পড়শি যদি আমায় ছুঁতো যম যাতনা সকল যেত দূরে: লালন সাঁই

পড়শি যদি আমায় ছুঁতো যম যাতনা সকল যেত দূরে: লালন সাঁই

hhhhhhhhhhhhhh

সমস্ত পরিচিতির নারীদের বিরুদ্ধে ভারতের ছায়াযুদ্ধ

  • 01 January, 1970
  • 0 Comment(s)
  • 218 view(s)
  • লিখেছেন : সৌমি জানা
একটি সমাজে যখন নির্যাতন, জাত, ধর্ম, বর্ণের ভিত্তিতে হিংসা ও নির্যাতন গর্জে ওঠে এবং বিচারব্যবস্থা প্রায় অচল, তখন ন্যায়, সমানাধিকার, মানবাধিকার প্রহসন হয়ে দাঁড়ায়। এই ন্যাশনাল ক্রাইম রেকর্ড ব্যুরোর রিপোর্টই বলছে যে, পুলিশ ৭৭.৬% ক্ষেত্রে চার্জশিট দিলেও, আদালত হয়ে উঠেছে ন্যায়বিচারের কবরস্থান—অধিকাংশ মামলাই বিচারে পৌঁছয় না।

ন্যাশনাল ক্রাইম রেকর্ডস ব্যুরো (NCRB)-এর ‘Crime in India 2023’ রিপোর্ট কোনও নতুন গল্প বলে না; বরং এটি নারীদের বিরুদ্ধে চলমান এক ভয়াবহ ছায়াযুদ্ধের ধারাবাহিকতাকেই আরও একবার নিশ্চিত করে। ভারতে লিঙ্গভিত্তিক বৈষম্য ও নির্যাতন এক বিপর্যয়কর হারে স্থিতিশীল হয়েছে, যা শুধু নির্যাতনের পরিমাণই নয়, বরং সামাজিক বাস্তবতা হিসেবে তার স্বাভাবিকীকরণকেও প্রকাশ করে। ন্যাশনাল ক্রাইম রেকর্ড ব্যুরো ২০২৩- এর রিপোর্ট অনুযায়ী, ২০২২ সালের তুলনায় ০.৭% সামান্য বৃদ্ধি পেয়ে নারীদের বিরুদ্ধে অপরাধের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৪,৪৮,২১১। এটি কেবল রিপোর্টিং বৃদ্ধির ইঙ্গিত নয়, বরং একটি গভীর কাঠামোগত সংকটের স্থায়িত্বের প্রমাণ। প্রতি লক্ষ নারী-পিছু ৬৬.২টি অপরাধের জাতীয় হার স্পষ্ট করে দেয়, ভারতে লিঙ্গভিত্তিক হিংসা বা নির্যাতন কোন বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; এটি নীরবতা, ক্ষমতা ও দায়মুক্তিতে অনুমোদিত এক সামাজিক ধারা।

মোট সংখ্যার বিচারে উত্তরপ্রদেশ শীর্ষে (৬৬,৩৮১), অপরাধের হারে তেলেঙ্গানা সর্বোচ্চ (১২৪.৯), এবং রাজস্থানে অত্যন্ত উচ্চ হার (১১৪.৮)। জাতীয় রাজধানী দিল্লিতে এই হার ভয়াবহ ১৩৩.৬ প্রতি লক্ষ নারী। এই বিদ্রূপ আরও নির্মম, কারণ আমাদের ভুলে গেলে চলবে না যে সামাজিক লজ্জা, নির্যাতন, এর স্বাভাবিকীকরণ এবং ভয়ের কারণে অধিকাংশ নারীই নির্যাতনের বিরুদ্ধে অভিযোগ জানান না। ফলে এই তথ্য কেবল রিপোর্ট হওয়া অপরাধেরই প্রতিফলন।

এই রিপোর্ট আবারও আমাদের সেই কঠিন সত্যের মুখোমুখি করে যে ঘর মোটেই কোন পরিচিতির মেয়েদের জন্যেই কোনভাবেই নিরাপদ নয়।  বছরের পর বছর NCRB রিপোর্ট তুলে ধরছে এই সত্য যে, নারীদের জন্য সবচেয়ে বিপজ্জনক জায়গা এখনো বাড়িই। স্বামী বা আত্মীয়দের দ্বারা নির্যাতন (ধারা ৪৯৮এ) মোট মামলার প্রায় ৩০%। ধর্ষণের ৯৭.৫% ক্ষেত্রে অপরাধী পরিচিত ব্যক্তি—পরিবারের সদস্য, বন্ধু বা আত্মীয়। এই তথ্য ‘নারী নির্যাতন বাইরে হয়, ঘর নিরাপদ’—এই ভ্রান্ত ধারণাকে চূর্ণ করে। সহিংসতা আসলে পারিবারিক, ঘনিষ্ঠ ও সামাজিক ক্ষমতার শ্রেণিবিন্যাসে প্রোথিত, যেখানে নারীর শ্রম, নীরবতা ও সহনশীলতাকেই এখনও গুণ হিসেবে দাবি করা হয়। এটি শুধু সামাজিক নয়; এটি এক মূল্যবোধের কাঠামো। PWDVA 2005, ৪৯৮এ বা POCSO–এর মতো অধিকারভিত্তিক আইনকে তুচ্ছ করা, বিরোধিতা করা বা ফেমিনিস্ট আন্দোলনকে বিদ্রূপ করার মধ্য দিয়ে একই বার্তা দেওয়া হয়—নারীর অধিকার সাংবিধানিক নয়, শর্তসাপেক্ষ।

