পড়শি যদি আমায় ছুঁতো যম যাতনা সকল যেত দূরে: লালন সাঁই

পড়শি যদি আমায় ছুঁতো যম যাতনা সকল যেত দূরে: লালন সাঁই

hhhhhhhhhhhhhh

কণ্ঠরোধের আইন-ঔপনিবেশিক ধারাবাহিকতা

  • 20 August, 2021
  • 0 Comment(s)
  • 546 view(s)
  • লিখেছেন : ঋতম মাজি
দেশদ্রোহিতা’ আইনের বেশ কিছু ধারা ১৮৭০ সালে গৃহীত হয়। এমন বক্তব্য বা লেখা যা সরকারের প্রতি ‘অসন্তোষের উদ্রেক’ করে তাকেই দেশদ্রোহিতা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। ১৮৯৮-এর সংশোধনীতে এই দেশদ্রোহিতার ধারণা ও নীতিকে আরও তীক্ষ্ণ করা হয় এবং যে কোনো ধরণের সরকারের প্রতি ‘এনমিটি' বা বিরুদ্ধতাকেই চিহ্নিত করা হয় দেশদ্রোহ হিসেবে। বাল গঙ্গাধর তিলকের বিরুদ্ধে দেশদ্রোহ মামলার পরবর্তীতেই এই সংশোধনী গৃহীত হয় এবং তিলকের বিরুদ্ধে মামলার অন্যতম প্রধান কারণ ছিল কেশরী ও মারাঠা পত্রিকায় ‘ব্রিটিশ রাজ’ বিরোধী প্রচার।

আমাদের দেশের বর্তমান রাজনৈতিক ইতিহাস বিশেষত রাষ্ট্রকাঠামো ও তার শাসনপদ্ধতির মধ্যে একঘেয়ে এক আবর্তন রয়েছে, রিপিটেশন বা পুনরাবৃত্তি রয়েছে, একবার নয় অসংখ্যবারের পুনরাবৃত্তি- ঔপনিবেশিক ধারার শাসনের। একটা সময়ের পর থেকে ঔপনিবেশিক নজরদারি ও ক্ষমতার কেন্দ্রীভবন ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের টিকে থাকার ক্ষেত্রে প্রধান রাস্তা হয়ে ওঠে। বিভিন্ন দমনমূলক আইন, শাসনের বিভিন্ন পদ্ধতি, কাঠামোগত শোষণ আর সমস্ত পদ্ধতির মধ্যেই এক আপাত বিমূর্ত সংযোগ – ‘টোট্যালিটেরিয়ান পাওয়ার’ বা সর্বগ্রাসী, সর্বশক্তিমান, ঈশ্বরতুল্য এক রাষ্ট্রকাঠামো নির্মাণ তথা এক বিশাল সাম্রাজ্যকে স্থায়িত্ব দেওয়ার যন্ত্র হিসেবে গড়ে উঠতে শুরু করে ঔপনিবেশিক রাষ্ট্রব্যবস্থা এবং প্রজেক্টটি অবশ্যই আন্তর্জাতিক স্তরের অর্থাৎ সমান্তরালভাবেই বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষা চলতে থাকে উপনিবেশগুলিতে। ভারতবর্ষ ছিল এই পরীক্ষার অন্যতম কেন্দ্র।

প্রাককথনঃ

এ কথা অনস্বীকার্য যে ১৭৯৯ সালে লর্ড ওয়েলসলি-র সময় থেকেই প্রকাশনা সেন্সর করার প্রচেষ্টা শুরু হয়। এমনকি ১৮২৩-র সময়েই প্রকাশনা ও মুদ্রণের ক্ষেত্রে লাইসেন্স বাধ্যতামূলক করা হয়। তৎকালীন সময়ে রাজা রামমোহন রায় এবং অন্যান্য ব্যক্তিবর্গ এর বিরুদ্ধে সর্বোচ্চ আদালতে গেলেও বিশেষ লাভ হয়নি এবং ১৮২৩ সালের প্রেস অর্ডিন্যান্স আইন হওয়ার প্রতিবাদে মিরাট-উল- আকবর পত্রিকার প্রকাশনা বন্ধ করেন। সেই সময়ে ‘ক্যালকাটা ক্রনিকাল’ ও ‘ক্যালকাটা জার্নাল’ – এর মতো পত্রিকাও দমননীতির সামনে পড়ে। তবে তখনও ভারতের ইংরেজি পত্রিকাগুলিতে কোম্পানির অফিসাররা সব সমালোচনার মধ্যেই মূলত জ্যাকবিনদের ভুতই দেখছিলেন।

