে। লক্ষ্য করুন আসাম বিধানসভায় ১২৬টি কেন্দ্রে কেন্দ্রিয় মাইক্রো অবজর্ভার এর সংখ্যা ৫১ জন। কেরলে ১৪০ আসনের বিধানসভায় মাইক্রো অবজার্ভারের সংখ্যা ৫১ জন। নির্বাচন কমিশনের প্রবণতা দেখে বোঝা যাচ্ছে অঘোষিত রাষ্ট্রপতি শাসন কায়েম করে তারা এরাজ্যে নির্বাচন সম্পন্ন করতে চায়। মুখ্যমন্ত্রীকে রাষ্ট্রপতি শাসনের মাধ্যমে অপসারণ করার ঝুঁকি না নিয়ে, মুখ্যমন্ত্রীর সমগ্র প্রশাসনযন্ত্র কে আপাদমস্তক ডানা ছেঁটে দিয়ে, নির্বাচন কমিশন নিজের ইচ্ছা ও পছন্দমত ভোট করতে চায়। 

এরপর দেখা যাবে ভোটের ক'দিন আগে থেকে বিজেপি বিরোধী রাজনৈতিক দলের নেতা কর্মীদের গ্রেপ্তার করা হবে শান্তিপূর্ণ ভোট পরিচালনার যুক্তিতে। দরকারে দু চার জায়গায় কেন্দ্রীয় বাহিনী শীতলকুচির পুনরাভিনয় ঘটাতে পারে। সর্বোপরি হাতে রইল ইভিএম মেশিন। এই সামগ্রিক অক্টোপাশের ভূমিকায় নির্বাচন কমিশন। যে কিনা আমাদের পৃথিবীর বৃহত্তম গণতন্ত্রের রক্ষক। এবারের নির্বাচনের তারিখ ঘোষণার বহু বহু পূর্ব থেকেই  একটি অগণতান্ত্রিক ভীতি ও আশংকা, অবিরাম নিয়ম বদল আমরা প্রত্যক্ষ করছি। ফলে জনগণের কাছে এই নির্বাচন "creeping" পরিবেশ। কি হয়, কি হয় আশঙ্কা, ভোট উৎসব নয়। নির্বাচন কমিশনের কাছে এই নির্বাচন নির্লজ্জভাবে নিয়ম ভাঙা, নতুন নতুন নিয়ম গড়া ও প্রভুর তোষামোদ করার রেকর্ড গড়ার প্রয়াস।

সমস্যা হল বাংলায় একটি প্রবাদ আছে বজ্র আঁটুনি ফস্কা গেঁড়ো। আসন্ন নির্বাচনে বঙ্গ বিজয়ের সমগ্র বজ্র আঁটুনি বন্দোবস্ত গুলো আমরা চোখে দেখতে পাচ্ছি। কিন্তু ফস্কা গেঁড়োটা ঠিক কোথায় একটু বুঝিয়ে বলি। যারা নাম বাদ দিচ্ছেন, নতুন নাম অন্য রাজ্য থেকে ঢোকাবেন বলে ঠিক করেছেন, মানুষকে ভোট না দিতে দেওয়ার পরিকল্পনা করছেন, তাদের একটা হিসেব আছে। পূর্ববর্তী নির্বাচনের ফলাফলের ভিত্তিতে সেই অনুযায়ী পরিকল্পনা হয়েছে। এখন সমস্যা হল, ইতিমধ্যে  এস আই আর পরিকল্পনা বাংলার মানুষের মনে কতটা বিরূপ প্রভাব ফেলল এবং তৃণমূলের পক্ষে কতটা জনসমর্থন যুক্ত হল, সেই হিসেবটা কমিশনের সামনে নেই। আবার ভাবুন গ্যাসের দাম বৃদ্ধি, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কাছে নির্লজ্জ আত্মসমর্পণ বা এসআইআর আতঙ্কে দুই শতাধিক মানুষের মৃত্যু, উত্তরবঙ্গকে বাংলা থেকে বিচ্ছিন্ন করার পরিকল্পনা, বিজেপি শাসিত রাজ্যে বাংলাভাষীদের ওপর অত্যাচার গণপ্রহার মৃত্যু, ভিন রাজ্যে মাছ মাংস আমিষের উপর বিজেপির নিষেধাজ্ঞা, এই সমস্ত ঘটনা বিজেপির জনসমর্থন কতটা কমিয়ে দিলো সেই হিসাবটা নির্বাচন কমিশনের কাছে বা শুভেন্দু শমীকের কাছেও নেই। তাদের কাছে পুরনো ভোটের হিসেবটাই সম্বল।