যখন অভিযুক্ত যৌন অপরাধীদের ‘ঐতিহ্য’-এর নামে মহিমান্বিত, স্বাভাবিকীকৃত ও রক্ষা করা হয়; পক্ষপাতদুষ্ট রায় ও অকার্যকর বিচারব্যবস্থা এই প্রবণতাকে জোরদার করে, তখন সমাজব্যবস্থায় ও সামাজিক পরিকাঠামোয় এক বিপজ্জনক সংকেত যায় যে এই পিতৃতান্ত্রিক ব্যবস্থার করিডরে নারীর নিরাপত্তা ও মর্যাদা দরকষাকষির বিষয়, গুরুত্বের নয়। লিঙ্গবিদ্বেষী ভাষা ও ঘৃণার স্বাভাবিকীকরণ ব্যক্তিগত ও সামাজিক পরিসরে ক্রমাগত বেড়ে চলা লিঙ্গভিত্তিক বৈষম্য ও নির্যাতনকে প্রাতিষ্ঠানিক বৈধতা দেয়।
এখন মাঝে মধ্যেই প্রশ্ন ওঠে নারী অধিকার আইনগুলির অপব্যবহার নিয়ে। আইনের অপব্যবহার বনাম অধিকারভিত্তিক প্রয়োগ—এই পার্থক্য নিয়ে আলোচনা হতে পারে, কিন্তু তা আইনগুলোর প্রয়োজনীয়তাকে অস্বীকার করার অজুহাত হতে পারে না। NCRB–এর তথ্যই দেখায় কেন এই পার্থক্য গুরুত্বপূর্ণ। পণবিরোধী আইন–এর অধীনে ১৫,৪৮৯টি মামলা (১৪% বৃদ্ধি) এবং ৬,১৫৬টি পণ-হত্যা স্পষ্ট করে—বিয়ে এখনও এক অর্থনৈতিক ও জবরদস্তিমূলক প্রতিষ্ঠান হিসেবে কাজ করছে। যে ঘরকে নারীর ‘নিজের জায়গা’ বলা হয়, সেটিই বেশিরভাগ ক্ষেত্রে নিয়ন্ত্রণ ও শাস্তির পরীক্ষাগারে পরিণত হয়।

আরেকটি বড় আঘাত এসেছে POCSO মামলার উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধির সঙ্গে। শিশু জনসংখ্যা প্রতি লক্ষে অপরাধের হার ২০২২–এ ৩৬.৬ থেকে ২০২৩–এ বেড়ে হয়েছে ৩৯.৯। ২০২৩ সালে দায়ের হওয়া ৬২,২০৮টি POCSO মামলা শিশুদের গভীর ঝুঁকির বাস্তবতা উন্মোচন করে। এই মামলাগুলি ভারতের নারীদের বিরুদ্ধে মোট মামলার ১৪.৮%। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই অপরাধীরা পরিচিত—শিক্ষক, আত্মীয়, প্রতিবেশী। এটি প্রাপ্তবয়স্কদের সহিংসতারই প্রতিচ্ছবি এবং দেখায়—পিতৃতান্ত্রিক অধিকারবোধের ধারাবাহিকতা শৈশব থেকেই শুরু হয়।

আধুনিক সময়ে ‘ডিজিটাল বা অনলাইন জগতে নির্যাতন’ আরও এক নতুন মাত্রা যোগ করেছে। ২০২২–এর তুলনায় সাইবার অপরাধ বেড়েছে ৩১.২%। নারীদের লক্ষ্য করে হওয়া এই অপরাধগুলি ভৌগোলিক সীমা ছাড়িয়ে এক নতুন নির্যাতনের ক্ষেত্র তৈরি করেছে - যেখানে নিয়ন্ত্রণ দুর্বল, দায়মুক্তি প্রবল। অনলাইন হেনস্থা, ডিপফেক, ডিজিটাল স্টকিং - সবই পিতৃতান্ত্রিক সহিংসতার ডিজিটাল সম্প্রসারণ। যে ফোন ও সোশ্যাল মিডিয়া আমাদের যুক্ত করে, সেগুলিই প্রায়শই নিয়ন্ত্রণ, নজরদারি, হুমকি বা লজ্জা দেওয়ার অস্ত্র হয়ে ওঠে। প্রযুক্তি-সক্ষম লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতা (TFGBV) এখন দৈনন্দিন জীবনের অংশ। ২০২৩ সালে নথিভুক্ত সাইবার অপরাধের ৬৮.৯% ছিল প্রতারণার উদ্দেশ্যে (৮৬,৪২০টির মধ্যে ৫৯,৫২৬টি), এরপর যৌন শোষণ ৪.৯% (৪,১৯৯টি) এবং অন্যান্য।