১৮৫৭-র মহাযুদ্ধ সেখানে একটা নতুন অধ্যায়ের সূচনা। দেশের বিভিন্ন প্রান্তের বিদ্রোহ তখন সাম্রাজ্যের বুনিয়াদ স্পষ্টভাবেই নাড়িয়ে দিতে সক্ষম হয়েছিল। লড়াইয়ের শহীদদের কথা তখন জনমানসে, আর তখন থেকেই খবর ছড়িয়ে দেওয়ার এবং রাজনৈতিক চেতনা সুসংহত করার অন্যতম মাধ্যম হয়ে ওঠে দেশীয় সংবাদপত্রগুলি। এবার আর জ্যাকবিনদের ভুত নয় বরং ‘কুসংস্কারাচ্ছন্ন ও কালা চামড়া’-র শাসিতের কাছে হেরে যাওয়ার ভয়।

শাসনের বুনিয়াদঃ

১৮৭৮-এর আইন এমন কিছু শর্ত তৈরি করেছিলো যার প্রভাব ভারতবর্ষের ক্ষেত্রে সুদূরপ্রসারী। তার অন্যতম দুটি কারণ হল –

১। সমস্ত পত্রিকাকেই, বিশেষত দেশীয় সংবাদপত্রগুলিকে প্রায় সর্বক্ষণের এক নজরদারির মধ্যে নিয়ে আসা; প্রতিটা লেখাপত্র, বক্তব্য, খবর সবটারই কপি জমা করতে হবে সরকারি দপ্তরে। আধুনিক ভাষায় বলতে গেলে ‘পোটেনশিয়াল থ্রেট’-কে বোঝার নামে এক সর্বক্ষণের নজরদারি।

২। যে কোনো প্রকাশনা যা ব্রিটিশের রাজত্ব বিরোধী তা হয়ে ওঠে শাস্তিযোগ্য অর্থাৎ যেকোনো ক্ষেত্রে বক্তব্য, লেখাপত্র সবকিছুর বিরুদ্ধেই সরকারের সন্দেহ হলেই তার বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নেওয়া যেতে পারে, সেটাকে ‘রাষ্ট্রদ্রোহিতা’ হিসেবে চিহ্নিত করা যেতে পারে।

এরকম বিভিন্ন কারণের জন্যেই ‘দেশীয় সংবাদপত্র আইন’ মূলত নজরদারির এক শক্তিশালী কাঠামো তৈরি করেছিলো যা পরবর্তী আইনগুলিতে এমনকি বর্তমান সময়েও পরিলক্ষিত হয়।

আজকের ‘দেশদ্রোহ’ আর ঔপনিবেশিক ‘রাষ্ট্রদ্রোহ’ এক এই অর্থে হয়ে যায় - ক্ষমতা,শাসনের বা শাসকের দর্শনকে সমালোচনা মানেই তা অপরাধ। মুক্তচিন্তা হয়ে ওঠে ‘সন্দেহজনক’! আর সেই সুত্রেই গুরুত্বপূর্ণ ১৮৭৮-এর ‘দেশীয় সংবাদপত্র আইন’। নিয়ন্ত্রণ ও শাসন যার মূল কথা।

১৮৮১ পরবর্তীঃ

সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়দের ‘ভারত সভা’ প্রতিষ্ঠার পর থেকেই সরব ছিল মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিয়ে, ১৮৭৮ এর আইন বিরোধী আন্দোলনে এই সংগঠন দেশের বিশেষত বাংলার সদ্য বিকশিত সিভিল সোসাইটিকে এক অর্থে সংগঠিত করেছিলো গণতন্ত্রের প্রশ্নে। পরবর্তীতে ভারত সভা সহ অন্যান্য সংগঠনের যৌথ প্রচেষ্টায় গঠিত হয় জাতীয় কংগ্রেস। একদিকে কোম্পানির লক্ষ্য দীর্ঘকালীন শাসন এবং অন্যদিকে জাতীয়তাবাদীদের ক্ষমতা অর্জনের লড়াই- এই পর্যায়ের ঐতিহাসিক গুরুত্ব অবশ্যই অপরিসীম।যদিও কংগ্রেসকে মান্যতা দেওয়ার একটা অন্যতম কারণ হয়তো ব্রিটিশদের ক্ষেত্রে ছিল দেশব্যাপী অসন্তোষকে প্রশমিত করা- বিশেষত কৃষক আন্দোলনকে।দেশীয় সংবাদপত্রের ক্ষেত্রেও এই সময় নিজেকে সংগঠিত করার এবং সরাসরি রাজনৈতিক পক্ষ নেওয়ার। হিন্দু পেট্রিয়ট, অমৃতবাজার-এর মতো পত্রিকার সরাসরি ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের বিরোধিতা তৎকালীন শিক্ষিত সমাজের পারস্পরিক সম্পর্ক স্থাপনের ক্ষেত্রে ছিল গুরুত্বপূর্ণ।