একবার ভাবুন প্রতারিত, বঞ্চিত ভোটারদের নিয়ে, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরাসরি দিল্লী যাত্রা করলেন। তারপর সুপ্রিম কোর্টে গিয়ে নিজেই প্রধান বিচারপতির সামনে বাংলার মানুষের বক্তব্য উপস্থাপন করলেন। এরপর কলকাতার মেট্রো চ্যানেলে লাগাতার ধর্ণা চললো। এই সমস্ত ঘটনা নির্বাচক মন্ডলীর ওপর কতটা প্রভাব ফেললো, সেই হিসেব বিজেপি বা নির্বাচন কমিশনের কাছে নেই। ফলে তাদের পক্ষে যত নাম ভোটার তালিকা থেকে বাদ দেওয়ার সম্ভব হলো, সেই হিসেবের সঙ্গে পরিবর্তিত জনমতের সঙ্গতি থাকল না। তখন বজ্র আঁটুনি ফস্কা গেঁড়ো। 

সহজ উদাহরণ দিয়ে বলি, মাত্র দিন কুড়ি আগেও একজন কট্টর বামপন্থী, কিন্তু সিপিএম বিরোধী ও তৃণমূল বিরোধী অবস্থানে স্থির ছিলেন। তিনি মনে প্রাণে চাইতেন তৃণমূলের বিকল্প হিসেবে বামশক্তি দ্বিতীয় স্থানে উঠে আসুক, যেমনটা আমিও চাই। লিবারেশন সহ সব বামেরা জোটবদ্ধ হলো। এদিকে নির্বাচন কমিশনের ভয়ংকর থাবা, দাঁত ও নখ স্পষ্ট হল। তার সামনে দাঁড়িয়ে তিনি অসহায়ের মতো দেখছেন, সিপিআইএম তখনও তার আক্রমণ ও সমালোচনার বর্শা মুখ মমতার দিকেই উদ্যত রেখেছে। এবার তাকেই বলতে শুনছি, না এবারও সিপিএম বিজেপির বিরুদ্ধে লড়াই করবে না। সিপিএম অন্য সব বামেদেরও ডোবাবে। অতএব, নো ভোট টু বিজেপি। এদের সংখ্যা বিজেপি ও কমিশনের সব হিসেবকে গোলমাল করে দিতে পারে।

ভাবতে পারেন, ১৪ আগস্ট, ২০২৪, অমন রাত দখলের পর দিন এক বামপন্থী আফসোস করেছিল, "ইস অভয়া কাণ্ডটা যদি দুমাস আগে হইতো, এক্কেবারে ফাইড়া ফ্যালাইতাাম।" মানে নির্বাচনের ফল অন্যরকম হতে পারতো। তারমানে বিজেপির ফল আরো ভালো হতে পারতো। এর দুমাস পর ছয়টি বিধানসভার উপনির্বাচন হয়েছিল। সেই উপনির্বাচনের ফলাফল কিন্তু স্পষ্টভাবে দেখিয়ে দিয়েছে, ক্ষমতাসীন তৃণমূল দলের ভোটের মার্জিন উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। অর্থাৎ জনগনেশ কি করছেন, কি ভাবছেন, তার হদিস পাওয়া বড়ই কঠিন। কথায় বলে ম্যান প্রোপোজেস এন্ড গড ডিসপোজেস। বিজেপি বা নির্বাচন কমিশন যা কিছুই প্রপোজ করুক না কেন, শেষ ডিসপোজ করার ভার জনগনেশের হাতে। কি হয় কে বলতে পারে? 

শুধু তো দাঁড় বাইলেই নৌকা আগায় না। 
পাল - হাল - চোরা স্রোত, 
সবদিকে খেয়াল রাখন চাই। 
নাও বাওয়া তো বাহাদুরের কাজ।

0 Comments

Post Comment