অনেকে প্রশ্ন করেন—সমতা নাকি প্রতিষ্ঠিত, তাহলে লিঙ্গভিত্তিক আইনের প্রয়োজন কী? আসল প্রশ্ন হওয়া উচিত—কোন সমতার কথা বলা হচ্ছে? যে ব্যবস্থায় চার্জশিট দাখিলের হার উদ্বেগজনকভাবে কম, বিচারাধীন মামলার জট পাহাড়সম - সেখানেই উত্তরটা স্পষ্ট হয়ে যায়।

একটি সমাজে যখন নির্যাতন, জাত, ধর্ম, বর্ণের ভিত্তিতে হিংসা ও নির্যাতন গর্জে ওঠে এবং বিচারব্যবস্থা প্রায় অচল, তখন ন্যায়, সমানাধিকার, মানবাধিকার প্রহসন হয়ে দাঁড়ায়। এই ন্যাশনাল ক্রাইম রেকর্ড ব্যুরোর রিপোর্টই বলছে যে, পুলিশ ৭৭.৬% ক্ষেত্রে চার্জশিট দিলেও, আদালত হয়ে উঠেছে ন্যায়বিচারের কবরস্থান—অধিকাংশ মামলাই বিচারে পৌঁছয় না। ধর্ষণের দোষী সাব্যস্ত হওয়ার হার মাত্র ২২.৭%। অর্থাৎ কত কম অভিযুক্ত সত্যিই শাস্তি পায়, আর ভুক্তভোগীর কাছে ন্যায়বিচার কতটা ধাপ্পা বুঝতে অসুবিধা হয় না। এনসিআরবি ২০২৩ এর রিপোর্ট অনুযায়ী-
● ২০২৩ সালের শেষে ২৫ লক্ষেরও বেশি মামলা বিচারাধীন।
● বিচারাধীনতার হার ৯০ শতাংশ অর্থাৎ অধিকাংশ বেঁচে যাওয়া মানুষের কাছে ন্যায়বিচার এক কল্পকাহিনি।

যখন লিঙ্গভিত্তিক অধিকার আইন শিথিল করার দাবি ওঠে, NCRB রিপোর্ট সেই বিদ্রূপই উন্মোচন করে—বেশিরভাগ মামলা কাগজেই রয়ে যায়; না চার্জশিট, না অগ্রগতি, না ন্যায়বিচার। NCRB ২০২৩ অনুযায়ী (পণ-হত্যা, স্বামী বা আত্মীয়ের দ্বারা নির্যাতন, নারীর শালীনতা লঙ্ঘন):

স্বামী বা আত্মীয়ের দ্বারা নিষ্ঠুরতা:
● পুলিশ চার্জশিট হার: ৮৭.৫%
● আদালতে দোষী সাব্যস্ত হওয়ার হার: ১৪.৬%
● বিচারাধীনতার হার: ৯০.৪%

এই বিচারিক স্থবিরতা প্রশাসনিক শুধু নয় বরং নৈতিক। প্রতিটি বিলম্বিত বিচার সমাজকে বার্তা দেয়—নারীর যন্ত্রণা ব্যয়যোগ্য, তার সাক্ষ্য দরকষাকষির বিষয়।
অতএব, NCRB ২০২৩ এক কাঠামোগত ও ছায়াযুদ্ধের ছবি তুলে ধরে। যা কোন কল্পকাহিনির যুদ্ধক্ষেত্র নয়, বরং আমাদের চারপাশের ঘর, অফিস, রাস্তা ও আদালতেই যার লড়াই। এটি দেখায় কীভাবে প্রাতিষ্ঠানিক অবহেলা ও পিতৃতান্ত্রিক মতাদর্শ মিলেমিশে লিঙ্গভিত্তিক নির্যাতন ও হিংসার সংস্কৃতিকে টিকিয়ে রাখে। লিঙ্গভিত্তিক হিংসা শুধু আইনশৃঙ্খলার প্রশ্ন নয়; এটি একটি গণতন্ত্রের নৈতিক স্বাস্থ্যের মাপকাঠি। যতদিন না আমরা বুঝব যে একটি ধুঁকতে থাকা বিচারব্যবস্থা মানে ন্যায়বিচারের অস্বীকৃতি; আর যতদিন পিতৃতন্ত্রকে কেবল ‘সংস্কৃতি’ বলে ভুল বোঝা হবে—ততদিন সহিংসতা স্বাভাবিকই থাকবে, প্রতিষ্ঠান দ্বারা বৈধতা পাবে এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মে উত্তরাধিকার হিসেবে বয়ে যাবে। কারণ আধিপত্য ও অবজ্ঞার ভাষা যখন স্বাভাবিক হয়ে যায়, তখন লিঙ্গভিত্তিক নির্যাতন আর ব্যতিক্রম থাকে না—সেটিই হয়ে ওঠে ব্যবস্থা।

(NCRB ২০২৩–এর এক ফেমিনিস্ট পাঠ)

0 Comments

Post Comment