১৮৮৫ টেলিগ্রাফ আইনঃ

ব্রিটিশ সরকার নতুন আইন এবং নির্দেশনামা জারি করে টেলিগ্রাফ, টেলিগ্রামের মতো বিভিন্ন মাধ্যমের অফিস স্থাপনের লাইসেন্স ও প্রচলন নিয়ে এবং মাধ্যমের সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ এবং গোপন তথ্যের অন্যথায় জেল বা দ্বীপান্তরের শাস্তির কথা ঘোষিত হয়।প্রাথমিকভাবে আইনটি পড়লে খুব স্বাভাবিকভাবেই মনে হবে সরকারি তথ্যের গোপনীয়তা বিষয়ক আইন কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো যোগাযোগের উপর এবং তথ্যের আদান-প্রদানের ক্ষেত্রে সরকারের সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ। সরকারবিরোধী যেকোনো তথ্য আদানপ্রদান করা বা মানুষ বিরোধী যে কোন নীতির সম্বন্ধে জানতে পারলেও কারুর অধিকার নেই তা প্রচার করার।

১৮৮৯ এর আইনঃ

তবে ১৮৮১-তে কুখ্যাত আইনটি বাতিল হলেও সংবাদপত্রের স্বাধীনতার উপর হস্তক্ষেপ বন্ধ হয়নি। নজরদারির যন্ত্রপাতি ক্রমশই তীক্ষ্ণ হয়ে উঠেছিল। ১৮৭৮-এর আগে থেকেই শিশির কুমার বসুর অমৃতবাজার নীলচাষীদের দুরাবস্থা নিয়ে এক দৃঢ় প্রচার চালিয়ে যাচ্ছিলো, যা ব্রিটিশ সরকারের রাগের অন্যতম কারণ ছিল সেই সময়।এমনকি লর্ড ইডেন বসুকে তার দফতরে ডেকে পাঠিয়ে নির্দেশ দেন তার সম্পাদকীয় প্রকাশনার আগে জমা করার জন্যে, যার উত্তরে শিশির বসু সোজাসুজি না করেন।১৮৭৮-এর আইনের পর অমৃতবাজারের বাংলা প্রকাশনা বন্ধ হলেও ইংরেজি সংখ্যা সরকারের অস্বস্তির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। পত্রিকায় দেশীয় মানুষ বিরোধী বিভিন্ন নীতি ও পদক্ষেপের বিষয়ে আগাম প্রকাশিত প্রতিবেদন ও গোপন তথ্য ফাঁস সরকারের কার্যকলাপকে সমস্যার মধ্যে ফেলতে শুরু করে। ভোপাল ও কাশ্মীর বিষয়ে গোপন সরকারী নথির প্রকাশ দেশ জুড়ে সাড়া ফেলে দিয়েছিলো।

এরকমই বিভিন্ন সুত্র ধরে পরবর্তীতে পাশ হয় ১৮৮৯এর ‘অফিসিয়াল সিক্রেটস আইন’। যে আইনের মূল লক্ষ্যই ছিল বিভিন্ন প্রকল্প ও নীতি সম্বন্ধীয় সরকারী নথির গোপনীয়তা বজায় রাখা এবং কোম্পানির স্বার্থকে সুরক্ষিত রাখা। শাস্তি- জেল, দ্বীপান্তর এবং প্রচুর টাকা জরিমানা; প্রয়োজনে প্রকাশক ও মুদ্রণ কেন্দ্রের সম্পূর্ণ দখল নিতে পারতো সরকার।

ঔপনিবেশিক শাসন আর স্বাধীনতাত্তোর গণতন্ত্র এ ক্ষেত্রে পরিপন্থী হওয়ার কথা কারণ তথ্যের গোপনীয়তা এবং সমস্ত কার্যক্রমের উপর নজরদারি গণতন্ত্রের প্রাথমিক শর্ত নয়। গোপনীয়তা রক্ষার প্রশ্নেও সরকার সবসময় দায়বদ্ধ যে কোনো পরিকল্পনা, নীতি এবং অন্যান্য যেকোনো বিষয়ে সঠিক তথ্য প্রয়োজনে জনসমক্ষে আনতে, অবশ্যই সে ক্ষেত্রে জনমতের প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। এমনকি জনগণের থেকে কি তথ্য সংগৃহীত হবে বা কার সাথে আদান প্রদান হবে সেই বিষয়েও সিদ্ধান্ত গ্রহণ জনাদেশকে মাথায় রেখেই করতে হবে, এটা গণতন্ত্রের প্রাথমিক শর্তের মধ্যে অন্যতম। কারণ গণতন্ত্রে সরকারের স্বার্থ এক্ষেত্রে একমাত্র জনতার স্বার্থ।

কিন্তু আধারের মাধ্যমে হোক বা অন্যান্যভাবেই হোক বায়োমেট্রিক নির্ভর নজরদারি আমাদের ‘শাসিত’ থেকে ‘নাগরিক’ হয়ে ওঠার লড়াইকেই সম্পূর্ণরুপে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করায়। রাফায়েল-এর দুর্নীতি ফাঁস হওয়ার পরে সরকার তরফে সামরিক ‘গোপনীয়তা’ জনসমক্ষ্যে আনার অপরাধে বিরোধীদের শাস্তি দেওয়ার হুমকি কখনই গণতান্ত্রিকতার পরিচায়ক নয় বরং তা সেই একঘেয়ে ঔপনিবেশিক পুনরাবৃত্তি যেখানে ‘কোম্পানি ও পুঁজি’ –র মানুষ বিরোধী স্বার্থকে সুনিশ্চিত করাই সরকারের একমাত্র লক্ষ্য।

সমসাময়িক আরেকটি বিষয় নিয়ে কথা না বললে ছবিটা অসম্পূর্ণ থেকে যায় –

১২৪(এর ক) ধারাঃ

‘দেশদ্রোহিতা’ আইনের এই ধারা ১৮৭০ সালে গৃহীত হয়। এমন বক্তব্য বা লেখা যা সরকারের প্রতি ‘অসন্তোষের উদ্রেক’ করে তাকেই দেশদ্রোহিতা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। ১৮৯৮-এর সংশোধনীতে এই দেশদ্রোহিতার ধারণা ও নীতিকে আরও তীক্ষ্ণ করা হয় এবং যে কোনো ধরণের সরকারের প্রতি ‘এনমিটি' বা বিরুদ্ধতাকেই চিহ্নিত করা হয় দেশদ্রোহ হিসেবে। বাল গঙ্গাধর তিলকের বিরুদ্ধে দেশদ্রোহ মামলার পরবর্তীতেই এই সংশোধনী গৃহীত হয় এবং তিলকের বিরুদ্ধে মামলার অন্যতম প্রধান কারণ ছিল কেশরী ও মারাঠা পত্রিকায় ‘ব্রিটিশ রাজ’ বিরোধী প্রচার।

স্বাধীনতাত্তোর ভারতের বাস্তবতা হলো এই দেশদ্রোহিতা আইন এখনও রয়েছে এবং ২০১৪ পরবর্তী সময় থেকে যথেচ্ছভাবে রাজনৈতিক কর্মী, ছাত্র যুব আন্দোলনকারী, গবেষকদের উপর প্রয়োগ করা হচ্ছে। স্বাধীনতার ৭৫ বছরে তাই সুবিচার-স্বাধীনতা-সমানাধিকার ও সুসম্পর্কের সমীকরণটা ক্রমশ গুলিয়ে যাচ্ছে।

তথ্যসূত্রঃ

https://www.thedailystar.net/in-focus/news/the-early-history-press-freedom-bengal-2087157

https://dot.gov.in/act-rules-content/2442

রোল অব ভার্নাকুলার প্রেস ডিউরিং ব্রিটিশ রুল ইন ইন্ডিয়া, ডঃনজাকত হুসেন

সেন্সরশিপ অফ দ্য ইন্ডিয়ান প্রেস বিটুইন ১৮৫৭ অ্যান্ড ১৯৪৫, ভাগবত প্রসাদ সিং

দ্য ইন্ডিয়ান প্রেস, বিশ্বনাথ আইয়ার

0 Comments

Post Comment